শিমুল মুস্তাফা

স্বদেশবিরোধী চিন্তাচেতনার মানুষগুলি ছাড়া আমি সবার কবিতাই পড়ি শিমুল মুস্তাফা


[শিমুল মুস্তাফা বাঙলাদেশের আবৃত্তিশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। তার সঙ্গে কথা বলেছেন জুয়েইরিযাহ মউ  সাক্ষাত্কারটি বাংলামেইল২৪ডটকম এ প্রথম প্রকাশিত হয়। কথাবলির পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশ হলো।]

 

বিশ বছর পর নতুন অ্যালবাম এল আবৃত্তির, এর মূল ভাবনা কী, বিস্তারিত শুনতে চাইছিলাম

সময় ব্যাপার না আসলে। এখন যেটা মনে হয় প্রোডাকশান হাউজগুলোর মুনাফা তেমন ভালো না, তাই সেরকম বেনিফিট পাই না। আগে অ্যালবাম সিডি বা ক্যাসেটে মানুষ শুনতো। এখন মনে হয় অ্যালবাম শব্দটা ভবিষ্যতে তেমন কাজেও লাগবে না। এখন পেনড্রাইভে, বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে আবৃত্তি ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে যার লেখা ভালো লাগে আমি সে লেখাই পড়ি। এখানে ইমরানের (মুহাম্মাদ ইমরান) লেখাগুলো ভালো লেগেছে, আর চিঠির প্রতি আমার আকর্ষণটা বেশি। ইমরান যে লেখা দিল তা পড়ার পর মনে হল ভালো লাগছে তাই সে চিঠিগুলো নিয়েই অ্যালবামটা করা। আটটা চিঠি, সমসাময়িক কিছু মানুষের ব্যক্তিগত প্রেম, সমসাময়িক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা চিঠি। বিশেষত হতাশাগ্রস্ত সময়ের ছাপ। আমি খুব একটা সময় নেইনি। দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিলাম।

গল্প, কিংবা উপন্যাস আবৃত্তিতে কম উঠে আসে কেন?

এটা আসবে, কিছুদিন পর এরকম শুরু হবে ইবুকের অডিও ভার্সন হিসেবে এখন বিভিন্ন গল্প, উপন্যাসের পাঠ উপস্থাপিত হচ্ছে। এর ভালো খারাপ দু-দিকই থাকবে। এতে ইবুক, অনলাইন পত্রিকা মানুষ বেশি গ্রহণ করবে, করছে। টেকনোলজি যেহেতু উন্নত হচ্ছে । ১৯৮৭ সালে হুমায়ুন আহমেদের ছোট গল্প নিয়ে সারগাম থেকে ‘নিশিকাব্য’ নামে একটা অ্যালবাম করি। গল্প বলা সম্ভবত আমিই প্রথম শুরু করি। চিঠি লিখতাম এক সময় খুব, চিঠি পড়তাম। রবীন্দ্রনাথের কাজের দিকে তাকালেও দেখি চিঠি তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এ জেনারেশনে চিঠির অনুভূতি কম। চিঠির সে রসেবোধ মানুষের কাছে নিয়ে আসার ভাবনা ছিল।

কবে থেকে আবৃত্তির প্রতি এই প্রেম? 

কাকতালীয়ভাবেই। আমার যা ভালো লাগে তাই করি, করতাম। কি হবো তা ভেবে কখনো আগাইনি। কি ভাবে যেন কবিতার দিকে চলে এলাম, আবৃত্তিতে জড়িয়ে গেলাম।

আবৃত্তির জন্য কবিতা নির্বাচন করার সময় কোন কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখেন ?

আমার কাছে যা সাহিত্য আছে সব পড়তেই ভাল্লাগে। তাই ওভাবে ভাবনার কোন জায়গা নেই। আজ কবিতা, চিঠি পড়ছি কাল দেখা গেল গানের লিরিক্স পড়ে যাচ্ছি। এ বিষয়টা একেবারেই আপেক্ষিক, টার্গেট নিয়ে কোন কাজ করি না। স্বদেশ-প্রকৃতি প্রেম-মানব প্রেম এ বিষয়গুলো যে পাঠে পাই তাই আমার ভালো লাগে।

আবৃত্তি চর্চাকে অনেক কবিই ইতিবাচক ভাবে দেখেন না। তাঁদের মতে কবিতার টোন আবৃত্তিতে সাবজেক্টিভ হয়ে দাঁড়ায়। যা শ্রোতার জন্য আরোপিত, কিন্তু পাঠক এখানে নানান ডায়মেনশন পান। এ ব্যাপারে আপনি কি মনে করেন?

