সিমন থ্যাকার

প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই খুব সুন্দর কিছু সুর লুকিয়ে থাকে, যা খুব গভীরভাবে মানুষের কথাই বলে সিমন থ্যাকার


 

[সিমন থ্যাকার। স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় গিটারিস্ট, সুরকার ও প্রশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আগ্রহী এ শিল্পী ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল মিউজিকের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেছেন। এরইমধ্যে সংগীত পরিবেশন করেছের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে কাজ করছেন বিশ্বসংগীতের নানা শাখায়। জ্যাজ সংগীতের পাশাপাশি আকৃষ্ট হয়েছেন বাউল ও ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রতি। আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব-২০১৬ এর প্রথম দিন শান্তিনিকেতনের রাজুদাস বাউল এবং বাংলাদেশের ফরিদা ইয়াসমিনকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে ওঠেছেন তিনি। তিনদেশের মৌলিক গানের সমন্বয়ে ভৌগোলিক সীমা অতিত্রক্রম করেছেন যন্ত্রানুষঙ্গের মাধ্যমে। তাঁর সংগীতজীবন, পথচলা, সাম্প্রতিক কাজ ও অন্যান্য বিষয়ে কথা বললেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রাসেল রানা।]

 

বাঙলাদেশে কি এবারই প্রথম?

হ্যাঁ। প্রথমবার। এর আগে ভারতে এসেছিলাম, তখন এ বাংলাদেশের কথা শুনেছি। এখানকার লালন, শাহ আবদুল করিমের গানও শুনেছি। খুব সহজেই সুরটা আপন করে নেয়া যায়।

আপনি নিজে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল শিখেছেন, গিটারে বিভিন্ন ক্লাসিকাল মিউজিক নিয়েই বেশি কাজ করছেন, কিন্তু লোকসংগীতের প্রতি আগ্রহী হলেন কেন?

এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত লোকসংগীতে আবেগ সরাসরি প্রকাশ করা যায়। আমি নিজেও ক্লাসিকাল নিয়ে কাজ করি, কিন্তু ক্ল্যাসিকালের সঙ্গে লোকসংগীত নিয়ে যখন কাজ করি, স্বতস্ফূর্ততার কারণেই সেটি ভালো লেগে যায়। তাছাড়া তাৎক্ষণিক অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে এ গানে। দর্শকের সঙ্গে কথা বলা, সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি করা, সুর নিয়ে খেলা করা। দর্শক খুব সহজেই গানের রিদমটা ধরে ফেলে। তাছাড়া লোকসংগীত নিয়ে কাজ করার সুযোগ কম। ক্লাসিকালের সঙ্গে লোকগানের এ সংযোগটা দরকার মনে হয়েছে। আমি এই চ্যালেঞ্জটা নিতে চাই বলেই কাজ শুরু করা।

আপনার গান শেখার শুরুটা কীভাবে?

খুব ছোটবেলায় গান শেখা শুরু করি। প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই জড়িয়ে পড়া। কলেজে পড়ার সময়ই রেকর্ড, অ্যালবাম এসব নিয়ে কাজ শুরু করি। তখন থেকেই স্কটল্যান্ডের সংগীত অঙ্গনের অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একসময়  গিটার নিয়ে কাজ শুরু করি। তারপর থেকে পুরো সময়টা গানের মধ্যেই কেটে যেত। কিন্তু কেন তা বিশ্লেষণ করা কঠিন। আমার মনে হয় জন্মগতভাবেই এটা আমি পেয়েছি। তবে পথচলা খুব সহজ ছিল এমন না। গানের কারণে স্কুল থেকে একাধিক সময়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। কিন্তু থেমে থাকিনি। একসময় সংগীতে উচ্চতর শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাসিকাল কোর্স শেষ করি। সে সময়টা পেরিয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন সবজায়গায় স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।

আপনার কাছে গান কী?

