লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠী

সাতবছর বয়সে আমি প্রথম যৌন-নিপীড়নের শিকার হই লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠী

 

[লক্ষ্মী নারায়ণ ত্রিপাঠী একজন ভারতীয় হিজড়াধিকার কর্মী, অভিনেতা এবং ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী। তিনি ১৯৭০ সালে ভারতের মারাঠা প্রদেশে একটি ব্রাহ্মন পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিশেবে স্বীকৃতি প্রদানের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘদিন। মোম্বাইয়ের মিথিবাই কলেজ থেকে ভরতনাট্যম এর ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে হিজড়াদের অধিকার নিয়ে একাধারে অনেকগুলি এনজিওতে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ২০০২ সালে শুধুমাত্র হিজড়াধিকার নিয়ে কাজ করে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম নথিভুক্ত একটি এনজিওর প্রধান হিশেবে নিযুক্ত হন। ২০০৭ সালের দিকে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিশেবে অধিকার আদায়ের আন্দোলনের লক্ষ্যে নিজেই ‘অস্তিত্ব’ নামে একটি সংগঠন চালু করেন। ত্রিপাঠীর নেতৃত্বে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর অবশেষে ২০১৪ সালের এপ্রিলে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট ভারতীয় হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি প্রদান করেন। যে স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে ভারতে বসবাসকারী ত্রিশলক্ষ হিজড়া সাধারণ জনগনের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল সুবিধা ভোগের সমান সুযোগ অর্জন করেছে। সাক্ষাৎকারটি ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের ‘গের্নিকা’ ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যা ‘বাউন্ডারিজ অব জেন্ডার’-এর জন্য গ্রহণ করেছিলেন ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক শানূর সিরভাই। তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ, ডেইলি বিস্ট, দ্য ক্যারাভান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং গের্নিকা ম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালেখি করেন। মুম্বাইয়ের গণিকাদের জীবন নিয়ে রচিত ‘ডটারস অব দ্য রেড লাইট’ বইটির রচয়িতা। বর্তমানে হারভার্ড কেনেডি স্কুল থেকে ‘পাবলিক পলিসি’ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন। তার নেয়া সাক্ষাৎকারটি কথাবলির পাঠকদের জন্য বাঙলায় ভাষান্তর করেছেন কবি ও অনুবাদক অজিত দাশ।]

 

হিজড়া শব্দটি সবার কাছে একরকম নিন্দনীয় হয়ে উঠেছে। এই শব্দটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

হিজড়া হলো নারীর আকারে গড়া একজন পুরুষ কিন্তু আমরা নিজেদেরকে নারীই মনে করি। সমাজে আমাদের একটি আলাদা অবস্থান আছে। হিজড়াদের অনেকেই নপুংসক হয়ে থাকে তবে সবাই নয়। তারা মনে করে তাদের মনটাই নাকি হিজরার মতো। তবে আমি মনে করি আমরা নারী কিংবা পুরুষ কোনোটাই না। তবে আমরা নারীত্বকে উপভোগ করি। নারীত্বকে উপভোগ করলেও একজন হিজড়া নিজেকে পুরোপুরি নারী হিশেবে মনে করেন না। অন্যের কাছে বিষয়টা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তবে এটা ভাবার কারণ নেই যে হিজড়ারা তাদের পরিচয় সম্পর্কে তেমন অবগত নয় কিংবা জানলেও তা লুকানোর চেষ্টা করেন। তবে তাদেরকে তোমার ভন্ড কিংবা প্রতারক ভাবা ঠিক হবে না। আমাদের আত্মা এবং শরীরের প্রতি নিষ্ঠা রেখেই আমরা আমাদের যৌনাতাকে প্রকাশ করি। বিজ্ঞান এবং ডাক্তাররা আমাদের নিয়ে যাই বলুক না কেন আমরা নিজেদেরকে যেরকম ভাবি ঠিক সেরকমভাবে নিজেদের কাছে নিষ্ঠাবান থাকার চেষ্টা করি।

ঐতিহাসিকভাবে হিজরারা ভারতীয় সমাজে অনেক সমাদৃত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পালটে যায়। আপনার কাছ থেকে এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত কিছু জানতে চাই?