একটা মানুষ যখন পোষাক পরিবর্তন করে তখন তার রূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়। একটা মাধ্যম থেকে আরেকটা মাধ্যমে যখন আমরা যাই তখনও পরিবর্তন ঘটে। এর ভালো দিকও থাকে খারাপ দিকও থাকে। কখনো কখনো তেমন গুণসম্পন্ন নয় এমন সাহিত্য আবৃত্তিতে এসে ভালো শোনাচ্ছে। আবার এটাও ঠিক অদক্ষতার কারণে শ্রোতার কাছে উপস্থাপন খারাপও শোনাতে পারে। আমি এ জায়গায় সচেতন থাকি, কবির অবস্থানকে বোঝার চেষ্টা করি। বাংলাদেশে যারা জীবিত কবি আছেন তাঁদের সাথে আমি আলোচনাও করি। একেকজন আবৃত্তিকার একেক ভাবে কবিতা আবৃত্তি করছেন। স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায় এক্ষেত্রে অনেকগুলো ডাইমেনশন তৈরি হতেই পারে। ৮০-র দশকে স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের সময় প্রেমের কবিতাও তো স্লোগান হয়ে উঠেছে। দ্রোহের কবিতাও কখনো সময়ের প্রয়োজনে প্রেমের কবিতা হয়ে উঠেছে। পাঠক হিসেবে যে কেউ যে কোন ভাবে পড়তে পারেন তবে শ্রোতার কাছে যখন আমি এটা পৌঁছে দিচ্ছি তখন দায়বদ্ধতার কথা চিন্তা করা উচিৎ। দক্ষতা এবং জ্ঞানের চিন্তা করা, চর্চা করা এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। কবি কিন্তু সবসময় প্রত্যাশা করেন যে তাঁর কবিতা মানুষের কাছে পৌঁছাক।

আবৃত্তি চর্চার ক্ষেত্রে কী কী ধরণের সঙ্কট আছে বলে মনে করেন?

প্রথম হল আমরা ঐক্যবদ্ধই কিন্তু জানান দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ আমরা যখন দেশকে ভালোবাসি, দেশের কথা চিন্তা করি তখন একই থাকি আমরা। এখন কিছু কিছু প্ল্যাটফর্ম আছে যেগুলোর খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ শিল্প সবসময় স্বাধীনচেতা, স্বাধীনভাবেই তার চলা উচিৎ।

কিছু কিছু প্ল্যাটফর্ম, যেমন?

যেমন আমি মনে করি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কোন ভূমিকা নেই। জোট কি করছে বলুন – একদম সহজভাবে বলছি। জোটের প্রয়োজন তখনই থাকবে যখন আমরা পথভ্রষ্ট হবো, দিকভ্রান্ত হবো। আমরা এখন দিকভ্রান্ত নই কিংবা জোট তেমন কোন পথ নির্দেশনাও দিতে পারছে বলে আমি মনে করি না। আমি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বিরোধী না, কিন্তু আমার মনে হয় জোট না থাকলে কিছু কিছু কাজ আছে যা সীমাবদ্ধ পরিসরে না হয়ে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন হতো।

সংগঠিতভাবে কাজ করছেন এ সম্পর্কে বলুন। ছেলেমেয়েরা কেমন উৎসাহী? 

তরুণরা অনেক অনেক আগ্রহী। এখন জীবন অনেক যান্ত্রিক, ব্যস্ত। বিচ্ছিন্নভাবে দূরে দূরে থাকে সবাই। আগে হয়তো বিকেলবেলা সম্পূর্ণ সময়টাই দিতে পারতো। এখন হয়তো সেটা সম্ভব হয় না। কিন্তু আগ্রহের কোন কমতি নেই। কারণ আগে একমাত্র ক্যাসেট বা মহিলা সমিতির মঞ্চ ছাড়া প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এখন বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হচ্ছে, মোবাইলে চাইলেই কবিতা শোনা যাচ্ছে, নাটকের সাথে সম্পৃক্ত বিশাল ইন্ড্রাস্ট্রী তৈরি হচ্ছে। অনেক বেশি বিস্তার লাভ করেছে এ কাজগুলো। এসমস্তই সংস্কৃতির একটা পার্ট। শ্রোতার সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।

পাঠের চাইতে শোনার আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার ইতিবাচক আর নেতিবাচক দিক কী কী বলে মনে হয়?

নেতিবাচক বলে কোন কথাই নেই। কেউ নেতিবাচক মনে করাটা দুঃখজনক। কারণ একটি কবিতার বই ৫০০ থেকে ১০০০ কপির বেশি ছাপা হয় না। অথচ যদি আবৃত্তি করি তবে তা হয়তো দুই লাখ শ্রোতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দেখুন অনলাইন পত্রিকার ভিউয়ার পনের দুই লাখ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কাগজ কি পৌঁছোচ্ছে সেভাবে। 

এই সময়ের কবিতা কি পড়েন?

আমি সবার কবিতাই পড়ি কয়েকজন মানুষ ছাড়া, যাদের সম্পর্কে আমার এলার্জী আছে। স্বদেশবিরোধী চিন্তা চেতনার মানুষগুলো ছাড়া আমি সবার কবিতাই পড়ি।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

ভবিষ্যত পরিকল্পনা কিছু নেই আমার। ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করি না।

আচ্ছা তাহলে বর্তমান পরিকল্পনা?

এই যে খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমোচ্ছি, চকচকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি...