অঞ্জন দত্ত

রাজনীতি আর ধর্ম মানুষকে আলাদা করে, শিল্প মানুষকে এক করে অঞ্জন দত্ত

 

[অভিনেতাই তার প্রথম পরিচয়, অভিনয় করতে করতেই চলচ্চিত্র পরিচালনা, অভিনেতা হিশেবে জনপ্রিয়তা পাবার পর গায়ক হিশেবে আত্মপ্রকাশ। তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন জীবনমুখী গানের গায়ক হিশেবে। তার চলচ্চিত্র দিয়ে কলকাতার বাঙলা চলচ্চিত্রে ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ এক বাকবদল। অঞ্জন দত্ত জন্মেছেন কলকাতার এক ক্ষয়িষ্ণু বনেদি পরিবারে ১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি। ছেলেবেলা কেটেছে দার্জিলিং-এ, যেখানে সবাই গিটার বাজায়। পড়েছেন সেখানকারই কনভেন্ট স্কুলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতকোত্তর। কিংবদন্তী নাট্যজন বাদল সরকারের কাছে অভিনয় শিখেছেন, মঞ্চলিপ্ত থিয়েটার চর্চা করছেন ১৯ বছর বয়স থেকে।   মৃণাল সেনের হাত ধরে চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি। অজস্র সিনেমা, টেলিফিকশনে অভিনয় করেছেন। পরিচালিত ছবির সংখ্যা ১৪। নিজের লেখা ও সুর করা জনপ্রিয় গানের সংখ্যা অন্তত ৩০০। তাঁর 2441139 ছুঁয়েছে জনপ্রিয়তার শঙ্খচূড়া। গান গাওয়া শুরু করেছেন অভিনয় শুরুর অনেক পরে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গানের অ্যালবাম শুনতে কী পাও? এরপর পুরনো গিটার, কেউ গান গায়, চলো বদলাই, হ্যালো বাংলাদেশ, কলকাতা-১৬, অসময়, রং পেন্সিল—  একের পর এক জনপ্রিয় অ্যালবাম আর গান গাইতে ঘুরে বেড়ানো সারা পৃথিবী। সত্যজিৎ রায় এর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে অঞ্জন দত্তর। এছাড়া অভিনয় করেছেন মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেনের চলচ্চিত্রে। হিন্দি ছবি বাড়াদিন এর মধ্য দিয়ে নিজে পরিচালনা শুরু করেছিলেন, পরিচালনা করেছেন ইংরিজি ভাষার ছবি Bow Barraks Forever ও। বং কানেকশন এ প্রথমবার যেনো খুঁজে পেয়েছেন নিজের ছবির প্রকরণ। এরপর পরিচালনা করেছেন চলো, লেটস গো, ম্যাডলি বাঙ্গালী, ব্যোমকেশ বক্সী, রঞ্জনা আমি আর আসবোনা, আবার ব্যোমকেশ, দত্ত ভার্সেস দত্ত, গণেশ টকিস ও শেষ বলে কিছু নেই। কত টিভি ফিকশন যে বানিয়েছেন তারও নেই লেখাজোখা। বাঙলাদেশের সাংবাদিক ও লেখক তুষার আব্দুল্লাহর গল্প নিয়ে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘মনবাক্স’ পরিচালনা করছেন অঞ্জন দত্ত। সেই চলচ্চিত্রের প্রি-প্রোডাকশনের কাজে বাঙলাদেশে এলে তাঁর সঙ্গে আড্ডায় বসেছিলেন শিমুল সালাহ্উদ্দিনসানজিদা ইসলাম পদ্মা। আলাপের লিখিতরূপ অবিচ্যুতভাবে তুলে ধরা হলো। আড্ডাটা শুরু হয় ধানমণ্ডির একটি গেস্ট হাউসের বাগানে, ৩১ আগস্ট, ২০১৪ সালে, সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। সেই অঞ্জনঘন সন্ধ্যার কথা কথাবলির পাঠকদের জন্যে শেয়ার করলেন সেদিনের আড্ডার সঞ্চালক শিমুল সালাহ্উদ্দিন।]

 

সানজিদা ইসলাম পদ্মা : দাদা,, কেমন আছেন? আপনিতো সিনেমা পরিচালনা করতে এলেন এবার। তো, কেমন লাগছে বাঙলাদেশে এসে?

