ইমরে কারতেস

আমি উপলব্ধি করলাম আমাকে লিখতে হবে, লিখতে হবে বিস্ময়কর আর হতাশাজনক বিষয়সমূহ নিয়ে ইমরে কারতেস


 

[ইমরে কারতেস। ২০০২ সালে নোবেল বিজয়ী হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যিক। জন্ম ১৯২৯ সালের ৯ নভেম্বর হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে। মৃত্যু ৩১ মার্চ ২০১৬ সালে বুদাপেস্টেই। এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন লুইসা জিয়েলিনস্কি। আর প্যারিস রিভিউ প্রকাশ করেছিলো ২০১৩ সালের গ্রীষ্মসংখ্যায়। সাক্ষাৎকারটি বাঙলা ভাষান্তর করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক।]

 

সাহিত্যে আপনার শুরুটা কী দিয়ে? আপনার পরিবারের কেউ কি লেখালেখি করতেন?

আমার পরিবারের কেউ লিখতেন না। আর আমার সত্যিকারের শুরুটা সেখানে হয়নি। আমার মনে পড়ে যখন আমার বয়স সাত কি আট, আমার এসবে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে যেত। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল আমি কী উপহার চাই, আর আমি কিছু না বুঝেই প্রত্যুত্তর করলাম- আমার একটি সাময়িকী চাই। এটা একটা চমৎকার সাময়িকী ছিল- এতই চমৎকার ছিল যে, আমি সেটা নষ্ট করতে চাইনি। যতই সময় গেল, আমি লিখতে চেষ্টা করলাম এবং অনেকটা বিরক্তিকর মনে হলেও কাগজে লিখে শেষ করেছিলাম। আর সেখানে যথারীতি যা কিছু ছিল সেগুলোকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করেছিলাম। আমি মনে করি একজন মানুষ তার লেখা বারবার সংশোধনের মধ্য দিয়েই লেখক হয়ে উঠে। আর এভাবে যেতে যেতেই হঠাৎ উপলব্ধি করলাম আমি বাস্তবিক অর্থেই একজন লেখক হয়ে উঠেছি।

এটা কখন হয়েছিল?

তখন আমার বয়স ২৪ বছর। যে মুহূর্তে রাস্তায় আমাকে কোন বিষয় তাড়িত করত, আমি সঙ্গে সঙ্গে তা লিখে রাখতাম, আর এভাবে আমি বহুবারই লিখেছিলাম।

এটা কি সে সময়টা যখন আপনি ‘দ্য ইউনিয়ন জ্যাক’ লিখেছেন?

হ্যাঁ, ‘ফিয়াস্কো’ লিখার সময়েও এটা হয়েছিল। কিন্তু সত্যিকার অর্থে লেখালেখি শুরু করার ক্ষেত্রে এটা তেমন কোন বোধ তৈরি করেনি। একজন লেখক হওয়ার মতো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আমার ছিল না। এমনকি আমার একটা কলম পর্যন্ত ছিল না।

তাহলে এ ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কোন জিনিসটি আপনাকে লেখালেখির জীবনে নিয়ে এলো?

এ বিষয়টি নিয়ে বলতে চাইলে আমি আমার সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম, আর অগণিত বইও লিখতে পারতাম। কিন্তু এই গল্পগুলোর মধ্যে আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলি। প্রকৃতপক্ষে, আমরা লেখকরা কাউকে কিছু বলতে নেই। যাদের কাজ করে যাওয়া উচিত নীরবে, নিভৃতে। এর কারণ হচ্ছে আমরা লেখকরা একটি নিজস্ব পথ উপলব্ধি করি। লেখালেখি আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। এর একটি অস্তিত্বগত মাত্রা আছে এবং তা সকল লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রত্যেক শিল্পীরই একটি মুহূর্ত থাকে জাগরণের, কোন একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার, যা আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে, আপনি একজন চিত্রকর নাকি লেখক তা বিবেচ্য বিষয় নয়। আমার জীবনের পরিবর্তনটা পেশাদারিত্বে নয়, এটা ছিল গভীর জাগরণের মধ্য দিয়ে।

আমি আউশভিতজে এক বছর অন্তর্লিন ছিলাম। আমি কয়েকটা কৌতুক ছাড়া আর কিছুই সঙ্গে নিয়ে আসতে পারিনি আর তা আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। তারপরও আমি জানতাম না এই আনকোরা অভিজ্ঞতা দিয়ে কী করা যেতে পারে। কারণ এই অভিজ্ঞতায় না সাহিত্যের জাগরণ ছিল, না পেশাদারিত্বের ছোঁয়া ছিল, না ছিল শৈল্পিক অন্তর্দৃষ্টি। আমি যা চাচ্ছিলাম সে ব্যাপারে আমার কোন ধারণা ছিল না আর তা বের করে আনাটাই একটা সংগ্রাম ছিল। কিন্তু তখনও লেখালেখি আমার পেশা ছিল না। এমনকি আমি লেখালেখির নিয়মকানুনের ক্ষেত্রেও নিজেকে যথেষ্ট সময় দিয়েছিলাম।

আপনার প্রথম উপন্যাস লিখতে তেরো বছর সময় নিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, এটা সত্য। কিন্তু তারমানে এই নয় যে, আমি প্রতিদিনই এজন্যে কঠিন পরিশ্রম করেছি, অবশ্য আমি কখনও আমার উপন্যাস হতে দূরে ছিলাম না। ঐ দিনগুলোতে আমার জীবন ছিল দুঃসহ। কমিউনিস্টদের শাসনের বছরগুলোতে আমাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। সুতরাং উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি লিখতে আমার অনেক সময় লেগেছিল এবং আমি যা চাই তা জানতে। কিন্তু আমি প্রথম থেকেই জানতাম যে আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাচ্ছি। আমি জানতাম আমি শব্দের নৈপুণ্য আনতে চাই। আর সেই সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল আমার বসবাস যা আমাকে অন্য সকল কিছুর চাইতে আগ্রহী করে তুলেছিল, যার বাস্তবতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

‘ফেটলেসনেস’ উপন্যাসটি ষাট ও সত্তরের দশকে লেখা, তবুও এটি গণহত্যা সম্পর্কিত। কোন ঐতিহাসিক ঘটনাটি উপন্যাসটিকে জীবনঘনিষ্ঠ হতে প্রভাবিত করেছে?

হ্যাঁ, আমি সম্পূর্ণ উপন্যাসটি কমিউনিস্ট শাসনকালে লিখেছি। আমার কোন ধারণা ছিল না আমি কোন্ বিষয়ে লিখব। আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল একটি নিজস্ব ভাষা ও ধারা তৈরি করা এবং পরিশেষে একটি বিষয়বস্তু বিনির্মাণ। আমি কিছু বিশেষ বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলাম, পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছিলাম সর্বগ্রাসী প্রক্রিয়ায় জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাকে। এটা আমার কাছে মোটেও স্পষ্ট ছিল না কিভাবে আমি সে রচনাশৈলীর মধ্য দিয়ে যেতে পারতাম। আমি নৈমিত্তিকতায় ভাষা বিনির্মাণ করতাম, তা ছিল শক্তিশালী এবং সংক্ষিপ্তও। আমি বিষয়বস্তুর চারপাশে অনর্থক মেদ বাড়াতে চাইতাম না। এবং যাই হোক আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যারা সর্বগ্রাসী সময়ের মধ্যে বাস করে গেছেন, সফল, মর্যাদাবান লেখক হওয়াটা তাদের জন্যে কঠিন ছিল।

ঐ দিনগুলোতে জীবিকার জন্যে আপনি কী করেছিলেন?

এক বন্ধু আমাকে ক্ষুদ্র গীতিনাট্য লিখতে বলেছিল। আর আমি তা-ই করেছিলাম। সে ছিল বড় মাপের সফল লেখক এবং তার দৃষ্টান্ত অনুসরণের কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না। আমার বন্ধু ব্যাপারটা লক্ষ্য করলÑ সেজন্যে আপনার অনুধাবন করা দরকার, আমি ২৮ বর্গমিটারের একটি ফ্ল্যাটে সস্ত্রীক বসবাস করতাম। আমাদের জীবনটা কেমন ছিল তা এই বন্ধুটি দেখতে পেল এবং জিজ্ঞেস করল, আমি অনাহারে মারা যেতে চাই কি না। অবশ্যই আমি তা চাইনি। সুতরাং সে আমাকে গীতিনাট্য লিখতে পরামর্শ দিল। আমি গীতিনাট্যের বিষয়ে তেমন কিছু জানতাম না। কিন্তু আমি সংলাপ লিখতে জানতাম। তাই আমরা একসঙ্গে দৃশ্য তৈরির সিদ্ধান্ত নিলাম, আর তার নির্দেশনায় আমি সংলাপ লিখতাম, আমি তা করতাম কেননা এ কাজে কোন অভিজ্ঞতা ছিল না আমার। আমি ভাগ্যবান যে, রচনাশৈলীর ক্ষেত্রে আমি নির্ভার ছিলাম। সেজন্যে আমাকে প্রদত্ত কাজ সহজেই সম্পন্ন করতে পারতাম। অপরদিকে, সে ছিল স্বীয় প্রবৃত্তির দাস।

‘ফেটলেসনেস’ রচনার সঙ্গে আপনি এর সমন্বয় ঘটালেন কিভাবে?

আমি বন্ধুর বাসায় সন্ধ্যা কাটাতাম, গীতিনাট্য নিয়ে কথা বলতাম এবং বিষয়বস্তুর চরিত্র নিয়েও। কিন্তু হঠাৎ আমি আমার উপন্যাস নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। একটা বাক্য আমার কাছে ধরা দিত। আমি এটা সম্পর্কে বলতে পারতাম না। কেউই বলতে সমর্থ ছিল না। আর এটা সেখানেই অনড় থাকত। বাক্যটি অনেকটা এ ধরনের, ‘আমি গাজরের চেয়ে শালগম বেশি পছন্দ করি।’ আমি বাক্যটি ঠিকভাবে পুনর্নির্মাণ করতে পারিনি, কিন্তু আমার মধ্যে একটি বিষয়ের অবতারণা হয়েছিল যে, এটাই আমার উপন্যাস রচনার প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে। অনুল্লেখযোগ্য একটি লাইন সম্ভবত এই উপন্যাসের মৌলিক বিষয়গুলোকে আলোকিত করে, আমার নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতেও। এটি একটি মজার বিষয় যে, একটি মাত্র বাক্য সকল কর্মযজ্ঞকে জীবনের কাছে পদানত করে। আমার কাছে বিবেচ্য ছিল ভাষাশৈলী ও বিষয়বস্তু। এই বিষয়টিই আমাকে আলোকিত হওয়ার শক্তি যুগিয়েছে। আমি অবগত ছিলাম যে আমি এমন একটি উপন্যাস শুরু করতে যাচ্ছি যা সহজেই কান্নার উদ্রেক করতে পারে আর তা শুধু এই কারণেই নয় যে, একটি বালক উপন্যাসের নায়ক চরিত্রে ছিল। কিন্তু আমি বালকটিকে অবিকল আবিষ্কার করেছি কেননা স্বৈরশাসনে যে কাউকে শিশুসুলভ অজ্ঞতা ও অন্ধকারের জগতে রাখা হয়। সে কারণে আমাকে শুধুমাত্র বিশেষ রীতি ও শৈলীই তৈরি করতে হয়নি, এমনকি সময়গতির প্রতিও নিবিড় মনোযোগ দিতে হয়েছে।

আপনার নোবেল বক্তৃতায় বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে আমি যে ঘৃণা আর হতাশা নিয়ে জেগে উঠি তা আমাকে তাড়িত করে নিয়ে যায় আমি যা বর্ণনা করতে চাই সে জগতে।’ লেখালেখি কি আপনার সে অবস্থাকে প্রশমিত করে?

আমাকে এমন একটা পৃথিবীতে নির্বাসিত করা হয়েছিল যা আমার কাছে ছিল একেবারেই অচেনা ভীনদেশ, যেখানে আমাকে প্রতিদিনই শুরু করতে হতো হতাশা নিয়ে যা থেকে মুক্তি অসম্ভব। এটা স্টালিনের হাঙ্গেরির জন্যে সত্য ছিল কিন্তু আরও বেশি সত্য ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিকদের অধীনে। নাৎসিরা সবকিছু গলাধঃকরণ করেছিল। এটা এমন একটা যান্ত্রিকতা ছিল যে, লোকজন যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছিল সেটাও বুঝার সুযোগ ছিল না। সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে এখানে আমার জন্য তিনটি ধাপ ছিল। প্রথমটি, গীতিনাট্য শুরুর আগে। সময় ছিল দুঃসহ কিন্তু আপনি কোনভাবে তা কাটিয়ে দিতে পারবেন। দ্বিতীয়টি, প্রিমো লেভির মতো লেখকগণের বর্ণনা যার অবস্থান ছিল ঘটনাসমূহের মাঝামাঝি, যেন ভেতর থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, ঘটনার সকল বিস্ময়কর আর আতঙ্কজনক সাক্ষ্য নিয়ে। এসব লেখকরা এমন কিছু বর্ণনা করতেন, যা কোন মানুষকে উন্মাদনার পথে ধাবিত করত বিশেষ করে যারা প্রাচীন মূল্যবোধ ধারণ করে। তৃতীয় ধাপটি ছিল সেসব সাহিত্যকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যা জাতীয় সমাজবাদের পতন পরবর্তীতে স্বরূপ লাভ করেছিল, আর পর্যবেক্ষণ করেছিল প্রাচীন মূল্যবোধকে। যাই হোক, তাদের কাজগুলো আমাদের কাছে সাহিত্যের মৌলিক ঐতিহ্যের দলিল হয়ে আছে।

আপনি কি আপনার নিজের সাহিত্যকর্মগুলোকে এই মৌলিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন?

হ্যাঁ, আমি এমনটা বিবেচনা করি। এছাড়া আমি নিশ্চিত নই, আমার লেখা নাকি আমার অসুস্থতা আমাকে হত্যা করতে যাচ্ছে। হ্যাঁ আমার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভবপর, অন্তত ততটুকু চেষ্টা করেছি। সুতরাং ইতিহাসের সান্নিধ্যে আসার ব্যাপারে আমি এখনও মরে যাইনি আর বস্তুতপক্ষে, এর বিপরীতে আমি মারাত্মক ধরনের পারকিন্সে মৃতপ্রায়।

বেঁচে থাকার মানে কি লেখালেখি হতে পারে?

মানুষ কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে বিশেষ করে সবগ্রাসী নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়ে তা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আমি আমার নিজের জীবনকে ব্যবহার করতে সক্ষম ছিলাম। আমি আত্মহত্যা করতে চাইনি, কিন্তু তখন আমি বড় লেখকও হতে চাইনি অন্তত বিশেষ করে প্রথম দিকে। এই ধারণাটিকে আমি দীর্ঘসময় ধরে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু তারপর আমি উপলব্ধি করলাম আমাকে লিখতে হবে, লিখতে হবে বিস্ময়কর আর হতাশাজনক বিষয়সমূহ নিয়ে।

সম্ভবত লেখালেখির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে?

কারও কারও থাকে না।

আপনার?

১৯৫৪ তে যখন আমি বুঝতে পারলাম এক ভয়ঙ্কর পৃথিবীতে আমি বাস করছি, আমি খুব অবাকই হয়েছিলাম। এ ধরনের পৃথিবীতে আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন না। আর যদিও তার কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। কিছু চুটকি, কিছু মজার গল্প, আর কৌতুক। আমি বিমোহিত হলাম যখন এটা আমার মধ্যে উদিত হলো যে আমার হাতে অসাধারণ কিছু বিষয় আছে যা দিয়ে আমি কাজ শুরু করতে পারি। সুতরাং আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। আমি কি নিজেকে এমন ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি যে স্বৈরতন্ত্র ও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে, অথবা আমি কি আমার জীবন থেকে এই ঘটনাগুলোকে উপড়ে ফেলতে পারি? যদি আমি বলার প্রয়োজনে সে মুহূর্তগুলোকে আটকে রাখতে না পারতাম, এই গল্পগুলোকে আমি ভুলে যেতাম। আমি দুর্ভাগ্যের শিকার হলাম এবং আউশভিতজে নির্বাসিত হলাম। কেউ কেউ আমাকে সাহায্য করেছিল, কেউ কেউ করেনি। আমাকে রাখা হলো টুকিটাকি সবকিছুর সঙ্গে যা আবর্জনার ঝুড়ির জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু সেসব আবর্জনা ছিল না। সুতরাং আমি আমার নিজের জীবনকে এই গল্পগুলো লেখার নিমিত্তে নিবেদন করলাম। আমার অভিজ্ঞতার মূল্যে আমি লেখালেখিতে প্রবেশ করলাম। আমি যে কোন উপায়ে সে সত্যকে গল্প বলায় তুলে আনতে চাইলাম, যে সত্য বলা যায় না।

ঐ দিনগুলোতে আপনি কি পাঠকের চেয়েও বেশিকিছু ছিলেন?