আপনার এ প্রশ্নটা চমৎকার। সংগীত আমার কাছে একটা ভিন্ন জগৎ, যেখানে প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করা যায়। গানের কারণেই আমি আজ পুরো বিশ্বে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি। ঢাকার দর্শক, রাজুদাস বাউল বা ফরিদা ইয়াসমিনের মতো অনেকের সঙ্গে হয়তো পরিচয়ই হতো না সংগীত নিয়ে কাজ না করলে। বিশ্বজুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে দেয়ার একটা যাত্রাও বলতে পারেন। আর যাত্রায় শুধু যে দিচ্ছি তা নয়, বরং বিভন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আবেগ ও ভিল্পুতা আমিও গ্রহণ করছি। এর বাইরে সংগীতের আরেকটা দিক আছে। যেটা প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক। খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়তো শুরু করেছিলাম, কিন্তু ক্রমাগত এক  স্তর থেকে অন্য স্তরে উন্নীত হওয়ার পর, সংগীতকেই একটা ভিন্ন ভুবন বলে মনে হয়। তবে এর সঙ্গে কপটতা বা বাণিজ্যিকতার সম্পর্ক খুব একটা নেই।

এরইমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আপনি সংগীত পরিবেশন করেছেন, এ বিশ্বযাত্রার আপনার সবেচেয়ে ভালো লাগার বিষয় কোনটি?

দেখুন, এখনকার সময়টা খুব আধুনিক। তাই একেক দেশের একেকরকম আঙ্গিক চোখে পড়ে। যেমন বাংলাদেশের এসেই বাউল গান ভালো রগেছে। গান শুনেই মনে হয়েছে, এটা খুবই শক্তিশালী এবং পরিশ্রমী শিল্পীর কাজ। একইরকমভাবে আফ্রিকান ফোক বা হিন্দুস্তানি ক্লাসিকালের বিভিন্ন দিক রয়েছে। আমার মনে হয়, প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই খুব সুন্দর কিছু সুর লুকিয়ে থাকে, যা খুব গভীরভাবে মানুষের কথা বলে। সেটা সাহিত্যে হতে পারে, ভাস্কর্যে হতে পারে বা চিত্রকলায় হতে পারে। শিল্পী নিজে তা অনুভব করে নেয়।

জ্যাজ, ওয়েস্টার্নের পাশাপাশি ভারতীয় সংগীতও আপনার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, এ আগ্রহটা কীভাবে সৃষ্টি হলো?

লোকসংগীত আমার কাছে একটি মহৎ স্বপ্নকে বাস্তবে অনুভব করার মতো। কলকাতা শহরে আসার পর এ অনুভব আরো দৃঢ় হয়েছে। আবার বাংলাদেশের ফরিদা ইয়াসমিনের কথা বলতে পারেন, তিনি এমন একজন নারী যার ফেসবুক নেই, ইমেইল নেই, কিন্তু প্রচণ্ড ভালো গায়। রেডিওতে আগে বাংলা রোমান্টিক গানও শুনেছি, ফরিদা ইয়াসমিন হয়তো সেরকম গানও করতে পারতো। কিন্তু এখানকার বাউল গানের মধ্যে একটা বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিকতা আছে, যা শিল্পীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। গানের এ নিজস্ব শক্তিটা সবগানে পাওয়া যায় না। অনেকটা এ কারণেই ভারতীয় সংগীত নিয়ে কাজ করা। তাছাড়া এখানে প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর পাশাপাশি প্রচুর অবহেলিত শিল্পী রয়েছেন। তারা হয়তো নিভৃতে সাধনা করে যাচ্ছেন। তাদের নিয়ে কাজ করাটাও আমি সৌভাগ্য হিশেবে মানি।

ভারতের দুজন শিল্পীকে নিয়ে আপনি কাজ করেছেন, কিন্তু অনেকেই হয়তো আপনার সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক, তাদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা আছে?

সম্প্রতি সুফি গান এবং আবিদা পারভিনের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি। তাদের গায়কীর সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকালের সমন্বয় নিয়ে ভাবছি। ভবিষ্যতে এ ঘরানার ওপর কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে।