অরুণ সোম

অনুবাদ করতে গেলে দুইটি ভাষারই স্পন্দন বুঝতে হয় অরুণ সোম



[ষাটের দশকে সোভিয়েত রাশিয়া যে সৃজন বিষয়ক কর্মযজ্ঞে মেতেছিল তাতে সামিল হতে অনুবাদকের চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন অরুণ সোম। প্রায় একদশক নিরন্তর অনুবাদ করেছেন, রুশ থেকে বাংলায়। এসময় অরুণ সোম প্রায় ৪০টির ও বেশি বই অনুবাদ করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর তিনি রুশী স্ত্রী ও দুই কন্যা নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় বসে তিনি এখনও একের পর এক অনুবাদ করছেন। ২৪ মে ২০১১ সালে তাঁর কলকাতার বাড়িতে তাঁর সঙ্গে সাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে আলাপ করেন কবি, কথাশিল্পী ও সাংবাদিক জাহেদ সরওয়ার। সেদিনের সেই সাক্ষাৎকারটি আর্টস বিডিনিউজ২৪ডটকমে ৬ জুলাই ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়। আজ কথাবলির পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি আবার প্রকাশ হলো।]


কেন আপনি রুশ সাহিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। রুশ শিখেছিলেন কোথায়?

আমার রুশ শেখা কলকাতাতেই। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, সে সময় রুশ শেখার বিষয়ে আগ্রহী হই। রুশ শেখার ব্যাপারটা খানিক রাজনৈতিকও। এ ছাড়াও আমাদের ছাত্রাবস্থায় রুশ সাহিত্য বাংলা অনুবাদে কিছু আমরা পড়েছিলাম। প্রথম যে রুশ সাহিত্যের সাথে পরিচয় হয়–মাক্সিম গোর্কীর মা ও আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসসমূহ। মা’টা কলকাতাতেই অনুবাদ হয়েছিলো সে সময়। অনুবাদ করেছিলেন পুস্পময়ী বসু। যদিও ইংরেজি থেকে করা। তবু আমার মনে হয় এই পর্যন্ত মা’র যত অনুবাদ বেরিয়েছে তার মধ্যে এই অনুবাদটি শ্রেষ্ঠ। আর যে বইটা আমার খুব ভাল লেগেছিল–গোর্কীর আমার ছেলেবেলা। ওটা মনে হয় বিষ্ণু চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদ ছিল। যাই হোক গোর্কীকে বলা যায় আমার রুশ সাহিত্যের প্রবেশিকা।

অনুবাদকের চাকরি নিয়ে অনুবাদ করা আর সৃজনশীল অনুবাদের মধ্যে কোনো তফাৎ আছে বলে মনে করেন? এর আলোকে বলতে পারি, যেহেতু অনুবাদকের চাকরি নিয়ে আপনারা সোভিয়েত গিয়েছিলেন; যদিও রুশ সাহিত্যপ্রীতি আছে বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিলো। আবার এখনো আপনি নিরন্তর অনুবাদ করছেন যদিও এখানকারটা আপনার চাকরি না।

পার্থক্যটা পরিবেশ ও পরিস্থিতির। সৃজনশীল সাহিত্যের প্রায় অনুবাদকেরা একটা ভাললাগা থেকে অনুবাদ করেন, আমার ক্ষেত্রে ব্যপারটা অন্যরকম। যেহেতু আমাদের শিক্ষাটা ছিল বাংলা মাধ্যম। ইংরেজি ছিল যদিও, তবুও বলবো ইংরেজিটা আসলে সেভাবে জানা নয়। যার মাধ্যমে সাহিত্যের স্বাদ নেয়া যায়। যা সে সময় অনুবাদ হতো তাকে ‘স্টোরি রিটোল্ড’ বলা যায়। কিন্তু তবুও ওটা কিছু হয়নি বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণ ওটা যাই হোক না কেন তা আমাদের সাহিত্যের আরও গভীরে প্রবেশের জন্য প্রবেশপথের মত কাজ করেছে। আমরা রবিনসন ক্রুসো বা রবিনহুড বাংলায় পড়েছি আবার ছোট একটা ইংরেজি সংস্করণে পড়েছি। কিন্তু আমাদের এক বন্ধু সের দরে বিক্রিত কাগজের ভেতর মূল রবিনসন ক্রুসোটা পেয়ে যায়। বইটার সাইজ এবং নেড়ে চেড়ে দেখে অবাক হই তাহলে আমরা কী পড়েছি। এত দেখি সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।