ভারতীয় প্রাচীন গ্রন্থ মনুসংহিতায় এবং বৈদিক সময়ে আমাদেরকে বলা হতো কিন্নর। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় আমরা খুবই মর্যাদা সম্পন্ন ছিলাম। রাজগৃহ হতে শুরু করে সর্বত্রই আমাদের সাধারণ বিচরণ ছিল। মুসলিম নবাবদের সময় হারেমের রক্ষক ছিলাম, উপদেষ্টা ছিলাম, রাণীর প্রতিরক্ষক হিশেবে ছিলাম। সেই সময়ে আমাদেরকে অনেক সন্মান দেয়া হতো। ব্রিটিশ শাসন আমল থেকেই আমাদেরকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয়। আমাদের প্রতি একধরনের নিচুমনা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতে থাকে ব্রিটিশরা। কেননা রাজ দরবার কিংবা কোর্টে আমাদের অবস্থান ব্রিটিশদের সন্দিহান করে দিয়েছিলো। তাদের কাছে মনে হয়েছে তাদের শান্তিপূর্ণ শাসনের আমরা হুমকিজনক। কেননা তারা আমাদের শারীরিক গঠনটি ঠিক মতো বুঝতে পারেনি। ব্রিটিশরা আমাদের কাছ থেকে আমাদের বাসস্থান ছিনিয়ে নিয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে আমাদের শিষ্য হতে প্রাপ্ত সকল জমি ছিনিয়ে নিয়েছিলো। সামাজিকভাবে আমাদের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছিলো। তৎকালীন ব্রিটিশরা ভারতীয় আদিবাসী গোষ্ঠীদের জন্য একটি ঔপনিবেশিক ফৌজদারি আইন চালু করেছিলো। সেই আইনের ধারা ৩৭৭ অনুযায়ী প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে যেকোনো ধরনের যৌন ক্রিয়াকলাপের প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরও তেমন কিছু পরিবর্তন হয়নি। ঔপনিবেশিক মানসিকতা এখনো মানুষের মনের গভীরেই রয়ে গেছে। ব্রিটিশদের দুইশ বছরের শাসনব্যবস্থা সত্যি ভারতীয়দের অস্তিত্ব এবং ধ্যান-ধারনাকে আমূল পালটে দিয়েছে। সরকার ছাড়াও সুশীল সমাজের কেউ পর্যন্তু আমাদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেননি। যখন আমরা আমাদের (তৃতীয় লিঙ্গ হিশেবে স্বীকৃতি প্রদানের আন্দোলন) কার্যক্রম শুরু করি আমি সবাইকে একটা কথাই বলার চেষ্টা করেছি, ‘আমরা মানুষ, আমাদের একটা অস্তিত্ব আছে। দয়া করে মানুষ হিশেবে আমাদেরকে বেঁচে থাকার মর্যাদাটুকু দাও।’ আমি মনে করি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্দশার কারণ হলো মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা। আমাদের সম্প্রদায়টি দিনের দিনের মানুষের ঘৃণা মোকাবেলা করে এসেছে। আমরা সবসময়ই অবহেলিত ছিলাম। এইচআইভি যখন বিশ্বব্যাপী একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন থেকে আমরা সংগঠিত হতে শুরু করি। মানুষজন বিশ্বাসই করতেন না যে হিজড়ারা যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারে। সবাই আমাদেরকে সমকামী হিশেবেই বিবেচনা করত। কিন্তু আমি বলেছি যে আমরা সমকামী নই।

কীরকম অনুভব করেন যখন লোকজন ভুল করে আপনাদেরকে সমকামী হিশেবে শ্রেণিকরণ করেন?

