রজার বেলেন

বেশিরভাগ লোকজন বলে, ছবিগুলি খুব ডিস্টার্বিং, ডার্ক। আমি বলি অন্ধকারই তো আলোর উৎস রজার বেলেন


[রজার বেলেন। একজন আমেরিকান ফটোগ্রাফার। জন্ম ১৯৫০ সালে নিউ ইয়র্কে। ফটোগ্রাফিতে তার হাতেখড়ি মাত্র তেরো বছর বয়সে। তার মা কাজ করতেন ম্যাগনামে, সেই সুবাদে। তারপর থেকে একটু একটু করে  এই পৃথিবীর অ্যাসাইলামের ভাষ্যকার হয়ে উঠেনে তিনি। পাখি মানুষ, পুতুল, তার সঙ্গে দেয়ালের ন্যুইসেন্স ড্রয়িং-ইন্সটলেশনের মাধ্যমে অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা করে দেন তার দর্শকদের। যে পৃথিবী আপাত কুৎসিত, বিভৎস এবং ব্রাত্য, তবে সুন্দরের অপর পিঠ হিশেবে তাও সত্য। অন্য এক সত্য। রজার বেলেনের এই সাক্ষাৎকার ২০১২ সালের ২৩ নভেম্বর প্রকাশ করে ফাইডন ডট কম। সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর করেছেন সুবর্ণা ধর।]

 

আপনি বলে থাকেন, ফটোগ্রাফি আপনার কাছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক এবং অস্তিত্বময় ভ্রমণ- এই ভ্রমণ থেকে আপনি কি পান?

প্রথমত, আমার কাজের মূল লক্ষ্যই হল নিজেকে খোঁজা। সম্ভবত, এটাই আমার এত বছরের ছবি তুলে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য। আমার ছবিগুলি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক নয় বরং একধরণের মনস্তাত্ত্বিক বক্তব্য। ছবিগুলির মাধ্যমে দর্শকরা নিজেদের খুঁজে পান। আমিও চাই আমার ছবিগুলি দর্শকদের অন্য যে ব্যক্তিত্ব, যেটাকে আমরা  অন্ধকার দিক বলি, তা বের করে আনুক।

আপনি ছবি সম্পর্কে দর্শকের কাছ থেকে কেমন মন্তব্য পান? 

বেশিরভাগ লোকজন বলে, ছবিগুলি খুব ডিস্টার্বিং, ডার্ক। আমি বলি অন্ধকারই তো আলোর উৎস। দর্শক কেমন বুঝে, তা তাদের মন্তব্য থেকেই বুঝা যায়। আর এভাবেই তারা নিজেদেরকেই প্রকাশ করে। অধিকাংশ দর্শক আমার ছবির যে সব লোকজন তারা কে এবং তাদের কি থাকা উচিত, এইসব নিয়ে  টেনশন করে। এই টেনশন আসলে তাদের  ভেতরকার বিষণ্ণতার বহিঃপ্রকাশ। আমার ছবির ডার্ক বা ডিস্টার্বিং দিকগুলি এটা পারে।  দর্শকের ভেতরকার সেই দিক, যা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন, তা বের করে আনে। আমিও চেষ্টা করি। যখন আমি পারি তখন স্বর্গীয় অনুভুতির মতো হয়। আর আমার কাছে, সবচেয়ে ভালো ছবি হলো সেই ছবি যা ব্যাখ্যা করার কোন ভাষা আপনার কাছে থাকবে না।  যা আপনাকে নীরব করে দেয় কিংবা আপনার মধ্যে গভীর রহস্যময়তা সৃস্টি করে। আমি মনে করি, এই অনুভূতি তৈরি করার মাঝেই একটি ছবির সাফল্য নির্ভর করে। তাই আমি ফটোগ্রাফকে ডিস্টার্বিং, সুন্দর বা অন্য কোন কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাই না। সেগুলি আসলে যা তা-ই। এবং ছবিকে ব্যাখ্যা করার ভাষা আপনার কাছে যতো কম হবে ততই সে ছবি ভালো ছবি হয়ে উঠবে। 

 

Roger Balllen

 

আপনি কি আপনার কঠিন সময়টার মধ্যেও ছবি তুলে যেতে পারেন নাকি কখনও কখনও কষ্টকর হয়ে উঠে?