যাইহোক আমার মনে হতে থাকে যে এই সমস্ত হেলাফেলা অনুবাদ না করে মূল জিনিসটা সাইজ অবিকৃত রেখে বাংলায় অনুবাদ হওয়া উচিত। যেহেতু সামগ্রিকভাবে রুশ সাহিত্যটার প্রতিই আমার আগ্রহ। রুশ শেখার পর আমি তুর্গেনেভ ও তলস্তয়ের কয়েকটা গল্প অনুবাদ করি। প্রাথমিকভাবে স্কুল কলেজে পড়াতাম সে সময়। আমি মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপও পেয়ে যাই। সুতরাং আমাকে শুধু অনুবাদকের চাকরি নিয়ে গিয়েছি বলা যাবে না। চাকরি নিয়ে অনুবাদ শুরু করার পর আমি খানিকটা হতাশই হয়ে পড়েছিলাম। কারণ আমরা স্ব স্ব ভাষায় অনুবাদ করছি, তার ওপর আবার ওদের এডিটর আছে। যারা সামান্য বাংলা জানে। অনুবাদের পর তাদের সঙ্গে বসতে হতো। তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করতো। হয়তো বলতো বাংলাটা এ রকম করেছো কিন্তু রুশিতে এই রকম আছে জাতীয় প্রশ্ন। কিন্তু হবহু অবিকৃত রেখেতো আর অনুবাদ করা যাবে না। যাই হোক তারা অভিধান দেখে যেভাবে করতে বলতো আসলে তাতো করা সম্ভব না। তাহলে মানেটাই যাবে বদলে। কিন্তু ওই যে খোদার উপরে খোদগারি! অনেক অনুবাদকই যা করতো, তা হলো এদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে সময় নষ্ট করার চাইতে হয়তো বলতো–ঠিক আছে, তোমারটাই ঠিক আছে বলে কেটে পড়তো। কিন্তু এই যে ছাড় দেওয়া, এই ছাড় দেওয়ার কারণে বহু অনুবাদের ক্ষতি হয়েছে। এই জন্য পরবর্তিতে অনেকের কাছে শুনতে হয়েছে। মস্কো থেকে তো অনেক ভাল ভাল বই বেরোয় কিন্তু অনুবাদগুলো যেন কী রকম। আসলে এটা অনুবাদকের দোষ না। কথা হচ্ছে, আমাদের ছিল ফোড়নের কাজ। যত পৃষ্ঠা অনুবাদ করবে সেই অনুযায়ী পয়সা। তো এতক্ষণ ধরে কে ওদের সঙ্গে বসে প্যাঁচাল পাড়বে! এমনকি ননী ভৌমিকের অনেক অনুবাদ দেখেও লোকে বলতো এটা কি ননী ভৌমিকের করা! হতেই পারে না। কিন্তু সেটা তো আর ননী ভৌমিকের দোষ না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম ব্যাপার ঘটেছিলো। আমার যে এডিটর ছিল সে আবার বয়সে ছোট ছিল আমার। প্রশান্ত দন করবার সময় তার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া হয়েছিল এবং সে আমাকে একদিন ডেকে বলেছিলো আমি ভেবে দেখলাম আসলে বাংলাটা আমি তোমার মতো তো আর জানি না। তোমার আরও স্বাধীনতা পাওয়া দরকার। ব্যাপারটা ভালই হয়েছিলো আমার জন্য। যাই হোক কলকাতায় আসার পর যেগুলো অনুবাদ করেছি সেগুলোতে স্বাধীনতার সদ্ব্যবহার করেছি।

একেকটা বই অনুবাদ করতে কতদিন সময় লাগতো। অনুবাদের প্রক্রিয়াটা কী রকম ছিল। আর এ পর্যন্ত কয়টা বই অনুবাদ করেছেন? 

