লিডিয়া ডেভিস

আমি সহজভাবে কথা বলতে পছন্দ করি, পাঠক ও নিজের মধ্যে কোনো দেয়াল না রেখে লিডিয়া ডেভিস


 

[লিডিয়া ডেভিস। জন্ম ১৫ জুলাই, ১৯৪৭। তাকে ছোট গল্পের লেখক বলা হয়, যদিও তিনি সব সময় এই কথা অস্বীকার করেছেন। তাকে সমসাময়িক কালের আমেরিকান সাহিত্যের অন্যতম শুদ্ধ ও সম্ভাবনাময় লেখক মনে করা হয়। তার এই সাক্ষাৎকারটি  গ্রহণ করেন কবি শাফিনূর শাফিন প্রাচ্যরিভিউর জন্য। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০১৩-এর শেষের দিকে আমি লিডিয়া ডেভিসের ওপর একটা লেখা পড়েছিলাম, তিনি সে বছরই ম্যান বুকার পেয়েছিলেন। লেখাটা পড়ার আগে তাকে আমি চিনতাম না। লেখাটার লেখক তার লেখায় লিখেছিলেন, ‘ লিডিয়া ডেভিস তার গল্প সম্পূর্ণ করেন না!’ এই লাইন টাই আমাকে এত প্রভাবিত করল যে আমি বাধ্য হলাম ‘দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অব লিডিয়া ডেভিস পড়তে। আর এটা নিশ্চিত ছিল যে আমি তার গল্পের মোহে আচ্ছন্ন হব। কাজেই যখন আমার কোনো কবি বা লেখকের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা মনে হলো আমার মনে লিডিয়া ডেভিসের নামই এলো প্রথমে...।’ সেই সাক্ষাৎকারটি কথাবলির জন্য অনুবাদ করেন নীলাঞ্জনা অদিতি।]

 

আপনি এক সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন যে, আপনি অনেক ছোটবেলা থেকেই জানতেন লেখালেখি করা আনন্দের চেয়েও বোঝা বলে মনে হয় বেশি। কী কারণে এই বোঝা কাঁধে নিতে বাধ্য হলেন?

আমার মনে হয় বিষয়টা এর চেয়েও একটু জটিল ছিল। প্রথম দিকে, শৈশবে আমি লেখালেখির প্রতি কৌতুহলি ও আগ্রহী ছিলাম। তারপর, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে যখন আমি সিরিয়াসভাবে লেখালেখিতে নিবেদিত হলাম সে সময় এটাকে বোঝার চেয়েও আনন্দ বলে অনুভব করলাম। আর এখনো অনেক আনন্দময় মুহূর্ত আছে নয়তো চালিয়ে যেতাম না। লেখালেখি আমার জীবনে প্রথম আগ্রহ ছিল, আর আমি অন্য কিছু করার কথা ভাবতেই পারিনি। আর সাথে সাথেই কয়েক বছরের মধ্যেই লেখালেখি বোঝার থেকেও অনেক অনেক আনন্দময় হয়ে ওঠে।

আপনার ওপর আর আপনার মননের ওপর লেখালেখির ক্ষেত্রে শৈশব ও অভিভাবকের কেমন প্রভাব ছিল?

আমার মা বাবা দুজনই লেখক ছিলেন, এবং আমার বাবা লেখালেখি ও সাহিত্যের শিক্ষকও ছিলেন। কাজেই ভাষা ও সাহিত্যকর্ম আমার অভিভাবকদের মূল আগ্রহের জায়গা ছিল (রাজনীতির পাশাপাশি) সব সময় আলোচনা হত। আমার কাছে এগুলোকে গুরুত্ব দেয়া ছাড়া উপায় ছিলনা আর মনোযগ না দিয়েও পথ ছিল না।

আপনি সব গল্প/অণুগল্পের সব ছাঁচ ভেঙেছেন। খুব বেশি সংলাপ বা বর্ণনা নেই এমনকি বেশির ভাগ চরিত্র কাল্পনিক। আমার পর্যবেক্ষনে কিছু গল্পকে স্বগতোক্তি মনে হয়েছে, যেমন ‘অড বিহেভিওর”, ‘ লস্ট থিংস” ইত্যাদি। আর আপনি হঠাৎ গল্প শেষ করেন যেন মনে হয় গল্পগুলোর ভাগ্য পাঠকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এমন কেন? আপনি এটা সচেতনভাবে করেন?