আমি যখন ছবি তুলি তখন বিষয়বস্তুটারই উপরই মনোযোগ দিই আর চেষ্টা করি সব মিলিয়ে একটা পুরা ছবি ফুটিয়ে তুলতে। আমার ছবিগুলি একাধিক বিচ্ছিন্ন উপাদানের উপস্থাপন না শুধু, সেগুলি হল হাজারও উপাদানের একটা অখণ্ড উপস্থাপন। আমার উদ্দেশ্য হল একটি প্রবল কিন্তু পরিমিত, ফর্মাল চিত্র তৈরি করা। আমার কাছে এইটি হল একটি অখণ্ড মাধ্যম যা অর্থ মূলত অন্তর্নিহিতই থাকে। আমি জীবন্ত কিছু সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। একটা ছবির মাধ্যমে   যা করতে চাই তা হল, জীবন্ত কিছু সৃষ্টি, এমনকিছু যা আপনার বাইরে এবং যার নিজস্ব ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য এবং  অনুভূতি রয়েছে। শিশুরা যেমন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরে তেমনি করে আমি ছবি নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি। আপনি যখন ফটোগ্রাফ শুরু করেন তখন ধারণাও করতে পারবেন না এর শেষ কি হবে। লোকজন আমাকে ছবি তোলার আগে কি ভাবি জিজ্ঞেস করে। কিন্তু  আমি চেষ্টা করি কোনকিছু নিয়েই না ভাবতে। তার দুইটা কারণ- এক, আমি এমন  নীরবতা ও শান্ত মন চাই ঠিক যেমন বিড়াল তার শিকার ইদুঁরের জন্য অপেক্ষা করে। ভালো ফটোগ্রাফি সবসময় একটা মুহূর্তের ব্যাপার,  যা আগে থেকে ঠিক করে রাখা যায় না। আমাকে সেই ঘটনাটিই কখন ঘটবে তার জন্য নিয়ে তৈরি থাকতে হয়। মাঝেমাঝে ঘটনাটি ঘটে, চোখের পলক ফেলার মত কিংবা, যেভাবে একজন ব্যক্তি ঘুরে তাকায় বা  পুরো ছবি জুড়ে কোন জন্তুর চলাফেরার মতো অথবা আমার এক কোন ড্রয়িংএ একেবারে শেষ অংশটি যেমন দেখায়  ঠিক তেমনভাবে।

যতোই অভিজ্ঞতা বাড়ে ততোই কি আরো শক্তিশালী কিছু সৃষ্টি  সহজ  হয়ে যায়? নাকি কঠিন?