বইয়ের ব্যাপারে একটা সময় বেধে দিতো, তার মধ্যে অনুবাদ করে দিতে হতো। আর কতগুলো ছিল জার্নালের কাজ। সোভিয়েত নারী, সোভিয়েত বিজ্ঞান প্রভৃতি। ওগুলো চার পাঁচদিনের মধ্যে দিতে হতো। বইয়ের কাজেও আয়তন অনুযায়ী সময় বেধে দেয়া থাকতো। আমাদের তো দ্রুত করবার তাগিদ ছিল কারণ ফোড়নের কাজ। যত পৃষ্ঠা অনুবাদ, সে অনুযায়ী পয়সা। একসঙ্গে অনেক অনুবাদ করতাম। জার্নাল, সাহিত্য, ছোটদের বই। প্রশান্ত দন চারখণ্ড করতে আমার দেড় বছর লেগেছে। ছোট বড় মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশটা বই অনুবাদ করেছি।

‘কোনো সিস্টেমের মধ্যে সৃজনশীলতা সম্ভব না’। রবীন্দ্রনাথসহ হালের মিলান কুন্দেরা ও আরো অনেকের অভিযোগ সোভিয়েতকালীন সাহিত্য সম্পর্কে। যেখান থেকে বেরিয়ে যেতে হয় ইভান বুনিন, ব্রদস্কি, সলোঝিনিৎসিন, আখমাতোভাসহ অনেককে আবার দেশের ভেতরেই আত্মনির্বাসিত থাকতে হয় বরিস পাস্তারনাককে। এ অভিযোগ কীভাবে নিতে চান?

প্রশ্নটা একটু জটিল। কিন্তু আমার মনে হয় সিস্টেম তো একটা ছিলই। সব সময় সবদেশই কিছু সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যায়, না হলে অবস্থানকে ধরে রাখা যায় না। সোভিয়েতও একটা সিস্টেম। সে সিস্টেমে কিছু বিধিনিষেধ তো ছিলই। যেহেতু সোভিয়েত আদর্শ ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। কিন্তু তাই বলে সবাই যে তা মানত তাতো না। যেমন গোর্কীকে তকমা মারা হয় সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার লেখক, আসলে কি তাই। এটা গোর্কীর ওপর চাপিয়ে দেয়া, গোর্কীর সব লেখাতো সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় লেখা নয়। গোর্কীর ছোটগল্পগুলো পড়ো। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন জারের আমলে। একমাত্র গোর্কীর মা, যা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতায় লেখা। এমনকি যাকে বলা হয় বিপ্লবের কবি সেই মায়কোভস্কিইতো পার্টিভুক্ত ছিলেন না। পাস্তারনাকের ব্যাপারটাই ধরো। ব্যাপারটাকে রাজনৈতিকায়ন করা হয়েছে। তার ডক্টর জিভাগো আমি পড়েছি। ভাল লেগেছে কিন্তু সে অর্থে ক্লাসিক নয় যে অর্থে তলস্তয় ক্লাসিক। পাস্তারনাকের খ্যাতি মূলত অনুবাদক হিসাবে, তিনি সেক্সপিয়ারের সমস্ত রচনা রুশে অনুবাদ করেছিলেন। এটা একেবারেই পশ্চিমি প্রচারণা। কেন শোলোখভ কি সোভিয়েত ক্লাসিক না। আন্দ্রেয়েভ আলেক্সেই তলস্তয়। রুশীয় শিকড়ের সঙ্গে যারা যুক্ত নয় তারাই মূলত বাইরে ছিল।

ইভান বুনিনের ভিলিজ সহ নানা লেখায় আমরা দেখেছি কী অসাধারণ ঐতিহ্য সচেতনতা এবং রাশিয়ার সাধারণকে তিনি কীভাবে দেখতেন, অনেক কাছাকাছি মনে হয় তাকে রুশ আত্মার। 

