ডিনিজ সানচেজ

পুরস্কার নয়, স্বীকৃতিই শিল্পীর অর্জন হতে পারে ডিনিজ সানচেজ

 

[ডিনিজ সানচেজ। নৃত্যশিল্পী, নির্দেশক ও ডিজাইনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলায় ’ব্যাক আর্ট’ আয়োজিত লাইভ আর্ট বিয়েনাল-এ অংশগ্রহণ করেছেন পুর্তগালের এ শিল্পী। ক্লাসিকাল ব্যালের পাশাপাশি ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় তিনি কাজ করছেন থিয়েটার ও অপেরা ডিজাইন নিয়ে। অধুনা পারফর্মেন্স আর্টস নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি কাজ করছেন নারীবাদ, লিঙ্গ বৈষম্য ও মানবাধিকারের দাবি নিয়ে। প্রথমবার বাংলাদেশ ভ্রমণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে কথা বললেন তিনি একরামুল মোমেনের সঙ্গে।]

 

‘ঢাকা লাইভ আর্ট বিয়েনাল’-এ প্রথমবার বাংলাদেশে কাজ করলেন, এখানকার অভিজ্ঞতা কেমন মনে হলো?

এটা আমার জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। একইসঙ্গে আনন্দের ও ভালোবাসার।  এখানকার দর্শকদের প্রশংসা শুনেছিলাম আগেই, এবারই প্রথম অভিজ্ঞতা হলো। যেহেতু বর্তমানে আমি দিল্লিতে কাজ করছি, তাই বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ ছিল। এখানে সবার বন্ধুত্ব ও আপ্যায়নে আমি মুগ্ধ হয়েছি। 

ঢাকার বাইরে কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে?

কলকাতায় যাওয়ার আগে একদিনের জন্য সিলেট যাচ্ছি। আসাম ও শিলংয়ের কাছাকাছি হওয়ায় আমার জন্য সুবিধাও হবে। সম্প্রতি কুটিয়াআট্টম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এ জায়গাগুলো নিয়ে নতুন করে জেনেছি।

নাচের মাধ্যমে আপনার যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে আপনি পারফর্মেন্স আর্টস-এর জন্যই খ্যাত। নাচ থেকে এ ভিন্ন শিল্পমাধ্যম নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হলেন কেন?

এটা ঠিক, ক্লাসিকাল ব্যালের মাধ্যমেই আমার যাত্রা শুর। তারপর আমি কন্টেম্পোরারি ড্যান্স নিয়েও কাজ করেছি। পারফর্মেন্স আর্টস নিয়ে আমি ভাবনাটা তখন থেকেই শুরু। এ মাধ্যমের সুবিধা হলো, একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয় নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। বলা যায়, এটাও এক ধরণের ড্যান্স থিয়েটার। আর বড় দল নিয়ে কাজ করা ঝামেলা বলেই পারফর্মেন্স আর্টস আমার পছন্দের জায়গা।

আপনার বর্তমান কাজে নৃত্যআঙ্গিক কীভাবে আসে?

ক্লাসিকাল বা সমসাময়িক নাচের একটা নির্দিষ্ট রীতি আছে, পারফর্মিং আর্টস-এর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু নেই। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে দর্শকদের কোন একটি বিষয় উপস্থাপন করতে হয়। সেটা নাচ হতে পারে, অ্যাকশন হতে পারে, ইনস্টলেশন বা থিয়েটার পারফরম্যান্সও হতে পারে। তাই কোন একটি শিল্পমাধ্যমে আটকে থাকার প্রযয়াজন নেই। তবে একটি অন্তর্নিহিত সত্যকে আশ্রয় করেই শিল্পীদের পরিবশেনা। নাচের বাইরেও অনেককিছু সেখানে চলে আসতে পারে।

সাম্প্রতিক দর্শক এ শিল্পমাধ্যম নিয়ে কতটুকু আগ্রহী?

দর্শক আগ্রহ না থাকলে লাইভ আর্ট নিয়ে এখন উৎসব হতো না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ শিল্পমাধ্যম এখন অনেক জনপ্রিয়। আমি মনে করি, একজন শিল্পী তাঁর নিজস্ব  বোধ এবং বিশ্বাস থেকেই এ মাধ্যম নিয়ে কাজ করে। সারবস্তু যদি গভীর কিছু হয়, দর্শক আগ্রহী হবে না কেন? কোন কোন দর্শক যদি সেটি কেবল উপভোগ করে তাতেও সমস্যা নেই। তবে এক্ষত্রে শিল্পীকে শুধু দর্শকের আগ্রহ নিয়ে ভাবলে হয় না, তাঁর নিজস্ব দায়িত্ববোধ থেকে দর্শকদের  বক্তব্যও তুলে ধরতে হয়। এরসঙ্গে শিক্ষকতার সম্পর্কও রয়েছে।  আমি লক্ষ্য করেছি, প্রথমে দর্শক আমাকে দেখে, থামে, কিছুক্ষণ দেখে এবং ভাবনা শুরু করে। যেহেতু নাচের মাধ্যমে আমি তাদের নতুন কিছু বলতে চাইছি, তাই দর্শক কাজটি নিয়ে ভাবেন। কেবলই প্রশংসা বা বিনোদনের জন্য এ মাধ্যম না।

বাংলাদেশের কোন নৃত্যআঙ্গিক নিয়ে আপনার আগ্রহ আছে?

বাংলাদেশের মণিপুরী নাচের প্রতি আমি ভীষণভাবে আগ্রহী। ইউরোপ থেকে ব্যালে শেখার পর ভারতের নৃত্যআঙ্গিক নিয়ে আগ্রহের কারণেই আমি ভারতে আছি। সেখানে ওডিসি, কত্থক, ভরতনাট্যম, মোহিনীআট্টম, কথাকলি অল্প অল্প শিখেছি। এ মুহুর্তে কুটিয়াআট্টম নামে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নাচের তালিম নিচ্ছি । নিখুঁত ফেশিয়্যাল এক্সপ্রেশনের জন্য এ নাচটা উপকারী।এর সঙ্গে আধ্যাত্মিকতারও যোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের কন্টেম্পোরারি কোন শিল্পীর সঙ্গে আমার কাজ হয়নি, ভারতে অনেকের সঙ্গে কাজ করা হয়েছে।

আপনার পরবর্তী কাজের বিষয়বস্তু নিয়ে বলবেন?

বাংলাদেশে আমার যে পরিবেশনাটি ছিল, তা পরবর্তী কাজের একটা অংশ বলা যেতে পারে। ভারতীয় পুরাণের ‘বিশাখা’ চরিত্রটির আধুনিক ইন্টারপ্রিটেশন নিয়ে ‌‌স্পাইস টুটু বয়েজ' নামে পরিবেশনাটি। এটি একইসঙ্গে আইডেন্টি ক্রাইসিস, জেন্ডার ও সেক্সুয়াল ইস্যু নিয়ে। ভারতীয় পুরাণ হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাস্তবতাও এ কাজে ফুটে ওঠেছে। এরপর ভরতের বিধবাদের নিয়েও আমার কাজ করার ইচ্ছা আছে। বছরের শেষে  স্পেনের বার্সোলোনার একটি থিয়েটারে কাজ করার কথাও চলছে।

আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠায় আপনার পরিবেশনার বিষয়টি কতটুকু বিরাজমান ছিল?

ছোটবেলায় আমার বাবা ও মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপর থেকে মা ও নানীর সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। যে কারণে নারীদের মনস্তত্ব নিয়ে আমি বেশি আগ্রহী। মা ও নানীর বিভিন্ন সংকট কাছ থেকে দেখায় আমার ভাবনা বদলে গেছে। আমি নিজেও নারী বা পুরুষের নির্দিস্ট ব্যাকরণে আটকে নেই। ছোটবেলা থেকে আমার খেলতে ভালো লাগত না, বাইরে বেরুতে অস্বস্তি লাগতো। আমার বাবা প্রথমদিকে এসব নিয়ে বাজে ব্যবহার করতো, কিন্তু একসময় আমার পরিচয় আমি স্পষ্ট করেছি। কখনো আমার এ ভ্রমণের জীবন, সম্পর্কহীনতা, একাকীত্ব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এজন্য একটা নির্দিষ্ট সময় আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সে সংগ্রাম যতোটা না সমাজের সঙ্গে, তারচেয়ে বেশি নিজের সঙ্গে।

থিয়েটার ও অপেরা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

সম্প্রতি দিল্লীর একটি অপেরায় কাজ করে ভালো লেগেছে। মূলত ত থিয়েটার হলেও আমি এটি অপেরার মতো ডিজাইন করেছি। এখানে সুর ও নৃত্য প্রধান। ক্যাসিকাল কথাকলি যেমন আছে, মাল্টিমিডিয়া ও ভিডিওচিত্রও আছে। তবে থিয়েটার ডিজাইন করলেও সিনেমাটোগ্রাফি ভালোবাসি। টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য সবসময় এটা অ্যারেঞ্জ করা সম্ভব না হলেও আমি চেষ্টা করতাম, এ মাধ্যমে নতুন কিছু কারার।

পেশা হিসেবে পারফর্মেন্স আর্টস এখনো কতটা চ্যালেঞ্জিং?

পেশা হিসেবে এ মাধ্যম নিয়ে কাজ করা কঠিন একটি কাজ। কারণ একটি কাজের পর আপনি জানেন না পরবর্তী কাজ কাজ কী। এজন্য প্রথমদিকে প্রচুর লেখালেখি করতে হয়। একটা সময় পর আপনি হয়তো আপনার পথ খুঁজে পাবেন, তখন আর কোন সমস্যাকে সমস্যা মনে হবে না। কিন্তু একটা সময় থেকে এখনও আমি হিশেব করি চলি। যেখানে কাজ করে মনে হচ্ছে ভালো কিছু হবে সে কাজটিই করছি। আর সবকিছু না মিললে না করে দিচ্ছি। তবে এ পেশা নিয়ে আমি গর্বিত অন্যকারনে। কারন শিল্প্পী হিসেবে আমি প্রতিদিন আরো বেশি ভালো হয়ে ওঠতে চাই, আর আমি বিশ্বাস করি, এভাবেই ভবিষ্যতের সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ সম্ভব। সভ্যতায় এই এতটুকু অবদান রাখাই আমার জীবনের প্রধানতম লক্ষ্য। 

বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড ও স্বীকৃতি নিয়ে আপনার অভিমত কী?

অ্যাওয়ার্ড নিয়ে আমার কেমন কোন চিন্তা নেই। তবে আমি মনে করি, পুরস্কার নয়, স্বীকৃতি শিল্পীর বড় অর্জন। ব্যক্তিগতভাবে আমি নারী ও পুরুষের মাঝামাঝি তৃতীয় সত্তা নিয়ে কাজ করি। আমার মনে হয়ম ছেলেরা জিম করে অ্যাপসনির্ভর শরীর যদি প্রদর্শন করতে পারে, তাহলে শিল্পীরও অধিকার আছে তাঁর নিজের কথা বলার। এ জন্য বড়োজোড় স্বীকৃতি দরকার। অ্যাওযার্ড কখনো কারও কাম্য হতে পারে না। তাহলে শিল্পীর কাজ একটা পয়েন্টে এসে আঁটকে যাবে।