অবশ্যই বলব, এইটা কখনোই সহজ হয়ে উঠে না। কারণ আপনি যতো বেশি অভিজ্ঞতা লাভ করবেন ততোই কঠিন করে কাজ করতে চাইবেন। এইটা এমন যে আপনি অনেক বেশি কঠিন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে সহজ সরল কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করেন। কেননা, আপনার বয়স এবং অভিজ্ঞতা আপনাকে যেকোন জিনিসকে বৃহৎ আঙ্গিকে দেখতে শেখায়। তাই তখন আপনার কাজটি আরো কঠিন হয়ে পড়ে যেহেতু এই বিশাল আঙ্গিকের বিষয়বস্তুর মধ্যে সমন্বয় করে একটি একক  ফটোগ্রাফ সৃষ্টি করতে হয়। ফলে, কাজটি সহজ না হয়ে আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠে। আবার, এইটি চ্যালেঞ্জিং হওয়াটাও জরুরি, না হলে, আপনি হয়ত ছবি তোলাতেই আগ্রহই হারিয়ে ফেলবেন। আমি প্রথম দিন থেকেই নিজের তাগিদেই ছবি তুলেছি, তাই কখনোই বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফার হয়ে উঠিনি। আমি বাজারের জন্য কাজ করি না। ছবি তোলা এটা একান্তই আমার। যখন আমি আমার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার নতুন কোন জায়গাতে পৌঁছাতে পারি না তখন টায়ার্ড হয়ে যায়। আর রেস্ট নিই। নিজেকে নিজের অনুকরণ করার কোন মানে হয় না। আমি জানি, আমার জীবন প্রতিনিয়তই বদলাচ্ছে এবং  সেই পরিবর্তনকে ধরবার কোন না কোন পথ অবশ্যই খুঁজে পাব। এইটা প্রাকৃতিকভাবেই আসে, একটি দরজাইতো আসলে আরকেটা দরজা খুলে দিতে সাহায্য করে।  আমি দুশ্চিন্তা করি না। শুধু ছবি তুলে যাই । আর এ ছবিই আরেকটা ছবির পথ দেখায়। বলে কোথায় যেতে হবে। আমি সবসময় আমার ছাত্রদের ফটোগ্রাফার হওয়া মানে কিন্তু ক্লাসের পর ক্লাস শুধু হাজিরা দিয়ে যাওয়া না। তোমাদেরকে তোমাদের নিজেদের ফিঙ্গারপ্রিন্টস চিনতে জানতে হবে।অথবা বালির মাঝে নিজের পায়ের পায়ের ছাপ। আর  এইটা সবচেয়ে ভালোভাবে সম্ভব শুধু ফটোগ্রাফির মাধ্যমে। তোমার ছবিগুলিই তো তোমার আয়না। 

Roger Ballen, Dresie & Cassie (1993)

Roger Ballen, Dresie & Cassie (1993)

আপনার মা ম্যাগনামে কাজ করতেন এবং সেই সুবাদে আপনার বেড়ে উঠা এই ফটোগ্রাফিক ইমেজ ঘিরেই।  আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গি, অতুলনীয় সব কম্পোজিশন, এইটা  কি আপনার এই শৈশবের পরিবেশের প্রভাব?

আমাকে সবচেয়ে বেশী উৎসাহিত করে ন্যাচার।ধরেন, একটা গাছ, একটা জন্তু বা মানুষের দিকে যদি তাকান, দেখবেন   প্রতিটা জিনিসের উপস্থিতির পেছনেই নির্দিষ্ট কারণ আছে।  সবগুলি মিলেই এক টোটাল ইমেজ। সেজন্যই, যখন ছবি তুলি প্রত্যেকটা খুটিনাটি জিনিসকেই আমি গুরুত্বের সঙ্গে নিই। আর এক্ষেত্রে আমি প্যল স্ট্রেন্ড, তার কম্পোজিশন দ্বারা  প্রভাবিত। উনি অনেক বড়( মাঝেমাঝে চারকোণা) ফর্মেটের ক্যামেরা ব্যবহার করতেন, এবং তার ছবিগুলি মসৃণ আর অনেক ফরমালিস্টিক। মনে পড়ছে, ওয়াকার ইভানও এ ধরণের কিছু কাজ করেছে। ১৯৮৪-৮৫র দিকে। এই সময়েই আমি প্রথম কম্পোজিশন নিয়ে অবসেসড হয়ে পড়ি।  আন্দ্রে কার্তেজ তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে।  তিনিই প্রথম দেখান ফটোগ্রাফিও একটা আর্ট। তিনি তাঁর ছবিকে সবসময় কল্পনাময়, রহস্যময় এবং ধাঁধা হিশেবেই আমাদের সামনে এনেছেন। যার কারণে আমরা বুঝতে শিখেছি ফটোগ্রাফি শুধু দলিল না। আরো বেশী কিছু। 

আপনি কি প্রতিদিনকার জীবনযাপন এর বিষয়টি অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে পর্যবেক্ষণ করার ব্যাপারে সচেতন থাকেন? যেমন ধরেন, এখন এই ক্যাফেতে বসে কি দেখছেন?