বুনিনের ব্যাপারটা আলাদা। বুনিনের বিশাল জমিদারি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। বুনিন হয়তো এই পরিবর্তন থেকে দূরে থাকার জন্য রাশিয়ার বাইরে ছিলেন। কিন্তু বুনিনের বই রাদুগা থেকে বের হয়েছে। সোভিয়েত আমলে তার সব বই বেরিয়েছে রাশিয়ায়। ব্রদস্কির ব্যাপারটা ধরলে বলা যায় ব্রদস্কি কি খুব বড় কবি? 

কিন্তু কবিতা লেখার অপরাধে তাকে আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সম্ভবত তখন ব্রদস্কি কবিতার সার্ভভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

দেখ সোভিয়েত আমলে আসলে সিস্টেমটাই এরকম ছিল যে কেউ বেকার থাকতে পারবে না। রাষ্ট্র সবার জন্য বাসস্থান ও খাদ্য যেমন বরাদ্দ রেখেছে তেমনি কর্মও বরাদ্দ রেখেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো আপনি কি করেন। বলে যে কবি। কিন্তু কবি তো কোনো জীবিকা না আপনি কী করে খান। আপনার টাকা পয়সা কোত্থেকে পান। শুধু কবি বললে তো হবে না।

এর পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো কারা কবি হিসাবে আপনাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জবাবে ব্রদস্কি বলেছিলো, কে আমাকে মানবজাতির মধ্যে স্থান দিয়েছে?

যাই হোক সোভিয়েত সিস্টেমের মধ্যে এটা যায় না। সোভিয়েত চেয়েছে সুনির্দিষ্ট উৎপাদনমূলক কর্ম। যাতে অংশ নেবে প্রত্যেকে। এর মানে এই নয় যে সোভিয়েত পর্বে কোনো সৎ সাহিত্যের সৃষ্টি হয় নি। যেমন ধরো আন্দ্রেয়েভ। তিনি গোর্কীর হাতে গড়া ছিলেন কিন্তু তিনিতো সোভিয়েত সমাজবাস্তবতার লেখক নন। এ ছাড়াও সোভিয়েত পর্বে রাশিয়া ছাড়াও সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নে গণসাহিত্যেও জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। পিরিমকুল কাদিরভ ভাসিলি ইয়ান চেঙ্গিজ আইৎমাতভ রাসুল হামজাতভ সহ আরো অনেকে।

আমার কাছে বিস্ময়, হয়তো অনেক পাঠকের কাছেও। শালোকভের এপিক উপন্যাস চার খন্ডে ‘প্রশান্ত দন’। দস্তইয়েভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’। সম্প্রতি শেষ করেছেন আরেক এপিক তলস্তয়ের ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ দস্তইয়েভস্কির ‘কারামাজভ ভাইয়েরা’। এর মধ্যে কেবল প্রশান্ত দনটা রাদুগা থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো কিন্তু পরের বৃহৎ বইগুলো করার জন্য আপনি চুক্তিবদ্ধ নন। তবুও কোনো দায়বোধ থেকেই কি পরের বইগুলো অনুবাদ করেছেন?

না, আমরা কি বই অনুবাদ করবো তা আমাদের হাতে ছিল না। তা সম্পূর্ণ ডিপার্টমেন্ট থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হতো। আর যখন কলকাতায় আসি, আকস্মিকভাবে যোগাযোগ ঘটে সাহিত্য আকাদেমির সঙ্গে। তারাই আমার কাছে প্রস্তাব দেয় রুশ ক্লাসিকগুলো, যে গুলো ইতিমধ্যে অনুবাদ হয়নি সেসব অনুবাদ করতে। তখন আমি নিজের থেকেই বলেছিলাম দস্তইয়েভস্কির কথা। অপরাধ ও শাস্তির পরে যখন আবার অনুবাদের কথা উঠলো, তখন আমি তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তির কথা বলি। তখন ওনারা বললো যে এটারতো অনেক অনুবাদ বেরিয়েছে। তখন আমি বললাম এগুলো একটাও মূলানুগ, যথাযথ বা সম্পূর্ণ নয়। তদুপরি সব ইংরেজি থেকে করা। আমি করবো মুল রুশ থেকে।