অঞ্জন দত্ত : অনেক চাপ। প্রচুর পরিশ্রম যাচ্ছে। সময় কম। পরিচিত অনেকের সঙ্গে দেখা করতে পারছি না। কাজের চাপটা একটু বেশি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : অঞ্জনদা, একটা স্মৃতির কথা বলে শুরু করি, আপনার গান নিয়ে, আপনার কর্মকাণ্ড নিয়ে কত যে স্মৃতি আমাদের। আপনার চলচ্চিত্রগুলি আসলে আমরা পরে দেখেছি, আমরা দুজনেই সংস্কৃতি বিষয়ক সাংবাদিকতা করি অনেকদিন ধরে, দুটি আলাদা টেলিভিশনে,আমি কিছু টুকটাক লেখালেখি করি, কবিতা, আপনার অ্যালবাম প্রথম আমার হাতে আসে ‘হ্যালো বাংলাদেশ’। এটা আটানব্বুইতে, তখন আমি ক্লাস নাইনে (আসলে এইটে) পড়ি, অ্যালবামটা আমি যখন কিনছিলাম টঙ্গীর কলেজগেট আমার স্কুলের সামনে থেকে তখন আমার বন্ধুরা আমাকে ক্ষ্যাপাচ্ছিলো এই বলে যে, এই গান আমার বাবা শুনবে কিনা! তো সেসব এড়িয়ে ওই অ্যালবামের পর আমি আপনার সব অ্যালবাম যোগাড় করি, এবং আমার পুরোটা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, যা আমি ছেড়েছি প্রায় বছর ছয়েক আগে, আপনার গানে, আমি, আমার বন্ধুরা বুঁদ হয়ে ছিলাম। বা এখনো থাকি। এরপর আসলে আপনার চলচ্চিত্রগুলি দেখা হয়েছে, আপনার টেলিফিল্মগুলি দেখা হয়েছে। আপনার বাবা ছেলের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি একটি টেলিফিল্মের শেষ অংশটা দেখতে দেখতে সেদিন কাঁদছিলাম। তো আমাদের প্রজন্মের সঙ্গে একভাবে, আমাদের আবেগের বড় অংশ জুড়ে আপনি আছেন। আপনি খুব ব্যস্ত, খুব স্বল্পসময়ে আমরা চেষ্টা করবো আপনার কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে। যে উত্তরগুলি আসলে আপনার শিল্পস্বত্ত্বাকেই হয়তো রিপ্রেজেন্ট করবে। আপনি একটা ইন্টারভিউতে দাবি করছিলেন যে আপনি নিজের কাছে ভয়ঙ্কর রকমের সৎ। আপনি যখন কোন কাজে ডুবে যান তখন ওই কাজ সংশ্লিষ্ট ছাড়া কাউকেই প্রায় চেনেন না। প্রথমেই জানতে চাই, আপনি প্রায় দশ বছরের বিরতির পর নতুন গানের অ্যালবাম করলেন, ঊনষাট। এত দীর্ঘবিরতি কেন? আপনি গেয়েছেন নিজের লেখা গান, ‘শেষ গাছটা যখন কাটা হবে শেষ পারমাণবিক সংকট, খাওয়ার জন্য থাকবে তখন শুধু কড়কড়ে টাকার নোট’। আপনার এই দীর্ঘ গ্যাপটা কি আপনার সিনেমা বা এমন অর্থকরি প্রজেক্টের পেছনে ছোটা, সেটাই প্রমাণ করে না যে আপনি টাকার পেছনে ছুটছেন?

অঞ্জন : তোমার স্মৃতিচারণ আমাকে আবেগকাতরই করে দিলো। দ্যাখো, গান আমাকে অনেক বেশি টাকা দিয়েছে। চলচ্চিত্রের থেকেও অনেক বেশি টাকা। আমি আমার বাবার দেনা শোধ করেছি গান গেয়ে। টাকা পেয়ে। গান আমায় যে টাকা দিয়েছে চলচ্চিত্র আমাকে সে টাকা কোনদিনই দেয়নি। আমি এখনো বছরে প্রায় দশ বারোটা শো বিদেশে করি, লন্ডন, অ্যামেরিকা, বিভিন্ন জায়গায়। দিল্লি বম্বেতো আছেই, ব্যাঙ্গালোর। কিন্তু সিনেমা দিয়ে আমার যাত্রা শুরু। আমি যে ছবিগুলিতে অভিনয় করেছি সেগুলিতে আর্ট লাগানো ছিলো। কত টাকা পেয়েছি বলো!

শিমুল : মৃণাল সেন?

অঞ্জন : হ্যাঁ,, টাকার জন্য আমি সেসব সিনেমা করিনি। আমি নিজে যে সিনেমাগুলি করেছি বাঙলা সিনেমা, সেগুলি অন্য জায়গায়, অনেক অন্যদিকে নিয়ে গেছে। বং কানেকশন, ম্যাডলি বাঙালি, চলো লেটস গো...

শিমুল : সেটাতো গত দশবছরের কথা!

অঞ্জন : না, টু থাউজ্যান্ড ফোর থেকে, হ্যাঁ, এখন দশ বছর চলছে, তবে সেগুলি কিন্তু বিগ বাজেট ছবি, তা নয়। তুষারের ছবিটা করতে এসেছি, এটাও কিন্তু পাগলু বা দেব বা জিৎ এর ছবির মতো আট কোটি টাকা ছ’কোটি টাকার বাজেটের ছবি নয়। ওর গল্পটা খুব ভালো। ভালো ছবি হবে। হ্যাঁ,, খরচা বেশি হয়, ভালোই হয়। কিন্তু ভালো ছবি বা  রুচি সম্পন্ন ছবি। কপি ছবি নয়। আমি গান লিখছি না, দশ বছর গান করছি না কারণ  ভালো গান  আসছে না আমার। আমার মনে হয় যদি ভালো গান লিখে থাকি কিছু আমি, আমি বৃষ্টি দেখেছি’র মতো গান যদি আসে আবার আমি লিখবো, কাঞ্চনজংঘার মতো...

শিমুল : আলিবাবা!

অঞ্জন : হ্যাঁ,, পরের দিকে আমার মনে হয় খুব ভালো গান হয়নি। আকাশ ভরা  সূর্যতারা, কাঞ্চনজংঘা, আলিবাবা এই কিছু গান নিয়ে আমি খুব গর্বিত। রঞ্জনা আমি আর আসবো না, কিছু গান নিয়ে আমি খুব গর্বিত। আবার কিছু গান আমার সে রকম জমে না। হয়তো জনপ্রিয় হয়েছে। সেই কারণে আমি দেখেছি যে অ্যালবাম না করে, পুরনো গানই গাই, অত কিন্তু আমি অ্যালবাম আমি করছি না কিন্তু তবু আমার প্রোগ্রাম লেগে আছে। আমি ফিরে যাবো পরশুদিন, তারপর  প্রতিদিন কিন্তু আমার শো আছে, আবার দিল্লিতে শো আছে, বম্বেতে শো আছে, ব্যাঙ্গালোরে শো আছে, পর  পর পর পর পুজো অব্দি আমার শো আছে। এবং অক্টোবর মাসটা পুরো আমি এখানে আসতে পারবো না কারণ আমার শোজ রয়েছে। সেই গানগুলি তো আমার পুরনো গান। মঞ্চে মঞ্চে আমি রঞ্জনা, বেলা বোস, মেরিয়ান, এগুলিই গাইছি। সেগুলি লোক শুনছে।  সেরকম ভালো গান যদি না লিখতে পারি তাহলে আমি লিখবো না। বয়স বেড়ে গেছে। দশ বছর পর আমার মনে হলো, ঊনষাট এ এসে আমি কিছু অন্য রকম কথা বলতে পারছি, অন্যরকম গান আমি লিখবো, রেগুলার বেসিসে যদি ভালো গান না হয়, আমি যদি ভালো ছবি না করতে পারি, আমি ছবি করবো না, জোর করে প্রতি বছরে বছরে একটা ছবি করার কোন মানে হয় না। 

শিমুল :  কিন্তু দাদা, চলচ্চিত্রে যদি আপনার যাত্রাটা আমরা একটু  খেয়াল করি, আপনি বম্বেতে মানে বলিউডে আপনি একটা চলচ্চিত্র দিয়ে শুরু করলেন...

পদ্মা : বড়দিন।

শিমুল : এই শুরুটা আপনি  কলকাতায় না করে, বাঙলা ভাষায় না করে হিন্দিতে কেন করছিলেন? 

অঞ্জন : কারণ আমার মনে হয়েছিলো যে আমি হিন্দি ছবি করতে পারি এবং হিন্দি ছবি বেশি মানুষ কম্যুনিকেট করবে।

শিমুল : সেটা কি আপনার অভিনয়ের জন্য...

অঞ্জন : না না না না। ভালো হিন্দি ছবি দরকার এবং ইংরেজি ছবি করতে পারি, হিন্দি ছবি করতে পারি। কলকাতায় থেকে বাঙলাই যে করতে হবে তার কোন মানে  নেই। কলকাতায় অজস্র রকমের মানুষ থাকে, অজস্র ভাষা বলে। কলকাতায় থেকেও হিন্দি ছবি করা যায়। এবং আমি ছবিটা করেছিলাম, এবং সিরিয়াস ছবি, শাবানা আজমী ছিলো—

শিমুল : শাবানা আজমী ছিলো রাইট। ইরফান খান ছিলো। 

অঞ্জন : এবং এটা ইরফান খানের প্রথম ছবিও। ইরফান খানের পঁচিশ বছর বয়স হয়নি তখন।  

পদ্মা : দাদা,, এই প্রসঙ্গে একটু জানতে চাচ্ছি, বলিউডের সিনেমা মানে, আপনার কেন মনে হয়েছে যে বলিউডে ভালো একটা সিনেমা আপনি করতে চান? একটা ভালো হিন্দি সিনেমা করতে চান?

অঞ্জন : স্ট্রং ছবি করতে চেয়েছি—

শিমুল : স্ট্রং সিনেমা মানে...।

পদ্মা : ভালো সিনেমাই কিন্তু ছিলো। শাবানা আজমির মতো একজন অভিনেত্রী যেটাতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু সিনেমাটা তো সে সময় দর্শকদের চাহিদাটা পূরণ করতে পারেনি। আপনার কি মনে হয়?

অঞ্জন : না না না। তখন দু ধরণের সিনেমা হতো , তখন হতো একেবারেই আর্ট সিনেমা, যে সিনেমা কেউ দেখে না। বিদেশে যায়, অ্যাওয়ার্ড পায়।

শিমুল : হা হা হা। 

অঞ্জন : আর আরেকটা হচ্ছে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে। আমার ছবিটা যেদিন রিলিজ করেছিলো দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে ও সেদিন রিলিজ করেছিলো। তো দর্শক বুঝে উঠতে পারেনি যে এটা কি রকম ছবি। এটা একটা মিক্সড।  যেমন তার মধ্যে এন্টারটেইনমেন্টও আছে আবার...

শিমুল : জীবনের গুঢ় সত্যের কথাও—

অঞ্জন : সত্যের প্রকাশও আছে। গানও আছে, আবার সিরিয়াস। এরকম ছবি তখন হতো না। আজকে বলিউডে কিন্তু এ সংখ্যক ছবি ম্যক্সিমাম দেখি।  

শিমুল : এরকম ছবি হচ্ছে। 

অঞ্জন : একটা সালমান খান বছরে, দু বছর অন্তর শাহরুখ খান, আর একটা নাম সঞ্জয় লীলা বানশালী বাদ দিলে, বা সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা, এদের বাদ দিয়ে আপনি যে কোন ছবি দেখেন, হাইওয়ে, কুইন, লাঞ্চ বক্স,  কাহানী, শাহিদ, যে কোন ছবি। অজস্র ছবি হচ্ছে যেগুলি বাড়াদিনের মতো ছবি, আজকে বাড়াদিন যদি রিলিজ করতো সাকসেস পেতো—

শিমুল : আপনি এটা মনে করেন?