এটি অনেক কঠিন প্রশ্ন কেননা আমি জানি না অন্যরা কীভাবে বিশ্বকে দেখে। কিন্তু আপনি যদি অন্যভাবে দেখেন তবে বলতে পারেন আমি অনেকগুলি কাজ একসঙ্গে করতে পারি। ধরেন, এই যে এখন খাচ্ছি, তার মাঝখানে আপনি যদি  বলেন, রজার, এইখানে একটা ছবি তোলো তো। তখন সঙ্গে সঙ্গেই আমার ব্রেইন কাজে লেগে যাবে। আমি প্রায়ই ১৯৫০ এর দিকে দেখা Clark kent-এর সুপারম্যান প্রোগ্রামের কথা ভাবি। সে ছিলো একজন স্বাভাবিক মানুষ যে একটি পত্রিকায় কাজ করত এবং অন্য একটা রুমে গিয়ে সুপারম্যান হয়ে যেত। ঠিক এইটাই আমি প্রায়শ করে থাকি। সকালে উঠে আমি প্রথমে নিজের প্রশাসনিক কাজ করি। এই যেমন লোক জনের সঙ্গে সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ এইসব।। এরপর ১২ টার দিকে ক্যামেরাগুলি গাড়িতে নিয়ে সম্পূর্ণ পরাবাস্তব একটা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। যখন সেই ভ্রমণ শেষ হয় আমি আবার আমার ফর্মাল লাইফে ফিরে আসি।  আমি  বছরের পর বছর এটাই করে যাচ্ছি। তাই এখন আর রজারের ভেতরকার মনকে উস্কে দিতে হয় না। এটি অটোম্যাটেড হয়ে থাকে। আমি এই প্রক্রিয়ার এক বিন্দুও বুঝি না, এটি এমনই ছিলো সবসময়। তাই যদি আপনি আমাকে এইখানেই একটা ছবি বানাতে বলেন তবে আমার মনকে এমনভাবে কাজে লাগাতে হবে যাতে আমি চুড়ান্ত মনযোগের জায়গায় পোঁছাতে পারি।   হয়ত  এইখানে বসেই ১৯৭৩ সালে দেখা আফগানিস্তানের কোন রেস্টুরেন্টের কথা মনে পড়বে। যেখানে এই চেয়ার এর কোন অংশ আমার ফটোগ্রাফের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল। অথবা এমনও হতে পারে এই টেবিলের কোন কিছু ঠিক ওখানটায় যেমন ছিলো তেমনি।   আসলে, কার মন   কখন কীভাবে কাজ করা তা বোঝা জাস্ট অসম্ভব। আমি বলতে চাইছি, কে আমাকে বলে দিচ্ছে এখন কি বলতে হবে? কোথা থেকে আসছে সব? আপনি এর উৎস খুঁজে পাবেন না, এটি মাল্টি-ডাইমেনশনাল। যখন কাউকে ইন্টার্ভিউ দিই, আমি প্রায় একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি, তা হল- কোথা থেকে সব কিছুর শুরু হল? আমি কি মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে আসার পরই আমার জার্নি শুরু করেছি নাকি মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়েই এর শুরু!! কিংবা দুটোর কোনটাই নয় অন্য কোথাও থেকে এর সূচনা! বিষয়টি নিয়ে বায়োলজিক্যালি এবং সাইন্টিফিক্যালি দুভাবেই ভাবুন। এর শুরু হয়েছিল ২ বিলিয়ন বছর আগে যখন এই গ্রহে প্রাণের সূচনা হয়েছিল। আপনি শুধুমাত্র এই সব কিছুর সমষ্টি। এবং প্রাণের সূচনা কালে এমন কিছু পর্যায় ছিল যখন জীবন ছিল অসম্পূর্ণ, হতে পারে একটা ভাইরাস। তার মানে আপনার অস্তিত্ব এরও আগে। 

Roger Ballen

Roger Ballen, Contemplation (2004)

মানুষ বা পশুপাখি শুধুমাত্র গল্পের অংশ বিশেষই বলতে পারে- এই হতাশা থেকেই কি ড্রয়িং বা ইন্সটলেশনকে  আপনার ফটোগ্রাফিতে নিয়ে আসার আগ্রহ পেয়েছেন?

