মিডিয়ায় নিজেকে দেখানোর লোভ সংবরণ করতে পারলে একাডেমিক শিক্ষা আরও সুফল বয়ে আনবেনা শাহীন সামাদ


 

[শাহীন সামাদ বাঙলাদেশের একজন প্রতিথযশা সংগীতশিল্পী। তিনি স্বাধীনবাঙলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী, পরিচিত এক মুখ সংগ্রামে-আন্দোলনে-শুদ্ধ সংগীতের চর্চায়। এবার একুশে পদক পেলেন এই গুণী শিল্পী। দীর্ঘকাল ধরে জড়িত আছেন ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের সাথে। বর্তমানে পঞ্চম এবং সমাপণী বর্ষের শিক্ষকতার দায়ভার তাঁর উপর। নজরুল সঙ্গীত প্রচার ও প্রসারের জন্য তার আন্তরিকতা ও উদ্যম অশেষ। হারানো দিনের গান নিয়ে একক অ্যালবাম তৈরি করছেন তিনি। অ্যালবামে আছে ৬০ দশকের পরবর্তী সময়ের ১০টি গান। গানগুলোর ভয়েস রেকর্ডিং করা হয়েছে ছায়ানটের স্টুডিওতে। সংগীত পরিচালনা করেছেন দূর্বাদল চট্টোপাধ্যায়। এটি শাহীন সামাদের চতুর্থ একক অ্যালবাম। ‘নিশিরাত’ শিরোনামের অ্যালবামটি প্রকাশ করেছে লেজার ভিশন। শাহীন সামাদ পাঁচ মিশালি গান নিয়ে একসঙ্গে দুটি অ্যালবাম প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, প্রাচীন লোকসঙ্গীত, দেশের গান, আধুনিক গান, ডিএল রায়, রজনীকান্ত সেনসহ বিভিন্ন ধারার গান দিয়ে অ্যালবামটি সাজানো হচ্ছে। শাহীন সামাদ সর্বশেষ ২০০৯ সালে আধুনিক গান নিয়ে তার পঞ্চম একক অ্যালবাম ’সন্ধ্যাতারা’ প্রকাশ করেছেন। তার সঙ্গে কথা বললেন জুয়েইরিযাহ মউ। তার অনুমতি নিয়ে কথাবলিতে আবার প্রকাশ করা হলো। এই সাক্ষাত্কারটি পূর্বে বাংলামেইল২৪ডটকম এ প্রকাশিত হয় ।]

 

অভিনন্দন একুশে পদক প্রাপ্তিতে; প্রথমে তবে এ নিয়েই কথা বলি, একুশে পদক আজ কতটা গুরুত্ববহ বলে মনে হয়?

আমার তো ইদানীং কালের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রচণ্ড গুরুত্ববহই মনে হয়। কারণ যথাযথভাবে বিবেচনা করেই নানান ক্ষেত্রের মানুষদের এ পদক প্রদান করা হয় বলে আমার বিশ্বাস। চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।

বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সাথে জড়িত থেকে আন্দোলন করেছেন, মুক্তাঞ্চলে গানগুলোকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেদিন যারা ছিলেন তাঁরা কি আজ মুক্তিযুদ্ধের সেই আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছেন বলে মনে করেন?

আসলে এখন চুয়াল্লিশ বছর পর, অবস্থা অনেক পালটে গেছে। সবার বয়স বেড়ে গেছে। পুরোপুরি ছড়িয়ে দিতে পেরেছি বলবো না। কিন্তু এখন তো অনেক মিডিয়া, ৩০-৪০টার উপরে, অনেক এডভান্স ছেলেমেয়েরা। ঠিক আদর্শটা দৃঢ়ভাবে ছড়ায়নি এই দেশে। ৭১ এ যে গান সে গানই কি ছড়ালো? না তো। বেসরকারী উদ্যোগে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছিলাম আমরা। কিন্তু সরকারীভাবে সংরক্ষণের তেমন কোন ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। অথচ উচিৎ ছিল এ সমস্ত গান সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে স্কুল-কলেজে-গ্রামে-মফস্বলে, জেলায় জেলায় প্রচারের ব্যবস্থা করা। গণজাগরণ মঞ্চ একটা উদ্যোগ নিয়েছিল, সেটাও আশার আলো দেখেনি। ওরা সুরে চেঞ্জ এনেছে, এটাও ঠিক হয়নি। যে গান যেরকম করে আমরা শিখেছি গুরুদের কাছ থেকে তা সেরকমই রাখতে হবে। এ পরিবর্তন তো মেনে নেওয়া যায় না। অজিত রায়, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, পটুয়া কামরুল হাসান, সনজীদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক – এরকম মানুষজনের কাছ থেকে গান শেখা গানের চর্চা করা তাঁদের সান্নিধ্যে থেকে। এসবের মূল্য তো দিতে হবে তরুণ প্রজন্মকে তাইনা?