আমার সাথে যা ঘটে বা যে চিন্তা মাথায় ঘোরে আমি তাই দ্বারাই অনুপ্রাণিত বা আচ্ছন্ন হই। সেগুলো লেখায় আনতে চাই। আমি সেগুলোকে খুব লম্বা বা জটিল করার চেষ্টা করিনা। এই কারনেই কিছু গল্প লম্বা ও জটিল, কিন্তু অন্য লেখাগুলো খুব সংক্ষিপ্ত শুধু চিন্তা ভাবনা প্রকাশের মত লম্বা। আমি সচেতনভাবে উদ্ভট ও অদ্ভুত গল্প লিখিনা শুধু চিন্তার সাথে আকৃতির সামঞ্জস্য রাখি। এটা সত্যি যে পাঠকের কাজ সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা থাকে।

কিছু সমালোচক বলেন আপনার গল্পগুলো শুধু সংক্ষিপ্তই নয় সংক্ষিপ্ততম! হয়ত আপনার জন্যই তারা নতুন একটা ধারা সৃষ্টির কথা বলছেন কারণ আপনি গল্প বলার সকল প্রচলিত নিয়ম ভেঙেছেন। কিন্তু নিজের গল্প গুলোকে কখনো ছোট গল্প বলেননি। কোন কারণ?

কাজেই আমার নিজের বেশির ভাগ গল্পে তা ব্যবহার করতে পারব না। আমি গল্প শব্দটা পছন্দ করি কারণ এটা বিভিন্ন ধরনের গল্পে ব্যবহার করা যায়, সংবাদপত্রে হোক বন্ধুর বলা চুটকি হোক বা কোন আখ্যান এর খণ্ডাংশ হোক। যেমন আমি মাঝে মাঝে বলি।

আপনার গল্প উপন্যাসগুলো কবিতার চেয়েও বেশি কিছু। আপনিও কি তাই মনে করেন? প্লিজ এই ব্যপারে কিছু বলুন।

আমার মনে হয় আপনি বলছেন ভাষা সুরেলা অথবা অন্তত ছন্দোবদ্ধ আর আনন্দের। আমি তাই আশা করি। আসলে বিষয় টা হল পড়তে লিখতে গিয়ে সব ভাষা আমি মস্তিস্কে শুনতে পাই আর আমি সেই ভাষার শব্দ সম্পর্কে সচেতন আর সেগুলো আমার জন্য গুরুত্বপূর্ন। এবং তবু আমি চাইনা আমার কাজ খুব বেশি সচেতনভাবে কাব্যিক হোক এতে স্টাইলটা ব্যভিচারী আর বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। আমি সরল ভাষায় লিখতে চাই যা প্রাঞ্জল হবে।

আপনার লেখার ধরনে যেটা আমার বেশ পছন্দ তা হল ভাষা খুব সহজ আর বাক্যগুলো খুব লম্বা নয় আর বুঝতে কঠিন লাগে এমন কোন কঠিন শব্দ নেই। (সত্যি বলতে কি, অভিধান খুলে বসার দরকারই হয় না!) আমার মনে হয় আপনার এই লেখার ধরনই বিশ্বব্যপী আপনাকে ইংরেজি ভাষার লেখক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনি কি লেখার সময় এগুলোই মনে রাখেন?

জেনে খুব ভাল লাগল যে আপনি আমার লেখার ধরনকে এত ইতিবাচকভাবে দেখেন। আমার লেখা সহজবপধ্য করতে আমি সচেতনভাবে সরল সহজ লেখার ধরন কে গ্রহন করি না। আমি শুধু নিজের কাজের জন্য একটা ধরন অনুসরণ করি। আমি সহজভাবে কথা বলতে পছন্দ করি, যেমন বলছিলাম। লেখক পাঠকের মধ্যে কোন দেয়াল না রেখে। কিন্তু আমি অন্য সব ধরনের লেখা পড়াটা উপভোগ করি।

আপনি কি নিজের গল্পে অনেক কাঁটাছেঁড়া করেন? নাকি প্রথমে যেমন লিখেছিলেন তেমনই রাখেন?

