শাহীন আখতার

ভাবি, যারা বাঙলা পড়তে জানেন, সবাই আমার লেখা পড়বেন শাহীন আখতার


 

[শাহীন আখতার। প্রায় দুই দশক ধরে গল্প-উপন্যাস লিখছেন। সম্পাদনা করেছেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-সংকলন। তিনি দ্বিতীয় উপন্যাস তালাশের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বই-১৪১০ পুরস্কার পান। বইটির ইংরেজি তর্জমা দ্য সার্চ নামে দিলিস্থ প্রকাশনা হাউস যুবান প্রকাশ করেছে ২০১১ সালে। তালাশ বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের নিয়ে, যাঁরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক ধর্ষিত হয়েছিলেন। শাহীনের চতুর্থ উপন্যাস ময়ূর সিংহাসন প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে ২০১৪ সালের একুশে গ্রন্থমেলায়। ময়ূর সিংহাসন উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছেন বাঙলার পাঠশালা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কথাসাহিত্য পুরস্কার-২০১৫। সম্প্রতি ভারতের আনন্দবাজার গ্রুপের টিভি চ্যানেল এবিপি আনন্দ কর্তৃক সাহিত্যে ‘সেরা বাঙালি’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এখন কর্মরত আছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র নামে একটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে। তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন দুপুর মিত্র। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছিলো অলস দুপর-এ ২০ ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৪-তে। কথাবলির পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশ হলো। ]

 

আপনি কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন?

আমি নিয়মিত লিখছি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় লিখেছি অল্প-স্বল্প।

আপনার সবচেয়ে সফল কাজ কোনটা?

সফল যদি অধিক সংখ্যক বই বিক্রি বা পাঠক দিয়ে বিবেচিত হয়, তাহলে আমার সফল বই ‘তালাশ’। আমার একমাত্র বই যার জন্য আমি পুরস্কৃতও হয়েছিলাম।

উপন্যাস লেখায় আপনি সুনির্দিষ্টভাবে কোন সমস্যায় বেশি পড়েন?

উপন্যাস লেখার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সময় দরকার - চাকরি করি বলে, যা আমার নেই। আরও অনেক সমস্যা আছে। এক কথায় বললে এটা বড় সমস্যা।

লেখার সময় আপনি কি শিডিউল করেন?

সে রকম কোনো সিডিউল করি না। তবে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখি।

আপনি কি কম্পিউটারে লিখেন?

কম্পিউটারে লিখি।

গল্প আর উপন্যাসের ভেতর আপনার পছন্দ কোনটাতে বেশি?

আজকাল উপন্যাস লিখতেই মনে হয় বেশি পছন্দ করি। এ মাধ্যমে নিরীক্ষাটা একটু বেশি করছি। ভাষা, আঙ্গিক, বিষয় - সব দিক থেকেই।

উপন্যাস লেখার সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক আছে কি?

উপন্যাস লেখার সঙ্গে ধৈর্য্যের সম্পর্ক আছে মনে হয়। বিশেষ করে পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপানোর জন্য অধৈর্য্য হয়ে পড়লে চলে না। সাহিত্য সম্পাদকরা উত্ত্যক্ত করলেও না। নিবিষ্ট হয়ে লেখার জন্য এটা জরুরি।

লেখার আগে কি আপনি আউটলাইন করেন?

একটা ছকের মতো করি। একটা ভার্চুয়াল ম্যাপের মতো দাঁড় করাই- ঘরবাড়ি, চরিত্রগুলোর গতিবিধি ইত্যাদির।

আপনার গদ্যশৈলী কি আলাদা? কিভাবে এটা আলাদা?

আমার গদ্যশৈলী কিছুটা আলাদা মনে হয়। হালে হচ্ছে - সখী রঙ্গমালা ও ময়ূর সিংহাসনে। সখী রঙ্গমালায় আমাদের লোকগানের আমেজ আনতে চেয়েছি। শব্দ, উপমা,বাক্যগঠনে এর কিছু আলামত আছে। ময়ূর সিংহাসনে - মোগলদের লেখাপত্র পড়ে ওদের কথা বলার ভঙ্গি কিছুটা রপ্ত করে রিপ্রডিউজ করার চেষ্টা করেছি। তবে বাক্যালঙ্কার পরিহার করেছি যতটা সম্ভব। এ ব্যাপারে পাঠক আরও ভালো বলতে পারবেন।

নিজের কোন কাজটির জন্য খুব তৃপ্ত বোধ করেন?

আপাতত ময়ূর সিংহাসন লেখে কিছুটা তৃপ্তিবোধ করছি। দীরঘ সময় নিয়েলিখেছি। রিরাইট করেছি, শল্যচিকিৎসকের মতো কাটা-ছেঁড়া করেছি, যাতে আমার যতখানি সামর্থ, পুরোটারই প্রতিফলন ঘটে এখানে।

আপনি কি বিশেষ কোনও পাঠককে সামনে রেখে লিখেন না বিশেষ অডিয়েন্সকে?

আমি ভাবি, যারা বাংলা পড়তে জানেন, সবাই আমার লেখা পড়বেন।

সাহিত্যের কি সামাজিক বাধ্যবাধকতা আছে? নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

আপাতদৃষ্টিতে থাকতে পারে আবার নাও পারে। সামাজিক দায়বদ্ধতা মোটাদাগের বিষয় নয়। একটা ভালো লেখা থেকে সমাজ নানাভাবে উপকৃত হয়।

আপনার লেখার কক্ষ নিয়ে কিছু বলুন?

আমার লেখার কক্ষটি বেশ খোলামেলা। কক্ষসংলগ্ন বারান্দা আছে। বড় দুটিজানালা আছে। তবে কম্পিউটারের সামনে বসলে বাইরের দৃশ্য অদৃশ্য হয়ে যায়।

আপনি কি বেশি পড়া পছন্দ করেন?

ছোটবেলা থেকেই আমি বইয়ের পোকা। পড়তে ভালো লাগে। বই পড়তে পড়তে ঘুমাই।

আপনি কি গল্প খুব দ্রুত শেষ করতে পছন্দ করেন?

আপশোস, আমার গল্প দ্রুত শেষ হয় না। আগে হতো।

উপন্যাস লিখতে আপনি সাধারণত কতটুকু সময় নেন?

উপন্যাস লিখতে বিস্তর সময় নিই। কয়েক বছর। অথচ আমার প্রথম উপন্যাস ‘পালাবার পথ নেই’ পাঁচ-ছ মাসে লিখেছিলাম।

আপনি সাধারণত কোনও গল্প বা উপন্যাসের কিভাবে শুরু করতে জোর দেন? চরিত্র না বাক্যকে? না কোনও ডায়ালগকে?

বাক্যের ওপর সাধারণত জোর দেই। এমনও হয়েছে একটা ডায়লগ দিয়ে গল্প শুরু করেছি।

লেখে ফেলার পর কি আপনার কখনও এমন হয়েছে যে পুরো লেখাই মানে গল্প বা উপন্যাসকে আপনাকে নতুন করে লিখতে হয়েছে?

না, গল্প বা উপন্যাস লিখে ফেলার পর পুরোটা নতুন করে লিখতে হয়েছে -এমন কখনো হয়নি। লেখার মাঝপথেই আমি বদলাই বা লেখার ফাঁকে ফাঁকে। রাতে হয়তোলিখলাম। দুপুরে অফিস থেকে ফিরে কম্পিউটার খুলে লেখাটা ভালো লাগলো না। বাদ দিয়ে নতুন করে আবার শুরু করলাম।

লেখার আগে আপনি কি সমাপ্তি ঠিক করে রাখেন?

শেষটা কীভাবে হবে, বেশিরভাগ সময়ই তা জানা থাকে না। সখী রঙ্গমালারক্ষেত্রে শেষটা আমার জানা ছিল। ময়ূর সিংহাসনের শেষ পৃষ্ঠাটা মাথায় আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে । এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে উপন্যাসের বেশ কিছু অংশ আমাকে বদলাতে হয়েছে।

লেখালেখিকে কি সংগ্রাম মনে হয় আপনার?

শুরু করাটা বেশ কষ্টের। এলোমেলো ড্রাফট। তারপর কাহিনিতে ঢুকে গেলে,এর সঙ্গে মিশে যাই - বিশেষত উপন্যাসের বেলায়। তখন লেখা থেকে দূরে থাকাটাই কষ্টের মনে হয়। ঘোরলাগা ভাবটা তখন বেশ উপভোগ করি। তখন প্রাত্যহিক সমস্যাগুলি দিব্যি এড়িয়ে চলা যায়।

লেখার পর আপনি সাধারণত কোন বন্ধুর সাথে শেয়ার করেন?

লেখার বিভিন্ন পর্যায়ে শেয়ার করার ইচ্ছা হয়। মুখে মুখে বলিও সুযোগ পেলে নানাজনকে। যারা আমার বন্ধু এবং বইয়ের পাঠক।

 

[এই সাক্ষাৎকারটি কপিলেফ্ট। এর যে কোনো অংশ অবিকৃত রেখে যে কেউ শুধুমাত্র অবাণিজ্যিক বা অলাভজনক উদ্দেশ্যে নকল ও পরিবেশন করা যাবে।]