তানিয়া জাবেদ

'আই হেইট পলিটিক্স' বলে ছাত্র-রাজনীতি থেকে ছাত্রদের দূরে থাকার সময় শেষ তানিয়া জাবেদ

 

[তানিয়া জাবেদ। একজন শিক্ষার্থী। জন্ম ২ ডিসেম্বর, মাইজদীকোর্ট, নোয়াখালি। পড়াশোনা করেন নোয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরিজি ভাষা ও সাহিত্যে। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে মশাল নামে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রচার-সম্পাদক। সর্বোপরি তিনি একজন সচেতন ছাত্র। তার সঙ্গে কথাবলির পক্ষ থেকে আমি কথা বলেছি তার পড়াশোনা, পছন্দ-অপছন্দ, শিক্ষাব্যবস্থা, ছাত্র-আন্দোলন, ছাত্রদের অধিকার ইত্যাকার বিষয় নিয়ে। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

কখনো কিছু হওয়ার ইচ্ছা ছিলো?

মানুষ হতে ইচ্ছে করতো। ছোটবেলা হতেই মনে হতো আমাদের মানবশরীর থাকলেও মনুষ্যত্ব বিষয়টা অর্জন করতে হয়। বড় হতে হতে খেয়াল করলাম বাবা তার এক বোনের মেয়ের গল্প করেন যিনি পেশায় ম্যাজিস্ট্রেট। গল্প করবার সময় বাবার চোখ উজ্জ্বল হতে থাকে। মনে হলো অই যায়গায় আমি পোঁছালে বাবার চোখ আরো কত না উজ্জ্বল হবে।পড়ছি। অসম্পূর্ণ মানুষ হয়ে আছি। পরিণত মানুষ হবো। তারপর হাওয়া। যেহেতু কেউ বলেছিলো, হাওয়ার আছে গগনব্যাপী ডানা।

পড়াশোনা করতে কেমন লাগে?

পড়াশোনা করতে ভাল লাগে। কিন্তু পরীক্ষা দিতে ভালো লাগে না।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কি তুমি সন্তুষ্ট?

না, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই।

কেনো এই অসন্তোষ?

মনে হচ্ছে দিন দিন শিক্ষাব্যবস্থা আরো এলোমেলো হচ্ছে। সবচেয়ে মন খারাপ হয় বাচ্চাদের দেখলে। বাচ্চারা বড় হচ্ছে শৈশবহীন। আমরা যে বয়সে মাঠে খেলে সন্ধ্যা করে ঘরে ফিরতাম বলে মায়ের মার খেতাম সেই বয়সে আমার ছাত্র মুখ গুঁজে থাকে বইয়ে। সবার জীবনের লক্ষ্য স্থির এ-প্লাস পাওয়া। সে যে করেই হোক। ক্লাস ফাইভ থেকেই বাচ্চাদের মুখোমুখি হতে হয় বোর্ড পরীক্ষার। অথচ জাপানের মতো দেশে শুনেছি চতুর্থশ্রেণি পর্যন্ত  কোনো পরীক্ষাই দিতে হয় না। আরেকটু ওপরের দিকে গেলে দেখি শিক্ষা কেবলই কাগুজে। হাতে কলমে কিছু নেই।

ছাত্র রাজনীতি দরকার আছে বলে কি তোমার মনে হয়?

ছাত্র রাজনীতির দরকার আছে। আমাদের দেশের জাতীয় পরিসরে বড় বড় আন্দোলন, প্রাপ্তি সবই তো ছাত্র রাজনীতিরই হাত ধরে আসা। ইতিহাস তাইই বলে।

তুমি কি ছাত্ররাজনীতি করো?

আমি পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে ভালোবাসি! 'আই হেইট পলিটিক্স' বলে রাজনীতি থেকে ছাত্রদের দূরে সরে থাকবার সময় শেষ হয়েছে। রাজনীতিতে নোংরা কিছু থাকলে সেটা পরিস্কার করার দায়-দায়িত্ব আমাদেরই। আমাদের ভার্সিটির ১০১ একর সীমার মধ্যে গানের আসর হয়, কবিতা আর আড্ডা কিংবা পাঠচক্রের নিয়মিত আয়োজন করে মশালের মতো সংগঠন। আমি এই সংগঠনের সঙ্গে কাজ করি।

তোমাদের ভার্সিটিতে কি বেতন-ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন হয়?

