হাসান আজিজুল হক

বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রটা এখন ইউরোপ থেকে সরে যাচ্ছে হাসান আজিজুল হক

[হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক। বিশ্বসাহিত্য নিয়ে এই প্রথম দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। পাঠাভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার মিশেলে আলো ফেলেছেন বিশ্বসাহিত্যের নানাপ্রান্তে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মোজাফফর হোসেন]।

স্যার, বিশ্বসাহিত্য তো একটা মহাসমুদ্র। মোটা দাগে আমরা হয়ত কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা করতে পারি। আলোচনা মানে একপেশে আলোচনা, আপনি বলবেন, আমি শুনবো। আমি জানি হেমিংওয়ে-তলস্তয়-দস্তয়েভস্কি-ফকনার-আচেবে আপনার প্রিয় কথাসাহিত্যিক। তারাসহ আরো অনেকের প্রসঙ্গে আমি জানতে চাইবো। কিন্তু শুরুটা করতে চাইদন কিহোতেদিয়ে। সার্ভেন্তেসের এই মাস্টারপিসটি আপনি প্রথম কবে পড়েন?

‘দন কিহোতে’ পড়েছি অনেক আগে, ছাত্র জীবনে। তাও সেটি সম্পূর্ণ ছিল না। সংক্ষিপ্তাকারে অনুবাদ করা। আমাদের স্কুলজীবনে বিখ্যাত বিখ্যাত সব উপন্যাসের কনসাইজ ভার্সন বের হত। আমি তখন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’—এইসব উপন্যাস পড়েছি। 

দন কিহোতেপ্রথমপাঠে আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

তখন তো এই গভীর বিদ্রূপগুলো বুঝতে পারিনি। সমাজকে, রাষ্ট্রকে অসম্ভব-রকমের বিদ্রূপ করা হয়েছে। তবে দারুণ লেগেছিল! খুউব ভালো; বুঝলে? পুরাদস্তুর বিষয়টি আমি তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু এত ভালো লেগেছিল যে সাঞ্চোর গল্প আর ভুলতে পারিনি। একটা বোকা মানুষ উইন্ড মিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, হুরদের মনে করছে রাজরানী, কুঁড়েঘরকে রাজপ্রাসাদ—এগুলো তো এমনি এমনি মনে করে নি! মধ্যযুগকে বিদ্রূপ করে একেবারে শেষ করে দিয়েছে। তখন তো গ্রামে গ্রামে জমিদার ছিল, নাইট ছিল, তারা সব লড়াই করত, এটাতে তো ইতিহাসের চমৎকার ব্যাপার আছেই।

সার্ভেন্তেস সম্ভবত জেলে বসে এটা লিখেছিলেন। প্রথম খণ্ডটা জেলে বসে লেখেন, দ্বিতীয়টা জেল থেকে বের হওয়ার বহুদিন পর লেখেন। তাও আবার একজন ধূর্ত লেখক তার নামে দ্বিতীয় খণ্ডটি বাজারে ছাড়লে, তিনি নিজে সেটি লিখলেন। এবং মজার ব্যাপার হল, দ্বিতীয় খণ্ডে সেই অসৎ লেখকের প্রসঙ্গটিও তুলতে ভুললেন না

হুম। আমার কাছে এখন যে ভার্সনটা আছে, সেটি পরিপূর্ণ। হাসান ফেরদৌস আমেরিকা থেকে এনে দিয়েছিল।     

রবিনসন ক্রসোএবংদ্য অ্যাডভেঞ্চার অব হাকলবেরি ফিনউপন্যাস দুটিকে আমরা যদি picaresque novel (a genre of fiction that depicts the adventures of a roguish hero of low social class who lives by his wits in a corrupt society) বলি। তাহলেদন কিহোতেকে তার উৎসমূল বলতে পারব কিনা? যদিও Lazarillo de Tormes-কে এই ফর্মের প্রথম উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সেটি তো আরদন কিহোতে মতো জনপ্রিয় বহুল পঠিত ছিল না

আমি তো বলবো, পুরো উপন্যাস সাহিত্যই এসেছে সার্ভেন্তেস থেকে। প্রকৃত উপন্যাস এখান থেকে শুরু হয়, এটা অনেকেরই কথা।যেমন ‘হ্যাকলবেরি ফিন’ সম্বন্ধে হেমিংওয়ে বলেছেন, ‘All modern American literature comes from one book by Mark Twain called Huckleberry Finn. American writing comes from that. There was nothing before. There has been nothing as good since.’ সমগ্র আমেরিকান সাহিত্যের উৎসভূমি হল ‘হাকলবেরি ফিন’ আর ‘টম সোয়ার’।

দন কিহোতে নির্মাণশৈলীর অনেকটা অনুসরণ করেছে পোস্টমডার্ন কথাসাহিত্য। ফাউলস্, বার্থলেম কিংবা প্রুস্তু পড়তে গিয়ে আমার কিন্তু তাই মনে হয়েছে। পোস্টমডার্ন উপন্যাসের যে প্রধান এলিমেন্টস (surfiction, metafiction, narrative within narrative, intertextuality, parody and pastiche) এগুলোদন কিহোতে’-তে আছে। আমার প্রশ্ন হল, ১৬০৫ সালে সার্ভেন্তেস যে কারিশমা দেখিয়ে গেছেন, সেটি নিয়ে এখননতুন কিছুআখ্যায়িত করে উত্তরাধুনিকতার  নামে এত হৈচৈ কেন?

আমি অর্থহীন মনে করি। Cixous যদি পড়ো। তারপর আরেকজন নারী ক্রিটিক আছেন, খুব সহজ করে লিখেছেন, বিশদ এবং প্রাঞ্জল করে লেখা পোস্টমডার্নিজম নিয়ে। নামটা মনে আসছে না এই মুহূর্তে। তাদের পড়লে বুঝবে। রোলা বার্থ, মিশেল ফুকো, দেরিদা, স্পিভাক এদের লেখা কেউ পড়ে কিনা জানি না। মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়ম চমস্কি বলেছেন যে, আমি দেরিদা পড়লাম, কিছু বুঝতে-টুজতে পারলাম না। এবং তাতে আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হল না! [হাঃ হাঃ]

তবে এখানে বলতে হবে, তোমরা পোস্টমর্ডানিজম হয়ে হৈচৈ করো তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই দার্শনিকদের তোমরা পড়েছ কিনা?   পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে পড়তে গেলে জা পল সাঁৎ পড়া ছাড়া গতি নেই। হাইদেগার পড়তে হবে, কিয়ের্কেগার্দ পড়তে হবে, এডমন্ড ফুসার পড়তে হবে। আলবেয়ার কামুকে পড়তে হবে। তার ‘দ্য প্লেগ’, ‘মিথ অব সিসিফাস’, ‘আউটসাইডার’ এগুলো শুধু পড়লে হবে না, পড়ে বুঝতেও হবে। আমাদের এখান থেকে পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে কথা বলতে হলে ইউরোপীয় সমাজের গঠনটাকে ধরতে হবে।

সমাজের গঠন থেকে চিন্তার গঠন নিরূপিত হয় কিনা, সেটা ভাবতে হবে। সেই সঙ্গে ওরা যে সময় লিখেছেন, সেই সময় ইউরোপিয়ান দেশগুলোর স্বাধীনতার অবস্থা কেমন ছিল, তারা মানুষকে ফ্রি থাকতে বলছে, কোনো সেন্টার থাকবে না, এই যে জিনিসগুলো, এগুলো কিন্তু একঅর্থে ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গলাচেপে ধরা রাষ্ট্রচিন্তার একটা চাল। যেমন বলা হচ্ছে, ইউ আর ফ্রি। যদি তুমি বলো, আই অ্যাম নট ফ্রি। তাহলে তোমার গলায় বন্দুক ধরে বলবে, ইউ মাস্ট বি ফ্রি! ইফ ইউ ডোন্ট ফিল দ্যাট ইউ আর ফ্রি, দেন ইউ উইল বি হ্যাংড্।[হাঃ হাঃ]

আমাদের বাস্তবতা আর ইউরোপিয়ান বাস্তবতা তো এক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ-প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত। এখানে কামুর মতো আমাদের অ্যাবসার্ডিজম বা কাফকা-জয়েসের মতো ইন্ডিভিজুয়ালিজম নিয়ে ভাবনার সময় কি আমাদের লেখকদের এসেছে? আমরা তো সবে সেই ভিক্টোরিয়ান যুগের মতো সমষ্টিগত সামাজিক মূল্যবোধের ভেতর থেকে বের হচ্ছি, নয় কী?

সেটা তুমি বলতে পারো। কিন্তু হাওয়া তো বয়বেই। পশ্চিমের হাওয়া পূবদিকেই আসবে। এটা ঠেকানো যাবে না। কিন্তু এটা ঠিক কথা যে, চিন্তার সূত্রপাত ঘটছে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, সমাজের মৌলিক কাঠামো এবং একটা বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে, তাই সেটি না বুঝলে এসব তত্ত্ব বোঝা যাবে না। পোস্টমর্ডানিজম নিয়ে আমেরিকা অতো মাথা ঘামায় না। ফরাসিরা লাফাচ্ছে বটে তবে আমার মনে হয় না, কোনো সাহিত্যিক এটাকে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে লিখছেন। ইংরেজদের ক্ষেত্রেও তাই। সেখানেও এটা নিয়ে খুব বেশি মাথা কেউ ঘামাচ্ছে না। উপন্যাসের ফর্ম তো নিয়ত বদলাচ্ছে, সেটি তো বদলাবেই, জীবন তো আর থেমে নেই।

যতক্ষণ পর্যন্ত ভূমিব্যবস্থা না বদলেছে ততদিন পর্যন্ত ধনবাদ দেখা দেয়নি। তারও আগে বিলেতে কর আন্দোলন হয়ে গেছে। কর আন্দোলন হল- বাইরে থেকে যদি কোনো গম আসে তাহলে দেশে গমের দাম পড়ে যায়। অতএব গম উৎপাদকরা বলছে বাইরে থেকে গম আসাটা নিষিদ্ধ করতে হবে। আর জনগণ বলছে, গম তো গমই, এখানে যে গম উৎপাদন হচ্ছে, আর বাইরে থেকে যে গম আসছে তার তো কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে বাইরের গম আসা বন্ধ হবে কেন? পার্লামেন্টে এ নিয়ে হৈচৈ হয়েছে। ‘কল ল’ বলে একটা আইনই তৈরি করতে হয়েছে। এইসব জিনিসগুলি লক্ষ রাখতে হবে।

খাঁটি বিজ্ঞানের সূত্রপাত শুরু হয়েছে ১৬শ শতকে, তখন দেকার্ত বলে একজন দার্শনিক জন্ম নিলেন। দেকার্ত মারা গেছেন ১৬৫০ সালে। দেকার্তের মূল চিন্তাটা গিয়ে পড়ল যে, যুগের যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, এখান থেকে আধুনিক দর্শন শুরু করতে হবে। দেকার্ত শেষপর্যন্ত গডকে মেশিনে পরিবর্তন করে দিয়েছে।মানে গড মেশিনের কাজ করে আর কিছু না। যে মুল সাবস্টেন্ট আছে তার দুটো অ্যাট্রিবিউট কোয়ালিটি আছে। একটা হল স্পিরিচুয়াল, অন্যটা মেটার। স্পিরিট আর মেটারের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই থাকে। এটা হল ডুয়েল রিয়েলিটি। এটা থেকে হল কী, বিজ্ঞানটা স্পিরিচুয়ালিটি থেকে মুক্ত হয়ে গেল। তাহলে মেশিন তৈরি করতে ঈশ্বরের প্রয়োজন পড়ছে না।

আমি বলতে চাচ্ছি, যে কোনো দর্শন বা তত্ত্বের সমাজ-সংলগ্নতা থাকে। কাজেই ইউরোপিয়ান সমাজ যেখানে দাঁড়িয়েছে, সেখানে উনবিংশ বা বিংশ শতকে এসে অনেককিছু বদলে গেছে। যেমন, পুঁজিটাকে অদৃশ্য করা হয়েছে। এটা আর দেখা যায় না, কোনোরকমের শাসকীয় উপস্থিতি ছাড়ায় সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারা যায়। এখন তো আর উপনিবেশ স্থাপনের যুগ নেই, সবাই স্বাধীন। কিন্তু তোমাকে এমন করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দেয়া হবে যে তুমি অলিখিত দাসে পরিণত হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ গোটা পৃথিবীতেই দাপটের সাথে উপস্থিত, তারা যেখানে যা ইচ্ছে করছে। সেই জন্যে বলছি, ইউরোপিয়ান-আমেরিকান সমাজে যে বাস্তবতা, সেই বাস্তবতা বাংলাদেশে ঠিক সেইরকম নয়। তাই সেখানকার তত্ত্বগাছ এখানে লাগিয়ে কিছু ফলবে না।

ওইদেশের ওকগাছ তুমি এখানে দেখাতে পারবে? এখানে তুমি যেখানে সেখানে বটগাছ দেখতে পাও, ওখানে পাবে? সুতরাং আমাদের লেখকরা সবকিছু জানুক, কিন্তু কেন্দ্র হোক বাংলাদেশ। তারা পোস্টমডার্ন উপন্যাস লেখার চেষ্টা কেন করবেন? মার্কেস কোনোদিন দাবি করেছেন যে, তিনি ম্যাজিক রিয়েলিজমের স্রষ্টা? ম্যাজিক রিয়েলিজম বলতে যাদের যাদের আমরা তালিকাভুক্ত করি, তারা কি কেউ একরকম করে লিখেছেন?

মোটেও না। এক লাতিন আমেরিকাতেই আলেহো কার্পেন্তিয়ের, হুয়ান রুলফো, মার্কেস তিনজনে তিনভাবে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি গ্রহণ করেছেন

দেখো, তাদের জন্য কোনো থিওরি বা ইজমের দরকার পড়েনি। সেজন্যে সৃজনশীল লেখকদের তত্ত্ব নিয়ে ওত পড়ে থাকলে চলবে না। এটা কেউ পরিকল্পিতভাবে করতে চাইলে সে দাঁড়াতে পারবে না।    

এখানে একটা বিষয় হল- প্রত্যেক দেশীয় বা মহাদেশীয় সাহিত্যের একটা স্বকীয় রূপ বা ক্যারেক্টার আছে। রাশিয়ার সঙ্গে জার্মান সাহিত্যের মিল নেই, ফ্রান্সের সঙ্গে  ইংল্যান্ডের মিল নেই। আবার আফ্রিকার সঙ্গে আমেরিকার মিল নেই। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যেরও একটা নিজস্ব চেহারা আছে। ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্যের কি ওইরকম একটা নির্দিষ্ট করে বলবার বা চিনবার মতো চরিত্র আছে?

ভারতবর্ষ হল ‘ওয়ান ইন মেনি’। সেজন্যে সামগ্রিকভাবে ভারতবর্ষকে ধরা যায় না, বুঝতে পেরেছ? কখনই তামিল আর বাংলা সাহিত্য এক হবে না।তামিল গদ্য হচ্ছে এক হাজার বছরের পুরনো। আমাদের গদ্যের বয়স দুশো বছরের একটু বেশি। কাজেই সেখানে সমুদ্রপাড়ের জেলেদের নিয়ে যে উপন্যাস সে উপন্যাস তো আমাদের সঙ্গে মিলবে না। যদি হরিশংকর জলদাস আপ্রাণ চেষ্টা করেন, তাও মিলবে না। আমি হরিশংকরের উপন্যাস পড়েছি, আবার উড়িয়ার একটা উপন্যাস পড়েছি। কারো সঙ্গে কারো মিলবে না। কাজেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঠাট্টা করে বলতেন, আমার পরিচয়, আমি আমার বাপের ছেলে। রবীন্দ্রনাথের কোনো ব্যাপার আমি মানিও না, জানিও না। আর বলতেন, কে কেমন লিখছে তুলনা করার দরকার নেই। সবাই নিজের নিজের পুকুরে সাঁতার কাটছে। 

মার্কেস যেমন  কলোম্বীয় সাহিত্যিক হয়েও বলেছেন যে, তার উপন্যাস পুরো লাতিন আমেরিকার উপন্যাস। ভারতীয় কোনো সাহিত্যিক তাহলে সেকথা বলতে পারবেন না?

মার্কেস তো ঠিকই বলেছেন। কারণ ওদের একটা লিংক আছে। তবে এখন লাতিন আমেরিকাও বিভিন্ন রকমের বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। ব্রাজিল বিশাল একটা দেশ। একদেশের ভেতরেই আমরা নানারকম বিষয়আশয় দেখছি। তাই এখন আর কোনো লেখকের পক্ষে গোটা মহাদেশের কথা বলা সম্ভব না। কখনো কখনো গোটা দেশের কথাই বলতে পারবে না। সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক পরিচয় আলাদা হলে সেটির সামগ্রিক প্রতিনিধিত্ব কোনো একজন লেখক করতে পারবেন না।   


উনবিংশ এবং বিংশ শতকে যে রিয়েলিস্ট ঔপন্যাসিকরা ছিলেন; যেমন ফিল্ডিং, টমাস হার্ডি, চার্লস ডিকেন্স, জর্জ এলিয়ট, এমিলি ব্রন্টে, স্টিফেন ক্রেন, ড্যানিয়েল ডিফো, পুশকিন, ফ্লবেয়ার, থ্যাকারে এমন আরো অনেকে। তাদের ভেতর কারা বেশি আপনাকে প্রভাবিত কিংবা মুগ্ধ করেছিল।  

কারো সঙ্গে তো কারো তুলনা করা যাবে না। তলস্তয়কে তুমি ধরো, তার ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা’ তো সবার ওপরেই আছে। ওই দেশেই (রাশিয়া) আবার জন্মগ্রহণ করেছেন দস্তয়েভস্কি। তার ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ও অতুলনীয়। এদের সঙ্গে কিন্তু ইংলিশ ঔপন্যাসিকদের তুলনা চলবে না। ডিকেন্স-হার্ডি, জর্জ এলিয়ট, থ্যাকারে, যাই বলো, তারা অনেক পিছিয়ে। কথাসাহিত্যে রাশিয়ান লেখকরা বড় জায়গা দখল করে আছেন। তাদের গদ্যসাহিত্যের তুলনা হয় না, কারো সাথেই হয় না।

আর সমগ্র ইংরেজ সাহিত্যের মূল শক্তি হল শেকসপিয়ার। নামডাক আরো অনেকের আছে কিন্তু খুব বড় সাহিত্যিক আমি খুব বেশি দেখছি না। আর বর্তমানে তো তাদের আরো দুর্দিন যাচ্ছে। অন্যদেশের লেখকরাই তো ভালো লিখছেন। সেখানে বসেই লিখছেন অনেকে। একটু ভাল করে খেয়াল করলে দেখবা, বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রটা এখন ইউরোপ থেকে সরে যাচ্ছে। 

ফরাসি সাহিত্য

ফরাসি সাহিত্যেরও তুলনা হয় না। ‘মাদাম বোভারি’র কোনো তুলনা হয়, বলো? ইন্টেলেকচুয়াল জায়গায় ফরাসিরা বিশ্বকে অনেক কিছু দিয়েছেন।

বালজাকও তো বেশ প্রভাবশালী লেখক

বালজাক অসাধারণ এক ঔপন্যাসিক। আমার খুবই প্রিয় লেখক। তার যে সিরিজটা আছে, La Comédie Humaine, সেটি একটি বিশাল কাজ। উনি মূলত বিবৃতিপ্রধান লেখক। কোনো খোঁড়াখুঁড়ি তুমি পাবে না। যাকে বলে আত্মার ভেতর শাবল চালানো, সেটা নেই। যা দেখেছেন তা লিখেছেন, খুব নির্দয় আর নির্মমভাবে।

এজন্যে বোধহয় উনাকে ইউরোপীয় সাহিত্যে রিয়েলিজমের প্রবক্তা বলা হয়। তবে উনি খুব সরল ন্যারেটিভের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যান। 

তা করলেও যে সমাজ ব্যবস্থার কথা উনি তুলে ধরেন, সেটা কিন্তু খুউব ভয়ানক। আমরা যে সমস্ত দেশ সম্পর্কে একটা স্বপ্নের মধ্যে থাকি, সে সমস্ত দেশে বাস করাটা যে কি ভয়ঙ্কর, এটা বালজাক পড়লে বোঝা যায়। একজন কন্যাকে কষ্ট করে বাবা মানুষ করেছে, কিন্তু সেই কন্যা বাবাকে দেখছে না। অনাহারে মরছে। এসব চিত্র আমরা বালজাকে পাই।    

আর হুগো

ভিক্টর হুগোও অসাধারণ লেখক। ‘লা মিজারেবল’ সম্পূর্ণটা এখানে কে পড়েছে জানি না। এটিও একটা মহৎ উপন্যাস।

আঁদ্রে জিঁদ

‘স্ট্রেইট ইজ দ্য গেইট’ পড়ে আমার মাথা খারাপ হওয়ার দশা হয়। খুউব ভালো। রবীন্দ্রনাথের কাজ অনুবাদ করেছিলেন জিঁদ।

ফরাসি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন। 

হ্যাঁ। তবে Remembrance of Things Past পড়ে আমি কিছু উদ্ধার করতে পারিনি।

এটা তো মার্শেল প্রুস্ত লেখা তিন খণ্ডের বিখ্যাত উপন্যাস

হ্যাঁ, খুউব বিখ্যাত। কিন্তু কে পড়ে কে জানে! [হা হা] ওর প্রকাশকরা নাকি বলেছিল যে, আপনার যদি চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাছে পৌঁছাতে দেড় পৃষ্ঠা খরচ হয়, তাহলে আমরা কি করে এই বই প্রকাশ করবো! তবে তিনিও অসাধারণ লেখক।

এমিল জোলা

কট্টর বাস্তববাদী লেখক তো, সেই জন্যে তখনকার দিনে শুচিবায়ুগ্রস্ত লোক যারা তারা ওর লেখা নিয়ে খুউব আপত্তি করত। আমার ভালোই লাগে, পরাবাস্তব লেখা লিখতেন। কিন্তু এমিল জোলার অসুবিধা হল, উনি পরাবাস্তবতার মধ্যে আটকে গেছেন। পরাবাস্তব কেন? মনুষ্য জগতটাকে আরো উদ্ভাসিত করার জন্যে তো। মানুষকে আরো পরিষ্কার করে সামনে আনার জন্যে তো। কিন্তু তাহলে একটি মাত্র ফ্যাকাল্টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তো হবে না!

উনাকে তো ন্যাচারালিজমের অগ্রগণ্য লেখক বলা হয়। 

এইজন্যেই আমি বলছি। তবে নট ব্যাড। আসলে ফরাসি লেখকদের কথা আলাদা।

সাঁৎ ফরাসি বলেই বোধহয়নসিয়া মতো উপন্যাস লিখতে পেরেছেন

ওটা আসলে ওর পার্ট অব ফিলসফি, বুঝলে? ফরাসিরা তো একধরনের দুঃখবাদী, তার মানে অস্তিত্ববাদী তো। অস্তিত্ববাদ দর্শনটাই হল কি যে—এই যে, সবসময় আংজাইটির ভেতর থাকতে হবে। আমি না জানি কি করি! সমগ্র মানব জগতের কাজ আমার ওপর নির্ভর করবে, আই মাস্ট বি ভেরি কেয়ারফুল। সব সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হবে : এটা হল বেসিক শর্ত অস্তিত্ববাদের। আমি চাই বা না চাই, আমি যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করছি, সেটি একসঙ্গে অনেকের জীবনে প্রভাব ফেলবে। সেটি আমার স্বাধীনতাকেই খর্বিত করবে। আমি তো সেটা চাই না। যাই হোক, এতে আমার মনে হয়, ইউরোপীয় সভ্যতার যে সচ্ছলতা, পূর্ণ বিকাশের ফলে মানুষের যে সংকটগুলো হয়, তারই একটা বহিঃপ্রকাশ। কথায় বলে না, আগে ক্ষুধা নিবারণ, তারপর কাম; তারপর নেশা ধরে ধনসম্পদ, তারপর এটাওটা। এখন সেটাকেই প্রধান করে তুললে তো হবে না। এর বিপরীত উদাহরণ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি এসব যতদূর পেরেছেন এড়িয়ে গেছেন।

ফরাসি ছোটগল্পকার মোপাসাঁ নিশ্চয় আপনার ভীষণ পছন্দের

মোপাসাঁর চাইতে চেখভ আমার প্রিয়। কারণ শেখভের মধ্যে অদ্ভুত ধরনের রসবোধ আছে। মোপাসাঁ একটু কাটকাট; তিনি গল্পগুলোতে গল্প রাখতে চেয়েছেন। এবং গল্পের শেষে একটা ধাক্কা দেয়ার প্রবণতা তার ছিল।

গল্পে দুই ধরনের সমাপ্তি আমরা দেখি। একটা ট্র্যাডিশনাল এন্ডিং, যেটা মোটামুটি প্রেডিকটেবল হয়। লেখক পাঠককে সঙ্গে নিয়েই -ধরনের সমাপ্তি টানেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ করেছেন। আপনি শেখভের কথা বললেন, তিনিও তাই করেছেন। আর একটা হল টুইস্ট এন্ডিং, যেটা গল্পের সমাপ্তিতে এসে একটা ধাক্কার মতো কাজ করে। হেনরি, মোপাসাঁ, রোয়ল্ড ডালের প্রায়ই গল্পেই এই সমাপ্তিটা আমরা পাই। আমার প্রশ্ন হলো, ভালো গল্পের জন্যে সমাপ্তিতে এসে পাঠকের জন্য চমক রাখা কতটা জরুরী

অবশ্যই অপরিহার্য বলে আমি মনে করি না। শেখভের গল্প থেকেই সেটা বুঝতে পারা যায়। যেমন, তার ‘দ্য ডার্লিং’ বলে গল্পটা। কিংবা ‘দ্য কিস’ বলে যে গল্পটা আছে। ‘কেরানির মৃত্যু’, কিংবা যে কোনো গল্পের কথা তুমি ধরতে পারো। ‘whip-crack’ কোনো এন্ডিং সেখানে নেই। আমেরিকার অন্য গল্পেও তেমন নেই। অ্যালান পো’র গল্পে অত তীব্র ধাক্কা নেই। যেমন The Fall of the House of Usher তেমন গল্প নয়। হেমিংওয়ের গল্পেও তো মোচড় নেই। ‘স্নোজ অব কিলিমাঞ্জারো’, ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য ব্রিজ’, ‘এ ক্লিন ওয়েল লাইটেড প্লেইস’, ‘হিলস দ্যাট লুক লাইক এলিফেন্ট’, এখানে কোনো টুইস্ট আছে, বলো?

না। বেশ ফ্লাট এন্ডিং। আমার তো মনে হয়, পরিকল্পিতভাবে গল্পে অপ্রত্যাশিত সমাপ্তি টানতে গেলে গল্পটা খুব হালকা হয়ে যায়। সিরিয়াসনেস নষ্ট হয়।  

হুম। আমি তো কখনো ওইভাবে চেষ্টা করিনি। কাজেই বলতে পারব না, সিরিয়াসনেস নষ্ট হয় কিনা।

স্যার, আপনার গল্প দিয়েই যদি বলি, আপনারশকুন’, ‘মা মেয়ের সংসার’, ‘আত্মজা একটি করবী গাছ মতো গল্পে যদি টুইস্ট এন্ডিং টানা যায়, তাহলে গল্পের মজাটা গল্পের ডেপথকে নষ্ট করে দেবে। পাঠক শেষের চমকটা নিয়ে ভাববে, কিন্তু আপনি যে ভয়াবহ সত্য উঠিয়ে আনলেন, সেটি চাপা পড়ে যাবে। এটা আমার মনে হয়েছে। 

তা তো বটেই। গল্প তো অল থ্রু মজা দেবে। গল্পটার অল থ্রু নিয়ে তুমি ভাববে, কেবল শেষটা নিয়ে ভাববে, তা তো হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ তো ওরকম গল্প লেখেননি। যেমন ধরো পোস্টমাস্টার, গুপ্তধন, ছুটি, মহামায়া, কাবুলিওয়ালা, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, একরাত্রি, ইচ্ছাপূরণ—এমন বিখ্যাত সব গল্প তিনি লিখেছেন। সত্যিই বিশ্ব সাহিত্যের স্ট্যান্ডার্ডে গল্প লিখেছেন তিনি। তিনি বাংলা গদ্যের শুরুতেই ‘মধ্যবর্তিনী’, ‘কঙ্কাল’, ‘সমাপ্তি’, ‘তিন কন্যার মতো’ গল্প লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় প্রথম ছোটগল্প লেখক এবং এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার।

তাকে তো আমরা শেখভ মানের বলতে পারি। 

হ্যাঁ, বলা যায়। তাকে আমাদের শেখভ বলা যায়।

জার্মান সাহিত্য নিয়ে আপনার কি মনে হয়

জার্মান কথাসাহিত্যও অনেক বড় কিন্তু আমার অতো ব্যাপক পড়া নেই। টমাস মান, মুসিল, গুন্টার গ্রাস কিছু পড়েছি।

আর মহাকবি গ্যেটে

গ্যেটে আমি পড়েছি অনেক পরে। ওটার অনুবাদ আমার হাতে বেশ দেরিতে এসে পৌঁছেছে। মুসলিম প্রাবন্ধিক ছিলেন, গ্যেটেকে নিয়ে লিখেছেন, নামটা ভুলে গেলাম—

কাজী আবদুল ওদুদ

হ্যাঁ, উনার ‘কবিগুরু গ্যেটে’ পড়ে তারপর আমি ‘ফাউস্ট’ পড়ি। 

কার অনুবাদে

আহমদ ছফার। ‘ফাউস্ট’ পড়েছ তুমি?

আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন কোথায় যেন পড়লাম, রবীন্দ্রনাথ গ্যেটে পড়ার জন্যে জার্মান ভাষা শিখেছিলেন। সত্যি কিনা জানি না। প্রথম গ্যেটের নাম শুনি। আমাদের মেহেরপুরের লাইব্রেরিতে বইটা একদিন চোখে পড়ল—‘গ্যেটের রচনাসমগ্র সম্ভবত সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ। কিছুদিন আগে ছফার অনুবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলাম, আমার কাছে সুধাংশুরঞ্জন বাবুকে আরামদায়ক মনে হল। সেই সময় ‘ফাউস্টকয়েকবার পড়ার চেষ্টা করলাম, কিছুই বুঝলাম না। তবেসাফারিংস অব ইয়ং ওয়ার্দারদারুণ লেগেছিল। বয়সে অমন প্রেমের গল্প পড়ার অনুভূতি অন্যরকম! পরে আর ফাউস্টে হাত দেয়ার সাহস পাইনি। 

রবীন্দ্রনাথের গ্যেটে পড়ার প্রসঙ্গ তুমি তুললে। আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ সবদিক থেকে সম্পূর্ণ ছিলেন। গ্যেটের ক্ষেত্রে আমার তেমনটি মনে হয়নি। তবে হয়ত তাকে সম্পূর্ণ বুঝিনি বলে এমনটি মনে হওয়া। আমি রবীন্দ্রনাথকে যে ভাবে বুঝবো, সেভাবে তো আর গ্যেটেকে বুঝব না। সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা (cultural barrier) বলে একটা কথা আছে।     

হারমান হেস, হের্টা মুলার, ব্রের্টল্ট ব্রেশট, এরিখ মারিয়া রেমার্ক

হ্যাঁ, এদেরও পড়েছি। বিশেষ করে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ তো ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’র মতোই মহৎ উপন্যাস। এটিরও কোনো তুলনা হয় না। হারমান হেসও বড় মাপের লেখক। তিনি তো খুব বেশি লেখেন নি।  তার ‘সিদ্ধার্থ’ পড়েছি, ভালো লেগেছে। ব্রেশট নাট্যসাহিত্যে অসাধারণ পণ্ডিতজন। 

কাফকা? তিনিও তো জার্মান ভাষায় লিখেছেন। তাকে শেকসপিয়ারের পর পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক বলে মনে করা হয়। পর্যন্ত নোবেল বিজয়ী ১০৯ জন লেখকের মধ্যে ৩২ জনই তাদের লেখায় কাফকার সরাসরি প্রভাব আছে বলে স্বীকার করেছেন। 

দেখো এভাবে চিহ্নিত করে অমুকের পর অমুক বলাটা আমি ঠিক মনে করি না। কে নির্ধারণ করে দেবে যে, শেকসপিয়ারের পর কাফকা? কাফকা দ্বারা প্রভাবিত অনেক লেখক আছেন সত্যি। কিন্তু তারা যেটা লিখেছেন, সেটা অন্য জিনিস। কাফকা নিজেও তো অনেকের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কাফকার ‘দ্য ক্যাসল’, ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘মেটামরফোসিস’, ছোটগল্পগুলো—সবকিছুই অসাধারণ। কিন্তু কাফকাই যে শ্রেষ্ঠ কিংবা প্রভাবশালী সেকথা আমি বলতে পারবো না। 

ইউরোপের সাহিত্য নিয়ে কথা হচ্ছিল। বর্তমানে ইউরোপীয় সাহিত্যে বড় ভূমিকা রাখছেন প্রবাসী লেখকরা। রুশদি, নাইপল, ঝুম্পা লাহিড়ি, অরুন্ধতী, স্পিভাক, কেতকী কুশারী ডাইসন, আচেবে, বেন ওক্রি, খালেদ হোসাইনি, চিমামান্দা আদিচির মতো অনেক নন-ইউরোপিয়ান বা নন-আমেরিকান লেখক ইউরোপ বা আমেরিকায় বসে লিখছেন। এখানে একটা বিতর্ক শক্তভাবে চলমান: যারা অধিবাস থেকে জন্মভূমি নিয়ে লেখেন তাদের লেখায় দেশের ইতিহাস সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের বিকৃতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা থাকে বলে  অভিযোগ আছে। রুশদি অবশ্য বলছেন, দূর থেকেই প্রকৃত সত্য লেখা সম্ভব। কারণ তখন প্রভাবিত হওয়ার কিছু থাকে না, আবেগশূন্যভাবে লেখা যায়। আপনার কি মনে হয়? আপনি নিজেও যখন রাজশাহী বসে আপনার জন্মস্থান যবগ্রামের (পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার একটি গ্রাম) কথা লিখছেন সেক্ষেত্রে আপনার কি মনে হয়েছে?  

[কিছুটা সময় নীরব থেকে] আমার মনে হয়, কিছু তো ফাঁক থাকে। ‘মিড নাইট চিলড্রেন’-এ ভারতের ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে কি হচ্ছে না, সেটা নির্ণয় করার আগে ইতিহাস কী সেটাই তো বলতে পারল না কেউ। ইতিহাস কি, এই প্রশ্নের যুতসই উত্তর না পেলে তো মোটা দাগে কিছু বলা যাবে না। রুশদিরা ভারতের বাইরে বসে ভারত নিয়ে লিখছেন, তার লেখাকে ভারতের ইতিহাস হিসেবে ভাবারও কোনো দরকার নেই। ভারতে বসেও অনেকে ইংরেজিতে লিখছেন। তাতে বোঝা যায়, সাহিত্য আর ইউরোপ-কেন্দ্রিক থাকছে না। শিফট করে লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকার দিকে কিছুটা চলে গেছে। 

আপনি মার্কেসকে নিয়ে লেখা মহাদেশের কথক গদ্যে বলেছেন, ইউরোপে উপন্যাস এখন মৃত, সেটি নতুনভাবে ফিরে আসছে লাতিন আমেরিকায়।

সেটা বলেছি। সেটা আফ্রিকার ক্ষেত্রেও আমি বলব। আচেবের মতো সাহিত্যিক এখন ইংল্যান্ডে নেই।

আচেবের প্রসঙ্গ ধরে প্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন করি। আচেবে বলেছেন যে, তিনি উপন্যাস লিখছেন কারণ তিনি ইতিহাসবিদ হতে চেয়েছেন। তিনি তার জাতির জন্য ইতিহাস লেখার জন্য লিখছেন। একইভাবে টনি মরিসন, জেএম কোয়েৎজি, নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, বেন ওক্রি, আমোস তুতুওলাসকলে আসলে নিজের গোষ্ঠীর মুখপাত্র হয়ে কলম ধরেছেন। এক্ষেত্রে একই ধরনের অনুভূতি কি আপনার ভেতর কখনো কাজ করেছে

হ্যাঁ, ইতিহাস আমার উপন্যাসে আছে, গল্পে আছে। তবে ওরা যেভাবে একটা স্কিম নিয়েছে, সেভাবে আমি কিছু করিনি। সেই স্কিম নিয়ে লিখতে হলে আমাকে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস সামনে আনতে হবে। সেটি বিশাল ব্যাপার। এমনকি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার খবর জানতে গেলেই প্রাণ বেরিয়ে যাবে। এখানে ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাপক বিস্তার নিয়ে লেখা খুব সহজ হবে না।

আমি আসলে সরাসরি ঐতিহাসিক ঘটনার পুনর্বয়ানের বিষয়টির কথা বলছি না। বলতে চাচ্ছি, সমাজ বাস্তবতার প্রতি সত্যনিষ্ঠ থেকেই গল্পটা ফাঁদা। যেমন, ‘থিংস ফল অ্যাপার্টকিন্তু ইগবু জাতির প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক অবস্থান তুলে ধরছে না। তুলে ধরছে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। যেটা আপনার লেখায়ও আছে। 

সে তো ‘আগুনপাখি’তে এসেছেই। দেশভাগ এসেছে, সমসাময়িক রাজনীতি এসেছে। কিন্তু সেগুলো তো এক মূর্খ মহিলার দিক থেকে দেখানো। তাই সেখানে বাহাদুরি দেখানো হয়নি। তাকে দিয়ে তো আমি নেহেরু-গান্ধীর সমাজতত্ত্ব আনতে পারি না। চরিত্র তার খণ্ডিত জীবনের কথা বলেছে। এরমধ্যে একধরনের ইতিহাস তো আছেই।

আপনার লেখায় মুক্তিযুদ্ধ-ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ আছে। দেশভাগের বিষয় এসেছে। এগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতা। অন্যদিকে শকুনের মতো গল্পে সামাজিক বাস্তবতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সেটিও তো একধরনের ইতিহাসের বয়ান

তা তো বটেই। আমি তো সময়ের কৃতদাস, কাজেই তা তো হবেই। আমি হলাম কি যে পায়ের নখ থেকে আপাদমস্তক বাস্তববাদী লোক। আমি কোনো আবেগে গলাটাকে কাঁদতে দিই না।

কেউ যদি তার ঐতিহাসিক-সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে লিখতে চান। সেটা কি সম্ভব? আগামী নিয়ে কি লেখা যায়?  

সম্ভব। তাহলে সেটি ইউটোপিয়ান কাজ হবে। ইউটোপিয়ান সাহিত্য বলে তো একসময় একটা সাহিত্যপ্রবণতা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেখানেও তো সমাজ বাস্তবতা থাকে? সমাজের ডেস্টোপিয়ান অবস্থার রিভার্সে গিয়েই না ইউটোপিয়ান উপন্যাস লেখা সম্ভব

হ্যাঁ। সব ভালো কিছু কল্পনা করে নিচ্ছে আর কি। যেমন পুরোপুরি যেদিন কম্যুনিজম আসবে, সেদিন কোনো পুলিশ প্রশাসন রাখার দরকার হবে না। কারণ কোনো অপরাধই সংগঠিত হবে না। এটা একটা ইউটোপিয়ান ধারণা। কোনদিনই বাস্তব হয়ে ফলবে না। অন্তত আমি আপাদমস্তক বাস্তববাদী মানুষ ওসব স্বপ্ন দেখতে চাই না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছুকাল পরেই ইউরোপে আঘাত হানল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই দুই যুদ্ধে যতটা না অর্থনৈতিক ক্ষতি হল কিংবা প্রাণহানি ঘটল তারচেয়েও বেশি পরিবর্তন সাধিত হল মানুষের চেতনায়। সাহিত্যে কয়েকটা নতুন মুখ গজালো। সাহিত্য সমাজমুখী গন্তব্য থেকে বাঁক বদল করে ব্যাক্তিমুখী হল। এখানে আমরা জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফদের মতো লেখকদের পেলাম। তারা মানুষের অবচেতনকে চেতনার স্থানে উঠিয়ে আনতে চাইলেন। অন্যদিকে পেলাম হেমিংওয়ের মতো স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড সাহিত্যিক, যিনি যুদ্ধোত্তর সময়ে একটা আপাত অর্থহীনতা (নাথিংনেস) উঠিয়ে আনলেন। কামুও হেমিংওয়ের মতো সাংবাদিক ছিলেন। তিনিও একঅর্থে বিশ্বযুদ্ধের প্রোডাক্ট। হেমিংওয়ের চেয়ে আরো নীরব ঘাতক তিনি। এখানে দুটো প্রশ্ন আমি করবো। জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফ প্রসঙ্গে আসার আগে হেমিংওয়ে  কামু সম্পর্কে জানতে চাইবো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ১৯১৮ সালে। হেমিংওয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিখছেন। কামু লিখছেন আরো পরে। কামুর লেখায় বিশ্বযুদ্ধ তীব্রভাবে ছাপ ফেলেনি। একটা ইমপ্যাক্ট ছিল সেখানে। যুদ্ধাক্রান্ত ইউরোপের যে সামগ্রিক বিনষ্ট জগত, সেটি এসেছে হেমিংওয়ের লেখায়। তবে যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের কথা বলতে হলে বলতে হবে এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ উপন্যাসের কথা। মেট্রিক পরীক্ষার আগে এই উপন্যাসটি পড়ি। এটি এখন পর্যন্ত আমার স্মৃতিতে পরিষ্কার হয়ে আছে।

কার অনুবাদে?

মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। মোহনলালের দাদু (মাতামহ) ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারী সুন্দর বাংলা। মোহনলালের গদ্য পড়ে দেখো। পাবে কিনা জানি না। বাংলাদেশ তো হতচ্ছাড়া, কোনো ক্লাসিক ছাপবে না। ঢাকাতে এসব বইয়ের ভালো অনুবাদ নেই। হেমিংওয়ের একটা অনুবাদ হয়েছিল পার্ল প্রকাশনী থেকে। পরে আর কোনো খবর নেই। আবুল মোমেনের বাবা প্রাবন্ধিক আবুল ফজল হেমিংওয়ের For Whom The Bell Tolls অনুবাদ করেছিলেন। আবুল ফজল প্রগ্রেসিভ চিন্তাধারার লোক। কিন্তু গদ্যটা জুতের না। স্টেইনবেকের কিছু বাংলা হয়েছিল। না; ফকনার বোধহয় হয়নি।   

হেমিংওয়ের তার সমসাময়িকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; সেটি ভাষা, ডায়লগ, বিষয়বস্তু, নির্মাণশৈলীসবদিক থেকেই। আপনার কাছে বিউটি অব হেমিংওয়ে বা এক্সিলেন্স অব হেমিংওয়ে কি

ওভারঅল দৃষ্টিভঙ্গি না। হেমিংওয়ের ডায়লগ খুব শার্প বটে। ডায়লগের সংক্ষিপ্ততা, দৃঢ়তা, সেটিই আমার বেশি ভালো লাগে। আর মাঝে মাঝে খুব ব্যঞ্জনাময় বাক্য থাকে। বর্ণনাগুলোও মারাত্মক। ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ খুব ভালো লেগেছে আমার। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ও ভালো। যুদ্ধের পরে প্যারিসে কিছু বুদ্ধিবর্গ এবং সাহিত্যিক একত্রিত হয়েছিলেন। তারা বিনষ্টটা লক্ষ করেছিলেন। ঐ সময় সাহিত্যের কিছু তত্ত্ব আসে। তখনই বিনষ্টির ধারনাটা জন্ম নেয়।

লস্ট জেনারেশন?

হ্যাঁ, Gertrude Stein যেটা বলেছিলেন, ইউ আর এ লস্ট জেনারেশন। তখন সবাই প্যারিসে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

আমার কাছে হেমিংওয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয় এই কারণে যে, সেখানে চরিত্ররা বেঁচে থাকার অর্থ পাচ্ছে না। অনর্থক বড়শি হাতে বসে থাকছে, কিংবা স্পেনে চলে যাচ্ছে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে, পানশালায় যতক্ষণ খোলা ততক্ষণ পান করে রাত্রি পার করছে, প্রেমিক-প্রেমিকা সমুদ্রের পাশে বসে মিনিংলেস সব কথা বলছে, বেড়াতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী যে যার মতো সময় পার করছে। চরিত্ররা কেউ কাউকে কানেক্ট করতে পারছে না।  

হুম। কারণ হেমিংওয়ে ইউরোপের বিনষ্টিটা দেখেছিলেন। তার উপন্যাসের মধ্যেই আছে, তারা যখন একশহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে শহর ফাকা পড়ে আছে। বাড়ির দেয়ালগুলো সব ফুটো ফুটো হয়ে পড়ে আছে। শরতে গাছের পাতাগুলো ঝরছে। ঠাণ্ডায় মরা পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। নিক অ্যাডামস চরিত্রকে নিয়ে যে গল্পগুলো আছে, সেগুলো পড়লে বুঝতে পারবে। ছোট ছোট কাহিনি। নিকের বাবা একজন ডাক্তার, সবজায়গায় তাকে কাজ করতে হয়। ব্রোথেলে গিয়েছে, নিগ্রোপল্লীতে গিয়েছে। নিগ্রোপল্লীতে এক মেয়ের প্রসববেদনা উঠেছে কিন্তু প্রসব করতে পারছে না। থাকার একটাই ঘর। ঘরের কোণায় একটা বাঙ্কারের ওপর মেয়েটির স্বামী শুয়ে আছে। সেও সহ্য করতে পারছে না স্ত্রীর এই যন্ত্রণা। আনেসথেসিয়া নেই। অজ্ঞান না করেই নিকের বাবা মেয়েটির পেট কাটছে। সেকি চিৎকার আর যন্ত্রণা! সন্তান যখন হয়ে গেল তখন, ডাক্তার ‘ইউ হ্যাভ এ বেবি বয়’ বলতে গিয়ে দেখল যে, মেয়েটির স্বামী স্ত্রীর কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের হাতের ব্লেড দিয়ে নিজের গলা কেটে মরে পড়ে আছে। এসব চিত্র তুমি নিক অ্যাডামসে পাবে।

নিক অ্যাডামস সিরিজে হেমিংওয়ে প্রায় ২৪টি গল্প লিখেছেন। কিন্তু হাতে গোণা কয়েকটি আমার পড়া।

হ্যাঁ, অনেক আছে। দারুণ বর্ণনা সব। পড়ে দেখো।

একটা বিষয় স্যার, হেমিংওয়ে যখন ছোটগল্প লিখছেন, তখন ইউরোপের ছোটগল্পের একটা মজবুত ভিত তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু হেমিংওয়ে কোনো পূর্বসূরিকে তো অনুসরণ করেননি।

তা ঠিক। হেমিংওয়ে নতুন একটা স্টাইল নিয়ে এসেছেন। এটা একেবারে তার গড়া। পরে হেমিংওয়েকেই অনুসরণ করেছেন অনেকে। অপূর্ব স্টাইল। ইমেজও ভারি চমৎকার। পুরুষরা ইমপোটেন্ট হয়ে যাচ্ছে। আর মহিলারা তাদের চুল ছোট করে ফেলছে। তাদের নারীত্বকে আর টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। মানে পৃথিবী আর বাড়বে না।

এখানে কামুর প্রসঙ্গও আসতে পারে। যুদ্ধোত্তর ইউরোপে মানুষের যে ডিটাচমেন্ট বা এলিনেশন, সেটি নিয়ে তো তিনি লিখেছেন?

সেও তো রেজিস্টারে ছিল। তখন তো আলজেরিয়াও স্বাধীনতা চেয়েছিল ফ্রান্সের হাত থেকে। যুদ্ধকে সেও দেখেছে। যে কারণে তার ভেতর থেকে ওরকম ভয়াবহ চিন্তা বের হয়ে আসতে পেরেছে। ‘আউটসাইডার’, ‘দ্য প্লেগ’র মতো উপন্যাস লিখতে পেরেছে। তারপর ‘দি ফল’। এগুলো সরাসরি যুদ্ধ নিয়ে নয়, তবে প্রভাবিত তো বটেই। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দেখে যাননি জেমস জয়েস এবং ভার্জিনিয়া উলফ। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। তাদের দৃষ্টিতে তো আমরা আবার অন্যরকম ইউরোপ পেলাম?

আমার মনে হয় তারা তাদের সময়ের যে বীভৎস দুনিয়া, নষ্ট-ছত্রভঙ্গ সমাজ, সেটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছিল। এ কারণে সালভাদর দালির মতো পরাবাস্তববাদীদের উত্থান ঘটে। জয়েসও চেতনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে একটা বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করেছেন।

তাহলে কি এটাকে আমরা একধরনের স্কেপিজম বলব?

স্কেপ নয়। এটা সময়ের যে ভয়াবহতা তারই একধরনের প্রকাশ। দুটো বিশ্বযুদ্ধের ব্যবধান তো খুব বেশি নয়। বলতে গেলে গোটাটা মিলে একটি বিশ্বযুদ্ধই। কাজেই তারা পৃথিবীর খুব দুর্দশা দেখে গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান দেখে গেছেন। ওদিকে হিটলারের আগমন ঘটছে। সবদিক থেকেই তো ডিপ্রেশন ছিল। সে জন্যে এদের লেখার মধ্যে অন্তর্মুখী ব্যাপারটা এসে গেছে। আর উলফের কথা বলছ, তিনিও তো ডিপ্রেশনে ভুগেছেন। হেমিংওয়ের মতো তিনিও আত্মহত্যা করেছেন। তারপর সিলভিয়া প্লাথ, আনা সেক্সটনও আত্মহত্যা করেছেন।

স্যার, হুয়ান রুলফো আপনার কেমন লাগে? তার একটা গল্প অনুবাদ করেছিলাম, উত্তরাধিকারে প্রকাশিত হয়েছে।

কোন গল্পটা বলো তো?

ওরা আমাদের জমি দিয়েছিল

ওটা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদ করেছেন। উনি হুয়ান রুলফো কথাসমগ্র অনুবাদ করেছেন। রুলফোর একটা গল্প আছে, ‘কোনো কুকুর ডাকে না’, খুবই সাংঘাতিক! এইটা আমার সবচেয়ে ভাল লাগে। ছেলেকে কাঁধে করে নিয়ে যায় বাবা, কাঁধে কেটে বসে যায়..। পুরো রাস্তায় তার সঙ্গে কথা বলে, আশ্বাস দেয়। শেষে তো  মারায় যায়। তারপর ছেলেকে তো কাঁধ থেকে নামানো যায় না, পা দুটো শক্ত করে আটকে গেছে। তারপর নামিয়ে দেয়ার পরে, কুকুর আর ডাকে না! তারপর ‘ভোরবেলায়’ গল্পটা সাংঘাতিক।

একজনকে খুনের অপরাধে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সে মনে করতে পারছে না সত্যি সত্যি খুন করেছে কিনা। সকলে বলছে বলে নাও করতে পারছে না।

হুম। খুবই সাংঘাতিক বিষয়। রুলফোর সবগল্পই ভালো। গল্প তো বেশি লেখেননি। একটি মাত্র গল্পগ্রন্থ, আর অন্যান্য কাজ করেছেন।

পেদ্রো পারামোউপন্যাসটি আছে।

এটা তো ছোট, উপন্যাস বলা যায় কি জানি না। ছোট তবে দারুণ। বাড়ি যখন গেল, সব মরে ভূত হয়ে আছে। মৃতদের গ্রামে সে তার অতীত খুঁজছে। অসামান্য লেখা।

মার্কেস তো বলেছিলেন, রুলফোর এটা থেকেই তিনিওয়ান হ্যান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউডলেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

সেই। তা তিনি বলতে পারেন। অনেকে এটা থেকে লেখার রসদ পেয়েছেন।

স্যার, কাফকা-সাহিত্যে তো প্রধানতম বিষয় হল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ভেতর ব্যক্তির অস্তিত্ব। যেখানে রাষ্ট্র একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ব্যক্তি তার অজান্তে ফাঁদে পড়ার মতো করে সেখানে পা ফেলে প্রমাণ করছে তার ওপর আরোপিত বাস্তবতাটা মিথ্যে ছিল না। সে তখন নিয়তি হিসেবে সেটিকে মেনে নিচ্ছে। কাফকার সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সূত্রপাত ঘটে, পুঁজিবাদ সবে আসছে, কর্পোরেট-মিডিয়া শক্তি তখনো আসেনি। তবে কাফকা পড়তে গেলে মনে হয় তিনি যেন বিংশ শতকটা জেনে লিখেছেন। আমার প্রশ্ন হল: বিংশ শতকে রাষ্ট্রশক্তি, কর্পোরেট শক্তি মিডিয়া শক্তি এত তীব্রভাবে আমাদের বেঁধে ফেলেছে, অথচ এই নিয়ে জ্বালাময়ী কোনো উপন্যাস পাচ্ছি না কেনবর্তমান ব্যক্তির সংকট নিয়ে কেউ কি তেমন করে লিখতে পারছেন?
এখানে আমি বাংলাদেশের প্রসঙ্গটাও টেনে নিচ্ছি। বাংলাদেশেও আমাদের যে নাগরিক সংকট। তিন শক্তির ফলে আরোপিত যে বাস্তবতা, সেটি  নিয়ে লিখতে পারছেন কেউ? আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর কোন উপন্যাসটা আজকের প্রতিনিধিত্ব করবে?

প্রতিটা লেখকের উচিত তার নিজের বাস্তবতা নিয়ে লেখা, নিজের দেখা জগত নিয়ে লেখা। দেখো আমি যা লিখেছি সবই আমার দেখা বাস্তবতা। ঢাকায় আমি থাকি নি। যেভাবে ঢাকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ তাতে আমি খুব বড় করে নাগরিক সমস্যা নিয়ে উপন্যাস লিখতে পারবো না। তাতে দুয়েকটি গল্প লেখা সম্ভব; আমি লিখেছি। যারা দীর্ঘদিন ঢাকায় আছেন, ঢাকার পরিবর্তনটা চোখের সামনে ঘটেছে, তাদের উচিত এই সময়ে নাগরিক সমস্যা নিয়ে লেখা। এটা তো ঠিক যে, বাংলাদেশের ভালো সাহিত্য মানেই গ্রামনির্ভর সাহিত্য। মানিক-বিভূতি-তারাশঙ্কর তিন বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার ভাবে গ্রাম ও প্রান্তিক জীবন নিয়ে লিখেছেন। তারা অসম্ভব ভালো লিখেছেন, বুঝেছ? তারা তাদের সময় নিয়ে লিখেছেন বলেই সেটি দাঁড়িয়ে গেছে। আজকের লেখকদের দাঁড়াতে হলে তাদের সময় নিয়ে লিখতে হবে।  

তরুণরা আজ নাগরিক জীবনে বসে মঙ্গা নিয়ে গল্প লেখেন, মহাজন নিয়ে গল্প লেখেন। আমি নিজে কয়েকজনের গল্পে দেখেছি। কেউ কেউ ইতিহাস পড়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছেন। আপনি নিজেও দুটি উপন্যাস লিখেছেন অতীত-প্লট থেকে। এটা কি লেখকের একধরনের স্কেপিজম নয়?

আমার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেটি স্কেপ নয়, বুঝেছ? আমি যেটা লিখেছি, সেটা না লিখলেই স্কেপিজম হত। কিন্তু তোমাদের যারা মঙ্গা নিয়ে লিখছে, মহাজন নিয়ে লিখছে, তারা কেন লিখছে আমি বুঝছি না। সময় তো অনেক এগিয়েছে, তরুণরা তাদের সময় নিয়ে লেখুক। আমিও তো সেটা চাই। তুমি একটা উপন্যাসের নাম বলতে পারবে, যেটা এই সময় নিয়ে দুর্দান্ত উপন্যাস হয়েছে? পারবে না তো! তবে আমি আশাবাদী। ভীষণ আশাবাদী, কেউ না কেউ আসবেই।

আপনার এই কথা থেকে আমার ফকনারের কথা মনে পড়ে গেল। ফকনার তার এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘যদি লেখক হিসেবে আমার অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে অন্য কেউ আমার লেখাগুলো লিখতেন। হেমিংওয়ে-দস্তয়েভস্কিসবার ক্ষেত্রেই আমি একই কথা বলব। শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ নন, শিল্পকর্ম গুরুত্বপূর্ণ; যেহেতু নতুন করে আর কিছু বলবার নেই। শেকসপিয়ার, বালজাক, হোমার সকলে প্রায়ই এক বিষয়েই লিখেছেন। এবং তারা যদি আরো হাজার বছর বেঁচে থাকতেন, তাহলে প্রকাশকদের বই প্রকাশের জন্য নতুন লেখকের দরকার হত না।

ঠিকই বলেছো। তবে কি জানো, প্রত্যেক লেখক তো তার সময়কে নিয়ে লেখে, সেই কারণে সবার আলাদা গুরুত্ব আছে। হোমার সারাজীবন লিখলে তো আর তিনি আচেবের লেখাটা লিখতে পারতেন না। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক লেখককে তার জাতির গল্পটা জানতে হয়েছে, তার সময়কে ধরতে হবে। সেইভাবেই তো সাহিত্যের পরম্পরাটা রক্ষিত হয়।