ইরতিয়াজ আহমেদ রতন

প্রতিদিনই নতুন কোন সুর বা কথার সাথে আমার প্রেম হয়ে যায় ইরতিয়াজ আহমেদ রতন


 

মিউজিক ক্যাফে এবং ক্যাফে সিঙ্গার। বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় অনেক দিন থেকেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মিউজিক ক্যাফেগুলো, যার বেশির ভাগ ভোক্তা আমাদের তরুন সমাজ। সেই সাথে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু তরুন গায়ক, যারা চাকুরী কিংবা পড়ালেখার পাশাপাশি শখের বশেই গান গেয়ে যাচ্ছে মিউজিক ক্যাফে গুলোতে। সেই সাথে এমনও কিছু গায়ক আছেন যারা ভালবেশে শুধুমাত্র গান নিয়েই আছেন। গানই তাদের ধ্যান-জ্ঞান , গানেই তাদের আনন্দ। আজ তেমনই একজন মানুষের সাথে কথা হচ্ছে, যিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন ঢাকার বিভিন্ন মিউজিক ক্যাফেগুলোতে।  ইরতিয়াজ আহমেদ রতন। যিনি নিজেকে একজন ক্যাফে সিংগার পরিচয় দিতে খুব ভালবাসেন।  কর্মব্যস্ত দিনে পথিমধ্যে থাকা এই সংগীতশিল্পীর সাথে কথা বলেছেন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে - রাসেল রন্টি

আপনার সংগীত জীবনের শুরু কোথা থেকে এবং কবে?

আমার সংগীত জীবনের শুরু ১৯৯৬ থেকে। মূলত আমার বড় ভাই সেই সময় বাসায় ক্যাসেট নিয়ে আসতেন, এবং তখন থেকেই আমার সংগীতের সাথে একরকমের সক্ষতা তৈরি হতে থাকে। এলাকার ছোট প্রোগ্রামগুলোতে গান গাইতে শুরু করি। এরপর মফস্বল থেকে রংপুর শহরে চলে আসা এবং রংপুরের ফ্র্যাকচার, পারফেক্ট এবং ওয়ারফেয়ার  নামের  ব্যান্ডগুলোতে কাজ করি।মজার ব্যাপার হলো এ ব্যান্ডগুলো ওই সময় রংপুরে খুব দাপুটে ব্যান্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। তারপর ঢাকায় চলে আসা!

এই সংগীতশিল্পে আপনার কি কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আছে?শুরুতে আমার কোন প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিলনা।সবই ঈশ্বর প্রদত্ত ছিল।পরের সময় গুলোতে কয়েকজন সংগীত সাধকের সান্নিধ্য পেয়েছি এবং এখনও শিখছি

বর্তমানে কি করছেন? শুধুই কি গান নাকি সাথে আরো কিছু?

গানটা আমার জন্য নেশার মত। একটা সময় ছিল যখন চাকুরীর পাশাপাশি গান করতাম, পর মনে হল গানটাকেও আমার পুরোপুরি প্রোফেশন হিসাবে নেয়া যায়। এখন বলতে পারেনঃ শুধুই গান করছি!

ratan on stageমিউজিক ক্যাফেগুলোর পাশাপাশি আর কোথায় পারফর্ম  করছেন?

ঢাকা শহরে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই মিউজিক ক্যাফে গুলোতে গান করার পাশাপাশি বাইরের বিভিন্ন স্টেজ শো-গুলোতেও পারর্ফম করছি।

বর্তমানে আপনার ব্যাক্তিগত গান বা অ্যালবাম নিয়ে কি কাজ করার ইচ্ছা আছে?

প্রতিদিনই নতুন কোন সুর বা কথার সাথে আমার প্রেম হয়ে যায়। এখন বাংলাদেশের গানের বাজার আগের মতন স্থিতিশীল নয়। আর এখন      গানের সাথে মিউজিক ভিডিও হলো দর্শকদের নতুন চাহিদা। এবং আমাদের মত একজন শিল্পীর জন্য এটা অনেক ব্যয়বহুল। এখন গান নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি, এবং ইতিমধ্যে আমি দুইটি মিক্সড অ্যালবামে গানের কাজ করেছি। এবং আশা করছি এই বছরের শেষের দিকে নিজের একক অ্যালবামের কাজ শুরু করবো ইনশা-আল্লাহ!

আপনি বেশ জনপ্রিয় মিউজিক ক্যাফে গুলোতে বর্তমানে গান করছেন। বর্তমানে তরুন সমাজের কাছে মিউজিক ক্যাফেগুলোতে    বাংলা গানের চাহিদা কিরকম বলে আপনি মনে করছেন?

বর্তমানে বাংলা গানের যে ধারা আর মিউজিক ক্যাফেগুলোতে মানুষের গান শুনতে চাইবার চাহিদা এক নয়। মিউজিক ক্যাফেগুলোতে সবাই পুরোনো দিনের গান বেশি শুনতে আগ্রহী। ৯০ দশকের গানের চাহিদা মিউজিক ক্যাফেগুলোতে সবচেয়ে বেশি। আর বর্তমানের যেই গানগুলো ফেইসবুক, ইউটিউবে বেশি জনপ্রিয়তা পায়, তরুন সমাজ ওই গানগুলোও বেশি শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে।

আপনি কি ধরনের গান গাইতে ভালবাসেন?

আমি সব ধরনের গান গাইতে ভালবাসি। মূলত যেই গান বা সুর  হৃদয়ে দাগ কেটে যায়, আমি সেই গান গাইতে ভালবাসি।

বাংলাদেশে ক্যাফে মিউজিকের ভবিষ্যত কেমন বলে আপনি মনে করেন?

