ফেরদৌস আরা

কাজী নজরুল ইসলাম রোজায়ও আছেন, আবার পূজায়ও আছেন ফেরদৌস আরা


 

[ফেরদৌস আরা। মূলত নজরুলগীতি করেন। কাজী নজরুল ইসলামের এই প্রয়ান দিবসে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন জুয়েইরিযাহ মউ। সাক্ষাৎকারটি পূর্বে  বাংলামেইল২৪ডটকম এ প্রকাশ হয়। কথাবলির পাঠকদের জন্যে সাক্ষাৎকারটি আবার প্রকাশ হলো।]

জরুলের গানে আপনি কী খুঁজে পান?

কিছু একটা আবিষ্কারের নেশা। নতুন দেখা-শোনা-জানা সর্বোপরি বৈচিত্র্য। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গান, কবিতা, অভিনয় সব কিছু মিলিয়ে সৃষ্টির যে বিস্ময় বিরাজ করে নজরুল-এর মধ্যে তাতে তাঁকে আমার একটি ইন্সটিটিউটই মনে হয়। সেই শৈশবে যখন তেমন বুঝিনা তখন থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম-এর গান আমায় টানে। এভাবেই আজ অবধি ডুবে আছি। আরো জেনেছি, বুঝেছি, জেনে চলেছি। কী দুরন্ত উদ্দীপনা! ক্ষুরধার গতি।

এই যে বাংলাদেশকে জন্ম দিতে সংগ্রাম তাতেও নজরুলের গান ছিল অনুপ্রেরণা। নজরুল সেই সময় তুলে এনেছিলেন নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ। রবিঠাকুর যখন নজরুল-কে ‘কবি’ বলেন তখন অনেকে বলেছে পাগলকে কবি উপাধি দেওয়া হল। রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন- ঐ তারুণ্য আমার থাকলে হতো বটে। ও তো কেবল কবি নয় মহাকবি।

এই নজরুলের সৃষ্টি কি আদৌ পৌঁছোলো সাধারণ মানুষের কাছে?

ব্যাপারটা কিন্তু ভিন্ন। সাধারণ মানুষ এর কাছ থেকেই আমরা নজরুলকে আয়ত্ত করেছি। অনেক সৃষ্টি লোকমুখেই বেঁচে ছিল, বেঁচে আছে।  শৈশবে একদিন শুনি গ্রামের একজন নারী গাইছেন নজরুলের গান। সাম্যবাদের কথা, মানবতার কথা মানুষের মাঝে না ছড়ালে আজ এতো বছর পরেও নজরুল কী করে জীবন্ত এতো বলুন। আপামর জনসাধারণের মাঝে কাজী নজরুল ইসলাম সবসময়ই ছিলেন।

বাংলাদেশে নজরুল চর্চার দিকটি আপনি কি ভাবে মূল্যায়ন করবেন?

হচ্ছে না কি যথাযথভাবে? বাংলাদেশ এগুচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ-বিভিন্ন সংগঠনে নজরুল-চর্চা হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিল্পীরা এসে বিভিন্ন কর্মশালায় অংশগ্রহণ করছেন। আমাদের নজরুল ইন্সটিটিউট গড়ে উঠেছে। এগুলো আশাব্যঞ্জক।

নজরুল-কে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে এরকম কথা শোনা যায়, এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

এটা খুব কঠিন বলা। কে কীভাবে কোন কাদার মধ্যে পড়েন তা বলা মুশকিল। তবে কাজী নজরুল ইসলাম রোজায়ও আছেন, আবার পূজায়ও আছেন। এটা মনে রাখতেই হবে, সাম্যের গান গেয়েছেন নজরুল আমৃত্যু।

নজরুল সংগীতে এক্সপেরিমেন্টকে কীভাবে নিবেন বা কতটা হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন?

দেখুন নজরুল যখন গান রচনা করেন তখন সেটা আধুনিক বাঙলা গান হিসেবেই আখ্যায়িত হয়। নজরুল আধুনিক বাঙলা গানের মুক্তিদাতা। সে গান আজও আধুনিক। তিনি নিজেইতো বৈচিত্র্য ভালবাসতেন। তিনি গজল, ঝুমুর, রাগ নিয়ে এসেছেন। গানের ভাষায় বৈচিত্র্য এনেছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ফিউশন তৈরি করেছেন। তবে তাঁর উত্তরসূরীরা কেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে না। তবে হ্যাঁ যেটুকু বোঝা দরকার তা হল নজরুলের গানের পৃথক একটি চরিত্র বিদ্যমান তা যেন ভেঙে না পড়ে। নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র প্রয়োগ করে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে গান গাওয়ার সময় নজরুলের গানের চারিত্রিক আবেশ যেন ঠিক থাকে এটুকু নিশ্চয় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

সেই কবে থেকে আমরা ভাত খাই, আগে মাটির সানকিতে খেতাম এখন কাচের প্লেটে। তাতে কি ভাতের পরিবর্তন হয়েছে বলুন। ব্যাপারটা এরকমই।

উপমহাদেশের বাইরে নজরুল কতটা ছড়িয়ে আছেন?

সাহিত্য লেখালেখির ক্ষেত্রে তো অনেক অনুবাদ হচ্ছে। গানেও হচ্ছে। তবে ব্যাপার হল বাঙলা গানের নিজস্ব একটা ধাঁচ আছে বিদেশী ভাষায় যা ধরে রাখা সম্ভব হয় না অনেক সময়। তবুও প্রবাসী তরুণ প্রজন্ম নজরুল চর্চার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী এটা সম্ভাবনা জাগায়।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি নজরুল সংগীত নিয়ে?

পরিকল্পনা আমার স্কুল নিয়েই, ‘সুরসপ্তক’ এর প্রতিটা শিক্ষার্থীকে শুদ্ধ সুন্দর গানের চর্চা করার মতোন মন গড়ে দেওয়া। এই যে ‘ক্ষুদে গানরাজ’ এ ছোট ছোট বাচ্চারা কী দুর্দান্ত গান গাইছে। এসমস্তই তো আমাদের পাওয়া। ইমপ্রেস অডিও ভিশনের সহায়তায় শুদ্ধ বাণী সুরে নজরুল-এর গান রেকর্ড করে যাচ্ছি ‘নজরুলসঙ্গীত সমগ্র’ শিরোনামের সিরিজে। এ সিরিজের চারটি খণ্ড আগেই রিলিজ পেয়েছে, আগামীকাল এ সিরিজের পঞ্চম খণ্ডটি রিলিজ পাবে। এসব নিয়েই থাকতে ভালবাসি।

আর যদি জানতে চাই প্রাপ্তি কোথায় এতোদিনের কিংবা কোন আক্ষেপের কথা যদি বলতেন প্রাপ্তি যদি সেভাবে বলা যেত তবে তো পথ চলাই শেষ হয়ে যেত। প্রাপ্তি হল- হচ্ছে কাজ, হবে আরোও কিছু এমন বিষয়। আক্ষেপ এই যে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হয়তো আরোও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত এ কাজগুলোকে আরও পরিক্লপিতভাবে। কোন পদক আজও হাতে পাইনি, এইতো আক্ষেপ এসবই।

আজ তরুণদের কিছু বলবেন?

আগে যা বলেছি তাই। গান নিয়ে কাজ করে যাবে তরুণরাই, ব্যাণ্ড হোক চলচ্চিত্র হোক যে মাধ্যমেই হোক না কেন। শুধু সচেতনতার সাথে এ পরীক্ষা চালানো দরকার, এটুকুই কেবল মনে রাখবে তরুণ মুখগুলো এ প্রত্যাশাই করি।