আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

একজন লেখক পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দিলে তিনি ফুরিয়ে যাবেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে


 

[আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আমেরিকান কথাসাহিত্যিক। ১৮৯৯ সালে আমেরিকার ইলিনয়ে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে কথাসাহিত্যে পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৫৪ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তাঁর হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে যা তাঁর অসংখ্য লেখায় ফুটে উঠে। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, দ্য সান অলসো রাইজেস, ফর হুম দ্য বেল টোলস তাঁর বিখ্যাত এবং বিশ্বজুড়ে বহুল পঠিত উপন্যাস। ছোটগল্পের বিনির্মাণেও তিনি অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এই কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক ১৯৬১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। প্যারিস রিভিউর এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে তাঁর লেখালেখির গল্প, কথাসাহিত্য নিয়ে তাঁর অভিমত এবং জানা-অজানা অনেক তথ্য। দ্য আর্ট অব ফিকশন নামে সাড়া জাগানো এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন জর্জ প্লিম্পটন। বাংলায় ভাষান্তর করেছেন মাইনুল ইসলাম মানিক।]

 

আপনি কখন লেখালেখি করেন? আপনি কি সময়সূচী কঠোরভাবে অনুসরণ করেন?

যখন কোনো বই বা গল্প নিয়ে কাজ করি, আমি প্রতিটি সূর্যোদয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব লিখতে বসি। এই সময়ে ব্যাঘাত ঘটানোর মতো কেউ থাকে না। তাছাড়া এই সময়টা শান্ত বা শীতল থাকে আর আপনি কাজ করতে করতে এক সময় উষ্ণ হয় উঠবেন। আপনি যা লিখেছেন তা পড়বেন এবং যখন আপনি অনুধাবন করবেন এরপর কী হতে যাচ্ছে, আপনি লেখা থামাবেন এবং সেখান থেকে চলে যাবেন। আপনি এমন একটি স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত লিখবেন যে আপনার কাছে তখনও কিছু নির্যাস থেকে যাবে। আপনি অবগত থাকবেন এরপর কী ঘটছে আর আপনি থামবেন এবং পরবর্তী দিন শুরু করার আগ পর্যন্ত প্রাণবন্ত থাকতে চেষ্টা করবেন। আপনি সকাল ছ’টায় শুরু করবেন এবং দুপুর পর্যন্ত বা তার পূর্বে যে কোনো সময় পর্যন্ত লিখবেন। আপনি যখন থামবেন তখন আপনি শূন্য, কিন্তু অনুভূতিটা এমন হবে যে, আপনি শূন্য নন, যেমনটা আপনি যাকে ভালোবাসেন, তাকে চাইলেই ভালোবাসতে পারলেন। কোনো কিছুই আপনাকে আঘাত দিতে পারে না, কোনো কিছুই ঘটতে পারে না যেই পর্যন্ত না আপনি পরবর্তী দিনের কাজ শুরু করবেন। পরবর্তী দিনে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কঠিন।

আগের দিনের রেখে যাওয়া লেখা পড়ে কি সংশোধন করেন? নাকি লেখা সম্পন্ন হলে সংশোধন করেন?

আমি প্রতিদিন যেখানে থামি, পরের দিনে সে পর্যন্ত সংশোধন করি। যখন সম্পূর্ণটা শেষ হয়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনাকে সেটা পড়তে হবে। যখন অন্য কেউ মুদ্রাক্ষর করবে আর আপনি তা স্পষ্ট মুদ্রাক্ষরে দেখতে পাবেন তখন আরেকবার সংশোধনের সুযোগ পাবেন। আর শেষ সুযোগ হচ্ছে প্রুফের সময়। এই ভিন্ন ভিন্ন সুযোগগুলোর জন্যে আপনাকে কৃতজ্ঞ থাকতে হবে।

আবেগের স্থায়িত্ব কি লেখালেখির ক্ষেত্রে অপরিহার্য? আপনি আমাকে একবার বলেছিলেন যে, আপনি প্রেমে পড়ার সময়ে সবচেয়ে ভালো লিখতে পারেন। এ বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