অঞ্জন : হ্যাঁ, অবশ্যই মনে করি। আমার কলিগরা যারা— অনুরাগ বসু, বারফি-টারফি যারা বানাচ্ছে, আমার বন্ধু অনুরাগ কাশ্যপ— যারা বানাচ্ছে তাঁরা আমাকে নিজেরাই বলে, তুমি ছবিটা তখন এগিয়ে করেছো। এখন ছবিটা করলে... ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ এরকম ছবি। ইরফান ইজ এ সুপারস্টার। নওয়াজ উদ্দিন সুপারস্টার, মানে  হিউজ স্টার, হিউজ বক্স আপিল। কঙ্কনা সেন শর্মা, হিউজ বক্স আপিল, বলিউডে একটা হচ্ছে শাহরুখ , শাহরুখ শুধু বলিউড নয়, অল ওভার দ্যা ওয়ার্ল্ড নাম্বার ওয়ান এখন। সো কিন্তু এই ধরণের ছবির বিরাট একটা চাহিদা আছে,  হয়তো বাড়াদিন সময় থেকে এগিয়ে ছিলো। 

শিমুল : আপনি এটা মনে করেন? এরপর আপনি আর ছবি তাহলে হিন্দী ছবি—

অঞ্জন : হ্যাঁ, তারপরেও আমি একটা হিন্দি ছবি করেছি, নাসিরউদ্দিন, কে কে মেনন, জিমি শেরগিল এদের নিয়ে, BBD বলে, সেটা পারফেক্ট পিকচার কোম্পানি তৈরি করেছিলো, কিন্তু  যে কোম্পানি তৈরি  করেছিলো, কিন্তু  সেই কোম্পানি এখন কিনে নিয়েছে বোধ হয় অন্য কোম্পানি। সেটা এখন এই জালেই আটকে আছে।  এই কোম্পানিকে যখন এটা, ভালো অন্য একটা কোম্পানি কিনে নেবে—   

শিমুল : তখন রিলিজ হবে।

অঞ্জন : তখন হয়তো রিলিজ হবে।

শিমুল : এরপর আপনি বাঙলা সিনেমা বানিয়েছেন। সিনেমার কথায় গেলে, আপনার আসলে বর্নাঢ্য ক্যারিয়ার। আমি আজকে সকালবেলা আইএমডিবি দেখছিলাম যে অঞ্জন দত্তের কী কী ছবি। কোনটা দেখা আর কোন চলচ্চিত্রটা দেখা হলো না। তো মানে মৃণাল সেনের সঙ্গে আপনার পরিচয়ের দিনটার কথা যদি আপনি আমাদেরকে বলেন? মানে, তিনি বোধ হয় আপনাকে, আপনার অভিনয়ের যে প্রতিভা, আপনি একজন ভালো অভিনেতা এটা প্রথম মেনশন করেছিলেন তিনি। 

অঞ্জন : আমি একটা বাচ্চা ছেলে তখন, আমি অভিনয় করতে চাইছি, আমি থিয়েটার করেছিলাম বহুদিন। আমি বার্লিনে তিন বছর থিয়েটার করেছি, যাই হোক আমি সেটা পরে, আমি থিয়েটার করছি, বাদল সরকারের হাতে আমি তৈরি। এজ এন এক্টর তিনি আমাকে ট্রেইন করেছেন। 

শিমুল :  রাইট।

অঞ্জন : কিন্তু আমি ছবি করার সুযোগ পাচ্ছি না, আমি তাই থিয়েটার করতাম। থিয়েটারের একটা কাজেই, একটা ফরাসী নাটকের কাজেই, আমি একটা ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বেসিতে গিয়েছিলাম স্পন্সরের ব্যাপারে ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে, তখন  আমার বয়েস একুশ না, বাইশ এরকম, আমি থিয়েটার তখন করছি, নির্দেশনা দিচ্ছি, আমার তখন একটা ছোট দলও আছে,  দুটা নাটক করেছি, সেই ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বেসিতে মৃণাল সেন এসেছিলেন, একদিন প্রতিদিন ছবিটার সাব টাইটেল, ফরাসি সাবটাইটেল এর ব্যাপারে তিনি এসেছিলেন। আমি একটা কোণে বসে বসে গাঁজা খাচ্ছিলাম। এতবড় একটা লোক বসে আছে, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন, আমি উনার সঙ্গে কথা বলি। আমি পরে বুঝতে পারি, মানে কথাটথা বলে পরে বুঝতে পারি যে উনি মৃণাল সেন। তখন আমি একটা খবরের কাগজে চাকরি করতাম । তার একবছর পর মৃণাল সেন আমাকে খোঁজ করতে শুরু করলেন। সবাই বললো, ‘তোমাকে মৃণাল সেন খুঁজছেন।’  তখন আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। যা হবার হবে। থিয়েটার টিয়েটার করছি। বার্লিন যাবো ভাবছি, বার্লিন যাবার একটা চান্স এসেছে ভাবছি যাবো কি না যাবো কি না। মৃণাল সেন খোঁজ করছেন তাঁর ছবির নায়ক বানাবার জন্য, মৃণাল সেন বললেন, ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বেসিতে বসে ছিলো একটা ছেলে, ওই ছেলেটা কে? ওকে আমার চাই। খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে  খুঁজতে, পেলো আমাকে, মৃণাল সেন, রিহার্সেলে ডাকলো আমাকে, এবং আমাকে বললো, ‘তুমি সিনেমায় নামবে?’ আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমি সিনেমার মোহে পড়ে গেলাম, অভিনয় করলাম, ছবিটা বোম্বেতে গেলো, আমি একটা পুরষ্কার পেলাম।   

শিমুল :  এবং প্রথম চলচ্চিত্রে পুরষ্কার পাওয়া।

অঞ্জন :  বেস্ট এক্টর অ্যাওয়ার্ড ফ্রম ভেনিস চলচ্চিত্র।            

শিমুল :  এটা কি মানে গান থেকে আপনার মনোযোগ কিছুটা হলেও কি এই ঘটনা সরিয়ে দিলো?

অঞ্জন : মানে গান করছি না আমি তখন,   

শিমুল : চুরানব্বইতে আপনার প্রথম অ্যালবাম বেরুলো।

অঞ্জন : এটা বলছি আমি নাইনটিন সেভেনটি নাইনের কথা। সেভেনটি নাইন, আমি গানটান করছি না তখন। মৃণাল সেন নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুটিং শুরু হবার আগেই বুদ্ধদেব বাবু খবর পেয়ে, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বললেন যে, আমার ছবিতে নায়কের চরিত্র করতে হবে। এইবার আমি পর পর পর পর কিছু ছবিতে কাজ করলাম। বুদ্ধদেব, মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ এবং আমি দেখলাম যে, এই মানে বাঙলা টলিউড সিনেমার সঙ্গে, আমি ওই সিনেমা আমি করতে পারবো না। আশির দশকের যে ছবি হতো। আমার এই মুষ্টিমেয় কিছু সিরিয়াস আর্ট ফিল্ম মেকারই আমার অভিনয়ে বুঝতে পারছে। টলিউড আমার অভিনয়টা বুঝতেই পারছে না বা আমার চেহারা বা হাবভাব বুঝতে পারছে না। তখন টলিউডের স্টার হচ্ছে তাপস পাল, মুনমুন সেন, প্রসেনজিৎ

শিমুল : মানে জনপ্রিয় স্টার? 

অঞ্জন : জনপ্রিয়তা। আর্টসেক্টরে আমি তখন ইম্পরট্যান্ট, কলকাতার আর্টিস্টিক মহলে আমি ইম্পরট্যান্ট। 

শিমুল : এই সিনেমাগুলি করেও কিন্তু আপনি আপনার বাবার দেনা শোধ করতে পারলেন না।

অঞ্জন : না। মৃণাল সেন আমায় পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তখন তো বাবা বেঁচে আছেন। আমার বাবা বেঁচে আছেন, বুদ্ধদেব বাবু আট হাজার, করতে করতে করতে করতে আমার শেষ ছবি অন্তহীনে মৃণাল দা আমায় দিয়েছিলেন, বোধ হয় আমার মনে হয় পঞ্চাশ হাজার, বুদ্ধ’র পঞ্চাশ হাজার, আমি পঞ্চাশ হাজার, ওরা তো এখন দশ লাখ টাকা, পঞ্চাশ হাজার তখন। অপর্ণা সেন তখন, তো এই করতে করতে অনেকদিন পরে...

শিমুল : অঞ্জনদা আপনার মানে চলচ্চিত্রগুলি...

অঞ্জন : আমি গান করে আমার একেকটি অ্যালবাম, পর পর চারটি অ্যালবাম আমি কত টাকা গ্রহণ করি ওইগুলিতে?

শিমুল : মানে আপনার জীবনটা আমাদের কাছে এসছে, আমরাতো   আপনার প্রায় নখের বয়েসী। আমাদের কাছে এসেছে কিন্তু উল্টোভাবে। আমরা আগে আপনার গান শুনেছি, পরে আপনার চলচ্চিত্র দেখেছি। এখন আপনার টেলিফিল্ম টিল্ম সব কিছু মিলিয়ে দেখি, তো আপনি আপনার বাবার দেনা শোধ করলেন, বাবা তখনও বেঁচে আছেন...

অঞ্জন : বাবা মারা গেছেন।

শিমুল : মারা যাবার পরে গান করে, চুরানব্বইতে যখন আপনার প্রথম অ্যালবাম বেরুলো, ‘শুনতে কি চাও?’

অঞ্জন : ‘শুনতে কি চাও।’ 

শিমুল : শুনতে কি চাও এবং সেই অ্যালবামটা মানে আপনাকে  আসলে কি কি উপলব্ধি দিলো? প্রথম অ্যালবাম।

অঞ্জন : না আমি দেখুন, আমি করেছিলাম বিকজ আমিতো এটা করে  টলিউডে হিরো হতে পারবো না। আর কিছু মুষ্টিমেয় ডিরেক্টরের উপর বেঁচে থেকে, আমার চলবে না। এটা আমার জন্যে ইনসিকিউরড। আর এটা প্রতিবছর, পর পর সবাই মিলে আমাকে যে, এরা বছরে হয়তো একটা ছবি করছে, তো বছরে আমি একটা পাচ্ছি, দেড় খানা পাচ্ছি। টাকা আমায় রোজগার করতে হবে। দশ হাজার, পনেরো হাজার টাকা দিয়ে তো আমার সারাবছর হবে না। তখন আমি ডিসাইড করলাম যে,  আমি ডিরেকশনে যাবো, ডিরেকশনে দিতে হবে আমাকে। কিন্তু ডিরেকশন আমি কি করে দেবো? আমি, আমার জানতে হবে, ডিরেকশনটা কি? এর একটা মানে ডিরেকশান নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার, ডিরেকশন মানে ছবি ডিরেকশন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার, সময় তো লাগবে। বাঁচার জন্য এমনি সব খরচা মানে পকেট মানি, কোন পকেটমানি করা যায় কি না, আমি পকেটমানির জন্য এবং পকেটমানির জন্য আমি গানটা করলাম।

শিমুল : কী নির্মম একটা বাস্তবতা চিন্তা করেছো?