সত্যি খুব খারাপ লাগে। আমার মনে আছে সেই ১৯৯৯ সাল থেকে যখন প্রতিবাদ করা শুরু করেছি, আমি বলেছিলাম যে রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই আমার লিঙ্গ নিয়ে যা খুশি তা বলবে। যদি আমি নিজে মনে করি আমি পুরুষ নই তাহলে রাষ্ট্রকে আমাকে চাপিয়ে দেয়ার। পুরুষ কিংবা সমকামী হিশেবে আমাদের বিবেচনা করা হলে আমার খুব মন খারাপ হয়। যখন কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে আপনি কি পুরুষ না নারী? আমি তাদেরকে বলি, ‘আমরা হচ্ছি পৃথিবীর প্রাচীন একটি আধিবাসী গোষ্ঠী যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাস আছে। এবং দক্ষিন এশিয়ার প্রায়ই চারটি দেশেই (ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নেপাল) হিজড়া আদিবাসীদের অস্তিত্ব আছে। আমাদের জীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং আমাদের দুঃখ, বেদনা, অনুভূতি সব মিলিয়ে আমাদেরকে এতটা যুথবদ্ধ হতে শিখিয়েছে যে যার মূল্য রক্তের সম্পর্কের চেয়েও অনেক গভীর। আর একারণেই আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বৃদ্ধাশ্রম ব্যাবস্থা নেই। আমাদের গুরু আমাদেরকে তিরস্কার করেন কিন্তু আমরা মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের গুরুর যত্ন নিয়ে থাকি।

আপনার শৈশবের গল্প শুনতে খুব আগ্রহ বোধ করছি।

শৈশবে অনেকটা দ্বিধা তৈরি হয়েছিল। আমি নিজেকে মেয়ে হিশেবে ভাবতে লাগলাম কিন্তু পরিবারের সবাই আমাকে ছেলে হিশেবেই দেখত। আমি সবসময়ি মেয়দের ফ্রক পরতে চাইতাম, মেয়েলী জামাকাপড় পরতে পছন্দ করতাম। ছেলেদের স্কুল ড্রেস পড়তে সবসময় খুব বিরক্তি বোধ হতো। সবসময় মেয়েদের স্কুল ড্রেস পড়ে স্কুলে যেতে চাইতাম। একটু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মেয়েলি বৈশিষ্ট প্রকাশ পেতে শুরু করল। সুযোগ পেলেই আমি মেয়েদের মতো নাচতাম। আমাদের স্কুলে একটি শখের ক্লাশ ছিলো যেখানে ক্লাশের একমাত্র বালক হিশেবে আমি নাচ শিখতাম। সাতবছর বয়সে আমি প্রথম যৌনহয়রানির শিকার হই দূরসম্পর্কের এক কাকার ছেলের দ্বারা। এই ঘটনার পর আমার কাকাতোভাই ও তাদের বন্ধুরা আমাকে প্রায়ই উত্যক্ত করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আমার ভিতেরর শিশুপনা দূর হতে থাকে এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমি পরিপক্ক হয় উঠি। আমি বিশ্বাস করি আমার কোনো শৈশব ছিলোনা। আমি বুড়ু হয়েই জন্মেছিলাম। আর আমার নারীত্বের কারণেই আমি এরকম নিপীড়নের শিকার হয়েছি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন হিজরার শরীরকে একটি খেলনা ছাড়া আর কিছুই ভাবা হয় না। আমি নাচ শিখেছি কেননা আমি নাচতে ভালোবাসতাম। নাচলে আমার সব ব্যথা দূর হয়ে যেত। যখন নাচতাম আমার খুব সুখানুভূতি হতো। নাচার কারণে মানুষের কাছে আমার একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

আপনি কি কখনো কারো কাছে যৌন নিপীড়নের কথাটি প্রকাশ করেছিলেন?

না। আমি ভিতু ছিলাম তখন। এবং কারো কাছে বলার কথা চিন্তাও করিনি। যৌন নিপীড়িতদের কাছে সব প্রশ্নের জবাব হয়ত থাকেনা। আর আমি কখনোই এটা উপলব্ধিই করতে পারিনি এটা যৌন নিপীড়ন ছিল। আমাদের প্রজন্মটা বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে অনেক আলাদা ছিলো। বর্তমানে একটা ছোট শিশু অনেক কিছু জেনে যায় যা আমাদের সময়ে হয়ে উঠেনি। যখন আমি বুঝতে পেরেছি এটা যৌন নিপীড়ন ছিলো তখন অনেক সময় পার হয়ে গিয়েছিল। সম্প্রতি আমি একটি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিশেবে গিয়েছিলাম এবং সেখানকার একটি ছেলে আমাকে যৌন নিপীড়ন করার চেষ্টা করেছিল। সে আমার দিকে ভাল করে তাকায়নি পর্যন্ত কিন্তু আমি তার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছি কেননা আমি বিশ্বাস করি কর্মফল অনুযায়ী লোকজন তোমাকে তার উপযুক্ত মূল্য দিবে। আসলে যা চলে গিয়েছে তা গিয়েছে। আমি অতীতকে আমার সঙ্গে কখনই টেনে বেড়াই না। তুমি অতীতকে পরিবর্তন করতে পারবে না কিন্তু ভবিষ্যতকে আরো সুন্দর করে তুলতে পারবে।

আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মন পরিবারের সন্তান। সেই সমাজ আপনার ওপর কীরকম প্রভাব ফেলেছিল এবং আপনি কীভাবে আপনার পরিচয় উপলব্ধি করতে পেরেছেন?

আমাদের অনেক বড় একটি বাড়ি ছিল। মহারাষ্ট্রের একটি শীর্ষ স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের নাক উঁচু বলে একটি কথা প্রচলিত ছিলো। আমি হস্ত শিল্প, নাচ, গান এবং বিতর্কে খুব ভাল ছিলাম। আমি প্রায়ই বলতাম কেন তারা বিতর্ক করে এবং কেনই বা তারা হাত তালি দেয়। আমার চারপাশ আমাকে এটা ভাবতে বাধ্য করেছে যে আমি একজন সমকামী। কিন্তু আমার নারীসত্তা এতটাই প্রবল ছিল যে সমকামীরা আমাকে নতুন কিছু ভাবত। কিন্তু আমি অনেকটাই নারীসুলভ ছিলাম এবং খুব হাস্যরসিক ছিলাম। আমি বিশ্বাস করতাম ভাল নারীরা স্বর্গে যায় এবং মন্দ নারীরা সর্বত্রই যায় তাই আমি হচ্ছি মন্দ নারী। কিন্তু তারা আমাকে পেপসির বোতলের সঙ্গে তুলনা করত। পরবর্তীতে আমি একটি নাটকের দৃশ্যে অভিনয় করার জন্য অংশগ্রহণ করি। কিন্তু সেখানকার সবাই একত্রিত হওয়া এবং নানারকম পার্টিগুলি ছিলো ভীষণরকম যৌনতায় ভরা। লোকজন দেখা করতে চাইত। একত্র থাকতে চাইত। কিন্তু আমি সবসময় আমার নিজেকে নিয়েই থাকতে চেয়েছি। এটা সত্যি একটা অন্যরকম আনন্দের যখন তুমি নিজেকে নিয়ে থাকতে চাইবে। নিজেকে সময় দিতে চাইবে। নিজের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করবে। আমার মধ্যে নারী সত্তা বলে একটা ব্যাপার ছিল তাই আমি ছেলেদের সঙ্গে থাকতে আপত্তি বোধ করতাম। এটা যৌনতা ছিল না। আমার জীবনে প্রতিটি সম্পর্কের একটি মূল্য ছিলো। আমি কোনো টম, ডিক কিংবা হ্যারির সংস্পর্শ পেতে চাইতাম না। আমার একজন ভাল পরামর্শদাতা ছিল যিনি সবসময়ই বলতেন, মানুষের জীবনে মর্যাদা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমার মাও ব্যক্তি চরিত্রের বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিতেন। আমি যখন প্রথম হিজড়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম এটা ছিল একটা বড় কর্মক্ষেত্র। প্রথমবারের মতো একটা আত্মশক্তি উপলব্ধি করেছি। সেখানে আমার না কোনো পুরুষ উত্যক্ত করবে না কারো সঙ্গে বিছানায় যেতে হবে। সবাই সবার মঙ্গলের জন্য প্রতীক্ষা করত। সবাই সবাইকে ভালবাসত।

হিজড়া সম্প্রদায় সাধারণত কী করে থাকে। উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু কর্মসূচি কী থাকে তাদের মধ্যে?

এটা আসলে গুরু-শিষ্য পরম্পরা। একটি সম্প্রদায়ে মূলত একজন গুরুই আর বাকি সবাইকে পথ দেখিয়ে থাকেন। সমাজে কীভাবে চলতে হবে, কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হবে এই সব কিছুর পরামর্শ এবং শিক্ষা গুরুই দিয়ে থাকেন। শিষ্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে সেই গুরুকে বৃদ্ধকালে দেখাশোনা করা। একজন গুরুর একজন থেকে শুরু করে হাজার হাজার শিষ্য থাকতে পারে। গুরুর মৃত্যুর পর শিষ্যদের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন কাউকেই আবার গুরুর মর্যাদা দেয়া হয়। প্রতিটি শিষ্য’র আবার নিজের শিষ্য থাকে। এটা অনেকটা পিরামিডের মতো। এ পর্যন্ত আমার প্রায়ই ১৫-২০ জন শিষ্য আছে। আমার একজন গুরুর সঙ্গে সবসময় আমার ভালো সম্পর্ক ছিল না কেননা আমি সবসময়ই আইন ভঙ্গ করতাম কেননা গন্ডিবদ্ধ জীবন আমার কাছে কখনোই ভাল লাগত না। আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে গুরু সঠিক কিংবা ভুল যাই বলে কখনো তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না। আমার শিষ্যরা আমাকে অনেক প্রশ্ন করে থাকে অন্যান্য অনেক গুরুর চেয়ে। আমি এতে খুব স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। কেননা ওদের সবগুলি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ক্ষমতা এবং জ্ঞান আমার মধ্যে আছে।

মূলত হিজরারা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে?

ভিক্ষাবৃত্তি, যৌনবৃত্তি এবং কোনো অনুষ্ঠান যেমন বিয়ে কিংবা জন্মদিনে আশীর্বাদ দেয়ার মাধ্যমে মূলত হিজরারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সামাজিক কাজ কর্মের মধ্যে হিজরাদের তেমন দেখা যায় না। তবে এখন অনেক হিজরাই সামাজিক কাজ কর্মে অংশগ্রহণ করছে। কেউ কেউ পড়াশোনা করে পিএইচডিও করছে। আমি যখন বার ড্যান্সার হিশেবে কাজ করতাম তখন পর্যন্ত কোনো হিজড়া বার ড্যান্সার ছিলনা। ১৯৯৯ সাল থেকে যখন হিজরাদের নিয়ে সংগঠন করা শুরু করি তখন পর্যন্ত হিজরাদের নিয়ে কাজ করে এমন এনজিও ছিলোনা ভারতে। কিন্তু আমি শুরু করেছি কেননা আমি মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। সমাজে আমার অবস্থানকে একটি মজবুত এবং সন্মাজনক ভিত্তি দিতে চেয়েছিলাম। আমি হিজড়া হওয়ার কারণে সমাজে আমার বাবা মাকেও অনেক অপমান অপদস্থের শিকার হতে হয়েছিল। আর এখন সেই লোকজনই পৃথিবীর নানা জায়গায় নানা রিয়েলিটি শোতে আমাকে অংশগ্রহণ করতে দেখে। একসময়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে খুব অসুবিধা হতো এখন কেউ দেখলেই আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চায়।

হিজড়াসম্প্রদায়ের মধ্যে নিশ্চয়ই একধরনের বিভাজন দেখা যায় এই যেমন ধরুন আপনি নিজের অস্তিত্বের প্রতি সৎ থেকেই এই সম্প্রদায়টির গতানুগতিক ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা করে একটা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন। এতে আসলে কি ধরনের সমস্যার সন্মুখীন হতে হয়েছে আপনাকে?

যারা একটু আলাদা হতে চায় আমি মনে করি তারা একটি নতুন প্রজন্ম এবং তারা তাদের মতো বেঁচে থাকতে চায়। আমি মনে করি নতুন প্রজন্মই হচ্ছে ভবিষ্যতে সংস্কৃতির কর্ণধার। ঐতিহাসিক ভাবে ব্রিটিশরা তাদের ভূমি কেঁড়ে নিয়েছিলো কিন্তু তারা সংগ্রাম করেছে। ব্রিটিশ পরবর্তী সরকারের অবহেলায়ও তারা সংগ্রাম করেছে এবং নিজেদেরকে গোপন করে রেখেছে। প্রকৃত অর্থে তারা নিজেদেরকে একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে যেটা কখনো হারাতে চায়নি। আগের গুরুদের সময় ছিল একরকম। এখন সময় অনেক পাল্টেছে। মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীণচেতা হতে শিখেছে। আমি বলছিনা তারা মন্দ ছিলেন। তারা তাদের কাজ করেছে আর আমি আমার কাজ। তারা হয়ত বুঝতে পারবেন না আমি আসলে কি করেছি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতি প্রচলিত ধ্যান-ধারনা থেকে মুক্ত হবে। যেরকম প্রতিটি সমাজের বিবর্তন হয় ঠিক সেরকমভাবে শিক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং সন্মান নিয়ে প্রযুক্তির কল্যাণে আমরাও নিজেদের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসব। রাষ্ট্র আমাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করেছে। লিঙ্গবিভাজনের দিক থেকে আমরা উল্লেখযোগ্যভাবে সংখ্যালঘু কিন্তু রাষ্ট্র আমাদেরকে চোখেই দেখতে পায় না। আমি মনে করি আমি কিংবা আমরা কখনো অদৃশ্য ছিলাম না। আমি মনে করি ‘আমরা একটি জটলা নই বরং জটলার মধ্যে কিছু দৃশ্যমান মুখ’।

আপনি মনে করেন আপনার গোপন জীবনযাপন আপনার পরিবারের জন্য সুফল বয়ে আনবে?

তারা হয়ত তাই বলবে। কিন্তু আমি তা মনে করি না। কেননা তুমি জান আমি ছোটবেলা থেকেই খুব স্পষ্টবাদী ছিলাম। গোপন জীবন যাপন বলতে তুমি কি বুঝ? আমার নারীত্বকে আমার মধ্য থেকে বাদ দিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। আমি ভয় পেয়েছি। পরবর্তীতে আমার বাবা আমাকে নিয়ে গর্ব করেছেন। তুমি নিশ্চই জান প্রতিটি পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানদের নিয়ে একটা কঠিন সময় পারি দিতে হয়। আমার বাবা মা আমাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলো আমি স্পষ্ট না বলেছি। আমি কীভাবে একটি মেয়ের সঙ্গে জীবন কাটাবো? আমি বলেছি তোমরা যদি আমাকে বিয়ে দিতে চাও তাহলে আমি আত্মহত্যা করব। তারা তখন খুব হতাশ হয়েছেন।

কিছু হিজড়াদের নিয়মানুযায়ী অন্ডকোষ কেটে ফেলে ।এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

হিজড়া গোষ্ঠীদের নিয়ম অনুযায়ী এটা জরুরী না। এটা একজনের নিজস্ব ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। যদি তুমি এটা কর তাহলে তোমার পুরুষালী বৈশিষ্ট দানকারী হরমোণ গুলি আর বৃদ্ধি পাবে না। শারীরিকভাবে তুমি নারীর রূপ লাভ করবে। কিন্তু আমি সবসময়ই বলেছি যে এটা সঠিক উপায় না। তোমাকে অবশ্যই একটি পূর্ণাঙ্গ লিঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে।

যারা অন্ডকোষ কেটে ফেলে কিংবা কাটে না তাদের কি আলাদা করে উত্তরসূরী থাকে?

অন্ডকোষ কেটে ফেলা হয়নি এমন কোনো হিজড়ার সঙ্গে যখন দেখা হয় এই ধর যেমন আমার মতো যারা। তুমি কি ভাবছ এরকম কাউকে হয়ত আমি উত্তরসূরি হিশেবে নির্বাচন করব? না। অন্ডকোষ কেটে ফেলে তারাই করে যারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। কেননা তারা নিজেদেরকে নারীর মতো করে দেখতে চায় । যখনি কোনো বিয়ে কিংবা অনুষ্ঠানে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে এবং লোকজন কিছু দেয়না তখন শাড়ি খুলে ফেলে আর এটাই হচ্ছে তাদের বড় হাতিয়ার। মূলত উপার্জনের প্রক্রিয়াটিকে টিকিয়ে রাখতেই অনেকে অন্ডকোষ কেটে ফেলে করে ফেলে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা গল্প চালু আছে হিজড়ারা ছেলে শিশুদের নিয়ে গিয়ে অন্ডকোষ কেটে ফেলে । এই বিতর্কিত বিষয়গুলিকে কীভাবে দেখ?

