অ্যালিস ওয়াকার

আমি নিজেকে মানবতার প্রতি সমর্পিত মনে করি অ্যালিস ওয়াকার


 

[অ্যালিস ওয়াকার । জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪। মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক এবং নারীবাদী। তিনি ফেমিনিস্ট শব্দের বদলে উইম্যানিস্ট শব্দটি বেশি পছন্দ করেন। প্রশংসিত উপন্যাস ‘দ্য কালার পার্পল রচনার জন্য ১৯৮৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এই উপন্যাস থেকে পরবর্তীকালে স্টিভেন স্পিলবার্গ সিনেমা বানিয়েছেন। আর প্রতিভা পারমার অ্যালিস ওয়াকারকে নিয়ে বানান বিউটি ইন ট্রুথ নামে একটা সিনেমা। এই সাক্ষাৎকারটি দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার জন্য নিয়েছিলেন অ্যালেক্স ক্লার্ক। আর প্রকাশ হয়েছিলো ৯ মার্চ ২০১৩ তে। সাক্ষাৎকারটি কথাবলির জন্য ভাষান্তর করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি।]

 

প্রতিভা পারমারের সিনেমো ‘বিউটি ইন ট্রুথ,’ যা আপনার জীবন ও কর্ম নিয়ে তৈরী, তা একটা মনোমুগ্ধর দৃশ্যকল্প তৈরী করেছে : আপনি অনেক কিছু অনেক স্থানে অনেক মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন । এ ব্যপার টা আপনার মধ্যে কেমন অনুভূতি জাগায়?

আমি এখনো একই সঙ্গে ৫ টা জীবনযাপন করছি, সত্যি বলতে কি আমি এতে নিজেই অবাক হয়ে যাই, আমার কোনো ধারনাই নেই এটা কীভাবে সম্ভব হয়। কিন্তু হ্যা, আমি মেক্সিকোতে থাকি, আমি হাওয়াই তে থাকি, আর আমি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকি আমার পুরো জীবন টা এমনই। আমি যেন আমার পূর্বপুরুষদের থেকে সকল উদ্যম পেয়েছি যাদের ৪০০ বছর এই উপনিবেশ ত্যাগ করার অনুমতি ছিল না আর আমি তাদের সকল ইচ্ছাগুলো পেয়েছি এই পৃথিবীর অংশ হতে।

সিনেমাটি শুরু হয়েছে জর্জিয়ার কৃষ্ণাঙ্গবিদ্বেষী শাসনব্যবস্থায় আপনার বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে, আটটি সন্তানের মধ্যে অন্যতম, বর্গাদারের কন্যা আপনি। আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশি ভালো ছিল না কিন্তু আপনার মা প্রচণ্ড দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ ছিলেন।

আমার মনে হয় আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধরনের মা ছিলেন, যারা পুরুষ এবং শ্বেতাঙ্গপ্রধান কর্তৃত্ব নীরবে মেনে নিয়েছিলেন কিন্তু আমার মা কোনো দিন মেনে নেননি, তিনি তা করতে পারেননি। এই ব্যপারটা তার মধ্যে ছিলই না।

আপনি লেখালেখি শুরু করেছিলেন শৈশবে। আপনি কি স্মরণ করতে পারেন কি বলতে চেয়েছিলেন আপনার লেখায়?

আমার নিজের আলাদা রুমের চাহিদা ছিল। ভার্জিনিয়া উলফ আমি পড়েছি প্রায় কয়েক দশক হয়ে গেছে আর সেই চিন্তার একটা সুন্দর ভাব আমার মধ্যে এসেছিল, কিন্তু আমি জানতাম এইটাই আমার দরকার ছিল। আমার মা যে গল্পটা বলেন তা হল, আমি যখন হামাগুড়ি দিতাম তিনি আমাকে খুঁজতেন আর আমি বাড়ির পেছনে চলে যেতাম আর তিনি আমাকে ময়লা আবর্জনায় মাখামাখি অবস্থায় পেতেন।

আপনার মা-বাবার চেষ্টায় আপনি স্কুলে পড়লেন। এবং একটা বৃত্তি নিয়ে কলেজেও গেলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবার দক্ষিণে ফিরে এলেন। কেন?

আমাদের প্রত্যেকের ভিতরে একটি অস্ফূট সত্ত্বা থাকে, যে জানে আসলে ঠিক আমাদের কোন দিকে যেতে হবে। আর আমি তার কণ্ঠস্বর শুনতে অনেক আগেই শিখেছিলাম, যদিও এটার কারণে অনেক কষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, আর আমার মনে হয়েছে এটাই একমাত্র সমাধান। আমি প্যারিসে গিয়ে পড়াশোনা করার জন্য বৃত্তির প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি এটা ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি অনুভব করেছিলাম আমার সত্যিকারের দায়িত্ব হলো ফিরে গিয়ে সেই মানুষদের সাহায্য করা যারা সত্যি আমার পরিবারের মতো। কাজেই আমি আমার ভিতরকার কথা শুনলাম। আর মিসিসিপি ফিরে গেলাম।

আপনার লেখায়, আপনি আপনার পরিবার ও অন্যদের কণ্ঠস্বর তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।

হ্যাঁ, করেছি, কারন আমি চেয়েছি তারা নিজেদের আলোয় নিজেদের দেখুক, তাদের মানবতাবোধে আর তাদের সংগ্রামে ও ঘামে, যেটা অন্যদের মতোই। সত্যিই কিছু ছিলো না। সেই সময় আমার পরিবার থেকে আমি যা পেয়েছি, পৃথিবীর অন্য অধিকাংশ পরিবারে তা আমি পেতাম না।

আপনার মতে কি সেটা লেখক হিসাবে আপনার প্রথম অনুপ্রেরণা ছিল? এই লুকিয়ে থাকা জীবনে আলো আনতে?

আমার যখন ১৩ বছর বয়স, আমার বোন ছিল অঙ্গসজ্জাকারী– সে শেষকৃত্যের জন্যে লাশকে সুন্দর-পরিপাটি করে সাজাতো। এক দিন তিনি এক নারীর মৃতদেহ দেখালো যাকে হত্যা করা হয়েছে।  তার স্বামী তার মুখে গুলি করেছিল। এখন অনেক মানুষ এই গল্প শুনবে, আর তারা এটা শ্রেণিভুক্ত করবে : কোনো এক কোণায় এটা বাক্সবন্দী করে রাখবে, কিন্তু আসলে  নারীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের নিষ্ঠুরতা দেশব্যপী ছড়িয়ে পড়েছে আর এটা নানাভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

১৩ বছর বয়সে এমন একটা অভিজ্ঞতা

আমার ওপর এটার অনেক প্রভাব পড়েছিল। আর যাকে গুলি করে হত্যা ফেলা হয়েছিল, তার মেয়ে আমাদের সঙ্গে পড়ত, আর আমার দাদীর নামে নাম ছিল তার। আমার মনে হয়, যখন আপনি লেখালেখি শুরু করবেন, আপনার প্রায়ই মনে হবে যে এটা আরিয়াডনের সূত্রানুসারে লেখা, আপনি কখনোই জানবেন না আপনার লেখায় কেমন মিনোতর (গ্রিকপুরাণে বর্ণিত অর্ধমানব)খুঁজে পাচ্ছেন। কিন্তু প্রায়ই এমন একটা কিছু খুঁজে পাবেন, একটা অথবা দুইটা অথবা তিনটা

আপনি মানবাধিকার ও নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, বিশেষত সেই পর্যায় যখন আপনি নিউইয়র্ক চলে গেলেন এবং MS Magazine এ গ্লোরিয়া স্টিনিম এর সঙ্গে কাজ করলেন ১৯৭০ এর দশকে

আমি নারীবাদী আন্দোলনকে ভালবেসেছিলাম আর আমি কখনো এটাকে জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট অংশের ব্যাপার বলে ভাবিনি। আমি MS Magazine এ কাজ করতেও ভালবেসেছিলাম, বিশেষ করে গ্লোরিয়ার জন্য, কারন সে বুজেছিল আমার সেখানেও একান্ত রুম দরকার।

সমসাময়িক নারীবাদিতা নিয়ে আপনার অনুভূতি?

একটা ধাঁধা, সেটা কেন বলছি, সব সংগ্রামের পরে ও শিক্ষার পরে শিক্ষাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ : আমরা একে অপরকে শেখাতাম, অন্য মহিলা, মেয়েদের শেখাতাম। নারীরা এই সময়ে এসে নিজেদের পুরুষের সমকক্ষ হিশেবে দেখাতে সাচ্ছন্দ বোধ করে, এবং মূলত সবক্ষেত্রে তাদের নারীত্ব মুছে ফেলতে চায়। আমি এটা বুঝতে পারি না।

৩০ বছর হয়ে গেল ‘দ্য কালার পার্পল’ প্রকাশিত হয়েছে। মনে হয় যে অনেক দিন পেরিয়ে গেছে?

না, কারণ সময় সবসময়  বর্তমান, যে কোন ভাবেই হোক – এমন মানুষ ও আছে যারা মাত্রই উপন্যাসটি আবিস্কার করেছে। আর তারা একই অনুভূতি নিয়েই আমাকে লেখে যে অনুভূতি নিয়ে ৩০ বছর আগে আমাকে অন্য কেউ  লিখত। কাজেই গল্পটা এভাবে বেঁচে আছে আর, আমি যদিও তার পর থেকে অনেক বই লিখেছি এভাবে হয়ত খুব কমই চিন্তা করি যেভাবে একজন নতুন পাঠক ভাবে, এটা এখনো বর্তমান।

স্টিভেন স্পিলবার্গ এটা নিয়ে সিনেমা বানানোর পর এর প্রতি যে খুব ঘৃণাত্মক আক্রমণ হয়েছে। এটা কেমন করে আপনাকে প্রভাবিত করেছে?

মানুষ আমাকে জনসমক্ষে অপমান করেছে, মানুষজন এভাবে বলতে শুরু করত, ’আমি এই বইটা পড়িনি। আমি এই সিনেমাটা দেখিনি। কিন্তু...’ আর অপরপক্ষে হয়েছিল কি,  আমাকে কেটে বাদ দেয়া হয়েছিল, তারা যখন বছরের পর বছর আপনার বই বিদ্যালয় থেকে দূরে রাখে। এটা কঠিন সময় ছিল তবু আবার আমি আমার পূর্বপুরুষের কাছে ফিরে গেছি যারা আসলে সেই অস্ফূট সত্তা, যারা বলে, “আমরা জানি আমরা কী করছি”, আর আমি একটা প্রকাশনা সংস্থা পাই “ Wild Trees Press”  নামে আর অন্য অজনপ্রিয় মানুষের জন্য প্রকাশ করতে শুরু করি।

আপনার কাহিনিতে, আপনি সব সময় সত্য বলার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকেন। সেটা কি আপনার কর্মক্ষমতাকে আরো উদ্যম এনে দেয়?

এটাই আমাদের একমাত্র আশা। সত্য আমাদের একমাত্র পথপ্রদর্শক। আপনি যদি মিথ্যা দ্বারা চালিত হন, অবশ্যই এই গ্রহ থেকে পতিত হবেন।

আপনি একজন প্রতিবাদী হিসেবে পুরো বিশ্ব ভ্রম করেছেন, কিন্তু আপনি নির্জনতাও ভালোবাসেন। কীভাবে এটা কাজ করলো?

অনেক শ্রম দিতে হয়েছে। আগামীবছর আমার বয়স ৭০ হবে। আর ৫০ বছরের মতো পার হয়েছে লেখালেখি করে আর সক্রিয় থেকে, আসলে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে থেকে আর লোকের ভীড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। আমার রাস্তা বহুমুখী রাস্তা... তবু যেটা সাহায্য করেছে তা হল যা আমাকে ডাকেনি সেই দিকে মনোযোগ দিতে আমি আগ্রহী হইনি।

আপনি আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্কে যে মূল্য দিতে হয়েছে সে ব্যপারে খুব খোলামেলা, যেমন আপনার সঙ্গীরা বা কন্যার সঙ্গে। (এলিস ওয়াকার আর তার কন্যা আলাদা থাকতো।)

আমি এটা মেনে নিয়েছি। আমি কি করতে পারি?  আমি এমন একজন মানুষ যে, যে কোন কারনেই হোক, মানবতার জন্য সম্পূর্ণ উৎসর্গীকৃত বলে অনুভব করি। আমি করি। আমি গভীরভাবে অনুতাপ করি কোন ক্ষতি করলে অথবা এমন কোনো ক্ষতির উপলব্ধি করতে পারলে যা আমি হয়তো কারো প্রতি করেছি নিজের আচরণ দ্বারা। আমি অবশ্যই সবচেয়ে সেরা কাজ করতে চেষ্টা করি আমার ভেতরে যে স্পৃহা আছে তা দিয়ে।

এখন কোন কোন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন?

দুটা বই নিয়ে। একটার নাম “ The Cushion in the Road”- এটা হলো কীভাবে একজন ধ্যানী হিসেবে, এমন একজন হিসেবে যে একাকীত্ব ভালোবাসে, বাড়িতে থাকতে ভালোবাসে, আমার কুশন আছে আর আমি সেখানে বসি, কিন্তু তারপর বিশ্ব ডাকে আর আমাকে যেতে হয়।

আর অন্যটা?

এটা একটা কবিতার বই নাম The World Will Follow Joy, এই বই শুরু হয় দালাই লামাকে নিয়ে লেখা কবিতা দিয়ে নাম “ What Makes The Dalai Lama Lovable?” ( হাসি)

আপনি কি এখনো লিখে অনেক আনন্দ পান?

আমি যদি তা না পেতাম, কেন লিখতাম? পুরো ব্যপারটাই আনন্দের, আর কিছু না। এইভাবে ভাবাটাই মানুষ ভুলে গেছে। এই গ্রহটা আনন্দের জন্যই।

আপনাকে খুব উৎফুল্ল শোনাচ্ছে

হ্যাঁ, কেন নয়?