সকাল রয়

গল্প আর কবিতাকে ভাইবোনের মতো জড়িয়ে রাখি সকাল রয়


 

[সকাল রয়। তরুণ কথা সাহিত্যিক ও কবি। জন্ম ১৯৮৭ সালে, সুসং নগর, নেত্রকোণা। বেড়ে উঠা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিলিগুড়িতে। পড়াশোনার পাশাপাশি ফটোগ্রাফির করেন। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘ প্রেম হলো প্রেমের মতো’। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, লেখালেখি, তার জীবনযাপন, শখ ইত্যাকার বিষয়ে। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।] 

 

আপনার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলেন

বইয়ের প্রতি আকর্ষণটা আমার জন্মগত হয়তো। ইশকুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ওপরের ক্লাসের বাঙলাবই পড়ার একটা ঝোঁক মাথায় কাজ করতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বই পড়ার নেশা বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থায় দাঁড়াতো যে নিজের পরের বাড়ির বড়দের বাঙলাবইগুলো পড়ে শেষ করার পর সহপাঠিদের কাছ থেকে ধার করতে হতো। যেখানে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছে সেখানে বইপড়ার কোনো লাইব্রেরি ছিলো না বলে সবসময় বই মিলতো না। একসময় বই পড়তে পড়তে মনে হতো গল্প বা উপন্যাসগুলোর দৃশ্যপট এভাবে না হয়ে অন্যভাবে হতে পারতো আর সেই দৃশ্যপটের রূপান্তর দিতেই একসময় কলম তুলি। কলেজের নবীন বরণের জন্য নাটক লেখা দিয়েই আমার লেখাপ্রকাশ শুরু তবে তারও আগে ইশকুলে পড়ার শুরুতে খাতায় লুকিয়ে চার-ছয় লাইনের কবিতার মতো লিখতাম, প্রচুর ডায়েরি লিখতাম এবং এখনও মনে আছে চিঠি পড়তে খুব ভালো লাগতো বলে আমি ইশকুলের দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়ার সময়ই চিঠি লিখেছিলাম। এরপর তো ২০০৯ এ এসে অনলাইন ভিত্তিক ব্লগ গুলোতে লিখতে শুরু করলাম।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ফিল্মমেকার হবার একটা জাগ্রত বাসনা খুব ভাবাতো আমায়। এখনো ইচ্ছেটা জাগ্রত, তবে হয়ে উঠবে না মনে হয়।

আপনি তো গল্প লিখেন...

নাটকের দৃশ্যপট সাজাতে গিয়ে প্রথম গল্প লিখেছিলাম খুব স্বল্প পরিসরে। তারপর থেকে মনে হয়েছিলো মাথার ভেতরকার দৃশ্যগুলোর একটা রূপ দেবার জন্য গল্পের চেয়ে উত্তম কিছু নেই।

আধুনিক গল্প কেমন হওয়া উচিত?

আধুনিক গল্প দিন দিন নতুন নতুন রূপ নিচ্ছে। তবে আমি মনে করি গল্পের ভেতর যেন গল্পটাই প্রাধান্য পাক।

গল্পে জাদুবাস্ততার প্রয়োগ বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?

জাদুবাস্তবতা অনেক সময়ই গল্প পড়ার একটা আকর্ষণ সৃষ্টি করে। গল্পলেখার রুচি পরিবর্তনের জন্যও জাদুবাস্তবতা অনেকে গল্প লিখে থাকে তবে সেটা কখনো কখনো ভৌতিক বা রহস্য গল্প হয়ে দাঁড়ায়।

আপনার গল্পের প্লট কীভাবে তৈরি হয়?

রোজকার পথ চলায় চোখ মেলে দেখি দৈনন্দিন জীবনের হাসি-কান্না, পরাজয়, প্রেম, বিষাদ এই সকল দৃশ্যপট মাথার ভেতরে কল্পের জন্ম দেয় আস্তে আস্তে মাথায় সে দৃশ্যগুলোর সঙ্গে দৃশ্য এসে যোগ হয় এভাবে জমতে জমতে গল্পের ভাবনা চলে আসে। আমি অনেকদিন মাথায় গল্প নিয়ে ঘুরি তারপর কখনো সময় হলে লিখি। যেমন আমি গত দুবছর ধরে দুটো গল্পভাবনা মাথায় নিয়ে ঘুরছি কিন্তু কিছুতেই লিখে উঠতে পারছি না। 

গল্প লেখার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে গুরুত্ব দেন?

লিখতে বসলে শুধু গল্পটার একটা সুস্থ্য জন্ম দেবার ভাবনা মাথায় থাকে। গল্পের ভেতরে একটা বিশ্বাসযোগ্য গল্প সৃষ্টি করাটাকেই আমি বেশি দেই।

আপনার লেখালেখির পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

শুরুতে নিজেই তো নিজের লেখার পাঠক ছিলাম সে কারণে প্রথমদিকে অনুপ্রেরণা দেবার কেউ ছিলো না উল্টো ডায়েরি লিখতাম বলে অনেকেই ভাবতো আমি বোধহয় বিষাদরাজ। পরবর্তী সময়ে অনলাইনে যখন লিখতে শুরু করলাম তখন সহলেখকগণ অনেক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। 

সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরস্কারগুলি প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে? রাখলে কীভাবে?

সাহিত্য বা লেখালেখির জন্য পুরস্কার কোনো ভূমিকা রাখে বলে আমার মনে হয় না। পুরস্কার হয়তো কিছু কিছু লেখকের আর্থিক সমস্যা লাঘব করতে পারে, সমাজে একটা সম্মান এনে দিতে পারে। তবে এখন তো পুরস্কার প্রতিষ্ঠানগত ভাবে দেয়া হচ্ছে এতে করে প্রতিষ্ঠান নিজেকে হাইলাইট করতে গিয়ে একটি লোভী লেখককে ভালো লেখক হবার লক্ষ্য থেকে দমিয়ে দিচ্ছে।

সমসাময়িক গল্পকারদের গল্প সম্পর্কে বলুন

সমসাময়িক গল্পকারদের অনেকেই ভালো লিখছে। সমসাময়িক কিছু লেখকের বিপরীত দিক নিয়ে বলা মুস্কিল এদের কেউ কেউ মনের দিক দিয়ে একটু মারমুখি। যে কারণে তাদের গল্প আমার কাছে কেমন লেগেছে সেটা বলা মানেই ‘খাল কেটে কুমির আনার মতো।’

আপনার প্রিয় গল্পকারদের নিয়ে বলেন।

প্রিয় গল্পকারদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, লিও তলস্তয়, জুলভার্ন, সত্যজিৎ রায়, শহীদুল জহির সহ আরও অনেকে। অমর এই গল্পকারদের নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই।

আপনি তো কবিতাও লিখেন। কেনো লিখেন?

বিভিন্ন কারণ থাকে তার মাঝে দুয়েকটা বলি, যখন কোনো ধ্বংস বা অন্যায় দেখি তখন বিদ্রোহী হতে না পারার যন্ত্রণাকে চেপে রাখতে কবিতা লিখি। জীবন ও নাগরিক ব্যর্থতাকে নিজের মতো রূপ দিতে কবিতা লিখি। তবে লিখবার পর কখনো কখনো মনে হয় আমি সারাজীবন ধরে একটা কবিতা লিখে চলেছি যার কোনো শেষ নেই।

গল্প না, কবিতা কোনটা লিখতে বেশি ভালো লাগে?

গল্প-কবিতা দুটো লিখতেই ভালো লাগে। শুধু সময়ের অভাবে গল্প লিখতে পারি না। সময়ের অপ্রতুলতায় গল্প লিখতে বসে কবিতা লিখি। মাথার মাঝে জমে থাকা গল্পের ভাবনাকে কবিতায় রূপান্তরিত করি। সে কারণেই গল্প-কবিতাকে ভাইবোনের মতো জড়িয়ে রাখি।

আপনার কাছে কবিতা কী?

