জয়নুল আবেদিন

কালো রং দিয়ে যে এত রংকে এক্সপ্রেস করা যায়, সেটা আমি সেদিনই বুঝলাম, যেদিন আমি দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকতে শুরু করলাম জয়নুল আবেদিন

 

[বিবিসির জন্য সিরাজুর রহমান কর্তৃক এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও প্রচার করা হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৯১ সালে বিবিসির বাঙলা বিভাগের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে লন্ডন থেকে বলছি শীর্ষক ম্যাগাজিনে এটি প্রকাশিত হয়। এবং পরে সৈয়দ আজিজুল হক সম্পাদিত জয়নুল আবেদীন জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলিতে সংযোজিত হয়।]

 

আবেদিন সাহেব, আপনার সঙ্গে আলোচনা আমরা এই বলেই শুরু করছি যে, শিল্প ও সংস্কৃতি সেবার বিভিন্ন রকম মাধ্যম থাকতেও আপনি বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমটা বেছে নিলেন কেন?

আপনার প্রশ্নটি খুব ছোট, কিন্তু আমার পক্ষে উত্তর দেওয়া খুব শক্ত। উত্তর যা আছে তা বড় এলোমেলো। তার ওপর আমি নিজেও কোনোদিন ভেবে পাইনি যে, কেন আমি এদিকে ঝুঁকলাম।

তবু তো একটা কারণ আছে। আপনার কী মনে হয়?

ছোটবেলার স্মৃতিগুলো এখনো আমার মনে লেগে রয়েছে। অনেক চেষ্টা করেছি তাকে ব্যক্ত করতে। জানি না কবে, কী করে এই মাধ্যম, এই অভিব্যক্তি আমার জীবনে এলো। সেই থেকে এঁকে যাচ্ছি কতভাবে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর কত দেশ, কত মানুষ, কত অভিব্যক্তির সঙ্গে। কিন্তু ভুলিনি এখনো আমার সেই ছেলেবেলাকার পরিবেশ, সেই অনুভূতি। কত নদীর বাঁক, কত গঠনের মেঘ, কী সুন্দর এই ষড়ঋতুর দেশ, এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশ, হাসিকান্না। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে আমার ইতস্তত ভাব বেড়ে চলেছে। প্রকাশভঙ্গিও জটিল হয়ে চলেছে।

আপনার প্রশ্ন থেকে আমি অন্যদিকে সরে যাচ্ছিলাম। আমি তো আগেই বলেছি, বড় এলোমেলো প্রশ্ন। আমি ছোট্ট একটা কথায় আপনার জবাব দেবার চেষ্টা করছি। আমার এক বন্ধু একদিন আমার খুব প্রশংসা করতে শুরু করল। প্রশংসা করতে করতে শেষ বেলায় সে বলল, জয়নুল লাইনটা তুমি ভালোই ধরেছিলে। উত্তরে বললাম, জানি না লাইনটা আমি ধরেছি—না লাইন আমাকে ধরেছে। তো আমার মনে হয়, এই লাইনটা আমাকে ধরেছিল, এখনো ধরে রেখেছে।

অর্থাৎ শিল্পবোধের যে তাড়না আপনি অনুভব করেছিলেন তার থেকেই শিল্পসৃষ্টির, রংতুলির সাহায্যে শিল্পসৃষ্টির তাড়না থেকেই আপনি ছবি আঁকতে এলেন, এটাই আপনার মনে হচ্ছে?

হয়তো অন্যদিকেও হতে পারত। ধরুন এমনটা, পানি থেকে খুব বড় বড় বাবলস উঠেছে, এর মধ্যে থেকে ছোট্ট একটা বাবলসও হঠাৎ করে অনেক ওপরে উঠে যায়। কী করে যায়? হয়তো কোনো প্রেসারে পড়ে যায়। আমি হয়তো সুরের রাজ্যে, হাসি-কান্নার রাজ্যে এমনি একটা প্রেসারে পড়ে ছিটকে বেরিয়ে এসেছি। জানি না ঠিক কীভাবে। আমার মনে হয়, সেই সুন্দর নদী, সুন্দর আমার দেশ আমাকে ইন্সপায়ার করেছে।

শিল্পী হিসেবে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন আপনি। আপনার ছবি বিভিন্ন দেশে দেখানো হয়েছে। কিন্তু গোড়াতে চারুশিল্পের কাজ থেকে যে তৃপ্তি, যে আনন্দ আপনি চেয়েছিলেন, এতদিনে ছবি আঁকার পর আপনার কী মনে হয় আপনি কি সেই তৃপ্তি পেয়েছেন?

