রাজীব দত্ত

শুধু কবিতাই নয়, সকল রকমের আর্টই তো এক ধরনের আত্ম-মৈথুন রাজীব দত্ত


 

[রাজীব দত্ত। মূলত একজন কবি, কথাসাহিত্যিক ও ভিজুয়াল আর্টিস্ট। এছাড়া অনুবাদও করেন। জন্ম চট্টগ্রামে। পড়াশোনা করেছেন চট্গ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা। তার সঙ্গে কথাবলির পক্ষ থেকে শিল্প-সাহিত্যসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছি সম্প্রতি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]


কবি, কথাসাহিত্যিক, চিত্রী কোন পরিচয়ে তোমার নিজেকে ভালো লাগে?

ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন পরিচয়ে থাকতে চাই। এটা আসলে ডিপেন্ড করে ।

কেনো আঁকো?

সব কিছু লিখে বলতে পারি না বলেই মনে হয় ছবি আঁকি।

আর কেনো লিখো?

সব কিছু এঁকে প্রকাশ করতে পারি না বলেই হয়তো লিখি। এইরকম। তবে লেখালেখির বিষয়টা স্বমেহনের মতো। অথবা, আমার যে আশপাশ, যার ভেতরে আমাকে বেঁচে থাকতে হয়, তাকে নিজের মতো করে মোকাবেলা করার একটা নিষ্ফল চেষ্টা। সবচে ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে।

তোমার প্রিয় চিত্রশিল্পী কে?

অনেকেই তো। কেইভ পেইন্টিং যেমন টানে, ওয়ারহলও ভালো লাগে। ফ্রিদা কাহলো যেমন, তেমনি ব্যাঙ্কসিও পছন্দের।

বাঙলাদেশের শিল্পসাহিত্যের ভবিষ্যত কী বলে তোমার মনে হয়?

ভবিষ্যত তো জানি না। মানুষ কি ভবিষ্যত বলতে পারে আসলে?

পৃথিবীর সমকালীন শিল্পকলা সম্পর্কে তোমার অবজার্বেশন কী?

এখনকার আর্টিস্টরা সম্ভবত পেইন্টিং, স্কাল্পচার, প্রিন্টমেকিং এইভাবে ক্যাটাগরাইজ করে না। তারা সবগুলিকেই ভিজ্যুয়াল আর্ট বলে মেনশন করতেছে। কারণ হচ্ছে, একটা আরেকটা সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে শিল্পী নিজের গায়েই নিজেই পেইন্ট করতেছে। আবার পারফর্মও করতেছে। গ্যালারির ফ্লোরে আঁকতেছে। ক্যানভাসেই টেক্স্ট লিখতেছে। ভিডিও প্রজেক্শন করতেছে। বিজ্ঞাপন রিপ্রোডিউজ করতেছে। বিজ্ঞাপণ ছাপাচ্ছে। কিংবা কোথাও কিছু নাই। খালি সাউন্ড। পুরা রুম জুড়ে। এরকম নানা কিছু। এগুলি নানান ডাইমেনশন।

নতুন করে কিছু আঁকার আছে বলে তো আমার মনে হয় না। তাই কি রিপ্রোডাকশন হচ্ছে বলে তোমার মনে হয় না?

হ্যাঁ, আপনার পয়েন্ট থেকে বললে, মানুষের যা আঁকার তা মনে হয় হয়ে গেছে। নতুন কিছু আঁকার নাই। নাই বলেই হয়তো নানা ডাইমেনশন যুক্ত হচ্ছে। একটা মাধ্যমের সীমাবদ্ধতাকে আরেকটা দিয়ে কাভার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রকৃতঅর্থেই কিন্তু তাইই। যাইহোক, আমার মনে হয় সালভেদর দালি, ফ্রান্সিস বেকন, মকবুল ফিদা হোসেন প্রমুখের প্রভাব আমাদের সমকালীন শিল্পকলায় ব্যাপক। তোমার মত কী?

হ্যাঁ, প্রভাব আছে। তাদের প্রভাব যেমন আছে, লোকজ শিল্পীদের আঁকার আঙ্গিকের প্রভাবও কম না। আমার অইটাই বেশি লাগে। স্কিল কে এভয়েড করা। নাইভভাবে আঁকা।

অন্য প্রসঙ্গে যাই এখন। কখনো কি অভিনয় করতে ইচ্ছে করেছে তোমার?

করে নাই। কিন্তু করেছিলাম কয়েকবার। অস্বস্তিকর। সবাই আমার দিকে তাকায় আছে, এটা আমার কাছে আনইজি লাগে।

তোমার প্রিয় ফিল্মমেকার কে? এবং কেনো?

অনেককেই ভালো লাগে এককজনের একেকটা দিক। নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

শিল্পে ইনস্টলেশন বিষয়টা কেমন লাগে?

ভালো তো।

কী তোমাকে সবচে’ বেশি আকর্ষণ করে?

বেঁচে আছি এটাই বেশি আকর্ষণ করে। কতজন কতভাবে মারা যাচ্ছে। এই জেনে ভাগ্যবান মনে হয় নিজেকে।

প্রথম মদ খাওয়ার অভিজ্ঞতা বলো।

বিষণ্ন লাগতেছিল তখন খুব। কোথাও কেউ নাই টাইপ।

আর প্রথম চুম্বনের স্মৃতি?

আমার সঙ্গে কারো প্রেম হয় নাই এখনো…

 

 

লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলো।

স্কুলে পড়তে পড়তে মনে হয় লিখতে আগ্রহী হই। যার লেখা পড়তাম ভালো লাগতো, তার মতোই লেখার একটা চেষ্টা করতাম। মনে হয় আমাকেও কেউ গুরুত্ব দিক এই ইচ্ছাও থাকতো মনে মনে।

আর আঁকাআঁকির শুরুটা…

আমাদের যৌথ ফ্যামিলিতে আমার মাকে অনেক কাজ করতে হতো। একা একা। আমার মা আমাকে সামলানোর জন্য কাগজ- কলম দিয়ে বসিয়ে রাখতো। যেনো ব্যস্ত থাকি। ফুল একেঁ দিতো। অইটার ওপর হাত ঘুরাইতে বলতো। এইভাবে। আমার মা সুন্দর আঁকেন।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতে?

কতকিছু যে হতে চাইতাম। যারাই আমাকে টানতো তাদের মতো হতে চাইতাম। আইসক্রিমঅলা থেকে মুদির দোকানদার, প্রতিমার কারিগর সব।

নিয়মিত কারো কবিতা পড়তে কি ভালো লাগে?

জীবনানন্দ, বিনয় এদের এখনো পড়তে পারি। বোর লাগে না, সামগ্রিকভাবে।

কেনো জীবনদাশের কবিতা আমরা বারবার পড়ি, সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না?

শুধু বুদ্ধি দিয়ে আর্ট হয় না বলেই হয়তো।

লেখকের দায় সম্পর্কে তোমার মত কী?

একজন রিকশাঅলার চেয়ে একেজন লেখক-শিল্পী কারো দায়ই বেশি না। একটুও না। অধিকারও।

তোমার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

অনেকেই এরকম মে বি। আমি তো অনেকের লেখাই পড়ি নাই। অনেক ব্যতিক্রমও আছেন। তবে এতো তাড়াড়াড়ি সিদ্ধান্তে না এসে আমরা অইসকল কবিদের শেষ বইটার জন্য পর্যন্ত ওয়েট করা বেটার।

কবিতায় স্টান্টবাজি নিয়ে বলো।

স্টান্টবাজি আছে। সব পেশাতেই। দুধ দই যেমন দরকার তেমন চানাচুর জাতীয় খাবারেরও প্রয়োজন আছে। তো থাকুক। যার যেমন স্বাদ আর কি।

তোমার সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে বলেন

বৈচিত্র্য কম এখনো। সময় দরকার সম্ভবত। আরো সময় পরে বলা যাবে।

তোমার কবিতা লেখার পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

কতো জনের যে আছে! আমার সময়ের সাম্প্রতিক ভালো লাগা কবিতাটারও অনুপ্রেরণা আমি নিই।

কবিতা কী তোমার কাছে?

শুধু কবিতাই নয় সব রকমের আর্টই এক ধরনের আত্মমৈথুন। সব মানুষেরই আত্মমৈথুন জরুরি। অন্য প্রাণিদের কথা জানি না। তাদেরও দরকার হয় হয়তো।

দশক বিভাজন বিষয়ে তোমার মত কী?

দশকের বিভাজনটা কি উদ্দেশ্য এটা একটা বিষয়। থাকলেও ক্ষতি নাই। না থাকলেও ক্ষতি নাই। অনেকদিন তো ছিল না। তবে অধ্যাপকদের লাগে। আর অধ্যাপকদের দরকারটা তো আমরাই তৈরি করে দিয়েছি।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখো তাদের কবিতা বিষয়ে বলো

বলা কঠিন। কতোজন যে লিখেন। আমি কতজনকে চিনি আর। যাদের চিনি তাদেরও অইভাবে পড়ি নাই। কবিতা পড়তে ভালো লাগে না অনেক দিন।

এই সময়ে এসে কবিতায় প্রথাগত ছন্দের প্রয়োজনীতা কি আছে? থাকলে কেনো আছে?

কোন গ্রামার না জেনেও, আজকের দিনেও মনে রাখার মতোন ছবি একেঁছেন এরকম শিল্পী মেলা। ছন্দ জিনিশটাও অইরকম। কী দরকার। অবশ্য যার দরকার তিনি লিখুন। আমার আপত্তি নাই।

লেখালেখি প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে তুমি কীভাবে দেখো?

বেশ পজিটিভলি দেখি। প্রকাশক-সম্পাদকের এলিটনেস ভেঙে গেছে এইখানে এসে।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে দলবাজি/সিন্ডিকেট এই ব্যাপারগুলিকে কীভাবে দেখো?

থাকে এগুলি। খারাপও না খুব। আমি যখন ছাপাবো, আমার পছন্দের লেখাই তো ছাপাবো। এটাই সিন্ডিকেট। আর আমি চাইলেও সবার লেখা ছাপাইতে পারবো না। যাদের লেখা ছাপাইতে পারবো না, তাদের কাছে আমি দলবাজই। একজন নিয়েও দল হয় অনেকসময়।

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরস্কারগুলি প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে? রাখলে কী ভাবে?

কে দিচ্ছে এটা একটা বিষয়। আমার প্রিয় লেখক যদি আমাকে আমার লেখা ভালো লাগার কারণ হিশেবে কিছু দেয় এটাও পুরস্কারই । নিতে খারাপ লাগবে না তো্। এর বাইরে দেখলে, কেউ যদি আমাকে একলক্ষ টাকা দেয়, আর আমার যদি দরকার থাকে নিবো না কেন। অভাবে অভাবে শহিদ হওয়ার মধ্যে কৃতিত্ব নাই মোটেও। মৃত্যুর পর চিতার ওপর সৌধ দিয়ে লাভ কী? তারপরও যারা আছেন, এরকম চাহিদামুক্ত, তাদের পরকাল বিশ্বাসী আস্তিকেদের মতো লাগে। তবে আমার লেখা যদি ভালো হয়, পুরস্কার পাইলেও ভালো থাকবে, না পাইলেও ভালো থাকবে। স্বীকৃতিই তো পুরস্কার।

অনেকে মনে করেন প্রেমসংলগ্ন মানেই ব্যর্থ কবিতা। তুমি কী মনে করো?

সবই তো প্রেম এই দুনিয়াই। কোনোটা ঈশ্বরপ্রেম, কোনোটা জীবপ্রেম। প্রেম ছাড়া কীভাবে সম্ভব। আত্মপ্রেম বলেও তো একটা বিষয় আছে। সব কবিতাই প্রেমসংলগ্ন। আর ব্যর্থ কবিতা বলতে কিছু নাই তো। ব্যর্থ হইলে আর কবিতা কেমনে?

তোমার প্রিয় কথাসাহিত্যিক কে এবং কেনো?

অনেকেই। যারাই আমার গণ্ডিটাকে আরো একটু বড় করে দেন, কোনো না কোনোভাবে, তারাই আমার প্র্র্র্রিয়।

তোমার প্রথম বই প্রকাশের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা কী?

বিষয়টা একইসঙ্গে আনন্দের এবং অস্বস্তির।

পরবর্তী বই কখন করবে?

এখনো নিশ্চিত না।