জাক দেরিদা

পরিচয় নিজেই একটি ভিন্নতা, নিজের সঙ্গে, নিজের মধ্যে ভিন্নতা জাক দেরিদা

 

[জাক দেরিদা, ফরাসি দর্শনিক, ১৫ জুলাই, ১৯৩০-এ তৎকালীন ফ্রান্স অধ্যুষিত আলজেরিয়ার আলজিয়ার্স নগরীর এল বিয়ার শহরতলিতে এক ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছিল মুসলিম-প্রধান আলজিরিয়ায়। সেখানে শৈশবেই সাম্প্রদায়িকতার শিকার হতে হয়েছে, স্কুলে ভর্তি করে তাকে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয় সাতশতাংশের বেশি ইহুদি ছাত্র নেয়া যাবে না এই সূত্র প্রয়োগ করে। অন্য দলে গিয়েও টিকতে পারেননি অসহনীয় জাতি-বিদ্বেষের জন্য। তিনি ডিকন্সট্রাকসন বা বিনির্মাণ নামে সেমিওটিক বিশ্লষণের একটি নতুন ধারা তৈরি করার জন্য বেশি খ্যাতি লাভ করেছেন। তার চিন্তা ও বিশ্লেষণ উত্তরাধুনিক দর্শনের সঙ্গে জড়িত এবং দার্শনিক অভিমুখ উত্তর কাঠামোবাদী (post-structuralist) কাজ হিশেবে পরিগণিত। দেরিদা তার বিভিন্ন বক্তৃতায় ও লেখায় কাঠামোবাদের (structuralism) নানা দুর্বলতা, অসঙ্গতি ও অপর্যাপ্ততা চিহ্নিত করেছেন। মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার প্রভাব রয়েছে। দর্শন, সাহিত্য ছাড়াও আইন নৃতত্ত্ব, ইতিহাস-রচনা, ভাষাতত্ত্ব, সামাজিক-ভাষাতত্ত্ব, মনোঃসমীক্ষণ, রাজনৈতিক তত্ত্ব, ধর্মগবেষণা, নারীবাদ, সমকামিতা গবেষণায়ও তার প্রভাব আছে। বিশেষ করে তার শেষের দিকের দর্শনে নৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয় বেশি এসেছে। কিছু সমালোচকের মতে Speech and Phenomena (1967) তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ।  অন্যান্য কাজের মধ্যে Of Grammatology, Writing and Difference, and Margins of Philosophy তার উল্লেখযোগ্য কাজ। দর্শন বিষয়ে তার ধারণা আর জটিল কাজগুলির জন্য যখন তিনি বির্তকিত হয়ে পড়েন তখনই তিনি বিখ্যাত আর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ত্ব হয়ে উঠেন। দেরিদা বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন বিশ্লষণাত্নক দার্শনিকদের থেকে। সব থেকে বড় আক্রমণ হয় যখন ১৯৯২ এ তারা  কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দেরিদাকে অনারারি ডক্টরেট দেয়াটা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।  দেরিদা ২০০৪ সালে ৯ অক্টোবর, ৭৪ বছর বয়সে প্যারিসে মারা যান। সাক্ষাৎকারটি স্টেনফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত  ‘Points...: Interviews 1974-1994’ বই থেকে নিয়ে কথাবলির জন্য সম্পাদনাপূর্বক ভাষান্তর করেছেন শিমুল ভট্টাচার্য।]

 

‘দেরিদা’র সঙ্গে আলাপচারিতা? অবশেষে আমরা হয়তো তাকে কিছুটা বুঝতে পারবো।’ এমনটাই ছিলো কিছু লোকের অভিব্যক্তি যখন আমি আপনার সঙ্গে এই কাজ করার প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছিলাম। বলা হয়ে থাকে যে, সুপাঠ্যতার পরিসরে আপনার রচনাগুলি অত্যন্ত জটিল। এই পরিচয়ে অনেক সম্ভাবনাময় পাঠক আগেভাগেই নিরুৎসাহিত হয়ে যায়। এই নিয়ে আপনি কীভাবে আছেন? আপনি কি এই প্রভাবটাই তৈরি করতে চাচ্ছিলেন অথবা বিপরীতে যদি বলি, আপনি কি এটার জন্য কষ্ট পান?

এটার জন্য আমি কষ্ট পাই, সত্যি! হেসো না, আর এই ফাঁদ থেকে বেরোবার জন্য আমার ভাবনায় যা কিছু সম্ভাব্য এবং গ্রহণযোগ্য সবকিছুই আমি করি। কিন্তু আমার ভেতরে একজন এর থেকে অবশ্যই কিছু সুবিধা পাবে; এক নিশ্চিত ‘সম্পর্ক’। এটা ব্যাখ্যা করার জন্য, আমার ইতিহাস থেকে অনেক প্রাচীন কিছু জিনিশ বের করে আনতে হবে এবং সেগুলিকে অন্যদের সঙ্গে কথা বলাতে হবে, খুবই বর্তমান, একটা সামাজিক অথবা ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে যা আমি বিবেচনা করার চেষ্টা করি। যেহেতু এই টেপ রেকর্ডের সামনে, এই গতিতে তাৎক্ষণিকভাবে বলছি, তাই এই সম্পর্কটা বিশ্লেষণ করা সম্ভব না। কিন্তু তোমার কি মনে হয় না যে যারা আমাকে ওই যেভাবে তুমি বললে, সেভাবে দোষারোপ করে, তারা যা বোঝে না বলে দাবি করছে, তার মূল সূত্রটা আসলে তারা বোঝে? যেমন সবার প্রথমেই যে ব্যাপারটা আসে তা হলো একটা পঠন বা মূল্যায়নের দৃশ্য কে এর প্রচলিত স্বাচ্ছন্দ্য, এর সুবিধা, এর সবধরনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা? একজন গনিতশাস্ত্রবিদ বা একজন পদার্থবিদের ওপর কেউ রাগ করে না, যাদের কাজ লোকজন একেবারেই বোঝে না অথবা যে ভিনদেশি ভাষা বলে তার ওপরও রাগ করে না। বরং রাগ দেখায় তার ওপর যে তোমার নিজের ভাষা নিয়ে, সঠিকভাবে বললে এই “সম্পর্ক” তে গুপ্ত প্রভাব বিস্তার  করে, যা শুধু তোমার। আমি তোমাকে নিশ্চিত করছি যে, শুধুমাত্র জটিল হবার জন্যই আমি পরিকল্পিতভাবে জটিল হয়েছি, এটা কখনোই নয়। এটা  খুবই হাস্যকর ব্যাপার হবে, ব্যাপারটা এমন যে আমি সময় নেয়ার প্রয়োজনটা বিবেচনা করি। অথবা এভাবে বলতে পারো- সময় যাতে ঘটনার ভাঁজগুলি মুছে না সেজন্য সময়কে সমর্থন দেয়। দার্শনিক অথবা রাজনৈতিক কারনগুলির জন্য, এই যোগাযোগ এবং গ্রহণযোগ্যতার সমস্যা, এর নতুন টেকনো অর্থনীতি প্রদত্ত অবস্থায়, এটা অন্য যেকোনো কারো চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটার সঙ্গে কেউ শুধুমাত্র, অসুস্থতা, স্ববিরোধিতা আর আপোস নিয়েই বাঁচতে পারে।