কারামাজভ ভাইয়েরা অনুবাদ হচ্ছে এটা শুনেছিলাম বেশ কিছুদিন হলো। যুদ্ধ ও শান্তি অনুবাদের আগেই কি কারামাজভ ধরেছিলেন।

না না, পর পর দস্তইয়েভস্কি অনুবাদ করিনি এই জন্য যে তারা হয়তো বলবে সবই দস্তইয়েভস্কি করবেন কেন।যুদ্ধ ও শান্তি শেষ হবার পর ওরা আমাকে বললো এবার কি করবেন তখন আমি বললাম কারামাজভ ভাইয়েরা। তখন তারা বললো আবার দস্তইয়েভস্কি? তখন আমি বললাম আবার বললে কি হবে দস্তইয়েভস্কিতো দস্তইয়েভস্কি, তাই না। এরপর কারামাজভ করি। এরপর হাত দেই ইডিয়টে। ইডিয়টের বেলায় কোনো প্রশ্ন উঠেনি কারণ তারা এতদিনে আমার পছন্দ সম্পর্কে জেনে গেছে। এখানে আমার অপার স্বাধীনতা কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো কোনো সম্পাদক নেই। আমি আমার মনের মতো কাজ করতে পারছি।

আরেকটি সম্পূরক প্রশ্ন, আপনার সময়ে কারা কারা ছিল রাশিয়ায় অনুবাদক হিসাবে?

আমি যখন যাই তখন বাংলাদেশের হায়াৎ মামুদ ছিল। ননী ভৌমিক তো ছিলই, আরেকজন অনেক সিনিয়র অনুবাদক ছিল বিঞ্চু মুখোপাধ্যায়। তিনি অবশ্য রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বইগুলো অনুবাদ করতেন। রাধামোহন ভট্টাচার্য ছিলেন, ধীরেন রায় ছিলেন।

দস্তইয়েভস্কি নাকি বলেছিলেন আধুনিক রুশ সাহিত্যের জন্ম গোগলের ‘ওভারকোটের পকেটে’। সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্যের দিকে তাকালে প্রায়ই লেখকের গল্পে, উপন্যাসে দস্তইয়েভস্কির চরিত্রের দেখা মেলে, সেটা বোর্হেস-কামু-কাফকা-কুন্দেরা-ইলেনেক-হেমিংওয়ে-স্টেইনব্যাক-ফকনার গ্রীণ কার্তেজ লাগের্কভিস্ট বাক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস–প্রায় সবার লেখায় দস্তইয়েভস্কির দেখা মেলে। দস্তইয়েভস্কির এই বিশাল কালজয়ী প্রভাবের দিকে তাকিয়ে এটাও বলা যায় দস্তইয়েভস্কি পরবর্তী বিশ্বসাহিত্যের জন্ম দস্তইয়েভস্কির অপরাধ ও শাস্তিতে। এটা এই কারণে যে দস্তইয়েভস্কির পর বিশ্ব উপন্যাসের চরিত্রগুলো বদলাতে থাকে। এমনকি তলস্তয়েরও চরিত্রগুলোর মধ্যে যতই ভাঙ্গগড়া থাকুক পিটার কিংবা সুফিয়া বা নেখলুয়েদভ বা কারেনিনা বা কনস্তানতিন লেভিন সবাই কিন্তু ধনতন্ত্রের প্রতিনিধি, হয়তো তলস্তয় নিজেও তাই ছিলেন বলেই চরিত্রগুলো বাধ্য হয়েছে। যদিও তাদের প্রত্যেকের আত্মজিজ্ঞাসাই মৌলিক। 