পদ্মা : ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। আপনার গান গুনলে বোঝা যায়, এই সবকিছুর প্রভাব আছে গানের লিরিকে।

অঞ্জন : হু। এর জন্যে গানটা আমাকে হিউজ , আ... নাইনটি থ্রি, নাইনটি ফোর, নাইনটি ফাইভ, নাইনটি সিক্স, নাইনটি সেভেন, সে সময় এক একটা শো আই আর্নড এ হিউজ অ্যামাউন্ট অব মানি।

শিমুল : অঞ্জনদা আপনার গানের একেকটা কথা, সেগুলি তো মানে, গীতিকবিতা, মানে সুর যদি বাদ দিই-ও, দুর্দান্ত সব কবিতা এবং আপনার সময়ে কবিতা যারা লিখছেন, আপনার সমসাময়িক যারা, যারা অনেকেই অনেক বিখ্যাত, তাঁদের অনেক বিখ্যাত কবিতাতেও আপনার গানের অনেক শব্দ, অনেক বাক্য, অনেক লাইন ঢুকে পড়ার উদাহরণ আছে।  অনেক স্ট্রং, অনেক নাড়া দিয়ে যায় আপনার গান—

পদ্মা : গানগুলির একটা বৈশিষ্ট্য হলো অনেক সহজ যেটা মানুষ সহজেই ক্যাচ করতে পারে। 

শিমুল : আপনার কখনও কবি খ্যাতি পাওয়ার ইচ্ছা হয়নি? 

অঞ্জন : না, আমার কখনো মনে হয়নি কবিতা পারবো। বা লেখক হবার ইচ্ছে ইদানীং হচ্ছে, মানে লেখা, বই লেখা। কিন্তু আমিতো নিজের স্ক্রিপ্ট নিজেই লিখি। কিন্তু সে জায়গা থেকে কবিতা কখনো আমার মনে আসেনি গানের মধ্যে দিয়েই এসেছে এবং সেই সময় আমি, সুমন প্রথম,  তারপর আমি,  নচিকেতা, আমরা তিনজনই একটা হিউজ পরিবর্তন আনলাম।

শিমুল : বাঙলা গানের।

অঞ্জন : বাঙলা গানের পরিবর্তন। তারপরে জেনারেশান আবার ব্যান্ড এলো তারপর। 

শিমুল : না আমি জানতে চাচ্ছিলাম যেমন আপনার গানের কথার মধ্যে আছে, মেঘ দেখে বললো মানে ওই বাচ্চাটা যখন ভাবছে বা বাবা মা তাকে রেখে গেছে, একা একা সে খেলছে এই যে জায়গা গুলি ভয়ংকর রকম স্ট্রং। আমি আসার সময় ওকে  বলছিলাম যে আমার খুব প্রিয় একটা গান আছে, দুটো মানুষ একসঙ্গে কত পথ চলা, হাতে হাত রেখে কথা বলা এবং শেষমেষ এসে অবহেলা, শেষ অর্থে বিদায়,   ফুলদানি আছড়ে ভেঙে চুরমার। এই যে লাইন, ফুলদানী আছড়ে ভেঙে চুরমার , ফুলজল সব একাকার, নেমে আসে অন্ধকার, জানালার বাইরে নেমে আসে রাত। 

পদ্মা : এতো কবিতাই  দাদা,?

শিমুল : আপনি পরে সুর দিয়ে গিটার বাজিয়ে গাইছেন কিন্তু আপনার ভক্ত যারা তাঁদেরতো হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করছে পুরো বিষয়টা এবং  আপনার কি মনে হয় না কখনও যে আপনি এত ভার্সেটাইল কাজ করার মধ্য দিয়ে আপনার মানে আসল যে ক্ষমতা লেখনী, মানুষের হৃদয়কে ছোঁয়ার, তাঁকে আসলে অবহেলা করেছেন?

অঞ্জন : না না না। আমার মনে হয় আমার গানে এসেছে, তা ব্যবহার করেছি। গান বেশি লোক শোনে ও কবিতা যারা পড়ে তার থেকে গান শুনে বেশি। আমি অনেক  বেশি মানুষের কাছে রিচ করেছি পরবর্তিকালে প্রত্যেকটা স্ক্রিপ্ট আমার আমি নিজে লিখেছি। তো স্ক্রিপ্টটা ওতো একটা লিখা। 

শিমুল : হ্যাঁ, অবশ্যই।

অঞ্জন : আমার ছবির গান নীল মাঝে মাঝে বলে যে, এই গানটা তুমি লিখে দাও। আমি গান লিখি। গানও লিখে দিয়েছি, এমন নয় যে গান লিখা বন্ধ করেছি। বং কানেকশনের গান,  ম্যাডলি বাঙালির দুটো গান লিখেছি, রঞ্জনা আমার পুরনো গান, একটা দুটা আছে, এই গানটা আমার লিখা, দত্ত ভার্সেস দত্ত এর গানটা। গানতো আমি লিখি।   

শিমুল : আপনার নাটকে যাই আমরা, বাদল সরকারের দলে আপনি কাজ করতেন......

অঞ্জন : না বাদল সরকারের দল নয়, বাদল সরকার উনি অভিনেতা ট্রেইন  করতেন। তিনি দল চালাতেন যেরকম, তিনি পয়সা নিয়ে শেখাতেন।

শিমুল : আপনারও তো দল ছিলো।

অঞ্জন : আমার একটা ছোট দল  ছিলো। কিন্তু তাঁর কাছে আমি শিখতে গিয়েছিলাম। অভিনয় শিখতে। তিনি ট্রেইন করেছেন আমায়। 

শিমুল : আপনার যৌবনে আপনি কোন বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন?