এ প্রশ্ন বড় ইয়ে প্রশ্ন। তৃপ্তি আর আনন্দের কথা আমি কখনো ভাবি না। এইটুকু আঁকার জীবনে কি আর তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব?

অনুভূতির তাগিদে যেটুকু আনন্দের ছোঁয়া পাই, সে আনন্দে আমার মনে হয় বেদনাই ভর্তি। আশার আনন্দে কাজ করতে প্রেরণা পাই, এই যা। নিজের পরিবেশ ও আরো দশজনের মধ্য দিয়ে আনন্দ ও তৃপ্তি খুঁজে পাওয়াই আমার কাজ। শুধু শিল্পের খাতিরে শিল্প করাতে আমি বিশ্বাসী নই। শিল্পীর স্বকীয়তায় বিশ্বাসের আগে আমি একটি দেশের শিল্পের স্বকীয়তায় বিশ্বাসী। এটাই আমার মতে ইউনিভার্সাল। অন্যের যা ভালো, তা গ্রহণ করব; আগে নিজেকে জেনে।

আচ্ছা, সাধারণ মানুষের কাছে আজকাল একটা শিল্পকে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টা শুধু আমাদের দেশেই কেন, দুনিয়ার সব দেশেই চলছে। এই আন্দোলনটা হচ্ছে শিল্পকে, সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। অথবা ঘুরিয়ে বলতে গেলে, সাধারণ মানুষের মনও শিল্পকে গ্রহণ করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনের যাঁরা উদ্যোক্তা, তাঁরা বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনেও শিল্পের প্রয়োজন আছে। এই প্রয়োজনটা কী, আপনি বলুন না!

সুকুমার শিল্পগুলোর মধ্যে চিত্রশিল্প একটা বিশেষ মাধ্যম, সেটা স্বীকার করতেই হবে। এককভাবে মূল্যবোধ যাচাই করতে যাওয়া সম্ভব নয়। অন্যান্য সুকুমার শিল্পগুলোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে এ শিল্প জড়িত। প্রবাদ আছে যে, যে দেশে চারুশিল্প যত উন্নত, কারুশিল্পও তত উন্নত হয়ে থাকে। চারু ও কারুশিল্প দিয়ে বিচার করা চলে যে, এই জাত কতটা উন্নত।

এক কবি সেদিন আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, একজন সাধারণ মানুষ, যে হয়তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অন্য কিছু হতে পারে, আন্তরিকতা নিয়ে চেষ্টা করলে হয়তো কবিও হতে পারে। আপনার মতে শিল্পীর ব্যাপারেও কি সে কথা প্রযোজ্য হতে পারে?

যে কেউ যে-কোনো রকম শিল্পী হতে পারে। সেটা নির্ভর করে তার প্রেরণা এবং পরিবেশের ওপর। সত্যিকার শিল্পী হতে হলে আমার মনে হয়, তার মধ্যে কয়েকটা গুণ থাকা প্রয়োজন। এগুলোর একটি হচ্ছে Ñ শিশুর মতো সহজ সরল এবং সুন্দর একটা মন। পরে আরো প্রয়োজন অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি। শুধু অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি হলেও আবার চলবে না, সত্যিকার সৃষ্টির সন্ধানে থাকতে হবে এবং রাখতে হবে সত্যিকার রস ও অনুভূতি রাজ্যের খোঁজ।

আচ্ছা আবেদিন সাহেব, আপনার বন্ধুরা এবং আপনার ছবির সমঝদাররা, যাঁরা আপনার ছবি আঁকার ইতিহাস সম্পর্কে জানেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে আপনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ করে থাকেন। তাঁরা বলেন যে, আপনি যখন আঁকতে শুরু করেন, তখন নানা বর্ণের নানা রঙের ছবি আঁকতেন। আর তা দিয়ে মানুষের রং দেখার যে বাসনা, তা পূর্ণ হতো। কিন্তু তাঁরা বলছেন, আপনি পরিণত বয়সে গিয়ে নানা রং বাদ দিয়ে শুধু কালো রং দিয়ে ছবি আঁকছেন। আপনি বলবেন কি, আপনি শুধু কালো রং দিয়ে ছবি আঁকেন কেন?