হুম, আমার ছবিগুলির মজার বিষয় হল আমি এগুলতে ইন্সটলেশন, ভাস্কর্য ইত্যাদির সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করি। ইন্সটলেশন বা ড্রয়িং এগুলির আলাদা একটা ভাষা আছে। কিন্তু, যখন এগুলিকেই ফটোগ্রাফে রূপান্তর করি, তখন সম্পূর্ণ ইমপ্যাক্টই আলাদা হয়ে যায়।
ফটোগ্রাফ হল বাস্তব বিষয়। অন্যদিকে, ড্রয়িং হল রজারের কল্পনার প্রকাশ। এইগুলি শিল্প আন্দোলনের বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, ড্রয়িংগুলির আর্ট ব্রুট এর সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে। এইগুলি শিশু, অপ্রকৃতিস্ত আর প্রান্তিক মানুষের আঁকা। এইগুলি আমরা সবসময় দেখি। আপনি বাচ্চাদের ক্লাসে গিয়ে, ড্রয়িংগুলি দেখলে অনেক সামঞ্জস্য পাবেন কিংবা গ্রাফিতিও দেখবেন। কিন্তু এই এগুলিকে আমি অন্যভাবে তুলে ধরি। আর এটা করতেই আমার প্রায় ৫০ বছরের মত লেগে গেছে।
দুইভাবে এটা ঘটেছে। এক- ক্যামেরার মাধ্যমে, দুই- মনের মাধ্যমে। কিন্তু তবুও এটি একটি স্থান, একটি এন্টিটি। তার মানে, এইখানে একটা ট্রাইএঙ্গেলের সৃষ্টি হয়- ক্যামেরা, রজারের কল্পনা এবং বিদ্যমান বিষয়বস্তু। কোন না কোনভাবে এইসবের মধ্যে একটা সমন্বয় তৈরি হয়। আমি মনে করি, এইভাবে ফটোগ্রাফের মাঝে ড্রয়িং এর সমন্বয় করার মাধ্যমে নতুন এক স্তর, গুরুত্বপূর্ণ এক ফরম্যাট আনতে পেরেছি। এবং সব শেষে এগুলি ফটোগ্রাফই থাকে।অন্য কিছু নয়। ফটোগ্রাফি একধরণের মাধ্যম বা চাবি। গত ৫/৬ বছরে আমি ড্রয়িং, পেইন্টিং , কখনো বা ভিডিও কেও মাধ্যম হিশেবে ব্যবহার করেছি। আমিতো নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি কেননা নিজের উপযুক্ত একটা মাধ্যম আমি খুঁজে পেয়েছি। এত উপযুক্ত মাধ্যম খুব কম জনই পায়।

আপনি যে মানুষের ডার্ক দিকটাকে সানে নিয়ে আসতেছেন, এটা কি স্রেফ ফটোগ্রাফিক আলো- ছায়ার খেলা নাকি অন্য কিছু?

প্রথমত, ছবিগুলির মানে শব্দে প্রকাশ সম্ভব না তেমন। তাই  মুখে বলে ভালো বোঝানোও যাবে না, আর দ্বিতীয়ত, এগুলি এত মাল্টি-ডাইমেনশনাল যে আমি নিজেই সবগুলি ডাইমেনশন জানি না। আমি সবচেয়ে ভালো ডাইমেনশনগুলি এখনও অর্জন করতে পারিনি। হয়ত জানিওনা এইগুলি কি!  শুধু এটুকু জানি ওই ছবিগুলির গভীরে এমন একটা একটা কিছু আছে, যা আমি নিজেও হয়তো ভালো জানি না । অনেক চ্যালেঞ্জিং বিষয়টা। 

Roger Ballen

আপনি এখন আর দক্ষিন আফ্রিকার বাইরে ছবি তুলেন না কেন? 

বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবছি। যা নিয়ে  এখনো স্থির হতে পারিনি। তাই ভালো ছবিও আসবে না। সময় নষ্ট হবে শুধু। অনে ছবিই তুললাম।এখন ভালো হয় এইসময়ে এখানে কি গুরুত্বপূর্ণ তাতে মনযোগ দেওয়া। প্রায়ই বলেছি,  পৃথিবী আসলে একটা মঞ্চ। কিন্তু এখন আমি সেই অবস্থায় ফিরে যেতে চাই যেখানে, দেয়ালে আঁচড়ে যাব প্রতিনিয়ত, গভীর থেকে আরো গভীরে, একই চিহ্ন  বা অন্যকিছু, কিন্তু আরো গভীরে পোঁছাতে চাই হয়ত দেয়ালের অই পাশটা পর্যন্ত। আমার মূল তাড়নার বিষয়টি পরিবর্তিত হয়েছে। আমি আমার মনেরই আয়নায় আসলে ডুবে আছি। একজন ভালো জেলে যেমন যেখানে মাছ আছে অইখানে যায় বারবার কিংবা ভালো বেইসবল প্লেয়ার যেমন একই ব্যাটব্যবহার করে,  অইরকমই।

আপনার সর্বশেষ প্রজেক্ট ‘অ্যাসাইলাম’ কীভাবে শুরু হলো ?

যখন আমি বোর্ডিং হাউস প্রজেক্টে কাজ করছিলাম তখন জোহানসবার্গে একটা জায়গা খুঁজে পাই। একটি বড় বাড়ি যা আমাকে Hitchcock এর Psycho মুভির বাড়িটির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। ওই জায়গায় গিয়ে দেখি সমাজের সব স্তরের লোক সেখানে আছে। এটা ছিল কিছু মাইন ডাম্পসের কাছে একটা জায়গা। এই লোকটা মানুষদের সে বাড়িতে ভাড়া থাকতে দিত, তারা বিভিন্ন কাজ করত। মাঝেমাঝে, পুরা ঘরের মেঝে জুড়ে তাদের ঘুমাতে দেখতাম। আর লোকটি ছিল সত্যিকারের পশুপাখি, বিশেষ করে পাখি প্রেমিক। তাঁর গ্যারেজে প্রায় একশ জোড়া পাখি –প্রধানত কবুতর ছিল। তিনি পাখিগুলি বাড়ির ভেতরেও রাখতেন এমনকি ঘরের মধ্যে উড়তেও দিতেন। এটিই মূল কারণ যে আমি প্রথমেই পাখির ছবি নিয়েছি আর পরে ওখানে কাজ শুরু করেছি। লোকজন পাখিগুলি পোষা প্রাণির মত রাখত। আমিও অনেকদিন আগে থেকেই পশুপাখি নিয়ে অবসেসড ছিলাম যার ফলে এদের ছবিই নিয়েছি অনেক। এসাইলাম সিরিজেও এই কাজই করছিলাম। বিশেষ করে পাখি ছবি তুললাম। এই নতুন সিরিজের প্রতিটি ছবিতেই পাখি আছে, হয় সেটা পালক, আঁকা কিংবা উড়ন্ত পাখি। এখানের পাঁচ বছর বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল। পাখির শট নেওয়ার কখনোই সহজ না। প্রথমত, তারা শুনে না, দ্বিতীয়ত, তারা নার্ভাস হয়ে পড়ে, তৃতীয়ত, উড়ে যায়। তবে আপনি বিশ্বাস করেন বা না করেন সবচেয়ে মজার বিষয় হল একসময় তারা আপনার কাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। আপনি যদি তাদের ছবি তুলতে চান তবে তা শুরুতেই করতে হবে কারণ তখনই শুধুমাত্র তারা বিভিন্ন দিকে তাকাতে থাকে। তখন তাদের চোখ, শরীর নড়তে থাকে, নার্ভাস থাকে তারা। ৫/৬ মিনিট পরে তারা কিছুটা নিরাপদ বোধ করে এবং নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তারপর তারা মাথা ঘুরিয়ে নেয়, পালকগুলি টেনে নেয়। এমনকি অনেক বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমাতে শুরু করে, ফলে আপনি ছবির এনার্জিটাই হারিয়ে ফেলেন। তাই পাখিদের নার্ভাস অবস্থা  তাদের সুস্থির অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো ছবি দিতে পারে।

 

Directed by Roger Ballen & NINJA