কী এক অদ্ভূত প্রশ্ন! কিন্তু চেষ্টার জন্যে পূর্ণ নাম্বার দেয়া যেতে পারে। যখন লোকজন আপনাকে একাকী থাকতে দেবে অথবা বিঘ্ন ঘটাবে না তখন আপনি সর্বদা লিখতে পারবেন। অথবা এ ব্যাপারে যদি আপনি খুব নির্দয় হতে পারেন তখনও। কিন্তু যখন আপনি প্রেমে পড়বেন, অবশ্যই তখন আপনার সেরা লেখাটি বের হয়ে আসবে। এ ব্যাপারটি আপনার ক্ষেত্রেও একই রকম হলে বরং আমি তা ব্যাখ্যা করতে চাই না।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কতটা জরুরী? ভালো লেখালেখির ক্ষেত্রে কি এটা কোনো প্রতিবন্ধকতা হতে পারে?

লেখালেখির সত্তাটি যদি খুব শুরুতেই চলে আসে আর আপনি যদি জীবন ও লেখালেখিকে সমানভাবে ভালোবাসতে পারেন তবে প্রলোভনকে সংযত করার মতো অনেক বৈশিষ্ট্যই আপনার মধ্যে চলে আসে। একবার যদি লেখালেখি আপনার বৃহৎ প্রবৃত্তি ও সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎস হয়ে উঠে তবে তা শুধুমাত্র মৃত্যুই থামাতে পারে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তখন আপনার জন্যে বড় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে যেহেতু এটা আপনাকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে। দুশ্চিন্তা লেখালেখির ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।

উঠতি লেখকদের জন্যে কোন্ বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

একজন তরুণ লেখকের উচিত ভ্রমণে বের হওয়া এবং নিজেকে সময় দেয়া। কেননা ভালো লেখালেখি করাটা তার কাছে অসম্ভব রকমের কঠিন মনে হবে। নিদেনপক্ষে, প্রলম্বিত সময়ের গল্পটা তার থাকবে যা দিয়ে সে শুরু করতে পারবে।

আপনি অন্যদের যা পড়ছেন তা দ্বারা ঐ সময়ের লেখনীতে প্রভাবিত হতেন বলে মনে হয়?

জয়েস কর্তৃক ইউলিসিস লেখার আগ পর্যন্ত এমনটা হয়নি। কিন্তু ঐ দিনগুলোতে আমাদের জানা যে সকল শব্দ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে উঠেছিল এবং একটা একক শব্দের জন্যেও আমাদের সংগ্রাম করতে হতো, জয়েসের কাজের প্রভাবে বদলে যেতো সে সব কিছু আমাদের। আমাদের পক্ষে সকল প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে সামনে আসা সম্ভব হতো।

শেষের বছরগুলোতে মনে হচ্ছে আপনি অন্য লেখকদের এড়িয়ে চলছেন। কেন?

এটা খুব জটিল বিষয়। আপনি লেখালেখিতে যতটা মগ্ন হবেন, ততটাই আপনি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বেন। আপনার পুরনো ভালো বন্ধুদের অনেকেই মারা যাবে, অনেকেই অন্যত্র চলে যাবে, আপনি খুব অল্প সময়ই তাদের কাছে পাবেন। কিন্তু আপনি যখন গভীর মগ্নতায় লিখবেন আপনার মনে হবে তাদের সঙ্গে আগের মতোই পুরনো দিনের কোনো কাফেতে আড্ডা দিচ্ছেন।

লেখালেখিতে আপনার অগ্রজ হিসেবে কাদের কথা বলবেন, যাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শিখেছেন?

মার্ক টোয়েন, ফ্লবার্ট, স্টেন্ডাল, বাক, তুর্গেনিভ, টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি, চেখভ, অ্যান্ড্রু মার্ভেল, জন ডান, মোঁপাসা, কিপলিং, থরো, শেক্সপিয়র, দান্তে, ভার্জিল, হেরোনিমাস, ব্রুঘেল, গয়া, ভ্যান গগ, সান জুয়ান ডি লা ক্রুজ, গঙ্গোরা — সবার কথা বলতে আমার একদিন চলে যাবে। আমি সবসময়ই পড়ি। পড়ার জন্যে আমি আমার কিছু সময় বরাদ্দ রাখি যাতে সেগুলো সবসময় আমাকে প্রণোদনা দেয়।

আপনার উপন্যাসে রূপকের ব্যবহার সম্পর্কে বলবেন? 

আমার ধারণা আমার লেখায় রূপকের ব্যবহার আছে, যেহেতু সমালোচকরা সেগুলো খুঁজে পাচ্ছেন। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি এসব নিয়ে কথা বলতে অপছন্দ করি। এটা অনুসন্ধিৎসুদের বঞ্চিত করে। যদি পাঁচ, ছয় বা তারও অধিক ভালো মানের ব্যাখ্যাকারী এই কাজটা করতে পারে তবে আমি কেনো তাদের বিঘ্ন ঘটাবো! আমি যা কিছু লিখি তার যতটুকু পড়বেন পড়ার আনন্দ নিয়ে পড়ুন। অধিক যতটুকু খুঁজে পাবেন তা দিয়ে আপনার পঠন মূল্যায়িত হবে।

গল্প লেখার সময়ে কি আপনি শিরোনাম নির্ধারণ করে থাকেন?

না, আমি লেখা শেষ করার পর নামের একটি তালিকা তৈরি করি। মাঝেমধ্যে এই সংখ্যাটি একশ’ও হয়ে উঠে। তারপর সেগুলো বাছাই শুরু করি এবং কখনো কখনো সবগুলোই বাদ দিয়ে দিই।

যখন আপনি লিখেন না, আপনি তখন একজন পর্যবেক্ষক হয়ে উঠেন, কিছু একটা খোঁজ করেন যা পরবর্তীতে ব্যবহার করা যেতে পারে?

নিশ্চয়ই। একজন লেখক পর্যবেক্ষণ বন্ধ করে দিলে তিনি ফুরিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি শুধু এর ব্যবহার কিভাবে করা যাবে তা ভেবেই পর্যবেক্ষণ করবেন না। একজন লেখক যদি কোনো কিছু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা না রেখে লিখেন তবে তাতে গলদ থেকে যাবে।

দ্য ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্য সি এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি হতে পারতো যদি প্রতিটি চরিত্র ও তাদের পারিপার্শ্বিকতা তুলে ধরতাম, যা অন্য লেখকরা প্রায়শ খুব চমৎকারভাবেই করে থাকেন। আমি ব্যতিক্রম কিছুই করতে চেয়েছি। প্রথমে আমি অপ্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ বাদ দিয়েছি, যাতে পাঠক যা পড়বেন তা তার জন্যে অভিজ্ঞতা হয়ে উঠে। এটা করা খুব কঠিন এবং এজন্যে আমাকে প্রাণান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে।

সবশেষে একটি মৌলিক প্রশ্ন, একজন সৃষ্টিশীল লেখক হিসেবে আপনার সৃষ্ট শিল্পের কার্যকারিতা কতটুকু বলে মনে করেন?

এসব নিয়ে বিহ্বল হও কেন? যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু বিরাজমান এবং যা কিছু তোমার জানা ও অজানা সবকিছু মিলিয়ে তোমার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সত্যের চেয়ে অধিকতর সত্য ও প্রাণবন্ত নতুন কিছু করতে পারো। এবং তুমি যদি তা করতে পারো তবে তুমি সেটিকে অমরত্ব দান করলে। আর তুমি শুধু এজন্যেই লিখবে, অন্য কোনো কারণ তোমাকে জানতে হবে না। কিন্তু অবশিষ্ট কারণগুলো কি সবারই জানা নয়?