আমি কার্যকরভাবে বিশ্বসাহিত্যে মগ্ন ছিলাম। হ্যাঁ, আমি স্কুলে থাকাকালেই ধ্রুপদী সাহিত্য পড়েছি কিন্তু স্পষ্টত ঐ বইগুলো পাওয়া কঠিন ছিল। পরবর্তীতে হাঙ্গেরিয়ান সরকার এই সমস্ত বই প্রকাশের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তাতে আধুনিক গল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সুতরাং আমার জগত আমার নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে। আমি বছরের পর বছর ব্যয় করেছি আমার প্রথম উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যা আমি বলতে পারব না। কেউ কখনও সবটুকু বলতে সক্ষম হয় না।

এটা সত্য, আপনি বলতে পারবেন না, এটা পড়ে মনে হয় যেন এটা আর অন্য কোনভাবে লেখা সম্ভব ছিল না।

আমি আনন্দিত। আমার মনে পড়ে যখন জার্মানিতে ‘ফেটলেসনেস’ প্রকাশিত হয়েছিল, আমি ব্যাগভর্তি চিঠি পেতাম। সেখানেও বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উপকরণ ছিল, যেগুলো আমি গীতিনাট্যের ভাষায় সংযোজন করেছি। উদাহরণস্বরূপ, একজন পাঠক আমাকে বলল যে, আমি একটা জানালা খুলে দিয়েছি। আমি পাঠকদের চোখ খুলে দিয়েছি যাদের বাবা ও মায়েরা এক্ষেত্রে নির্বিকার ছিলেন। তারা কথা বলতে অস্বীকার করতেন কারণ তারা ইতিহাসের মুখোমুখি হতে চাইতেন না। আর সেটা নিশ্চিতভাবে কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু এটা করতে হবে।

আপনার ছোট কক্ষটিতে কোন জিনিসগুলো আপনার জন্য আনন্দ কিংবা চিত্তবিনোদন নিয়ে আসে?

সেগুলো খুবই একান্ত গল্প যা আমি বলতে পছন্দ করি না। আমি তেমন কিছু করি না। আমি গীতিনাট্য লিখি।

আর সেটা আপনাকে আনন্দ দেয়?

না।

এছাড়া আর কী করেন?

শুধুমাত্র লেখালেখি। আমি জানি এটা একটা ভাল প্রশ্নÑ কী আমাকে আনন্দ দেয়। আর যদি আমার উত্তর হয় ‘শুধুমাত্র লেখালেখি’ তখন অবশ্যই এটি সত্য হবে না যেহেতু আমি লেখালেখি করি। যখনি আমি লিখতে বসতাম, একটা দুর্ভাগ্যের মতো অনুভূত হয় যা আমাকে সহ্য করতে হতো। এখানে একমাত্র আনন্দ হচ্ছে অতীত-দর্শন। একবার স্টুটগার্টে একটি পঠন অনুষ্ঠান শেষে এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে রাতের খাবার খেয়েছিলাম যিনি আমাকে বলেছিলেন, তিনি আমার প্রতি সহমর্মিতা দেখিয়েছিলেন যে দুঃসহ সময়ের মধ্য দিয়ে আমাকে আসতে হয়েছিল। স্টুটগার্টের ঐ মুহূর্তটি ছিল আমার প্রথম উপন্যাস লেখার ত্রিশ বছর পরের ঘটনা। তখন আমি অনুভব করেছিলাম যে, ঐ দিনগুলোতে আমি ভীষণ সুখী ছিলাম।

আপনার উপন্যাস লেখা?

অবশ্যই, আমি আমি দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আমার এক একটি কাজ শেষ করতে সমর্থ হই আর ঘটনাচক্রে স্টুটগার্টের একজন ভদ্রমহিলা খুব দারুণভাবে সহমর্মিতা দেখিয়েছিলেন। তার শব্দগুলো আমার কাছে সাফল্যের একটি তকমা ছিল। আমি অনুধাবন করেছিলাম যে, আমি একটি জীবনমুখী কাজ করতে সফল হয়েছি। আমি যতটা উপলব্ধি করতে পারি, এটা আমার জীবনে এক সীমাহীন সুখময় মুহূর্ত।

আপনি কি ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো, কদ্দিস ফর আনবর্ন চাইল্ড ও লিকুইডিয়ান’কে আপনার জীবনের সেরা চারটি কাজ মনে করেন?

না, এটি একজন হাঙ্গেরিয়ান মূক সাংবাদিকের কাজ যে টেট্রালজির এই ধারণা নিয়ে এসেছিল। এর আগে যখন শুধুমাত্র আমার ফেটলেসনেস, ফিয়াস্কো ও কদ্দিস ফর এ্যান আনবর্ন চাইল্ড প্রকাশিত হয়েছিল, সে বলেছিল, আমি ট্রিলজির কৃতিত্ব ধারণ করেছি। সে আসলে আমার কাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না।

আপনি ‘দসিয়ের’-এ বলেছেন যে আপনার স্থান ইতিহাসে নয়, আপনার ডেস্কে।

আমি ডেস্কে খুব কমই লিখেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা না বলাই ভাল।

হ্যাঁ, ডেস্কের রং কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়।

তাহলে ঠিক আছে, আমার ডেস্ক হলুদাভ ছিল।

সে দিনগুলোতে আপনি কিভাবে লিখতেন?