সংক্ষেপে, বিজ্ঞানীদের সূত্রপাতে যেটা সংগতিপূর্ণ সেটাই আপনি দার্শনিকের জন্য দাবী করছেন : ভাষান্তরের প্রয়োজনীয়তা, অন্যরা যা সম্পাদন করবে তার একটা ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা।

আমরা সবাই মধ্যস্থ ব্যক্তি, অনুবাদক। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো, দর্শনেও তোমাকে, কখনও নিশ্চিত না হবার পরও বস্তুর গূঢ় পর্যায়টা গন্য করতে হবে। আর এভাবে অনেক বড় পরিমাপের গ্রহণ ও স্থানান্তরকে (শিক্ষাদান, পত্রিকা, প্রকাশনা, বইপত্র, প্রচার মাধ্যম) বিবেচনা করতে হবে এইসব গ্রহণ ও স্থানান্তরগুলির ভাগ করা দায়িত্বের সঙ্গে। কেন সুষ্ঠুভাবে দার্শনিকদেরকেই ‘সহজতর’ হিশেবে আশা করা হয়? কেন সেটা কিছু বিজ্ঞানী বা অন্য কারো কাছে চাওয়া হয় না, যারা একই পাঠকের কাছে আরো বেশি দুর্বোধ্য? আর লেখকরাই বা নয় কেন, যারা দেরিতে গ্রহণযোগ্যতা পারার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক, ভুল বোঝার স্বীকার হওয়া অথবা অসম্ভবের ঝুঁকি নিয়ে কল্পনা করতে পারে, নতুন পথ তৈরি করতে বা বাঁধা আসলে ভাঙ্গতে পারে? সত্যি বলতে কি, এখানে আর একটা জটিলতা আছে— আমি মনে করি সবসময় একজন ‘লেখক’ কেই দুষ্পাঠ্য বলে দোষারোপ করা হয়, তুমি যেটা দাবী করেছ, সেটা হচ্ছে এমন একজনকে যে ভাষার ব্যাখ্যা , এর সঙ্কোচন,  সংকেত পদ্ধতি ও প্রবাহের সঙ্গে জড়িত যা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য। এভাবে; অভিযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছে সে, যে সমগ্র লিখনির সঙ্গে কয়েকটি স্থানীয় ভাষার ক্রিয়াকলাপের সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। আর সে যদি হয় দার্শনিক, তাহলে তাকে দোষ দিবে কারণ সে ভাষা, অলংকরণ আর চেপে বসে থাকা প্রথাসমৃদ্ধ শুদ্ধ কেতাবি বিন্যাসে কথা বলে না, আবার “সকলের ভাষা” যেটাকে বলি, যার অস্তিত্ব আসলে নেই, তাতেও বলে না। ব্যাপারগুলি তখনই উগ্র হয়ে উঠেছিল (যেহেতু এইটাই ঘটনা, তাই না? এবং সৌভাগ্যবশত এইসব লোকেরা যা কিছু পড়তে পারে না তা নিয়ে অভিযোগ করে না) যখন, হার্সালের কিছু বইয়ের ওপর আমি প্রকারগুলির (genre) একরকমের দুষণের অভিযোগ তীব্রতর করেছিলাম। মানুষ ভেবেছিলো “সব ধারার মিশ্রণ”, কিন্তু এটা সঠিক শব্দ নয়। তাই নির্দিষ্ট কিছু পাঠক তখনই হয়তো আমার ওপর বিরক্ত হয়েছে যখন তারা আর তাদের ক্ষেত্রটা চিনতে পারছে না, তাদের “স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জায়গা” বা “নিজের মধ্যে থাকা” তাদের প্রতিষ্ঠান, এগুলি চিনতে পারছে না অথবা আরো খারাপ হয় যখন এগুলি এই দৃষ্টিকোণ বা দূরত্ব থেকে অনূভব করা হয়। 

তাহলে, আপনার লেখা পড়তে গেলে একজন পাঠকের শুধু দর্শন বিষয়ে ধারণা থাকলে হবে না, মণোসমীক্ষণ, সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, বা অংকনের ইতিহাস এগুলি ও জানতে হবে।

এখানে এক বিশেষ ক্ষমতা আছে যা কেউ চাক বা না চাক এক টেক্সট থকে অন্যটাতে উন্মুক্ত হয়ে যায়, এটা এক রসায়ন।

আপনার লেখা পড়ার জন্য দেরিদাকে পড়ে আসতে হবে।

কিন্তু এটাই সবার জন্য সত্য! একটা লেখা যা একটু একটু করে নিজেকে জোরালো করে তুলেছে, তার পুরনো গতিপথের মূল্য উপলব্ধি করা কি খুব ভুল? কিন্তু এটাকে আলগা করে দেয়া, দৃঢ়তা ভেঙে দেয়াটা ও আকর্ষণীয়। আমি আবারও সবচেয়ে সহজ বিষয়ের সান্নিধ্যে থেকে শুরু করতে চাই যা কখনো জটিল, কখনো বা বিপজ্জনক। তুমিতো জানো, দর্শন, বিজ্ঞান বা সাহিত্যের মতো জিনিসে যেই “চিন্তন” প্রকাশ পায়, তা সম্পূর্ণভাবে এগুলিতেও সম্পৃক্ত  নয়। এটা এমন এক লেখা আহবান করে যা আপাত নমনীয়তা নিয়ে পড়া যায়।