অঞ্জন : না আমি কোনদিন ছিলাম না কিন্তু আমার অজস্র বন্ধু ছিলো। অজস্র বন্ধু বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলো।

পদ্মা : আপনার অনেক ছবিতে কিন্তু ব্যাপারটা এসেছে, আপনার চরিত্ররা বামপন্থী হয়।

শিমুল : কলকাতার বাস্তবতায় সেটা ছিলো। এই সময়কার বাস্তবতায় সেটা ধরতে চেয়েছেন।  

অঞ্জন : হ্যাঁ,, আমি দার্জিলিং এর পড়াশোনা করাটা ছেড়ে কলকাতায় এসে কমপ্লিটলি খেই হারিয়ে ফেলি। আমার একদিকে একটা ভীতির জগত ছিলও। রক এন্ড রোল মিউজিকের জগত ছিলো এবং   পার্কস্ট্রিটের গানের জগত ছিলো।

শিমুল : রবীন্দ্রসংগীতের জগত ছিলো!

অঞ্জন :  রবীন্দ্রসংগীতটা আমার কাছে অনেক পরে এসেছে। আমার কাছে সে সময় রবীন্দ্রসংগীতের জগতটা ছিলো না। আমার কাছে পশ্চিমা একটা ব্যাপার ছিলো। প্রতিবাদী মিউজিক হচ্ছে রক মিউজিক, রক মিউজিক তো প্রতিবাদী মিউজিক, রক মিউজিক এইটাই ইস্যু ছিলো আমার কাছে। 

পদ্মা : হুম হুম । আপনার গানে সেটার রেশ পাওয়া যায়।

অঞ্জন : বব ডিলানের গান শুনেছি, বুঝতে পেরেছি প্রতিটি কথা। ভিয়েতনামী যুদ্ধ এবং সেই সূত্রে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সঙ্গে আমার  যোগাযোগ।  এক বন্ধু হিশেবে, আমি কোনদিন উগ্র ভায়োলেন্ট, হিংসার রাজনীতি, কোন রাজনীতিতেই বিশ্বাস করি না। হিংসাতে বিশ্বাসই করি না কিন্তু আমার বন্ধুরা ছিলো, তাঁরা বিশ্বাস করতো, তাঁদের সময়-অসময়ে দরকারে, প্রয়োজনে টাকা লেগেছে, দিয়েছি। বাবার ঘোর কংগ্রেস, বাবা জানতেন না। বই পত্র লুকিয়ে রাখা হতো, আমার বাড়িতে মাঝে মাঝে সেটা লুকিয়ে রাখতাম। বন্ধু বান্ধব আসতো, এক রাত্তি  রাত্তি থেকে চলে যেতো। বন্ধু বলে, রাজনীতিক বলে নয়। তাঁরা যে বন্ধুই হোক, তাঁরা ডানপন্থী বন্ধু হলেও তাঁরা আমার বাড়িতে থাকতে পারতো । আমার কাছে বন্ধুত্ব রাজনীতি থেকেও অনেক বড়। এই তাঁরা রাজনীতি করে বলে  নয়, তাঁরা আমার বন্ধু বলে । 

শিমুল : আপনি গাইছেন, ছন্দা আই এম রাইটিং দিস লেটার টু ইউ... ওই গানটা, হ্যাপি বার্থ ডে। আ ছন্দা’দির সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে হলো যদি আমাদের একটু বলেন।

অঞ্জন :  ইউনিভার্সিটি জীবনে আমাদের দেখা। ও মিয়ানমারে বড় হয়েছে। মিয়ানমারে জন্মেছে। মিয়ানমারে বড় হয়েছি, অনেক বড় বয়সে, মিয়ানমারের   পাহাড়ে, টাউনজি পাহাড়ে বার্মার, আমি ওখানে বড় হয়েছি।     

শিমুল : রেঙ্গুন?

অঞ্জন : রেঙ্গুন থেকে আরও দূরে, পাহাড়ে। আমিও পাহাড়ে বড় হয়েছি দার্জিলিং এ। আমাদের দেখা হয়  ইউনিভার্সিটিতে, ইংলিশে এম এ পড়ছি, আমাদের দেখা হয়। এবং আমাদের ভালো লাগা, গান,  হিহি, রক এন্ড রোল এই জায়গা থেকে আমাদের এক সম্পর্ক তৈরি হয়। এবং আমরা বিয়ে করে ফেলি খুব অল্প বয়সে। এই আমাদের যোগাযোগ। তারপর থেকে ও পড়িয়েছে, নাটক করেছে আমার সঙ্গে, ওর জগত চলেছে, আমার জগত চলেছে এবং আমরা দুজন দুজনকে স্পেস দিয়েছি আমরা। এমন নয় যে আমরা... বাট অনেক ছুটতে হয়েছে আমাকে, অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে। মানে আমি ঠিক সংসার আমি করতে পারিনি।  

শিমুল : সংসারটা তিনিই করেছেন? 