আমার এখনো গুরুর কথা মনে আছে। তিনি কখনো আমাকে শাড়ি পড়তে বলেননি। তিনি বলেছিলেন এটা কোনো মজা করার বিষয় নয় কেননা এখনো হিজড়াদের প্রতি সমাজের কোনো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। কোনো শিশুই এতটা দুঃখ নিয়ে জন্মায়নি যতটা দুঃখ আমরা পেয়েছি। আমি সবসময় বলি, আগে পড়াশোনা শেষ কর তারপর জীবনে যা হতে ইচ্ছা করে তাই হবে। আগের নিজের একটি আর্থ সামাজিক শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। যদি তুমি অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠ তাহলে দেখবে সবকিছুই তোমার জন্য সহজ হয়ে পড়েছে। আমি নিজেই এখন সবার জন্য একটি দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছি। এবং মানুষজন সত্যি এটা মনে করে আমি হয়ত এখন একটা শান্তির জীবনযাপন করছি, সবাই আমাকে গ্রহণ করছে, আমার বাবা মাও আমাকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। আমি আমার মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেগুলি বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করি। এবং নিজের সন্মানের জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করার চেষ্টা করি। লোকজন যখন আমাকে নিজের আত্মজীবনী লেখার কথা বলেছিলো আমি বলেছি আমার বয়স এখনো অনেক কম কিন্তু তারা আরো জোড় দিয়ে বলে তোমার লেখা উচিত কেননা সাধারণ মানুষ হিজরাদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। লোকজন বিশ্বাস করে যদি কোনো হিজড়া তোমাকে অভিশাপ দেয় তাহলে সত্যি তোমার জীবনে অমঙ্গল কিছু একটা ঘটবে। লোকজন আমাদেরকে টাকা দেয় কেননা তারা আমাদের অভিশাপ থেকে বাঁচতে চায়। বর্তমানে এই একটা হাতিয়ার ব্যবহার করেই হিজরারা তাদের জীবিকা নির্বাহের কাজটা সহজে চালিয়ে যাচ্ছে।

হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন সংগ্রাম করে এসেছেন। যার ফলপ্রসূ ভারত সরকার এপ্রিল ২০১৪ সালে ভারতীয় হিজরাদের তৃতীয় লিংগের স্বীকৃতি প্রদান করে। আপনার কি মনে হয় এই মর্যাদা হিজড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এক নতুন পরিবর্তন নিয়ে আসবে?

অবশ্যই। আমি অনেক হিজড়াকেই দেখেছি এখন রূপচর্চা কেন্দ্রগুলিতে কাজ করছে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট এ পড়া এক হিজড়া ছাত্র আমাকে বলেছে এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর পর তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয়ে সে একটি কলেজে ভর্তি হয়েছে। তোমার সঙ্গে কথা বলা অবস্থায় একটি ফোন এসেছে একজন হিজড়া একটি বাড়ি কিনতে চায় কিন্তু কেউ তাকে কিনতে দিচ্ছেনা। আমি বলেছি পুলিশ স্টেশনে গিয়ে সাধারণ ডায়রি করতে। সংগ্রাম ছাড়া কেহই তোমাকে তোমার অধিকার দিতে প্রস্তুত হবে না। আর সেই অধিকারই হিজড়ারা এখন অর্জন করেছে।

আপনার বর্তমান সামাজিক অবস্থান এবং যোগাযোগের পরেও কখনো কখনো আপনাকে লিঙ্গ বিভাজনের স্বীকার হতে হয়েছে। এরকম কোনো অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই?

আমাকে মুম্বাইয়ের একটি জিমখানা ক্লাব থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। জিমখানা ক্লাব ছিলো মোম্বাইয়ের ধনী নাগরিকদের নিয়ে গঠিত একটি ক্লাব। এটা দুহাজার দশ সালের ঘটনা। সেখানে রাতের বেলা একটি জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমাকে অতিথী হিশেবে আমন্ত্রণ করা হয়েছিলো। অনুষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে অনেক মহিলা ছিলেন যারা আমাকে দেখে কাছে এসে ছবি তুলতে চাইলেন। আমি তাদের সঙ্গে সানন্দে ছবি তুলেছি। পরে যখন দোতালায় অনুষ্ঠানের মূল কক্ষে পৌঁছালাম তখন ক্লাবের সিইও এসে ক্লাব প্রধানকে ধমক দিয়ে বললো এটা তুমি কাকে ধরে নিয়ে এসেছ? ক্লাব প্রধাণ যখন বললেন, তিনি আমাদের বিশেষ অতিথি তখন সিইও তার সদস্যপদ বাতিলের কথা বললেন। অবশেষে পরিচালক মহেশ মাথাই আমার কাছে এসে অশ্রুসজল চোখে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন আমি নিজেকে একজন ভারতীয় বলতে লজ্জা বোধ করছি। সে অনুষ্ঠান থেকে যখন বের হয়ে যাচ্ছিলাম তখন একটা কথাই আমার মনে হচ্ছিল, ‘এটা হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে ভারতীয় এবং কুকুরদের প্রবেষ নিষেধ’। তবে এই ঘটনার পর অনুষ্ঠানটি আর ঠিকমতো হয়নি। কেননা আমার অপমান অনেককেই ব্যাথিত করেছিলো।