আসুন, আপনার ভবিষ্যত জীবনীকারকে কল্পনা করি। যে কেউ ভেবে নিতে পারে, সে গণ-নথির অলস পুনরাবৃত্তি নিয়ে লিখবে— জাক দেরিদা, ১৯৩০ সালের ১৫ জুলাই, আলজিয়ার্সের কাছে এল-বিয়েরে জন্মগ্রহণ করেন। এটা আপনার ওপর নির্ভর করে যে আপনি আপনার জীবগত জন্মকে আপনার সত্যিকারের জন্ম দিয়ে প্রতিস্থাপন করবেন কিনা, যেখানে আপনি এই ব্যক্তিক বা সার্বজনীন ঘটনা থেকে এগিয়ে গিয়ে ‘আপনি’ হয়ে উঠেছেন।

শিক্ষানবিশদের জন্য এটা একটু বেশি হয়ে যায়। এতক্ষণ তুমি যা বললে—“আপনার জন্মের সময় নিয়ে বলাটা আপনার ওপর নির্ভর করে”। না । এমন কিছু যদি থাকে যা “আমার ওপর নির্ভর করে” না তাহলে এটাই সেটা। তা হতে পারে যা নিয়ে আমরা বলছি, তুমি যাকে বললে ‘জীবগত জন্ম’ গণ-নথির বাস্তবধর্মিতার রূপ নিয়েছে, বা “সত্যিকারের জন্ম”।“ আমি জন্মেছিলাম” এটাকে আমি সবচেয়ে একক অভিব্যক্তিগুলির একটি হিশেবে জানি,বিশেষ করে এর ফরাসি ব্যাকরণগত গঠনে। যদি তোমার সাক্ষাৎকার সেই সুযোগ দেয়, তাহলে তোমাকে সরাসরি উত্তর না দিয়ে আমি বরং একটা শব্দসমষ্টির চিরন্তন বিশ্লষণ করাটাকেই বেশি পছন্দ করবো। সেই শব্দসমষ্টি হলো ‘আমি, আমি হই, আমি জন্মেছি’, যেখানে কোনো ক্রিয়ার কাল দেয়া নেই। এই বিষয়ে উদ্বেগ কোনভাবে যাবে না, কারণ যেই ঘটনার নাম দেয়া হয়েছে, তা আমার মধ্যে কেবলমাত্র ভবিষ্যতেই এর আগমণবার্তা ঘোষণা দিতে পারে। ‘I am (not yet) born” [আমি (এখনো নয়) জন্মজাত], কিন্তু এই ভবিষ্যতের একটা অতীত রূপ আছে, যেটাকে কখনোই সম্যক দেখা যাবে না আর এই কারনেই সেটা সবসময় প্রতিশ্রুত আর তার ওপর নানাবিধ হয়ে থাকে। কে কখন বলেছে যে সে শুধু একবার জন্মেছিলো? কিন্তু একজন মানুষ কি করে অস্বীকার করে যে সব রকম  প্রতিশ্রুত জন্মের ভিতর দিয়ে, এটা একক এবং একটাই সময় , অনন্য সময় ; যা জোরালোভাবে প্রকাশ করে আর চিরকাল এর পুনরাবৃত্তি হয়? এই ব্যাপারটার কথা Circumfession এ(দেরিদার ধর্মভিত্তিক সাক্ষাৎকার) বলা হয়েছে।

 “আমি এখনো জান্মাইনি”, কেননা যেই মুহূর্তে এটার সীদ্ধান্ত হলো, আমার নামকরণযোগ্য পরিচয় আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হলো সবকিছুই গোছানো আছে, যেন তা একই ভাবেই ঘটে আর একেই বলে সংস্কৃতি। এইভাবে অনেকগুলি ভিন্ন ভিন্ন পুনর্ঘটনের মধ্যে দিয়ে কেউ শুধু সেই চুরিটাকেই বা সেই প্রতিষ্ঠান কেই পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করতে পারে যা বার বার ঘটতে থাকে। কিন্তু যতই পুনরাবৃত্তি হোক আর বিভাজনযোগ্য হয়ে থাক না কেন এই “একবার মাত্র” ব্যপারটা থেকে যায়।

আপনি কি বলতে চান যে আপনি কোন আত্মপরিচয় চান না?

ঠিক তার উলটো, সবার মতো, আমি ও চাই। কিন্তু এই অসম্ভব জিনিসের বিপরীতে ঘুরে এবং সন্দেহাতীত ভাবে আমি নিজেও যার বিরোধিতা করি, এই “আমি” প্রতিবন্ধকতার কাঠামো গঠন করে। প্রতিটি মুহূর্তে যখন এটি নিজের পরিচয় ঘোষণা করে , একটি নিজস্ব জিনিশ আমাকে সীমাবদ্ধ করে, যদি এভাবে বলি, কেউ বা কিছু যেন বলে ওঠে— ফাঁদ আছে, খেয়াল কর, তুমি ধরা পড়েছ। ছাড়িয়ে নাও, মুক্ত হও, নিজেকে বিচ্ছিন্ন কর। তুমি অন্য কোথাও বাঁধা পরে আছো। খুব নতুন কিছু  নয়, তাই তো?

আপনি যেই কাজ করেন, তা কি এই পরিচয় পুনর্বার খুঁজে পাবার উদ্দেশ্য?

কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে ভঙ্গিমা তা খোঁজার চেষ্টা করে, সেটাই আবার নিজেকে দূরে নিয়ে যায়।  কোনো একজনকে অনতিক্রম্য ব্যবধানের নিয়মের নির্দিষ্ট রূপ দিতে হবে। এইটুকুই আমি সব সময় করছি। (পরিচয় ব্যাপারটা এর নিজের কাছেই ভিন্ন, নিজের সঙ্গে, নিজের মধ্যে ভিন্ন) পরিচয় নিজেই একটি ভিন্নতা, নিজের সঙ্গে, নিজের মধ্যে ভিন্নতা। এভাবে, সঙ্গে, বাদ দিয়ে এবং শুধুমাত্র এটা ছাড়া। জন্মের কাছে ফিরে  আসার এই বৃত্তই কেবল খোলা থাকতে পারে, কিন্তু এটা একই সঙ্গে একটা সুযোগ, জীবনের ইঙ্গিত, আর আবার ক্ষতও। যদি জন্মের পরই এই বৃত্ত বন্ধ হয়ে যায়, কথার যেই প্রাচুর্য্য বা যে জ্ঞান বলে “আমি জন্মগ্রহণ করি” তা মারা যাবে।

আপনার প্রথম জন্ম এবং এই অন্যান্য জন্মের মধ্যে কি সম্পর্ক লোকে দেখতে পাবে, যেমন ফ্রান্সে আপনার আগমন, লাইসি লুই লো গ্র্যান্ডে আপনার পড়াশোনা, খানিয়াতে পড়াশোনা, একদম ভিন্ন একটা জগতে নাম লেখানো?

আমি শুরু করেছিলাম আলজেরিয়াতে। সাহিত্য ও দর্শনে “ঢোকা” থেকে কথা বলা যাক। আমি লেখালেখির স্বপ্ন দেখতাম আর ইতোমধ্যে অনুকরণীয় ব্যক্তিরা সেই স্বপ্নের পথ নির্দেশ করছিলেন, এক নির্দিষ্ট ভাষা, কিছু চরিত্র আর নাম এটার নিয়ন্ত্রন করছিলো। খুব কম বয়সেই, নাইনথ কি টেনথ গ্রেডে থাকতেই আমি জিদ, নিটশে, ভ্যালেরি পড়েছিলাম। জিদ, এমনকি তারও আগে, কোনো সন্দেহ নেই : শ্রদ্ধা, মোহ, অর্চনা, বস্তুকাম এগুলি জেনেছিলাম। আমি আর জানি না যে অবশেষে এগুলির কি রয়েছে। লেফেবর নামে একজন লালচুলো, যুবক শিক্ষকের কথা আমার মনে পড়ে। সে Metropole (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ব্রিটেনকে বোঝায় কখনো লন্ডনকে বোঝায়) থেকে এসেছিলো বলে আমাদের মতো একগুয়ে ছেলেমানুষ পিয়েদ-নোয়াহ্ দের (Pied-Noir—ফরাসি শাসনকালে ইউরোপীয় যারা আলজেরিয়াতে বসবাস করতো) দৃষ্টিতে তাকে হাস্যকর আর বোকা মনে হতো।

সে প্রেম রাজ্য আর Les Nourritures Terrestres (The Fruits of the Earth, আন্দ্রে জিদের গদ্য কবিতা) এর স্তবগান করতো। যদি পারতাম এই বইটা মুখস্থ করে ফেলতাম। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, অন্য কিশোরদের মতো আমিও এর উৎসাহ, এতে থাকা ধর্ম ও পরিবার সংক্রান্ত যুদ্ধের বিবৃতির গীতিধর্মিতার প্রসংশা করতাম, (আমি মনে হয় “আমি বাড়ি, পরিবার, সব জায়গা যেখানে মানুষ ভাবে যে সে বিশ্রাম নিতে পারে সব ঘৃ্ণা করি” এটাকে সহজভাবে অনুবাদ করে লিখেছিলাম : আমি এই পরিবারের অংশ নই।) এটা আমার জন্য একটা মেনিফেস্টো বা বাইবেল, একসঙ্গে ধর্মীয় আর নব্য নিটশেপন্থি-ভোগবাদী, অসাধুপন্থি আর বিশেষকরে, জানো তো, খুবই আলজেরিয়। জি্দের সবই আমি পড়েছি আর হয়তো L’immoraliste (The Immoralist, আন্দ্রে জিদের উপন্যাস) আমাকে নিটশের দিকে আগ্রহী করেছে, সেটা আমি খুব খারাপভাবে বুঝেছি, সন্দেহ নেই। আর নিটশে, খুব অদ্ভুতভাবে আমাকে রুশোর দিকে নিয়ে গেছে। Reveries এর রুশোর দিকে। (Reveries of the Solitary Walker, রুশোর অসমাপ্ত বই)। আমার মনে আছে, আমি রুশো আর নিটশের মধ্যে বড় তর্ক বিতর্কের মঞ্চ হয়ে উঠেছিলাম, আর সব ভূমিকা নেয়ার জন্য আমি বাড়াবাড়ি রকম প্রস্তুত ছিলাম। জিদ প্রোটিয়াস সম্পর্কে যা বলেছে, তা আমার খুব ভালো লাগতো, আমি খুব সরলভাবে নিজেকে তাঁর (জিদের মত) মতো ভাবতাম, সে আবার সম্ভবত তাকে প্রোটিয়াসের (গ্রিক সমুদ্র দেবতা) মতো ভাবতো। এটা যুদ্ধের শেষের দিকে (“আমার” আলজেরিয়া মূলত সবসময়ই যুদ্ধের মধ্যে থাকতো, কারন প্রথমদিকে বিদ্রোহগুলি, আর এভাবে আলজেরিয় যুদ্ধের প্রথম লক্ষণগুলি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে চাপা দেয়া হয়েছিল।)১৯৪৩-৪৪ সালে প্যারিস দখল হবার পরে স্বাধীন আলর্জিয়াস একধরনের সাহিত্য রাজধানী হয়ে ওঠে। জি্দ প্রায়ই উত্তর আফ্রিকায় থাকতো, ক্যামুকে (আলজেরিয়ার ক্যাম্যু) নিয়ে বেশি কথা হতো। নতুন নতুন সাহিত্য পত্রিকা, নতুন প্রকাশকের উত্থান হচ্ছিলো। এইসব আমাকে মুগ্ধ করতো। আমি কিছু বাজে কবিতা লিখেছিলাম। ওগুলি উত্তর আফ্রিকার জার্নালে ছাপিয়েছিলো। একটা “ব্যক্তিগত ডায়েরি” রাখতাম। যদিও আমি লেখাপড়া বা অন্যান্য নিরিবিলি কাজগুলির দিকে চলে গিয়েছিলাম। অনেকটা খাপছাড়া ভাবে, পাশাপাশি আমি একটা ছোকড়া গুন্ডার মতো জীবন যাপন করতাম, এমন একটা “গ্যাং” এ ছিলাম যারা পড়াশোনার চেয়ে ফুটবল বা ট্র্যাক করা নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলো। লাইসি তে, শেষের দু বছর আমি বার্গসন আর আর সার্ত্র পড়েছিলাম। এরা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ছিলো যে কারনে এটাকে শুরুর দিকের একটা দার্শনিক “প্রশিক্ষন” বলা হয়।

আপনি বা আপনার মা-বাবা কি চেয়েছিলেন যে আপনি ইকোল নরমালে কলেজে যান?

আমার মা বাবা ওটা কি তা জানতো না। আমিও জানতাম না। এমনি যখন আমি hypokhâgneতে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন ও জানতাম না। যখন লুই লো গ্রান্ডে যেতে শুরু করলাম, এটা সেই ঊনিশ বছর বয়সে একটা প্রথম ভ্রমণ বলা যায়। আলজিয়ার্সের শহরতলিতে এলো—বিয়ের আমি কখনো ছাড়িনি। প্যারিসের বোর্ডিং স্কুলের অভিজ্ঞতা খুব কঠিন, আমি ভালো মতো মানাতে পারতাম না। আমি সব সময় অসুস্থ থাকতাম, মাঝে মাঝে দুর্বল ও মনে হতো, স্নায়ুবৈকল্যের মতো হতো।

যতদিন পর্যন্ত না আপনি ইকোল নরমালে যেতে পারছিলেন?

হ্যাঁ। ওই বছরগুলি ছিলো সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। তাতে খানিকটা, এক ধরনের নির্বাসনের মতো ছিলো, খানিকটা ছিলো ফরাসি নিয়মে জাতীয় প্রতিযোগিতার ভয়ংকর নির্যাতন। একোল নরমালের মতো এসব প্রতিযোগিতা আর এগ্রিগেশন পরীক্ষার (ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে সম্মানজনক ও প্রতিযোগীতাপূর্ণ পরীক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে এই পরীক্ষা চালু আছে) চাপে যাদের অবস্থা আমার মতো হয়েছিলো, তাদের এই ভয়ানক মেশিনের মধ্যে সবকিছুই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হতো অথবা মনে হতো তারা যেনো জীবন বা মৃত্যুদন্ডের মাঝামাঝি রয়েছে। ফেল করার অর্থই ছিলো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আলজিয়ার্সে ফিরে যাওয়া। আর আমি কোনোদিন আলজেরিয়াতে ফিরে যেতে চাইনি(দুটো কারন ছিলো—আমার মনে হতো আমি “বাড়ি”তে থেকে “লিখতে” পারবো না আর আরেকটা ছিলো রাজনৈতিক কারণ, ৫০-এর দশকের উপনিবেশিক সমাজ আমার কাছে অসহ্য ঠেকেছিল।) এইরকমভাবে খাইনি আর ইকোল-নরমালে কাটানো বছরগুলি ছিলো এক অগ্নিপরীক্ষা (আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা, পরীক্ষায় ব্যর্থতা; কোনোকিছুই আমি প্রথম প্রচেষ্টাতে পাইনি)।

আর এখনো আপনি দীর্ঘ সময় ধরে ইকোল নরমালে কলেজে রয়ে গেছেন?

এই কূটাভাস তোমার নজর এড়ায়নি। কোন সন্দেহ নেই, এই ব্যাপারে বলতে গেলে অনেক বলা যায়। আমার সবসময় “স্কুল পীড়া” থাকতো, লোকজনের যেমন সমুদ্রপীড়া থাকে তেমন। স্কুলে ফিরে যাওয়ার সময় আসলেই আমি কাঁদতাম, এমনকি যখন অনেকটা বড় হয়েছি, এই ধরনের আচরণে লজ্জা পাবার কথা, তখনও। আজও অস্বস্তি বা উদ্বেগের শারীরিক উপসর্গ (বুক আর পেটের কথা বলতে চাচ্ছি) ছাড়া আমি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চৌকাঠ পার হতে পারি না। (যেমন একোল নরমাল, যেখানে আমি বিশ বছর অধ্যাপনা করেছি, বা একোল দেজহত জেতুদ, সেখানে ছয় বছর ধরে পড়াচ্ছি) আর এখনো, সত্যিই, আমি প্রকৃত অর্থে স্কুল ছাড়িনি। আমি সব মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ বছর ইকোল নরমালে কলেজে ছিলাম।

আপনি প্রায়ই বারবার বলেছেন যে deconstruction কোনো পদ্ধতি না, “দেরিদার পদ্ধতি” বলতে কিছু নেই। তাহলে, কীভাবে কেউ আপনার কাজের মর্ম উপলব্ধি করবে? এর প্রভাবকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? কাদের উদ্দেশ্যে আপনার এই লেখা আর সবশেষে কারাই বা আপনার লেখা পড়ে?

প্রকৃত অর্থে, আমি জানি না কাদেরকে এটা উদ্দেশ্য করে। বা হ্যাঁ, আজি জানি! এই ব্যাপারে নির্দিষ্ট কিছু জ্ঞান আমার আছে, কিছু পূর্বজ্ঞান, কিছু প্রতিরূপ। কিন্তু একটা জায়গায় তা প্রকাশক বা বক্তার চেয়ে বেশি না। আমি গন্তব্য নিয়ে একদমই নিশ্চিত না। এমনকি কেউ যদি এক বা একাদিক সম্ভাব্য ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলার ব্যাপারটা ঠিক রাখার করার চেষ্টা করে, এজন্য আদর্শরূপ প্রোফাইল ব্যবহার করে, যদি কেউ এটা করতেও চায় সেটা সম্ভব হবে না। আর আমি মনে করি কারো এই গন্তব্যটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা উচিত নয়। তার ওপর, এটাই কারো লেখালেখির করার কারন। এখন তুমি শব্দসমষ্টি উল্লেখ করলে। হ্যাঁ, কিন্তু আমিও বিশুদ্ধ শব্দসমষ্টি তে বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয়, যেই বলছে বা লিখছে, তার স্বাভাবিক একটা ইচ্ছে থাকে যে, একটা কথ্য, মানে বিকল্পহীন পদ্ধতিতে আগমন করবে। কিন্তু যখনি পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনার মতো সীমা দেখা যায়, যখনি এখানে একটা ভাষা সাধারনভাবে দৃশ্যে প্রবেশ করছে। আর এই শব্দসমষ্টি  এমন কিছুর সঙ্গে আপোস করছে যেটা একটা প্রচলিত ভাষা, ধারনা, আইন, সাধারন নিয়ম সমৃদ্ধ কথ্য রূপ নয়, এর ফলে, এমনকি  কেউ যদি এই যে পদ্ধতির কথা বললে- নিয়মের একটা ধারা যা অন্যরা ব্যবহার করতে পারবে, তাই কেউ যদি এটা অক্ষুণ্ন রাখতে চায়, তাহলে, এই পদ্ধতির শব্দসমষ্টি... যাইহোক, ব্যাপারটা এমন যে শব্দসমষ্টি  বিশুদ্ধ না। এখানে ইতিমধ্যে পদ্ধতি আছে। প্রতিটি বক্তব্য, এমনকি একটা কাব্যিক বা দ্ব্যর্থবোধক বাক্যও অনুরূপ জিনিশ তৈরি করার জন্য নিয়মের একটা ধারা বহন করে। আর এভাবে প্রণালী বিদ্যার একটা রূপরেখা তৈরি করে। তাই বলা হয়, একই সময়ে আমি সেই পদ্ধতিগুলি চিন্হিত করতে চেয়েছি; যেমন বিনির্মান মূলক প্রশ্নগুলি যাতে কোনোপদ্ধতির জন্ম না দিতে পারে, তার মানে এক প্রসঙ্গ  থেকে অন্য প্রসঙ্গে পুনরাবৃত্তি হতে পারে এমন প্রযুক্তিগত পদ্ধতি যাতে না বের হয়।

আমার মনে হয়, আমি যেভাবে লিখি, তারও কিছু সাধারণ নিয়মাবলি আছে, কিছু প্রক্রিয়া আছে যা উপমার মাধ্যমে পরস্পর স্থান পরিবর্তন করতে পারে। একে বলে একরকম শিক্ষাদান, একধরনের জ্ঞান প্রয়োগ। কিন্তু এই নিয়মগুলি টেক্টসটে এমনভাবে নেয়া হয় যা প্রতিটি ক্ষেত্রে তুলনাহীন উপাদান। আর এটা নিজেকে সম্পূর্ণ একটা পদ্ধতি হতে দেয় না। আসলে, এই এককত্ব বিশুদ্ধ না কিন্তু এটার অস্তিত্ব আছে। লেখকের সুচিন্তিত ইচ্ছার থেকে স্বাধীন হয়ে এটা টিকে থাকে। সবশেষে, এখানে একটা স্বাক্ষর থাকে, যেটা কেউ বিবেচনা করেছে এমন কিছু নয়, যেটার স্বাভাবিকভাবে কোনো গোত্রনাম নেই, যেটা মৌলিক বা অননুকরণীয় কিছু প্রস্তাব করার জন্য বিশদভাবে কৌশলের সেট নয়। কিন্তু কেউ পছন্দ করুক বা না করুক , অন্যের ওপর শব্দসমষ্টির প্রভাব আছে।এটা ফটোগ্রাফির মতো—যেই পোজেই দাঁড়াও, ছবিটাকে এইরকম বা ওইরকম বানাবার জন্য যেই সতর্কতাই নাও, একটা মূহুর্ত আসবে যখন ছবিটা তোমাকে চমকে দেবে। শেষপর্যন্ত অন্যের দৃষ্টিই জয়ী হয় আর স্বীদ্ধান্ত নেয়। তাই, আমার মনে হয়, আমি বিশেষত যা নিয়ে লিখি, তা কিন্তু অন্যের কাছ যুক্তিসঙ্গত। একই জিনিশ ঘটে বিশেষার্থক শব্দ সমষ্টি আর পদ্ধতির বেলায়। সাধারণভাবে, পঠন হচ্ছে একটা মিশ্র অভিজ্ঞতা যা অন্য একজনের ব্যক্তিত্ব এবং দার্শনিকতার ব্যাপার, তথ্য যা এই ব্যক্তিত্ব থেকে আলাদা করে নেয়া যায়, এইসব বিষয়বস্তুর দ্বারা তৈরি হয়।

আপনার কাজ, সংক্ষেপে বলতে গেলে, সবসময়ই অনেক বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, আপনি অত্যন্ত সহিংসভাবে আক্রান্ত হয়েছেন এবং বুদ্ধিগত অনুসন্ধানের যথার্থ প্রকৃতিকে ধ্বংস্ব করার চেষ্টার অযুহাতে নিন্দিত হয়েছেন। এই হিংস্রতা আর আপনার কাজের ওপর আক্রমণের এই অত্যুক্তিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

এটা যদি হতো শুধু “আমার” কাজের প্রশ্ন, একজনের বিশষ বা বিচ্ছিন্ন গবেষণার ব্যাপার, তাহলে এমন হতো না।  বস্তুত, যেই ব্যাপারটাকে দোষ দেয়া হচ্ছে সেটা একটা চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। এখানে যা প্রকাশ পাচ্ছে, প্রতিরোধশক্তির মতো এটা অবশ্যম্ভাবীরূপে সক্রিয় হয়ে উঠে। এটা একটা ব্যক্তিগত “শিল্পসম্ভারে” অথবা কোনো নিয়মশৃংখলে কিংবা কেতাবি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না। কোনো বিশেষ প্রজন্মে নয়—প্রায়শই ছাত্র ও নবীন শিক্ষকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা আমাদের কিছু সহকর্মীদের একটা জায়গায় নার্ভাস করে দেয় যে তারা আমাকে আর আমার কাজকে আক্রমন করার সময় তাদের পরিমিতি বোধ হারিয়ে ফেলেন এবং যে একাডেমিক নিয়মগুলি তারা তৈরি করেছেন তা ভুলে যান। এই কাজ খামখেয়ালিপূর্ণ বা অদ্ভুত, দূর্বোধ্য বা অসঙ্গত বলে যে তাদের কাছে এটা হুমকি বলে মনে হতো তা নয়। (যা তাদেরকে এটা মীমাংসা করতে অনুমোদন দিবে।) বরং আমি আশা করি এবং তারাও যতটা স্বীকার করে, তার চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে যে এই কাজ উপযুক্ত, অক্ষরে অক্ষরে সুচিন্তিত। মৌলিক নীতির পুনঃপরীক্ষণে প্রতীতি এবং প্রভাবশালী আলোচনাগুলির প্রস্তাব বহন করে। এই নীতিগুলিতে অর্ন্তনিহিত আছে তাদের অনেকের মূল্যায়ন, একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো এবং গবেষণা যা তাদের সীমার মধ্যে আছে। এই ধরনের জিজ্ঞাসাগুলি যা করে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় দৃশ্যপটের রাজনীতিকরণ ও গনতান্ত্রিককরন করার চেষ্টা করে। যদি এই অন্ধ আবেগপূর্ন আর ব্যক্তিগত আক্রমনগুলি প্রায়ই শুধুই আমার ওপর আসে (মাঝে মাঝে যখন লক্ষ্য করি শুধু আমি না, যারা আমাকে অনুসরন করে বা অনুকরন করে যাদেরকে দোষ দেয়া হয়- সবই বিতর্কের পরিচিত নমুনা) তাহলে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ “বিনির্মাণ” অনেকগুলি বিভাগ ও প্রভেদকে অনুসন্ধান করে বা প্রশ্নবিদ্ধ করে। উদাহরণ হিশেবে একদিকে দর্শনিক বাহাসের কৃত্রিম নিরপেক্ষতা এবং অন্যদিকে অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয় আবেগ ও তাড়নার মধ্যে পার্থক্য। কোনটা ব্যক্তিগত আর কোনটা সার্বজনীন তার পার্থক্য এবং এ রকম ব্যাপারগুলি। বার বার আমি লেখা, স্বাক্ষর, আত্নকথন “আত্মজীবনীমূলক” প্রবৃত্তিকে সবচেয়ে কঠোর এবং প্রয়োজনীয় দার্শনিক অনুসন্ধানে একত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। এমন যে আমি বিষয়টাকে (জীবনীমূলক অর্থে) দার্শনিক বাহাসের কেন্দ্রে বা উৎসমূলে রাখতে চাই (আসলে আমি স্বাভাবিকভাবে দোষী সাব্যস্ত হই বিপরীত ব্যাপারটা করার জন্য।) কিন্তু আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়েই এই প্রশ্নগুলি রাখতে চেষ্টা করি। মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই যা নিসন্দেহে আমার কিছু সহকর্মীকে বিরক্ত বা উত্তেজিত করে আর তারা এগুলি দমন করতে পছন্দ করে (যেমন, দৈহিক পার্থক্য এবং নারীত্ব, সঠিক নাম, সাহিত্য ও মনোবিশ্লেষণ—কিন্তু এখানে কিছু অন্য বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত বা রাজনৈতিকরণ থিমও পর্যালোচনা করতে হবে।)

এই সবকিছুই সম্ভবত ব্যাখ্যা করবে কেন আমার সবচেয়ে শক্তিশালী বিরোধীরা বিশ্বাস করে যে আমি বড় বেশি দৃশ্যমান, যে আমি একটুবেশি “ব্যক্তিগতভাবে” “জীবিত” যে আমার নাম টেক্সটে খুব বেশি প্রতিধ্বনিত হয় যেটাকে তারা অগম্য বলে দাবি করে। সংক্ষেপে এই “অস্বাভাবিক বীভৎসতা”, এই পীড়াদায়ক “হিংস্রতা” আর “আক্রমন” এর “অতিরঞ্জন” এর উত্তর দিতে গেলে, আমি বলবো যে আমার ক্ষেত্রে এই সমালোচকেরা খুব বেশি ব্যক্তি পুজার ব্যবস্থা ও চর্চা করেন, যেগুলিকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয় ও কীভাবে পরিমিত করতে হয় তা দার্শনিকের জানা উচিত।

রাজনৈতিক ক্ষেত্র বিবেচনায় আপনি কখনোই গোলমেলে অবস্থান নেননি। এমনকি, আপনি, যাকে বলেন একরকম গুটিয়ে রাখার চর্চা করেছেন।

আহ, “রাজনৈতিক ক্ষেত্র”! কিন্তু উত্তরে আমি বলতে পারি, ব্যাপার দেখে যাই মনে হোক না কেন, আমি কিছুই ভাবি না। হ্যাঁ , নীরব থাকি এবং একরকম গুটিয়ে ও থাকি, কিন্তু আমরা এটাকে বাড়িয়ে না বললেই হয়। তবে যদি এতে কারো আগ্রহ থেকে থাকে, কোনোরকম দ্ব্যর্থতা ছাড়া, এটা খুব সহজে বোঝা যায় যে কোথায় আমার পছন্দ ও আনুগত্য আছে। কোনো সন্দেহ নেই এটা আমি খুব একটা প্রকাশ  করি না, সেটা নিশ্চিত। কিন্তু, এখানে মাপকাঠিটা কি এবং আদৌ কি আছে? আমার প্রায়ই মনে হয় যে আমি কেবলমাত্র গতানুগতিক আর সাধারণ কিছুই বলতে পারি, যেখানে আমি কোনো কর্তৃত্ব , আমানত বা বিশেষ  সুবিধা যা অস্পষ্টভাবে “বুদ্ধিজীবী” বা “দার্শনিক” দের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে তা দাবি না করেই , অন্যদের সঙ্গে আমার কন্ঠস্বর ও ভোট যুক্ত করতে পারি।

যে বুদ্ধিজীবী (দার্শনিক, লেখক, অধ্যাপক) তোমাদের পরিচিত চিত্রনাট্যের মতো তার রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে আর   যার ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার দাবী রাখে আমি সেইরকম বুদ্ধিজীবীরূপে নিজেকে কখনোই চিনতে পারি না। এমন নয় যে আমি এটা ঘৃণা বা এটার সমালোচনা করি। আমি মনে করি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, একটা ধ্রুপদীকর্ম এবং দায়িত্ব এখানে আছে যা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এমনকি এড়ানোটা যদি হয় ভালো বোধকে জাগানোর জন্য যা আমি রাজনৈতিক দায়িত্বের সবচেয়ে প্রাথমিক ধাপ বলে মনে করি, তাও নয়। কিন্তু, আমি একটা রূপান্তর নিয়ে অনেক বেশি সচেতন যা আজকের এই দৃশ্যকে কিছুটা ক্লান্তিকর, ব্যর্থ চিত্র হিশেবে হাজির করে। আর কখনো ভয়প্রদর্শনের নিকৃষ্টতম বাঁকাপথগুলিকে (এমনি যদি এগুলি ভালো উদ্দেশ্যে হয় তাও) নিয়ে ভাবি। এগুলি রাজনৈতিক কাঠামোর সাধারন মাপকাঠি ছাড়াই করি। মিডিয়াগুলির বিকাশে যেই নতুন দায়িত্ব নেয়া প্রয়োজন তা আমি নিয়েছি (যখন কেউ ছোট লাভের জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে না, একটা অনুমান যা সহজে বুদ্ধিজীবীর ধ্রুপদ গতানুগতিকতার সঙ্গে মিলছে না)।