দস্তইয়েভস্কি গোগলের ওভারকোট সম্পর্কে যা বলেছিলেন আসলে তার কোনো লিখিত রূপ নেই। জনৈক ফরাসী সাহিত্যিককে তিনি নাকি এ কথা বলেছিলেন। নাকি। কিন্তু তাহলেও ঘটনাটা সত্য। দস্তইয়েভস্কির মন্তব্যটা ঠিক। তাহলে আমরা এটা বলতে পারি যে দস্তইয়েভস্কিরও গুরু আছে। গোগলের কাছে অনেক নিয়েছেন দস্তইয়েভস্কি। সেটা মনস্তাত্ত্বিক বা আর্থ সামাজিক। এই যে তুমি বললে বিশ্বসাহিত্যে দস্তইয়েভস্কির প্রভাব সম্পর্কে সেটা এই জন্য যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দস্তইয়েভস্কি সবসময় বঞ্চিত মানুষের পক্ষে। আর লেখকদের নীতি সবসময় ধনতান্ত্রিক যে অমানবিক প্রক্রিয়া তার বিরুদ্ধে কারণ তারাতো ন্যায়ের পক্ষেই কথা বলতে চায়, যদিও সব লেখকরাই তা নয়। আর ন্যায়তো সবসময় প্রলেতারিয়েতের পক্ষে সে কারণে তা দস্তইয়েভস্কির মানসের কাছাকাছি।

কখন শুনলেন আপনাদের কাজ শেষ। শুনে কী অনুভূতি হয়েছিলো? 

না চাকরি নেই বা আমাদের কাজ শেষ এ কথা হঠাৎ একদিনে বলা হয়নি। অর্থনৈতিক একটা বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল তখন। ১৯৮৫ সালে যখন গর্বাচেভ এলেন। তিনি এসে ১ম বছর নানান কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন অর্থনৈতিক মুক্তির। ২য় বছর লোকজন এর ওপর খুব বিরক্ত হয়ে পড়ে। সবাই বলাবলি শুরু করলো একে দিয়ে কিছু হবে টবে না। গর্বাচেভ যা বলা শুরু করেছিলো–বিভিন্ন স্টেট থেকে অনুদান বা নানান সেবা সংস্থাগুলো গুটিয়ে নেয়া হবে। সবকিছুকে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে। সবকিছুকে লাভজনক খাতে পরিণত করলে তাহলে রাদুগা থাকবে কেন, প্রগতি থাকবে কেন? কারণ এই প্রকাশনা সংস্থাগুলোতো অনেকটা সেবা প্রতিষ্ঠান। এটাতো লাভজনক নয়। যদিও গর্বাচেভ মুখে বলেননি। কিন্তু তার কথাবার্তা আচরণে বুঝা গেল যে একটা পুঁজিতান্ত্রিক গণতন্ত্রায়নের পথে তিনি এগুচ্ছেন। ওরা অনেকেই বলল এই প্রকাশনাগুলোকে তারা লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। আমি বললাম অসম্ভব, যে সস্তায় ওরা বইগুলো দিচ্ছে তার যথাযথ মূল্য রাখতে হলে এবং তা রুপি বা টাকায় কনভার্ট করতে গেলে একেকটা বইয়ের অনেক দাম পড়ে যাবে। তারপর আমার ধারণা হল যে রাদুগা আর প্রগতি থাকবে না। আমার মেয়েরা রুশ স্কুলে পড়তো। অনেক ভাল ছিল রুশ স্কুলিং ব্যবস্থা। আমি তাদের ওখান থেকে এনে ইন্ডিয়ান এম্বাসির ছেলেমেয়েদের জন্য যে স্কুল তাতে ভর্তি করে দিলাম। কারণ বাচ্চাদের তো হিন্দি জানতে হবে, ইংরেজি জানতে হবে, না হলে তো তারা বাঁচতে পারবেনা। তার মানে আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আমি ৮৫ সালে না হলেও বছর তিনেকের মধ্যে বুঝতে পারলাম এসব থাকবে না। শেষে তো তাই হলো। ৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলো। এরপর বুঝলাম এটা একেবারেই শেষ।

এরপর কি সবাই মানে, অনুবাদকরা সবাই একসঙ্গে রাশিয়া ছাড়লেন?