মিউজিক পাইরেসির বিষয়ে কী অভিমত আপনার?

সরকারীভাবে এগুলো প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ। আমরা শিল্পীরা তো এফেক্টেড হই। সিনেমা হলে মানুষ যায় না, সিডি কিনে মানুষ গান শোনে না, রয়্যালটির টাকাও আমরা পাই না। সরকার যদি লক্ষ্য রাখে তাহলে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে মনে হয়। যারা গীতিকার যারা শিল্পী তাদের মূল্যায়নই হয় না প্রায়। দেখো না ৬০-৭০ এর দিকে কী দারুণ কথা ছিল গানের। এখন অনেকে চলে গেছেন। আর নতুনদের বেশিরভাগের লেখা গানের লিরিক্স অতো মানসম্মত নয়।

রবীন্দ্রসংগীত বা নজরুলগীতিতে ফিউশন ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখেন?

ফিউশনে আপত্তি নেই কিন্তু কথা-সুর ঠিক থাকতে হবে। যে ইন্সট্রুমেন্টই ব্যবহার কর যভাবেই কর নজরুল বা রবীন্দ্রনাথ যে কথা আর সুর লিখে রেখে গেছেন তা বদলে ফেলবে ফিউশনের দোহাই দিয়ে তা তো হয় না।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কী অবস্থা বাংলাদেশে?

বেশ ভালো, দশ বছরে আমি বলবো অনেক এগিয়েছে শ্রোতার সংখ্যা কিংবা চর্চার দিক দিয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। এই যে বেঙ্গলের ক্ল্যাসিকাল মিউজিক নিয়ে এই আয়োজন এছাড়া ছায়ানটও বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে, তিনদিন ব্যাপী উৎসবের আয়োজন করছে কবছর থেকে। এতে শ্রোতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাগ সম্পর্কে বোঝা, কখন কোন রাগ কী ভাবে গাইতে হয় – এগুলো তো সহজ ব্যাপার না। মানুষের আগ্রহ জন্মাচ্ছে এগুলো সম্পর্কে।

নজরুল সঙ্গীত নিয়ে একাডেমিক শিক্ষা চালু হওয়ার প্রভাব কতটা পড়েছে সঙ্গীতঅঙ্গনে?

আমি ছায়ানটে এতোগুলো বছর ধরে আছি। ছায়ানটের শিক্ষাব্যবস্থা অন্যরকম। গান যেভাবে শেখানো হয় তা নিজের ভেতর নিয়ে নিয়ে বড় হয় ছেলেমেয়েরা। এজন্যই জুনিয়র সেকশনে সিনিয়র সেকশনের শিল্পীরাই শিক্ষকতাও করে। আমি এখন পঞ্চম আর সমাপণী পর্বের শিক্ষার্থীদের ক্লাস ঞেই। তবে একটা জিনিস কি মিডিয়া নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শোবার মধ্যে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় টিভিতে মুখ দেখাতে হবে। নজরুল একাডেমিতে শেখানো হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে চর্চা হচ্ছে। আরও নানান জায়গায় হচ্ছে। মিডিয়ায় নিজেকে দেখানোর লোভ সংবরণ করতে পারলে একাডেমিক শিক্ষা আরও সুফল বয়ে আনবে বলে মনে হয়।

নজরুল সঙ্গীতের সংরক্ষণে কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে আপনার জানামতে?

নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি বছর সিডি বের, এবারও হচ্ছে। এছাড়া বেশ ভালো কালেকশন আছে ইন্সটিউটের ওখানে। গেলেই দেখতে পাবে। এ ব্যাপারে আমি সন্তুষ্ট।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা আগেও হয়েছে এখনো হচ্ছে, এ ব্যাপারে শিল্পীদের কি কোন দায় আছে বলে মনে করেন?

এটা সরকারের দায়-দায়িত্ব। শিল্পীরা শিল্পীদের মতোন গান গাইবে। গান দিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা তো চলছেই। কিন্তু রাজনীতি তো আর শিল্পীর জন্য নয়। আমি কোনদিন রাজনীতি করিনি, রাজনীতি করবোও না।   

কিন্তু এই যে মুক্তাঞ্চলে গান গেয়ে বেড়ানো বা আজও সংগ্রামী গানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এসমস্তই কি রাজনীতিরই অংশ নয় একভাবে দেখতে গেলে?

না, এতে আবার রাজনীতি কোথায় ? ছায়ানট কোনদিন রাজনীতি করেনি। আমিও করিনি। আমরা শুদ্ধভাবে জীবন যাপনের, পোষাকে-ব্যবহারে-চিন্তায়-শিল্পে জীবনকে যাপনের চর্চায় বিশ্বাসী ছিলাম। তাই আছি। তাই থাকবো। সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীন হওয়ার জন্য যুদ্ধ করেছে একসাথে, সেটাকে আমার রাজনীতি মনে হয় না।