এটাই আজকে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলির একটি। গণমাধ্যমের বর্তমান রূপগুলির সামনে এই দায়িত্ব এবং বিশেষ করে কুক্ষিগতকরণ ও স্বতসিদ্ধিকরণের সামনে এই দায়িত্ব। যে গুটিয়ে নেয়ার কথা তুমি বললে, আমার মতে তা কখনোই মিডিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য নয়। আমি দৃঢ়ভাবে তাদের উন্নয়ন এবং বিশেষকরে তাদের বৈচিত্র্যের উন্নয়নে সমর্থন করি। এছাড়া আমি কিন্তু মিডিয়ার অতি সাধারণীকরণের এবং বিভিন্ন কর্তৃত্বগ্রহণ যার থেকে অন্য পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে সেসবের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে আছি। এটা আসলে সবকিছুকে নীরবতায় পরিণত করেছে যা খুব নির্ধারিত ও খুব ক্ষমতাশালী কাঠামো বা নিয়মাবলিতে খাপ খায় না বা এখনও পর্যন্ত “গ্রহণযোগ্যতা”র একটা অপচ্ছায়া হওয়ার অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এই “মিডিয়া”র প্রথম সমস্যাটা তার দ্বারাই চাপানো হয়েছে যা অনূদিত হয় না, এমনকি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভাষায় প্রকাশিত হয় না। এমন কিছু ব্যপার যেগুলি গ্রহণযোগ্যতার আইনকে শাসন করে, সংক্ষেপে, ডান দিকে যতটা যতটা করে বাঁ দিকে ও ততটা করে।

এটা এই কারণেই যে গবষনায় যা সবচেয়ে নির্দিষ্ট এবং সূক্ষ; যেই  প্রশ্নগুলি বা যেই অঙ্গীকারগুলি আমাকে আকৃষ্ট করে (আরো কিছু সঙ্গে নিয়ে) সেগুলি হয়তো রাজনৈতিকভাবে লক্ষণীয় নয়। এটা হয়তো রাজনৈতিক চিন্তার বিষয়, একটা সংস্কৃতি বা বিরোধী সংস্কৃতি বিষয় যা আমি আমার যেসব নিয়মনীতির কথা বললাম তাতে প্রায় শোনাই যায় না। কে জানে, হয়তো সুযোগগুলি চালানো বা ঝুঁকিগুলি রাখার জন্যই কেউ এখানে আশা বা আশাহীনতার মধ্যে সবসময় বিক্ষিপ্ততা এবং লঘুতার মধ্যে কথা বলে।

এটা গ্রেফ-এর সঙ্গে আপনার রাজনৈতিক কার্যকলাপের কথা মনে করিয়ে দেয়, Research Group on the Teaching of Philosophy.

সবকিছুর আগে প্রত্যেক শ্রেণিতে যেখানে অন্য তথাকথিত মৌলিক বিষয়গুলি পড়ানো হয়, সেখানে পর্যন্ত দর্শনশিক্ষা প্রসারণের মধ্যে দিয়ে মোটকথা, যারাই শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্লষণ ও পরিবর্তন করতে চায়, বিশেষ করে দর্শনচর্চার প্রতিষ্ঠান গুলিকে সেই সব শিক্ষকদের, হাইস্কুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের গ্রেফ এক জায়গায় জড়ো করেছে। এই উদ্দেশ্যে ফ্রঁসোয়া মিতেরাঁ খুব যথাযথ অঙ্গীকারমালা তৈরি করেছিলেন। এটা নিয়ে আমরা অনেক আনন্দিত ছিলাম, আর এগুলি যাতে ভেঙে না পরে সেজন্য আমরা সম্ভাব্য সবকিছু করবো, যেমনটা আমরা গত কয়েকমাস করেছি এই ভয়ে যে সেগুলি হয়তো উদ্দেশ্যভ্রষ্ট হয়ে যাবে। সব ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলি থাকবে আর সেই সঙ্গে তারাও থাকবে যারা এগুলির গুরুত্ব নিয়ে সম্পূর্ণ সচেতন আর ওগুলির সঙ্গে মোকাবেলা করবে।

এই সবই রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ও অন্যান্য, বিজ্ঞান, কলাকৌশলগত  গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির আর সংস্কৃতির সম্পর্কগুলিতে একটা গভীর রুপান্তর দাবী করে। যেই মডেলগুলি এখন ধ্বসে পরছে সেগুলি মোটাদাগে শিল্পপণ্যোৎপাদী সমাজের উষাকালে হেগেল, শেলিং, হামবোল্ট, শ্লাইয়েমাকার, নিটশের পথ অতিক্রম করে কান্ট থেকে হাইডেগার, জার্মানির “মহান দার্শনিক”রা,  বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হওয়ার আগে ও পরে আলোচনা করেছিলেন। যখন দর্শন নিয়ে ভাবছে তখন কেনো এদের লেখা আবার পড়ছে না, এঁদের সঙ্গে বা এঁদের বিরুদ্ধে চিন্তা করছে না? যদি কেউ রাষ্ট্র এবং জ্ঞান, কলাকৌশল, আর চিন্তার যুক্তিপ্রয়োগকরণের মধ্যে অন্যান্য সম্পর্ক উদ্ভাবন করতে চায়, কেউ যদি নতুন চুক্তিমূলক গঠনগুলি এগুলির মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে চায় বা তাদের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনকে আমূল বিছিন্ন করতে চায় তখন এইধরনের দর্শনচর্চা অপরিহার্য। এখনই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠানগুলির বাইরে শিক্ষা দেওয়া আর গবেষণার স্থান উদ্ভাবনের চেষ্টা করার প্রয়োজন?