ফরিদা ওসমান

আমি আরবীয় নারীদের দৃষ্টান্ত হতে চেয়েছি ফরিদা ওসমান


 

[ফরিদা ওসমান একজন মিশরীয় নারী সাঁতারু যিনি ফ্রিস্টাইল ও বাটারফ্লাই ডিসিপ্লিনে দক্ষ। তিনি ‘অল-আফ্রিকা গেমস’ এ স্বর্ণপদকজয়ী ও বাটারফ্লাই ডিসিপ্লিনে ৫০ মিটার ও ১০০ মিটারে রেকর্ডের অধিকারী। জন্ম ১৮ জানুয়ারি ১৯৯৫। মিশরের জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় তিনটি ডিসিপ্লিনেই ফারিদা ফ্রিস্টাইল, বাটারফ্লাই ও ব্যাকস্ট্রোকে জাতীয় রেকর্ড অর্জন করেছেন। রাসিফ২২ডটকমে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি কথাবলির পাঠকদের জন্য বাঙলায় ভাষান্তর করেছেন  ম্যাগডিলিনা মৃ।]

 

একজন সাঁতারু হতে গিয়ে মিশরে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

মিশরে ফুটবল খেলার চিত্র একরকম। সাঁতার সম্পর্কে এখনো কারো তেমন কোনো ধারণা নেই। তাই আমার সঙ্গে লেগে থাকা কিংবা আমাকে উৎসাহ দেয়ার মতো তেমন কেউ ছিল না। আরবের কিছু কিছু দেশে নারীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর যদি কেউ এরকম নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পছন্দের খেলায় অংশগ্রহণ করে তাহলে অবশ্যাই তাকে নানারকম বাঁধা বিপত্তির সন্মুখীন হতে হয়। এখানে খেলেধুলা থেকে শুরু করে সামাজিক ও শারীরিক শিক্ষায় আমি অনেক কিছু আয়োজন করেছি। কিন্তু এখনকার সমাজ ব্যবস্থায় সেগুলো করা অনেক বেশি কঠিন। প্রতি তিন থেকে চার মাস পর পর কোচ পরিবর্তন করা অনেক বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমি এরকম প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে প্রস্তুত করেছি এবং রেকর্ড অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। মিশরের জাতীয় প্রতিযোগিতায় ফ্রিস্টাইল ৫০ মিটার ও বাটারফ্লাই ১০০ মিটার ডিসিপ্লিনে স্বর্ণপদক জিতেছি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আরব চ্যাম্পিয়নশিপেও জয়ী হয়েছি। আমি ছিলাম আরবের সবচেয়ে তরুণ সাঁতারু।  

রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় একজন ক্রীড়াবিদের অর্জনকে পাশ কাটিয়ে, দেখা যায় তার পরিধেয় পোশাক নিয়ে সমালোচনা করা হয় যেটার মুখোমুখি কেবল নারীদেরকেই হতে হয়যেমন এই সময়ের একজন টেনিস তারকা সান্দ্রা সামিরকেও তার পোশাক নিয়ে সমালোচিত হতে হয়েছেআপনি এরকম সমালোচনা কীভাবে অতিক্রম করেছেন?

আমি সমালোচনা থেকে দূরে থাকার অনেক চেষ্টা করে থাকি। যেকোনো টুর্নামেন্ট শুরুর পূর্বে প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় যাবত আমি কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করি না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি সেই টুর্নামেন্ট আমার লক্ষ্য পৌঁছাতে পারছি।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে মৌখিক কিংবা যৌন হয়রানি নারীদেরকে তাদের সখের বিষয়গুলোর চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছেআমরা জানি আপনার ক্ষেত্রেও সেগুলো প্রকাশ পেয়েছিলোআপনি কীভাবে সেগুলো অতিক্রম করে এসেছেন?

অবশ্যই, আমি জানি আরব সমাজের অনেক নারীকেই তাদের লালিত স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হয়। তবে যদি কেউ সত্যি কিছু ভালবেসে থাকে, তাহলে অবশ্যই তাকে সমাজের সকল প্রতিবন্ধকতা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষজন তাদের নেতিবাচক সমালোচনা বন্ধ করবে না, আর এ কারণেই আমি আরব নারীদের দৃষ্টান্ত হতে চেয়েছি। আমিই সেই আরব নারী যে তার স্বপ্ন আর লক্ষ্যকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিশ্বের নিকট পৌঁছেছে।

এছাড়া অন্য কোনো বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

এতে কোনো সন্দেহ নেই আমাকে দ্বিগুণ বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে।  নারী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট খেলার অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া সহজ কিছু ছিলোনা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পড়াশোনার পাশাপাশি একই তালে খেলাধুলার অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া।  যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর আমার চাপ অনেকটাই কমে গেছে। এখানে লোকজন পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলায় অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।  যেখানে আরব সমাজে খেলাধুলার তেমন কোনো গুরুত্বই নেই। আমি প্রতিটি চ্যাম্পিয়নশিপের পূর্বে অনেক উৎসাহ এবং মানসিক প্রস্তুতি নিতে পারি, বিশেষ করে  মিশরের চেয়ে এখানকার উন্নত পদ্ধতি ও পরিবেশের কারণে। 

আপনার পছন্দের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব কে? তিনি কীভাবে আপনার অনুশীলনে সহযোগিতা করে?

মিশরীয় সাঁতারু রানিনা আলওয়ানি, যদিও সে আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট।  যুক্তরাষ্ট্রের সাঁতারু নাতালি কেভার্ন।  তাঁরা আমাকে আরব সমাজের কুসংস্কার ঠেলে বের হয়ে আসতে সহযোগীতা করেছে।  ষোলবছর বয়সেই আমি আফ্রিকান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপের তিনটি ডিসিপ্লিনে যথা ফ্রিস্টাইল, বাটারফ্লাই ও ব্যাকস্ট্রোকে বিজয়ী হয়েছি।  আমি স্বচক্ষে সেরা সাঁতারুদের দেখেছি। তাদের আদর্শকে অর্জন করতে প্রতিনিয়ত নিজেকে উৎসাহ দিয়েছি এবং কোনোরকম নেতিবাচক চিন্তা আমার মনের ভিতরে প্রবেশ করতে দেইনি আর এটাই আমাকে মিশরের জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে প্রথম পদক জয়লাভ করতে সহযোগিতা করেছে। 

আমেরিকাতে আপনার প্রথম বছরটি কেমন ছিলো?

এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি আমাকে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে। যদি কোনো কারনে আমার টুর্নামেন্ট এবং পরীক্ষার সময়সূচি একই সময়ে হয় তাহলে প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় একজন কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করেন আমার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। এই বিষয়টি একজন প্রশিক্ষণার্থীকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে অনেক বেশি সহযোগীতা করে। বিশেষ করে আধুনিক প্রতিযোগীতামূলক শিক্ষা পদ্ধতিতে পড়াশোনার জন্য এটা অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি বিষয়গুলোকে এমন নির্বাচন করি যেন আমার সাঁতার প্রশিক্ষণের অনুশীলনে ব্যাঘাত ঘটাতে  না পারে। প্রথম বছরটি আমার জন্য কঠিন ছিল, কেননা আমি পরিবার, বন্ধু-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম সেই সংগে আমি পুরো দায়িত্ববানও ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি প্রশিক্ষক জানতেন না অন্যানন্য সাঁতারুদের মতোই আমিও দক্ষ ছিলাম। প্রতিযোগিতায় যেকারো সঙ্গে লড়াই করার মতো যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস ছিলো। তবে এখানকার পরিবেশ এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দেখে আমার মনে হয়েছে এটা আমাকে একজন ক্রীড়া নায়ক হতে সহযোগীতা করবে। এটা আসলে শুধু মাত্র প্রশিক্ষক থেকে প্রশিক্ষন নেওয়ার বিষয়ই ছিলোনা। এখানে একজন মনস্তত্ত্ববিদ, একজন পুষ্টিবিদ, শারীরিক প্রশিক্ষক এবং শরীরতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ছিলো।  

মিশরীয়দের নিয়ে বিদেশিদের গৎবাঁধা কোনো ধারণা আছে? আপনার কী মনে হয়?

পশ্চিমে, বেশিরভাগ মানুষজনের বিশ্বাস যে আমরা এখনো মরুভূমিতে বাস করছি এবং সৌন্দর্যের দিকে এগোচ্ছি, আমাদের মরুভূমিতে এখনো নগরায়ন হয়নি, এমনকি আমরা প্রযুক্তির বিপ্লবের মধ্য দিয়েও যাইনি।

কোনো নারীকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আপনি কী পরামর্শ দিবেন?

শুরুতে তাকে অবশ্যই তার স্বপ্নটিকে নির্ধারণ করতে হবে যে, সে আসলে কী চায়। সে জায়গায় পৌঁছাতে যেসব প্রচেষ্টা ও যত্ন প্রয়োজন সেগুলো করতে হবে। এবং সেটির জন্য পরিবার পরিজন থেকে নৈতিক ও মানসিক সমর্থন খুঁজতে হবে। 

আগামী ২০২০ সালের টোকিও চ্যাম্পিয়নশিপের পর কিছু করার পরিকল্পনা আছে?  

আমি আধুনিক পদ্ধতিতে সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য একটি স্কুল চালু করব। সেখানে আমিও একজন মনস্তত্ত্ববিদ, পুষ্টিবিদ, অংগসংবাহকারী, অংগসংবাহন বিশেষজ্ঞ রাখতে চাই। যুক্তরাষ্ট্রে আমি যেভাবে প্রশিক্ষিত হয়েছি ঠিক একই পদ্ধতি মিশরেও চালু করতে চাই যা কিনা একজন সাঁতারুকে দ্রুতই তার লক্ষ্যে পৌঁছুতে সহযোগিতা করবে।