আমরা প্রথমে যখন মিউজিক ক্যাফেগুলোতে গান শুরু করি, তখন খুব একটা মিউজিক ক্যাফে ছিলনা, আপনি নাম শুনে থাকবেনঃ ফায়ার অন আইস, মাদার অফ মিউজিক ক্যাফে বলা হয়,  প্রথমে এই মিউজিক ক্যাফেতেই গান শুরু হয়। তবে এখন বেশ কিছু মিউজিক ক্যাফেতে গান শুরু হয়েছে, তারপরও আমার মনে হয় বাংলাদেশে মিউজিক ক্যাফের যে প্ল্যাটফর্ম, তা এখনো অনেক দূর্বল!

মিউজিক ক্যাফের জগতে আপনার পথচলা কিভাবে শুরু হয়?

শুরুটা হয় ২০১০ সালে, গুলশানের একটি মিউজিক ক্যাফে- “রোড হাউজ” থেকে। পরবর্তিতে আমার গুরুজি লিটন গোমেজের হাত ধরে ফায়ার অন আইস-এ চলে আসা। 

irtiaz ahmed ratanসংগীত জীবনে আপনার অনুপ্রেরনা কে কে?

আসলে সংগীত জীবনে যতজন মানুষকে আমি দেখেছি, পথ চলেছি - সবাই আমার জন্য অনুপ্রেরনা।

গান নিয়ে সব শিল্পীরই কিছু না কিছু স্বপ্ন থাকে, তো ক্যাফে মিউজিক শিল্পী হিসাবে আপনার স্বপ্ন কি ছিল এবং আদৌ তা পূরণ হয়েছে কি?

আসলে স্বপ্ন পূরন করতে চাইলে আপনার সাধ্য থাকতে হবে। তবে আমার স্বপ্ন হচ্ছে আমাদের এই প্রজন্ম এখন যেভাবে মিউজিক ক্যাফেটাকে নতুন একটা ধারায় নিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাওয়া গানগুলোকে যেন তারা সঠিক ভাবে উপস্থাপন করে। অনেক অজানা-অচেনা জনপ্রিয় গান ছিল, যা আজ হারিয়ে যাবার পথে, মূলত আমি চাই মিউজিক ক্যাফেগুলোতে সেই গানগুলো আবার ফিরে আসুক, হারিয়ে যাওয়া সেই শিল্পীর নামে, সেই সুরকার ও গীতিকারের নামে। স্বপ্ন ছিল, স্বপ্ন এখনও দেখি, ক্যাফে মিউজিক বাংলাদেশে একটা ঐতিজ্যবাহী অংশে পরিনত হবে।

 

মিউজিক ক্যাফেতে গান গাইতে গিয়ে আপনার স্বরনীয় কোন ঘটনা কি আছে?

প্রতিদিনই যেহেতু কোন না কোনা মিউজিক ক্যাফেতে গান করি, সেক্ষেত্রে অনেক ঘটনাই হয়। তবে আমার খুব মনে পড়ে আমি “ফায়ার অন আইস”-এ গান করছিলাম। এক ভদ্রলোক তার সন্তানদের নিয়ে এসেছিলেন। তার সন্তানরা অনেক উতফুল্ল, দেশের বাইরে থেকে এসেছেন, ওই ভদ্রলোকই কেবল দেশে থাকেন। তো সবাই অনেক আনন্দ করছেন, গান শুনছেন, কিন্তু আমি খেয়াল করলাম ভদ্রলোক নিশ্চুপ, তিনি কিছু ভাবছেন। আমি তখন গাইলামঃ ‘আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেল – বলো ভাল আছো তো’। আমি ভদ্রলোক-কে অনেকক্ষন দেখেছি কাঁদতে। কারণ পরে জানতে পারলাম- ১৬বছর আগে তিনি তার স্ত্রীকে হারিয়েছেন, এবং এই গানের সাথে তাদের অনেক স্মৃতি জরিয়ে আছে। বিষয়টা আসলে অনেক আবেগে ছুয়ে যাবার মতন একটি ঘটনা।

বিটিভিতে গান করার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন?

কিছুদিন আগে বাংলা স্টুডিও প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিটিভিতে আমার যাত্রা শুরু হয়। আমি যখন জানতে পারলাম যে আমি বিটিভিতে পার্ফম করতে যাচ্ছি, তখন আমার মনে হয়েছে, আমি আসল কোন পরীক্ষায় আজ অংশগ্রহন করতে যাচ্ছি। আসলে প্রত্যেকটা শিল্পীর জন্যই বিটিভি অনেক বড় একটি প্ল্যাটফর্ম। আমি সব সময়ই বলে এসেছি, যেই শিল্পী বিটিভিতে গাইতে পারেনি, তার শিল্পী জীবন বৃথা। বাংলাদেশের আজকে যত কিংবদন্তীর জন্ম হয়েছে তাদের সকলের প্রধান ভিত্তিই কিন্তু বিটিভি, এবং এখন আমার গর্ব হয়, যে আমি বিটিভিতে গান গাইবার সুযোগ পেয়েছি।

পরিশেষে, ক্যাফে মিউজিক নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে যদি কিছু বলতেন?

ঢাকায় ক্যাফে মিউজিক গুলোতে যারা প্রতিনিয়ত পার্ফম করছেন, তাদের নিয়ে আমার একটি সংগঠন তৈরী করার ইচ্ছা আছে। আর পারিশ্রমিক নিয়ে ক্যাফে কতৃপক্ষ ও সংগীত শিল্পীদের মাঝে যেই সমস্যাটা হয় তা এই সংগঠনের মাধ্যমে সমাধান করার উপায় বের করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।

ratan on stage