ফারিয়া তাবাসসুম

আমি যে একজন নারী, সেটা এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বড় হতে হতেই জেনেছি ফারিয়া তাবাসসুম


 

[ফারিয়া তাবাসসুম। একজন শিক্ষার্থী। কবিতা দিয়েই লেখালেখিটা শুরু করতে চায়। জন্ম ঢাকার সাভারে ১ আগস্ট ১৯৯৭ সালে। পড়াশোনাও সাভারেই সিটি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্য। কথাবলির পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো সে সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা, মানুষ, নারী এইসবকে কীভাবে দেখে। আরো জানা গেলো তার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, স্বপ্ন, পরিকল্পনাসহ আরো অনেক বিষয় সম্পর্কে।— নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

‘অপরাজিতার ডায়েরি’ নামে তোমাকে মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখালেখি করতে দেখা যায়…

লেখা-লেখিটা হলো আত্মপ্রকাশ আর আত্মতৃপ্তির জায়গা। সেখান থেকেই লেখার চেষ্টা করি। আসলে এইগুলি তো একটা শুরুরই প্রাথমিক শুরু।

অপরাজিতা কি তোমার পেন-নেম?

হ্যাঁ, এটা আমার পেন-নেম। এই নামেই আমি লিখবো বলে ভাবছি এখন। পরের কথা জানি না।

লেখা-লেখিটা কখন থেকে করো?

স্কুলে থাকা অবস্থায় ডায়েরি লিখতাম। নিজের প্রিয় মূহূর্ত বা বিশেষ ঘটনাগুলিই প্রথমতো লেখা হত, সেখান থেকেই শুরু।

বৃষ্টি কি সবসময় ভালো লাগে?

ভালো লাগে, ভালো লাগে, ভালো লাগে…। স্কুলে থাকতে কখনো ঝুমবৃষ্টির সময় কাকভেজা হয়ে বাসায় ফিরতাম। এখন আর সেইভাবে ভিজতে পারি না। খুব মিস করি সেইসব দিন।

কচুপাতায় বৃষ্টি পড়তে দেখেছো কখনো? কচুপাতা কিন্তু বৃষ্টিতে/পানিতে ভিজে না। জল গড়িয়ে পড়ে। এইটা খেয়াল করেছো? অনেকটা হাঁসের পালকের মতো। এই ব্যাপারটা তোমার কেমন লাগে সেটা জানতে চাইছিলাম।

হ্যাঁ, দেখেছি তো।

ইদানীং কী লিখছো বা লিখতে চাও?

সত্যি বলতে কি আমি এখনও সে-রকম কিছু লিখছি না, যেটা প্রথা বিরুদ্ধ। কারণ এখন শেখার কাজটা চলছে। আমার মা-বাবাকে আমি এখনও এ বিষয়ে অবগত করিনি।

লেখালেখির বাহিরে আর কী করো বা করতে পারো?

গান করা হয়। তবে কেবল নিজের মন খারাপের অষুধ হিশেবে এটা করি।

আর অবসরে কী করো?

বেশিরভাগ সময় বই পড়ি বা বিভিন্ন আর্টিকাল পড়ি।

ফেলুদা, ব্যোমকেশ আর কাকাবাবু এই তিন গোয়েন্দার মধ্যে কাকে ভালো লাগে?

ফেলুদাকে বেশি ভালো লাগে। পড়ার সময় এখন মনে হয়, ইশ্! যদি ফেলুদা হতে পারতাম!

কখনও কিছু হওয়ার ইচ্ছা ছিল?

হ্যাঁ, ছিলো। ভবঘুরে হওয়ার ইচ্ছা ছিলো।

পড়াশোনা করতে তোমার কেমন লাগে?

মোটামুটি ভালো লাগে। কারণ পাঠ্যবই আমার কাছে সমুদ্রে পড়া একফোঁটা বৃষ্টির মতো লাগে।

দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কি তুমি সন্তুষ্ট?

না, আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই। প্রথমত পাঠ্যবই বিনামূল্যে দিলেও স্কুল কলেজগুলি এখন নিজেদের ইচ্ছে মতো সেবার নামে টাকা আদায় করছে। আর কোচিং বাণিজ্যটা আমার কাছে জুয়ার আখড়া মনে হয়। দ্বিতীয়ত, যে ছাত্র বা ছাত্রী মাসুদ রানা, ফেলুদা না পড়ে বড় হচ্ছে, প্রশ্নফাঁসের বিষয়ের ওপর নির্ভর হচ্ছে তাদের কাছ থেকে কীভাবে দেশ প্রেম, মানবিকতা, সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারার প্রত্যাশা রাখি? তৃতীয়ত, আমার দেশের শিক্ষা সবার জন্য না।আমি আবার বলছি, আমার দেশের শিক্ষা সবার জন্য না। কারণ ৮০ টাকা পরীক্ষার ফি দিতে না পেরে আত্মহত্যা করতে হচ্ছে একজন শিশুকে। বাঙলাদেশে কখনও কি কোনো ব্যস্তিতে থাকা ছেলে-মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেখেছি কি? দুয়েকজন থাকলেও সেটা উদাহরণ হিশেবে বলা যায়। কারণ ব্যতিক্রম কখনও উদাহরণ হয় না।

ছাত্ররাজনীতি দরকার আছে বলে কি তোমার মনে হয়?

হ্যাঁ, ছাত্র রাজনীতিরর দরকার আছে।

তুমি ইংরিজি সাহিত্যে পড়তে গেলে কেনো? আর কোনো বিষয়ে পড়ার ইচ্ছা ছিলো?

সাহিত্য বিষয়টার সঙ্গে আমি কম বয়স থেকেই জড়িত বাঙলা সাহিত্যের অনেকের বই সে সময় পড়া হয়েছে। বাঙলা সাহিত্যেই পড়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সেটা হলো না। তাই ইংরিজিতে পড়া। সত্যি কথা বলতে বাঙলাই হোক বা ইংরিজি, সাহিত্যতো সাহিত্যই হয়, তাই না?

আচ্ছা। সাহিত্যের স্টুডেন্ট হিশেবে তোমার কবিতা ভালো লাগে নাকি ফিকশন?

রোমান্টিক পিরিয়ড় এবং মডার্ন পিরিয়ডের কমবেশি সব কটাই ভালো লাগে। ফিকশনের ও ভালো লাগে খুব।

তোমার প্রিয় কবিদের মধ্যে কার কবিতা এ মুহুর্তে মাথায় আসছে?

ইয়েট্স-এর The Second Coming…

হুঁ, Things fall apart; the centre cannot hold… আচ্ছা, এইবার বলো লেখালেখি নিয়ে তোমার পরিকল্পনা কী?

কবিতা দিয়েই মূলত নিজেকে পরিচয় করাতে চাই। এখনওতো কেবল শেখার পালা চলছে।

আচ্ছা, তোমার ফেসবুক ভর্তি দেখা যায় মেডুসার ছবি। মেডুসাকে তোমার কেনো ভালো লাগে?

মেডুসাকে ভাললাগার প্রধান আর একমাত্র কারণ হলো দেবী অ্যাথেনার অভিশাপের ফলে সে যে রূপ পেয়েছে, সেটার জন্য। আমার কাছে কোনো স্বাভাবিক সুন্দর নারীর তুলনায় মেডুসার অভিশপ্ত রূপ বেশি আকর্ষণীয়। তার সর্পচুল একটা শক্তি।

তোমার প্রিয় ফল কী?

লিচু।

কার গান ভালো লাগে?

লালন, রবীন্দ্রসংগীত, Little Max, Ellie Goulding, জলের গান-এর গান।

বিবাগী হতে ইচ্ছা করে?

না, তবে ভবঘুরে হতে খুব ইচ্ছে হয়, আগেই বলেছি।

পাহাড়ে যেতে ইচ্ছে করে?

হ্যাঁ, যেতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে। আমার বড় হয়ে ওঠাটা তো কক্সবাজার-এর কাছেই। সেখানে খুব কাছ থেকে পাহাড় দেখেছি। হয়তো সে জন্যই পাহাড় আর সমুদ্রের প্রতি আমার অন্যরকম একটা টান কাজ করে।

নির্জনতা, নাকি কোলাহল ভালো লাগে?

দুটোই ভালো লাগে। নির্জনতায় কেবল নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার সুযোগটা থাকে। আর কোলাহলে না গেলেতো একসঙ্গে অনেক মানুষের বিচিত্র আচরণের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায় না।

চাইলেই ঘুমাতে পারো, মানে ইচ্ছে ঘুম?

আমি খুব ঘুমপ্রিয় মানুষ। আর ইচ্ছেঘুমটা খুব কাছের অভ্যাস আমার।

কখনো বাঁশের সাঁকো পার হয়েছো?

না কখনই না। তবে ইচ্ছে আছে।

আগুনের রূপ কেমন লাগে?

ভালো লাগে।

কাকপাখিকে পাখি হিশেবে কেমন লাগে তোমার?

ভালো লাগে, ভালো লাগে। শ্রীহহীন জীবের মধ্যেও যে শ্রী আছে কাকপাখি তারই প্রতীক।

তুমি কি সিনেমা দেখতে পছন্দ করো? প্রিয় কোনো সিনেমার দৃশ্যের কথা বলো, যেটা এখনো চোখে লেগে আছে।

খুব পছন্দ করি। সব ধরনের সিনেমা কমবেশি দেখা হয়্। তবে আমার প্রিয় সিনেমা ‘জুরাসিক পার্ক’। এটা এমন একটা সিনেমা যা এখন দম বন্ধ করে দেখতে ভালোবাসি।

বাহিরের কার লেখা ফিকশন তোমাকে বেশি টানে?

সমরেশ মজুমদারের। তার সৃষ্টি করা প্রতিটা নারীচরিত্র, তাদের আদর্শ, গুণ, জীবনদর্শন আমাকে খুব টানে। তার লেখা ‘সাতকাহন’ আমি ৩ বার পড়েছি। প্রতিবারই একই অনুভুতি কাজ করেছে।

সাতকাহন পড়তে পড়তে দীপাবলিকে নারীই মনে হয়েছে। সে নিজের চেষ্টায় আইসিএস পাশ করার পর, সরকারের প্রশাসনিক পদে দীর্ঘদিন চাকরি করার করে নানামুখি সমস্যা এবং সংগ্রামের ভিতর দিয়ে পথ চলতে চলতে একসময় হোছট খেয়ে পড়ে। আর সব ছেড়ে ঠাকুর মা মনোরমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে, তখন তাকে আমার নারী মনে হয়েছে। এটাকে তুমি কীভাবে দেখো?

দীপাবলিকে আমি কখনও একজন নারী হিশেবে পাইনি, যতবার ওকে খুঁজে পেয়েছি দেখেছি ওতো একটা শক্তি। যে শক্তি কখনও মাথা নিচু করেনি, নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেয়নি। ও যদি কেবল একজন নারীই হতো তাহলেতো ওকে আমার আর সত্যিকারের দীপাবলি মনে হতো না। মনে হতো কেবল খোলসে মোড়ানো মেয়েমানুষ। আর ঠাকুরমার বুকে ঝাপিয়ে পড়াটা হলো ক্লান্তি থেকে মুক্তির চিহ্ন।

তুমি কি ফেমিনিজম বোঝো? তোমার কাছে ফেমিনিজম কী?

জন্মাবার সময় আমি জানতাম না আমি মেয়ে না ছেলে। আমি একজন মানুষ এই বোধটা হয়তো জন্মাবার আগেই আমার মধ্যে ছিলো বা থাকার কথা। আর আমি যে একজন নারী, সেটা এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বড় হতে হতেই জেনেছি। ফেমিনিজম বিষয়টাও আমাকে সেভাবেই বুঝতে হয়েছে। আমি খুবই অবাক হই যখন দেখি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোনো কোনো ছেলে যখন ফেমিনিজমের বিরোধিতা করে। ভাবি, এই সমাজ যদি আমাকে আমার জায়গাই দিতে না চায় তবে সেই সমাজ কোন অধিকারে আমার স্বাভাবিক জীবনযাপনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সমস্যা হলো, মানুষ শব্দটা যেমন পুরুষ-এর অস্তিতকেই বোঝায় ঠিক সমাজশব্দ টাও একই। সমতার কথা যদি আসে নারীদের যেদিন নারী হিশেবে না দেখে একজন মানুষ হিশেবে সমাজ গ্রহণ করবে, সেদিন বুঝবো এই পথচলা সফল হয়েছে, তার আগে কখনোই নয়।

হুমায়ুন আজাদের কোনো বই পড়েছো? পড়লে কোন বইটা পড়েছো? কেমন লেগেছে? হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে তোমার পর্যবেক্ষণ কী?

হুমায়ুন আজাদের বই তো এখনো আমার পড়া হয়নি।

তুমি তবে হুমায়ুন আজাদের নারী বইটা পড়তে পারো। যার বই পড়ার অভ্যাস আছে সে চাইলেই নারী বইটার মতো সহজ একটা বই পড়তে পারে। আর বইটিকে আমি খুবি গুরুত্বপূর্ণ বই মনে করি, সিমোন দ্য বোভোয়ারের Le Deuxième Sexe-এর পর। এবং এই বইটিকে আমি প্রতিটি নারী (যে নারী হয়ে জন্ম নেয় না, ক্রমশ নারী হয়ে উঠে) র জন্য বেদসম মনে করি। কেননা এটি তার নিজেকে চিনতে শেখায়। তার অবস্থান সম্পর্কে জানিয়ে দেয়। নারী নয়, মানুষ হিশেবে তার ঔচিত্যবোধকে জাগ্রত করে।এরপর পড়তে পারো হুমায়ুন আজাদ অনূদিত সিমোন দ্য বোভোয়ারের Le Deuxième Sexe. এটা দ্বিতীয় লিঙ্গ নামে বাজারে পাওয়া যায়। তারপর ‘আমার অবিশ্বাস’, ‘লাল নীল দীপাবলি’, ‘বুকপকেটে জোনাকি পোকা’সহ আরো অনেক বই। যাই হোক, সব শেষে জাতির উদ্দেশে তোমার কিছু বলার থাকলে বলো।

আমাদের দেশ যত উন্নত হচ্ছে ঠিক ততটাই আমাদের মনের জগৎ ছোট হচ্ছে। আমরা কেবল নিজের অধিকার, ভালো থাকা না থাকা নিয়েই মাথা ঘামাই, তাতে যদি অন্যের অধিকারেও আঘাত লাগে তাতে কিছু আসে যায় না। তাই বলব নিজে বাঁচো অন্যকেও বাঁচতে দাও।আমরা পশু নই যে নিজের সুখটাই সব। আমরা মানুষ তাই আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা আছে প্রকৃতির ও অন্য মানুষের কাছে।