ঠিক যেভাবে গল্পগুলো চলে আসে সেভাবেই থাকে। কিন্তু আমি গল্পগুলো বারংবার পড়ি ছোট বড় বদল করি। আমি অনেকবার সেগুলো পড়ি যতক্ষন কিছুতে না আটকাই। তাই আমি নিভিড়ভাবে বারবার চোখ বুলাই যতই ছোট গল্প হোক না কেন।

আন্তর্জাতিক ম্যান বুকার পুরস্কার খুব বিশেষ কিছু। এর পরে আপনার ব্যক্তিজীবনে ও লেখায় কী বদল হয়েছে?

এটা সত্যি বিশেষ কিছু আর আমার জন্য চমক ছিল। আমি আশা করি আমার লেখায় কিছু বদলায়নি কারণ তা ভাল হত না। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই বিদেশিদের আগ্রহ তৈরী হয়েছে আর অনুবাদের প্রকল্প চুক্তি হয়েছে। এটাই এখান থেকে ভাল ফলাফল ছিল।

আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করি লেখালেখির মাধ্যম হিসেবে অনুবাদ সবচেয়ে কঠিন। (আমি সবসময় কাব্য সম্পর্কে ফ্রস্ট  এর উক্তি স্মরণ করি- “ হোয়াট গেটস লস্ট ইন ট্রান্সলেশন!”) আপনি কিছু ফ্রেঞ্চ ক্লাসিকাল সাহিত্য অনুবাদ করেছেন, প্রাউস্ট এর সোয়ান’স ওয়ে আর ফ্লোবার্ট এর মাদাম বোভারি সহ। কিভাবে আর কখন অনুভব করেন যে পাঠক মূল লেখার স্বাদ পাবে?

আমি ৪০ বছরের ও বেশি সময় ধরে অনুবাদ করছি, এবং পরিস্কারভাবে আমাকে ত উপভোগ করতেই হবে চ্যালেঞ্জিং হওয়া সত্বেও। এটা কঠিন কিন্তু লেখকের জন্য এটা ভাল অনুশীলন। আমার ধারা হল মূল বইয়ের সাথে যুক্ত থাকা, যখন এটা গুরুত্বপূর্ণ ও ভাল বই হয় যেমন প্রাউস্ট আর ফ্লোবার্ট  এর কাজের মত। আমি বিশ্বাস করি যে আমি যদি খুব ভাল মত মূল লেখা অনুসরণ করি প্রাঞ্জল ও সন্তুষ্টিকর  ইংরেজি কেখার সময়ও আমি মূল লেখার কিছ স্বাদ আনতে পারব।

বেশির ভাগ সময় মেয়েদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হয়। প্রায়ই তাদের জীবন এমনভাবে চলে যেন তীক্ষ্ম ব্লেডের ওপর দিয়ে চলছে – সব সময় ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আপনি লেখক, অনুবাদক, শিক্ষক এবং আপনার ব্যক্তিগত জীবন ও আছে। লিডিয়া ডেভিসের এই সকল স্তর এর মাঝে কোনোদিন সংঘর্ষ বেঁধেছে নাকি লেখালেখির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?

আমার দেখা মত মানুষের জীবনে চারটা মূলক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা খুব কঠিন (পুরুষদের বেলাতেও); জীবিকা, পরিবার দেখাশোনা, শিল্পের সাধনা, অথবা বন্ধুদের সাথে সামাজিক জীবন রক্ষা অথবা কারো সমাজে সক্রিয় থাকা। যখন আমার বাচ্চারা ছোট ছিল, আমি আমার সমাজে কম সক্রিয় ছিলাম, আমি একই সময়ে দুটা কাজ করতাম, জীবিকা নির্বাহ ও সন্তান দেখাশোনা; অথবা শিল্প সাধনা আর উপার্জন ( যখন বাচ্চারা বিদ্যালয়ে থাকত)। সব কিছুতে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন, আর কিছু সময় খারাপ লাগে যখন বাচ্চা ঘুম থেকে উঠে যায় আর লেখা বন্ধ করতেই হয়। কিছু মানুষের পরিবার থাকে না অথবা খুব সামান্য সামাজিকতা রক্ষায় ইচ্ছুক থাকে, অথবা দুটোই। কিন্তু আপনি যদি সব চান, তাহলে সব কিছুতে ভারসাম্য রক্ষায় সবচেয়ে যা উত্তম তাই করুন।