হ্যাঁ। বিগত ৫ বছরে দুবার হয়েছে এমন আন্দোলন। প্রথমবার ২০১১ সালের এর শেষের দিকে মানে আমাদের ফার্স্ট ইয়ারে। বেশ বড়সড় আন্দোলন ছিলো। ফলত ক্রেডিট প্রতি ১৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছিল। এই কিছু দিন আগে আবার টিউশন-ফি বাড়বে খবর এলে ছাত্রদের জোর প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।

এই আন্দোলনকে তুমি কীভাবে দেখো?

এ ধরনের আন্দোলন অবশ্যই ইতিবাচক বলে আমার মনে হয়। আমরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই তাহলে অন্যের সুযোগ নেবার সুযোগ থাকে না। তাছাড়া এমন আন্দোলনগুলি মনে করিয়ে দেয় যে কোনো যৌক্তিক আন্দোলনে সকল ছাত্র একতাবদ্ধ।

তুমি ইংরিজি সাহিত্যে পড়তে গেলে কেনো? আর কোনো বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিলো?

সাহিত্যে পড়তে গেলাম মুলত বিবিএ তে সুযোগ না পেয়েই। কিন্তু পড়তে গিয়ে আনন্দ পেয়েছি। মনে হয়েছে সাহিত্য আমার জন্যই। আনন্দ নিয়ে পড়েছি, এখনো পড়ছি।

সাহিত্যের স্টুডেন্ট হিশেবে তোমার কবিতা ভালো লাগে, নাকি ফিকশন?

কবিতা কবিতা এবং কবিতা ভাল লাগে। তারপর ফিকশন।

তোমার প্রিয় কবিদের মধ্যে কার কবিতা এ মুহূর্তে মাথায় আসছে?

রবার্ট ফ্রস্ট-এর ‘...I have promises to keep, /And miles to go before I sleep...’  ভাবলেই আমার মনে হয় এই লাইনটার একটা আলাদা শক্তি আছে।

 তোমাকে মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখালেখি করতেও তো দেখা যায়...

 এইসবকে তো লেখালেখি বলে না। মনের দুঃখে যেমন বনে যায় মানুষ তেমনই আমিও ফেসবুকের ওয়ালে দুয়েক লাইন লিখি।

 লেখালেখি নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কী?

লেখালেখি নিয়ে এখনই কিছু ভাবছি না। তবে ভাষার ওপর দখল আনতে চাই। অনেকটা হুমায়ুন আজাদের মতো, যা লিখবো তাই যেনো ফুল, পাতা আর বৃষ্টির মতো মনে হয়। তবে কোনোদিন যদি গুছিয়ে এক মলাটে নিয়ে আসি এইসব টুকরো কথা তবে এদের নাম হবে ‘পেচার পাখায়, জোনাকির গায়ে...’

তোমার প্রিয় ফল কী?

আম।

কেনো প্রিয়?

খেতে মজা তাই।

কার গান ভালো লাগে?

নিদিষ্ট কারো না অথবা অনেকের। পুরনো বাংলা আর হিন্দি গান পছন্দ। তবে বিশেষ ভালো লাগে নাথের গান, রবীন্দ্রনাথ।

বিবাগী হতে ইচ্ছে করে?

ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে।

পাহাড়ে যেতে ইচ্ছে করে?

ইচ্ছা করে। বন ভাল লাগে। সবুজ ভাল লাগে। কখনো সব ছেড়ে ছুঁড়ে আমার পাহাড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে করে।

প্রিয় গাছ কী?

বটগাছ। যেনো আঁকড়ে ধরে কেমন করে! ছায়া দেয়। এবং একটি বটগাছ কে আমি নিজের বলেই ভাবি। খুব মন খারাপে তার ছায়ায় বসি। শান্তি লাগে।

নির্জনতা নাকি কোলাহল ভালো লাগে?

নির্জনতা ভালো লাগে।

ল্যাম্পপোস্টের আলো কেমেন লাগে?

ভালো লাগে না। জোনাকির আলো ভালো লাগে ।

চাইলেই ঘুমোতে পারো? মানে ইচ্ছে ঘুম?