দেখুন অনেকে মনে করেন, আমি স্যাডিস্ট। দুর্ভিক্ষের সময়ে আঁকা ছবিগুলো দেখার পর থেকেই এ কথাটার বেশি প্রচলন হয়েছে।

আপনার কালো রঙের সঙ্গে দুর্ভিক্ষের কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল কি?

না, কালো রং দিয়ে যে এত রংকে এক্সপ্রেস করা যায়, সেটা আমি সেদিনই বুঝলাম, যেদিন আমি দুর্ভিক্ষের ছবি আঁকতে শুরু করলাম। আমি যে মন দিয়ে, সিনসিয়ারিটি দিয়ে একটা ময়ূরকে আঁকি, আমি সেই সুন্দর মন এবং সরলতা দিয়ে একটা শকুনকেও আঁকি। আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। সেটা হলো—একবার জাপানে আমি পৃথিবীর একজন খুব বিখ্যাত লোকের সঙ্গে বসে খাচ্ছি। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলেন, আমার কী রকম লাগছে এই জাপান দেশটা। তখন আমি এক কথায় বললাম, আমি খুব গরিব এবং খুব ধনী, দুজনেরই বাড়ি দেখলাম, আমি জানি না, কোনটাকে বেশি ভালো, বেশি সুন্দর বলব আমি। রুচিবোধের এই সমতা আনা জাপানি জাতির সম্ভব হয়েছে, এই জন্য যে, তারা বাহুল্য জিনিসকে বাদ দিয়ে সব কিছুকে মিনিমাইজ করেছে। আর এই মিনিমাইজেশন সবার মধ্যে সমানভাবে এসেছে। এটাই সবচেয়ে বড় জিনিস। আমি একটা কালো রঙের আঁচড় দিয়ে যে বহু রঙের সমাবেশ দেখতে পাই, অনেক রং দিয়েও আমি হয়তো তা প্রকাশ করতে পারি না। কারণ এত রং ও সরঞ্জাম দিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে আমার আসল অনুভূতিতে আঘাত লাগে, ব্যাঘাত ঘটে।

অর্থাৎ বেশি রঙের দিকে নজর দিতে গিয়ে আপনি মূল বিষয়ে মনোযোগ দেবার অবকাশ কম পান?

হ্যাঁ, তবে তাই বলে আমি এ কথা বলব না যে, আমি রং দিয়ে আঁকতে ভালোবাসি না। আসলে সেটা বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে।

আপনার কালো রং নিয়ে আমি সেদিন এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছিলাম। তিনি বলছিলেন যে, আবেদিন সাহেব যুদ্ধের সময়ে, দুর্ভিক্ষের সময়ে শুধু কালো রং দিয়ে ছবি আঁকতেন। তখন রং পাওয়া যেত না, কিনতে পারতেন না। সেই অভ্যাসটাই তাঁর রয়ে গেছে।

সে অভিযোগ অনেকে করেন। চিত্রশিল্পী এল গ্রেকোর বাড়িতে আমি গিয়েছি তাঁকে দেখতে। তাঁর বিরুদ্ধে একটা অপবাদ রয়েছে যে, তিনি চোখে কম দেখতেন বলেই তাঁর ছবির ওই রকম একটা লম্বাটে ভাব। ওনার সঙ্গে দেখা করার পর আমার তা মনে হয়নি। আমার বেলায় এটা ঠিক, তখন রং এবং কাগজ কিছুই ছিল না। রং-তুলি খুঁজে বের করার মতো সময় এবং ইচ্ছা তখন ছিল না। হাতের কাছে তখন যা পেয়েছি, তাই দিয়েই এঁকেছি।