হিজড়াদের মধ্যে আপনি উল্লেখযোগ্য ভাবে নিজেকে একটি দৃষ্টান্তমূলক জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি নানা দেশের ঘুরে বেরিয়েছেন। আপনার এই অভিজ্ঞতা কিংবা খ্যাতি অন্য হিজড়াদের নিশ্চই ঈষার্ন্বিত করে। আপনার মতো যারা সেরকম সুযোগ পাননি সে বিষয়ে কি বলবেন?

তারা অনেকেই আমাকে ঘৃণা করে। তারা জানতে চায় আমি কি করে এত নাম ডাক করেছি। এরকম পরিস্থিতিতে অনেক সময় তোমাকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে। আমি হিজরাদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করেছি। এবং সবাইকে বলেছি যে স্তন থাকলে অথবা লিঙ্গ পরিবর্তন করে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। সর্বপ্রথম তোমাকে তোমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার মতো অনেক হিজরাই আছে যারা সন্মানমূলক পেশায় অর্থ উপার্জন করতে চায়। আমি কখনোই ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা পতিতাবৃত্তি পেশা বেঁছে নিইনি। অর্থ উপার্জনের জন্য প্রথম দিকে একটি নাচের স্কুল খুলেছিলাম, তার পূর্বে একজন মডেল সমন্বয়ক হিশেবে কাজ করেছি। অর্থ উপার্জনের জন্য একজন হিজড়া কিংবা রূপান্তরকামী নারীর অনেক দরজাই খোলা আছে। যদি সে নিজ ইচ্ছায় পতিতাবৃত্তি বেঁছে নেয় তাহলে কিছু বলার নেই। তবে এটাও ঠিক যে একজন হিজড়া তখনি পতিতাবৃত্তি বেঁছে নেয় যখন সমাজে অর্থ উপার্জনের অন্যান্য পথ গুলি তার জন্য অবরুদ্ধ।

একজন সক্রিয় কর্মী হিশেবে এই সম্প্রদায়ের কোন বিষয়গুলি আপনাকে অনুপ্রেরণা দেয়?

এটা আমার দায়িত্ব। যদিও এ কাজে কোনো ধন্যবাদ আমি প্রত্যাশা করি না। আমাকে অনেক হিজরাই হয়ত ঘৃণা করে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমি আমার নিজের প্রতি সবসময়ই সৎ ছিলাম আর এটাই আমাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।

আপনার বইটির নাম ‘আমি হিজড়া, আমিই লক্ষ্মী’ কেন দিয়েছেন?

আমি লক্ষ্মী। যখন আমি নাচতে চেয়েছি নেচেছি। যখন আমি গান গাইতে চেয়েছি গেয়েছি। যখন আমি একজন সক্রিয় কর্মী হিশেবে কাজ করতে চেয়েছি সব বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে এসেছি। যদি আমার মা আমাকে তার পুত্র সন্তান মনে করে থাকে তাহলে আমি তার পুত্র সন্তানই। যদি আমার বোন আমাকে তার ভাই মনে করে তাহলে আমি তার ভাই। যদি আমার শিষ্যরা আমাকে গুরু মনে করে তাহলে আমি তাই। আর আমার গুরুর কাছে আমি একজন শিষ্য। হিজড়া শব্দটি আমাকে বরাবরই উপহাস করেছে। লোকজন কত গালমন্দ করেছে। তবে আমি ত হিজড়াই। এরচেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। আমাকে কেউ বিশেষ করে বলার প্রয়োজন নেই আমি হিজড়া। তাই বইটির নাম দিয়েছি ‘আমি হিজড়া, আমিই লক্ষ্মী।’