না, সবাই একসঙ্গে আসেনি। ননী ভৌমিক তো ওখানেই, উনি তখন রিটায়ার্ড। দ্বিজেন দা তো পরে এলো, ওনার ছেলে ওখানে আছে। আমি দেখলাম যে আমিতো কোনো ব্যবসা করতে পারবো না। বেশিরভাগই তো অন্য বৃত্তি নিয়ে থেকে গেলেন। না, মূলত আমি যে আইডিওলোজি, আদর্শ নিয়ে গিয়েছিলাম সেটাই যখন নেই তখন আর আমার মন সায় দিচ্ছিল না ওখানে থাকার ব্যাপারে।

অনুবাদকদের অনুবাদ করতে কোন কোন ব্যাপারগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয় বলে অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করেন?

অনুবাদে আসলে অনেকগুলো ব্যাপারেই সতর্ক থাকতে হয়। দুইটি ভাষারই স্পন্দন বুঝতে হয়। আর শাব্দিক অনুবাদতো একেবারেই সম্ভব না, কারণ একেকটা ভাষার প্রকাশভঙ্গি একেকরকম। যেমন আমরা বলি ‘ধাপ করে পড়লো’। এটাকি ধাপ করে পড়ল নাকি পড়ে ধাপ করে শব্দ হলো। কিন্তু রুশ ভাষায় শাব্দিক অনুবাদ করলে এটা হবে ‘পড়ল এবং ধাপ করে শব্দ হলো’। গোগলের ওভারকোটেই আছে প্রায় দেড় পৃষ্ঠার একটা বাক্য। এখন আমি চেষ্টা করেছি জিনিসটা যেন অবিকৃত থাকে। এটাকে যদি ভেঙে ভেঙে করি তাহলে দেখা যাবে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও অনুবাদ করতে করতে বুঝা যায় আসলে কোন কোন বিষয়ে অনুবাদককে সতর্ক থাকতে হয়।

ব্যাপারটা সম্পর্কে আমি সঠিক কোনো তথ্য জানি না, তাই জানতে চাই। সোভিয়েত ভাঙ্গার পর রাদুগা বা প্রগতির যে অজস্র বই ছিল গোডাউনে। গোডাউন খালি করতে বইগুলো নাকি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো?

না, এই তথ্য আমি জানি না। বই রাখার জায়গা না থাকলে পুড়িয়ে ফেললেও ফেলতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় কোনো একটা আর্কাইভেতো রাখার কথা। যেহেতু বইগুলো রাশিয়ায় কোনো কাজে আসবে না। আর যদি রাখার জায়গাও না থাকে নিশ্চই বইগুলোর কোনো একটা বিহিত তো হয়েছেই। কিন্তু বইগুলোর ভাগ্যে কি ঘটেছে তা আমি জানি না।

সোভিয়েত পর্বে কাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখক মনে করেন?

যদিও গোর্কির কিছুটা জারের আমলে তবু গোর্কিকে ধরা যায়। আন্দ্রেয়েভ, ইয়েভতেশঙ্কু, ভজনেসনস্কি, শোলোখভ, মায়াকভস্কি, আলেক্সেই তলস্তয়সহ শিশু সাহিত্যে প্রচুর লেখক আছে, যাদের নামও হয়তো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে শিশুসাহিত্যে সোভিয়েত পর্বে যে কাজ হয়েছে তা অন্য কোনো সময় হয়নি।

বলতে গেলে সাহিত্যের সেবা করেই একটা জীবন কাটালেন। জীবন কি অর্থময় মনে হয়?

জীবনতো এমনিতেও কেটে যেতো। ধরো আমি স্কুল মাস্টারি করতাম, সেটায় লেগে থাকলেও চলে যেতো। কিন্তু এখন এই যে ধরো পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ থেকে খুঁজে খুঁজে তোমরা উপকৃত হবার, ভাল লাগার কথা জানাচ্ছো–তাতে মনে হয় জীবন একেবারে নিরর্থক যায়নি।