একজন ব্যক্তিমানুষের নিঃস্বার্থ বন্ধুটিই হলো কবিতা।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

প্রভাবিত বিষয়টা এককভাবে বললে বাদ পড়ে যাবে তাই সংখ্যক ভাবে বলছি। সুকান্ত ভট্টাচার্য, শক্তি চট্রোপাধ্যায়, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, হেলাল হাফিজ, তসলিমা নাসরিন, লতিফুল ইসলাম শিবলী ইনাদের কবিতা পড়লেই কবিতা লিখবার একটা তাড়না অনুভব করি।

আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

আমি যাদের লেখা নিয়মিত পড়ি তাদের কবিতা কিছুটা ধারনা করতে পারি কবিতার লেখক কে।  এই ধারণাটা জন্ম নেয় তাদের শব্দচয়ন আর কবিতার বর্ণনাশৈলী দেখে। কিন্তু সমসাময়িক বেশির ভাগ কবিদের কবিতায় কবি নামটি না থাকলে চেনা যাবে না। 

আপনার সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে বলেন

সমকালীন কবিদের কবিতায় মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ভালো লাগা কাজ করে যে কারণে মনে হয় পূর্বের অনেক কবিতার চেয়ে অনেক ভালো কিছু সৃষ্টি হচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতার মতো করে লেখাগুলো কবিতা হয়ে উঠছে না, কিন্তু কেন হয়ে উঠছে না বা আমার কেন ভালো লাগছে না সেটার কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারি না।

আপনি তো লেখালেখির পাশাপাশি ফটোগ্রাফি করেন, ডিজাইনও করেন। এই তিনের সমন্বয় কী করেন? নাকি আলাদা আলাদা?

সবগুলোই আলাদা। ফটোগ্রাফিতে এসেছিলাম জীবননগরে উজান বাইবার জন্য আর ডিজাইন আমার কল্পনার খোরাক, লেখালেখি হলো বেঁচে থাকার আনন্দ।

আপনার তো একটা নদী আছে। সেই নদীর প্রভাব আপনার সার্বিক জীবনে কেমন?

শৈশবের পর থেকে একটা নদীই আমাকে ভাবুক হতে শিখিয়েছে তা হলো সোমেশ্বরী। যে নদীটির ক্রমাগত বদলে যাবার রূপ দেখে আমি দৈন্যের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অনেক কিছু শিখেছি।

আপনার কাছে প্রেমের সংজ্ঞা কী?

প্রেম জ্বলন্ত এক আগুন। এই জলন্ত আগুনে একবার হাত দিয়ে ফেললে পুরোপুরি পুড়ে যাবার আগ পর্যন্ত উঠিয়ে নিতে নেই তাহলে সারাজীবন এর জ্বালা বয়ে বেড়াতে হয়।

পরবর্তী বই কখন করবেন? সেটা কি গল্পের হবে, নাকি কবিতার?

২০১৮ তে বই প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে।  গল্প-কবিতা দুটো বই প্রকাশের ইচ্ছে আছে। আমার গল্প হয়তো থামবে না তবে কবিতা এই শুরু আর এটাই শেষ।

আপনার প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি অভিজ্ঞতা কী?

প্রথম বই প্রকাশ হবে বা হচ্ছে এই বিষয়টা আমার কাছে কোনো রকম অনুভূতির কাজই করেনি। এক মলাটে গল্পগুলো বন্দী না করলে একসময় হারিয়ে যাবে ভেবেই বই প্রকাশের ভাবনাটা মাথায় এসেছিলো। বই প্রকাশের পর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। যা হলো দলবাজী বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক লেখক ছাড়া সাধারণ লেখকদের পাশে কেউ থাকে না।

লেখালেখির মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমার লেখালেখির অগ্রগতি হয়েছিলো অর্ন্তজালকে সম্বল করে। এখনো যা-লিখি তার বেশির ভাগই এখানেই। লেখালেখির মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজাল যেমন স্বাধীনতা দিয়েছে তেমন সামান্য কিছু সমস্যাও দিয়েছে, তারমধ্যে হলো লেখা চুরি হয়ে যাওয়া এবং ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা অনভিজ্ঞ কিছু নিউজ পোর্টালের সাহিত্য পাতায় সম্পাদনাবিহীন ‘সম্পর্কভিত্তিক লেখা প্রকাশ।’ এগুলো রহিত হলে অর্ন্তজাল-সাহিত্য বেশ ভালো।