 না। মনখারাপ ঘুম দিতে পারি। ইচ্ছে ঘুম দিতে হলে আগে মন খারাপ করে ফেলতে হবে।

 কখনো বাঁশের সাঁকো পার হয়েছো?

 অনেক বার পার হয়েছি।

বাঁশের সাঁকো পার কেমন লাগে?

ভয় ভয় ভাল লাগে।

বাঁশফুল দেখেছো কখনো?

দেখেছি মনে হয়। একসময় আমাদের বাসার পাশেই বাঁশঝাড় ছিলো।দেখেছি। কিন্তু মনে করতে পারছি না

বাঁশফুল কেমন করে দেখেছো? বাঁশফুল তো ফোটে মনে হয় কয়েকশ বছর পর একবার। শেষবার বেশ কয়েকবছর আগে ফুটেছিলো রাঙ্গামাটিতে।

কয়েশ বছর পর পর হলে তো দেখিনি! হ্যালির ধূমকেতুর জন্য তো আরো কম অপেক্ষা করতে হয়। আসলে ঘরের আমরা যে ফরেস্ট কলোনিতে ছিলাম ওখানে ঘরের পাশেই বাঁশবাগান ছিল। তাই মনে হলো দেখেছি। ছোট ছিলাম তো তাই ভুলে গেছি।

শৈশবে পড়া কোন পদ্য এখনো বেশি মনে পড়ে?

আমি হবো সকালবেলার পাখি/সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি কিংবা বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই/ মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই...

আর কিছু মনে পড়ে?

যে পদ্যগুলি বেশি বেশি মনে পড়ছে.. ওইগুলি আমার শৈশবের রং। বাবা বলতো, ভোর হলো দোর খোল,/খুকুমনি ওঠোরে... দুষ্টুমি করতে গিয়ে ধরা পড়লে বলতো, ‘দুষ্টের শিরোমনি’। খুব অভিমানে গাল ফুলালে বলতো, ‘কে মেরেছে, কে বকেছে, কে দিয়েছে গাল...’

কাকপাখিকে পাখি হিশেবে কেমন লাগে?

কাকের ডাকাডাকি ছাড়া সব ভালো। আমার ভাল্লাগে বউ কথা কউ। অলস দুপুরে আমি চুপচাপ হয়ে থাকার সময়ে এ পাখি ডাকে। আমার মনে হয় পাখিটা আমায় ডাকছে।

তোমার তো পড়াশোনা শেষ হতে আর বেশিদিন নাই। তুমি তোমার অনুজ শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু বলো।

অনুজদের জন্য বলতে চাই, সৎ ও সচেতন থাকবে।এই সচেতন থাকবে নিজের ও অন্যের অধিকার রক্ষার জন্যে। আমরা আজ ক্ষয়ে যাচ্ছি, কারণ আমরা ভাবছি, কই, চাপাতি তো আমার ঘাড়ে পড়ছে না। যার ঘাড়ে পড়ছে দায়ও তার। অন্যের অধিকার নিয়ে আমি না ভাবলে সেও তো ভাববে না আমার টা নিয়ে। কাল যখন আমি বিপদে পড়বো কেউ তো এগিয়ে আসবে না। ছোট্ট একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে বুঝবে ব্যাপারটা। এই কিছুদিন আগেও ক্যাম্পাসে বখাটেরা মেয়েদের উত্যক্ত করতো। ছিলো বহিরাগতদের বাড়াবাড়ি আনাগোনা। একটা আন্দোলন এর জন্য যখন হলের মেয়েদের সাথে কথা বলতে যাওয়া হলো তারা বললো যে কই আমাদের তো কিছ্য করে না। যার যার সমস্যা তারা তারা আন্দোলন করুক...। এই হলো অবস্থা।

তাই বলি, বইয়ে মুখ গুঁজে হয়তো খুব ভাল সিজিপিএ হাকিয়ে নিলে। কিন্তু মন ও মননের বিকাশের জন্য জন্য কতোদূর কী করলে তা খেয়াল রাখবে। নিজের ভাষা সংস্কৃতির থেকে দূরে সরে নয় এর মধ্যে থেকেই এসো নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাই।