নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

যে প্রচ্ছদ তেমন ভালো হয় না, খোঁজ নিলে জানা যাবে সেই প্রচ্ছদে লেখক/প্রকাশকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে নির্ঝর নৈঃশব্দ্য


 

[নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। মূলত কবিতা লিখেন। এর বাইরে গল্প লেখাসহ সাহিত্যালোচনা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এইসবও করে থাকেন। এবং ছবি আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা। প্রকাশিত বই : 'পাখি ও পাপ' (২০১১, কবিতা), 'শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প), কাপালিকের চোখের রং' (২০১৩, কবিতা), 'পুরুষপাখি' (২০১৪, মুক্তগদ্য), 'আরজ আলী : আলো-আঁধারির পরিব্রাজক' (২০১৫, প্রবন্ধ), 'মহিষের হাসি' (২০১৫, কবিতা), 'রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয়' (২০১৬, গল্প), 'আকাশ ফুরিয়ে যায়' (২০১৭, মুক্তগদ্য), 'হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস' (২০১৭, কবিতা)। সম্পাদিত বই : 'ওঙ্কারসমগ্র : বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণের শ্রুতিলিপি' (২০১৭)। সম্পাদিত ছোটোকাগজ :' মুক্তগদ্য' । এ ছাড়া পূর্বে আরো সম্পাদনা করেছেন জলপত্র, চারপৃষ্ঠা মেঘইত্যাদি। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন জুয়েইরিযাহ মউ। কথা হয় মূলত প্রচ্ছদশিল্প নিয়ে। সাক্ষাৎকারটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছে বাংলামেইল২৪ডটকম এর শিল্পীমুখ পাতায়। কথাবলির পাঠকদের জন্যে সাক্ষাৎকারটি আবার প্রকাশ হলো।]

 

আপনি প্রচ্ছদ আঁকেন কবে থেকে? মানে চারুকলা থেকে বের হওয়ার পর না আগে থেকেই?

আমি ১ম প্রচ্ছদ এঁকেছি ১৬ বছর আগে, ২০০০ সালে। চারুকলায় (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হয়েছি ২০০০ সালে। আমাদের এলাকার এক প্রবীণ কবি তার কবিতার বই করবেন। সেই প্রচ্ছদ ‘ঋতবর্ণ’ প্রকাশনের প্রকাশক ইবরাহীম মুহাম্মদ আমাকে দিয়ে করালেন। প্রকাশক আমার খুব প্রিয় মানুষদের একজন। তিনি আমার প্রথম কবিতার বই ‘পাখি ও পাপ’-এরও প্রকাশক।

আচ্ছা তার মানে হুট করে আসা। প্রচ্ছদ কে কি আপনার পৃথক শিল্প মাধ্যম মনে হয় ?

হুট করে আসা বলা যাবে কিনা জানি না। তবে প্রচ্ছদ করবো এই রকম বাসনা আমার মধ্যে ছিলো। পূর্ণেন্দু পত্রীর করা প্রচ্ছদ দেখে এই বাসনা আমার তৈরি হয়েছিলো। প্রচ্ছদ অবশ্যই পেইন্টিং থেকে আলাদা। প্রচ্ছদ মানে মলাট। একটা মলাটের প্রথম শর্ত হলো অবশ্যই সেটা দৃষ্টিনন্দন হতে হবে। আর একটা পেইন্টিং দৃষ্টিনন্দন হতে হবে এমন কোনো শর্ত নাই।

শুধু দৃষ্টি নন্দন হতে হবে এটাই কি বিষয়। আপনি কি মনে করেন প্রচ্ছদ সম্পূর্ণ বইটাকে রিপ্রেজেন্ট করে?

আমি শুধু দৃষ্টি নন্দন হতে হবে তা বলি নাই। বলেছি দৃষ্টি নান্দনিকতা প্রচ্ছদের প্রথম শর্ত। এরপরে বাকি শর্তগুলি পূরণ করতে হবে। আর প্রচ্ছদেরও ধরন আছে। গল্প/উপন্যাসের প্রচ্ছদ এক রকম হতে হবে, কবিতার প্রচ্ছদের ধরন আরেক রকম। এইভাবে গদ্য/প্রবন্ধ ইত্যাদি। আর বইয়ের প্রচ্ছদ পুরোটা বইকে রিপ্রেজেন্ট করবে এমন কোনো শর্ত নাই। বইয়ের ভিতরকার বিষয়ের সঙ্গে সংগতি থাকলেই হয়।

বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরিতে কতটুকু স্বাধীনতা পান? লেখকের কাছ থেকে প্রচ্ছদ সম্পর্কে কোন অনুরোধ বা ইন্সট্রাকশন থাকলে কিভাবে দেখেন ?

অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। তবে স্বাধীনতা আমি নিজেই নিয়ে নিই। বলি, আমি কারো ইন্সট্রাকশনে কাজ করি না। পাণ্ডুলিপি/সারাংশ পড়ে নিজের মতো করে করি। তবে দুয়েকজন প্রতিবছর পাওয়া যায়, যাদের আইডিয়া থেকে এমন কিছু উপাদান/ইংগিত পাওয়া যায়, যা আমার মাথায়ও ছিলো। এছাড়া লেখকের ইন্সট্রাকশনে কাজ করতে গেলে সেই কাজ অতিশয় বাজে হয়। এবং পারতপক্ষে আমি তা করি না। যদি কঠিন অনুরোধে করতেই হয় তবে তার ক্রেডিট আমার নামে না দিতে অনুরোধ করি। কিন্তু আমার সেই অনুরোধ দেখা যায় শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয় না।

তার মানে প্রচ্ছদশিল্পীর ভাষা এসব ক্ষেত্রে লেখকের ভাষার সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে কখনো কখনো?

কথা সেটা নয়। লেখক আর প্রচ্ছদশিল্পীর প্রকাশের মাধ্যম তো ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন লেখকের ছবির রং, কম্পোজিশন, ধরন এইসবের জ্ঞান তেমন থাকে না। না থাকাই স্বাভাবিক। তিনি হয়তো প্রচ্ছদ কেমন হবে তার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু ভিজুয়ালি তা দেখতে কেমন হবে তা ভাবতে পারেন না। তাই লেখকের উচিত প্রচ্ছদশিল্পীর ওপর নির্ভর করা। কারণ একজন প্রচ্ছদ শিল্পী এই লাইনে আসেন দীর্ঘদিনের একাডেমিক পড়াশোনা, জানাশোনা আর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

প্রচ্ছদ কি বই এর মূল্যমান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। যদি তা হয় তবে প্রচ্ছদ যতটা না শিল্প তারচে বেশি কি বিজ্ঞাপন নয়? তাহলে প্রকাশক/লেখক তো কথা বলতে পারে, না কি?

প্রচ্ছদ বইয়ের মূল্যমান কখনো নির্ধারণ করে না। বইয়ের ভিতরের বস্তু ভালো না হলে সুন্দর প্রচ্ছদের বই কেউ কেনার কথা না, আমি নিজে অন্তত কখনো কিনি না। একটা বইয়ের প্রথম বিষয় প্রচ্ছদ নয়, ভিতরকার বস্তু। তবে প্রচ্ছদকে আমি বিজ্ঞাপন ওই অর্থে মনে করি না। প্রচ্ছদ অনেকাংশে বইয়ের জামা। আর প্রচ্ছদশিল্পী সেই জামাটাকে যতটা সম্ভব সুন্দর করে বানানোর চেষ্টা করেন। আর খানিকটা অবশ্যই বিজ্ঞাপন। যে বিজ্ঞাপনের আকর্ষণে পাঠক বইটাকে স্পর্শ করবে উল্টেপাল্টে দেখবে, আর ভিতরের বস্তু ভালো বলে মনে হলে কিনবে বা লেখকের নাম দেখে কিনবে। আর যে অর্থে অধিকাংশ লেখক/প্রকাশক আর্ট বোঝে না, সেই অর্থে তাদের পছন্দ অপছন্দের দাম দিতে গেলে জিনিশটা ভালো হয় না। কারণ একজন প্রচ্ছদ শিল্পী জানেন কোনটা দেখে পাঠকের ভালো লাগবে বা লাগবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে প্রচ্ছদশিল্পী প্রফেশনাল।

একাডেমির কথা বললেন, একাডেমিক পড়াশোনা বিশেষত প্রচ্ছদ শিল্পী সৃষ্টিতে বাংলাদেশে কতটা ভূমিকা রাখছে?

বাংলাদেশে প্রচ্ছদ শিল্পীর সংখ্যা কিন্তু ১০ এর মধ্যেই। আর যারা প্রচ্ছদ করেন তারা প্রত্যেকেই একাডেমিকভাবে শিক্ষিত। একাডেমিক শিক্ষার ভূমিকা অবশ্যই আছে। আর যারা প্রচ্ছদ করেন তারা অবশ্যই প্রচ্ছদ নিয়ে ভাবেন। যে প্রচ্ছদগুলি আপাতদৃষ্টিতে আমাদের চোখে ভালো লাগে না খোঁজ নিয়ে দেখলে জানতে পারবেন সেইসব প্রচ্ছদে লেখক/প্রকাশকের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

একাডেমি সিলেবাসে প্রচ্ছদ শিল্পকে আলাদাভাবে বিবেচনা করলে সংখ্যাটা বাড়বে বলে কি মনে হয়?

প্রচ্ছদশিল্প নিয়ে আলাদা ভাবে পড়ানো হয় না। তার দরকারও নেই। কারণ একাডেমিতে টেকনিক শেখানো হয়, ক্রিয়েটিভি শেখানো হয় না। ক্রিয়েটিভিটি তৈরি হয় শিল্পীর মাথায় নিরন্তর কাজ, পড়াশোনা এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই আর্টের টেকনিক জানা একজন মানুষ যদি সৃজনশীল চিন্তা করতে পারেন তবে শিল্পের যে কোনো মাধ্যমে তিনি কাজ করতে পারবেন। তাই টেকনিক এবং  ক্রিয়েটিভিটি পরস্পরের পরিপূরক।

প্রচ্ছদ করার ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেন?

রংটাকে প্রাধান্য দিই। বইয়ের থিমের সঙ্গে মিলিয়ে রং ব্যবহার করি।

প্রতিটি বই কি পাণ্ডুলিপি পড়ে প্রচ্ছদ করা সম্ভব হয়? বা এটা কি মানেন যে বই পাণ্ডুলিপি পড়েই করতে হবে।

পাণ্ডুলিপি সবক্ষেত্রে পড়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে লেখক একটা সারাংশ লিখে দিয়ে দেন সেটা পড়লেই বোঝা যায়। এবং সেটা পড়েই করি। আর কবিতা বইয়ের ক্ষেত্রে নাম কবিতাটা পড়লেই চলে। আর প্রবন্ধ/গদ্যের বইয়ের কমন একটা ফরমেট আছে তাই পড়া তেমন দরকার হয় না। একটু  উল্টেপাল্টে দেখলেই প্রচ্ছদের আইডিয়া পাওয়া যায়। আর আমি অবশ্যই মনে করি না যে প্রচ্ছদ সবসময় বইয়ের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলতে হবে।

এবার মেলায় তো অনেকগুলো প্রচ্ছদ করলেন। এত এত বইয়ের প্রচ্ছদ করতে গিয়ে মানের দিক দিয়ে কি কিছু বইয়ের প্রতি অবিচার করা হয় না? অথবা ধরুন পুনরাবৃত্তি কি ঘটে ?

প্রথম কথা, আমি প্রফেশনালি প্রচ্ছদ করি না। মানে লেখক/প্রকাশকের কাছে আমি যাই না। কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের প্রচ্ছদ করে দিই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখকরাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, প্রকাশক দুয়েকজন। এইবার প্রচ্ছদ করেছি দুইশোটার মতো। অধিকাংশই ফ্রি করেছি। আমি নিজে থেকে কোনো বইয়ের প্রতি অবিচার করি না। অবিচার হলে সেটা লেখকের কারণেই হয়। কারণ ধরেন, আমি অনেক যত্ন করে একটা প্রচ্ছদ করলাম আর সেটা লেখকের পছন্দ হলো না, আমাকে অনুরোধ করলেন আরেকটা প্রচ্ছদ করে দিতে, তখন আমি তার জন্য যেনোতেনো একটা প্রচ্ছদ করে দিই। দেখা যায়, সেটা তার খুবই পছন্দ হয়ে গেলো। এই আরকি। আর প্রতিবছর অনেক নিম্নমানের বইয়ের প্রচ্ছদও আমাকে করতে হয়, সেক্ষেত্রে বরং সেইসব বইয়ের প্রতি আমি সুবিচারই করি।

হাহাহা, আচ্ছা আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের বইগুলির প্রচ্ছদের স্বতন্ত্র কোনো দিক আছে? মানে দেশভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রচ্ছদের স্বকীয়তার জায়গা কতটুকু?

অবশ্যই আছে। বাঙলাদেশের বই ভালো হোক বা মন্দ হোক অধিকাংশ প্রচ্ছদ দৃষ্টি নন্দন হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা। এছাড়া বাইরের বইয়ের প্রচ্ছদ আমার তেমন একটা ভালো লাগে না।

বর্তমান প্রচ্ছদ শিল্পের সংকটগুলো কী?

বর্তমান প্রচ্ছদশিল্পের প্রধান সংকট টেকনিকালি এবং আইডিওলজিকালি অপেশাদার লোকজন প্রচ্ছদ করতে শুরু করেছেন। মানে লেখক/প্রকাশক নিজেই প্রচ্ছদ করা শুরু করেছেন। এছাড়া গ্রাফিকালি সাউন্ড নয় এমন লোকজন কম্পিউটার গ্রাফিক্স করে প্রচ্ছদ করা শুরু করেছেন। আরো একটা প্রধান সংকট হলো লেখক-প্রকাশকরা প্রচ্ছদ শিল্পীকে পারিশ্রমিক দিতে চান না। কাজ করিয়ে ভুলে যান। তারা ছাপাখানায় টাকা দিতে পারেন, বাইন্ডারকে দিতে পারেন, কাগজের দোকানে টাকা দিতে পারেন, কিন্তু প্রচ্ছদশিল্পীকে দিতে পারেন না বা দেন না, যেনো প্রচ্ছদশিল্পীর দায়িত্বই হচ্ছে তাকে ফ্রি ফ্রি কাজ করে দেয়া।

আপনি তো কবিও । কোন মাধ্যমে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ?

অবশ্যই কবিতা। তবে প্রচ্ছদও আমি স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দ নিয়েই করি।

প্রচ্ছদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কার কার প্রচ্ছদ ভালো লাগে ?

সব্যসাচী হাজরা, ধ্রুব এষ এবং রাজীব দত্ত।