এটি একটি কৌশলগত ব্যাপার কারণ আমি দীর্ঘসময় কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারতাম না। না আমি হাতে লিখতে পারতাম। কিন্তু আমি সব উপকরণই পেয়ে গিয়েছিলাম যা আমি আমার সারা জীবনভর সংগ্রহ করেছি আমার ডায়েরি, আমার রিপোর্টগুলো, লিকুইডেশন। যা কিছু করা ছিল, আমাকে তার বেশি কিছু নতুন করে লিখতে হয়নি। আমি আমার কাজ শেষ করেছি।

আপনার শেষ উপন্যাস ‘লিকুইডেশন’ সম্পর্কে বলুন। কোন্ জিনিসটি প্রাথমিকভাবে আপনাকে প্রেরণা দিয়েছিল?

আমি মূলত একটি নাটক লিখতে চেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, উপন্যাস তো লিখেছি। কিন্তু আমি ১৯৯০ সালের পরিবর্তিত শাসনামল সম্পর্কে লিখতে চেয়েছি। এই সময়টাকে আমার কাছে নাটকীয় হিসেবে অনুভূত হয়েছিল। তারপর এটা আমাকে এতই তাড়িত করে যে, আমি বিভ্রমে ছিলামÑ না আমি একজন নাট্যকার ছিলাম, না মঞ্চের ব্যাপারে আমার বিশেষ কোন আগ্রহবোধ ছিল। মঞ্চ আমার কাছে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা, একটা নির্মাণাধীন প্রতিকূলতা ছিল। এবং সেজন্য আমি নাটকের পা-ুলিপি তুলে রাখলাম এই উপলব্ধি করে যে, এটি একটি সেরা উপন্যাসের ছোট প্রতিকৃতি ছিল।

ফুকোয়ামার ‘এ্যান্ড অব দ্য হিস্টোরি’ সম্ভবত গতানুগতিক ধারার কিছু একটা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমি ভেবে পুলকিত হই ‘লিকুইডেশন’ লেখার সময় এ বিষয়টি আপনার মনে ছিল কি?

আমি এভাবে কখনও ভাবিনি।

আপনি হলে এ উপন্যাসটির ক্ষেত্রে কী করতেন?

আমার কাছে মনে হয় আপনার উপন্যাসটিতে ‘এ্যান্ড অব দ্য হিস্টোরি’র অনুরূপ কিছু একটা আছে। এটি লেখা হয়েছিল ২০০০ সালের প্রথম দিকের কোন এক সময়ে, কিন্তু তা ৯০’র কমিউনিজমের সময়কে ধরে রাখে, বিংশ শতকের ইতিহাসের জন্যে একটি মুহূর্ত যা বিভিন্ন সমকালীন বিষয়কে ধারণ করে ও নাড়া দেয় এবং একটি স্বচ্ছ সন্ধিক্ষণ বিনির্মাণ করে আর সম্ভবত তা লিকুইডেশন। আসলে আপনার কথা সম্পূর্ণই সঠিক। এটা অনেকটা সেরকমই। আমরা সে ব্যক্তিকে পেয়েছি যে আউশভিতজে জন্মগ্রহণ করেছে এবং তারপর জুডিথে, যে নারী তার মধ্যদিয়ে আউশভিতজ প্রত্যক্ষ করেছেন আর চেষ্টা করেছেন তার নিজের ইতিহাস সমাপ্ত করতে। তারপর তিনি পালিয়ে যান সে পৃথিবী থেকে এবং এমন একজনকে বিয়ে করেন স্বৈরতন্ত্র যাকে কখনও স্পর্শ করেনি। সে সন্তানের ইচ্ছা পোষণ করল আর এভাবেই জীবনের প্রতি আজ্ঞাবহ হলো। এটা ছিল একটি গোপনীয়তা, একটি ইঙ্গিত; সন্তান ধারণ করা চলমান জীবনের সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত। জীবন ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে জীবনকেই বেছে নেয়। ঠিক আছে, এ পর্যন্তই থাক। এটাই আমার শেষ সাক্ষাৎকার।