অঞ্জন : হ্যাঁ, ছন্দা সে দায়িত্বটা নিয়ে সংসারটাকে ধরে রেখেছে, ছেলেমেয়েগুলিকে মানুষ করেছে, পড়িয়েছে, নীলকে গিটার শিখিয়েছে, আমি শেখাই নি। জার্মানি চলে গেলাম তিন বছর, বিয়ে করার পরেই। তিন বছর ছিলাম না তরপর আবার ফিরে এলাম, নীল জন্মালো। অ্যামেরিকা চলে গেলাম এক বছর, আরও পরে নাইনটি ওয়ান থেকে নাইনটি টু। এইযে নানা রকম কিছু। ফিরে এসে নাইনটি ফোরে গান করলাম।  একটা আনসারটেইন সময় গেছে। তো এই সংসারটাকে ধরে রাখা, আমাদের, বাচ্চাদেরকে এবং আমাকে নিয়ে ধরে রাখাটা ছন্দার। সেটা আমার মনে হয় এবং আমাদের বড় হওয়ার মধ্যে বন্ধুত্বটা খুব রোল প্লে করেছে। বন্ধুত্বটা খুব ইম্পরট্যান্ট বলে বিশ্বাস করেছিলাম।  

শিমুল :  আপনি বলেন যে. ছন্দাদি আসলে একভাবে সেক্রিফাইস করেছে তার জীবন আপনার জন্য। 

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবনেই সেটা হয়। একজনকে ছাড়তে হয়। সেক্রিফাইস ছন্দা কখনও মনে করে না। হ্যাঁ, আমি মনে করি যে ছন্দা অন্য কিছু করতে পারতো। আরও হয়তো অন্য কিছু করতে পারতো। এয়ারহোস্টেস হবার ইচ্ছে ছিলো ওর। হয়তো হয়নি এয়ার হোস্টেস আমার জন্যই। কিন্তু পরবর্তীকালে আবার আমি যে সিকিউরিটিটা ওকে দিয়েছি, সে সিকুইরিটিটা আমি জানি না, কোথাও গিয়ে একটা সময় সে আমার পাশে অসম্ভব দাঁড়িয়েছিলো আরও একটা আমি আবার, ওকে এমন একটা জায়গা দিতে পেরেছি। আমি আর নীল দুজনে মিলে, ওকে আর ভাবতে হয় না। ও জানে যে হ্যাঁ, আজ অঞ্জন, নীল আছে, আই এম দেয়ার। সেইটা আর কি। তবে আমার গড়ে উঠার পেছনে ছন্দার একটা অবদান আছে।

শিমুল : মানে আপনি যখন আপনার পড়াশোনা শেষ করলেন মানে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা যখন শেষ করলেন সেই সময় এবং এই সময় যদি মিলিয়ে দেখেন, আপনার জীবনের দিকে যদি ফিরে তাকান, আপনি... কি মনে হয়, যা যা করতে চেয়েছিলেন, যা যা চেয়েছিলেন জীবনের কাছে, পেয়েছেন?

অঞ্জন : হ্যাঁ,, আমি এটাই করতে চেয়েছিলাম এবং এটাই করতে চাইবো, আমি এক্টিং করতে চেয়েছি, সিনেমা করতে পেরেছি, গানটা চলে এসছে, আমি কিন্তু একটা ক্রিয়েটিভ শিল্পী হতে চেয়েছি, আমি কখনও তেমন একটা নিজেকে বিকিয়ে দেইনি। বিজ্ঞাপনের চাকরি টাকরি ও করেছি কিন্তু আমি কর্পোরেট লাইফ কখনও চাইনি। অফিস যেতে চাইনি। আমি একটা নিজের মতোন বাঁচতে চেয়েছি। সেটার জন্যে কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে, অনেক। একসময় মা সোয়েটার বুনে দিতো আমি গিয়ে ওটা বিক্রি করে আসতাম। বাবার অবস্থা খুব খারাপ । খুব বড়লোক ফ্যামিলির ছেলে আমি, কিন্তু সেই ফ্যামিলিটা সত্তরের দশক থেকে হুড়মুড় হুড়মুড় করে পড়ে গেলো। মানে কলাপস করে বসলো, দত্ত ভার্সেস দত্ত আমার জীবনের খুব কাছের।      

পদ্মা : হ্যাঁ, আপনি বলেছেন আপনার জীবন থেকে অনুপ্রাণিত।

অঞ্জন : আমার জীবনে খুব চাপ ছিলো তো..

শিমুল : মানে এই পড়ে যাওয়ার সঙ্গে

অঞ্জন : মানে আমরা খুব   প্রাউড একটা ফ্যামিলি। বাবুয়ানিতে যেমন।

শিমুল : রাইট

অঞ্জন : বাবুয়ানা

শিমুল : টাকা নেই তবু বাবুয়ানা।

অঞ্জন : হ্যাঁ, সে এমন করে অনেক কিছু দেখেছি, চূড়ান্ত বড়লোকিপনা দেখেছি। আবার সেখান থেকে চূড়ান্ত দারিদ্র্য  আমি দেখেছি। তারপর পরবর্তীকালে যখন স্ট্রাগল করেছি, নাটক করেছি, ছন্দার বিয়ের গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। কারণ আমি চেয়েছি এ রাস্তাটা। আমি চেয়েছি এটা করবো, আমি জানতাম আমি এটা করতে পারবো। সেটা করেছিও। আজ অব্দি ছন্দাতো আফসোস করে না যে গয়নাটা। তার মানে নয় যে আমি আর গয়না গড়ে  দিচ্ছি না। কিন্তু...

শিমুল : বিয়ের গয়না মানে আলাদা মাহাত্ম্য বহন করে। 

অঞ্জন : হ্যা। তবু ও দিয়েছে, না দিতেই পারতো, বলতে না আমার বিয়ের গয়না আমি  তোমায় দেবো কেন?  কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো যে, দিয়ে দাও আমি আর পারছি না আমাকে, গিভ মি টাইম। মুঠো করে দিয়ে দিয়েছে। বলেছি টাইম দাও আমায়, সুতরাং আমি দারিদ্র্য’র মধ্য দিয়েও গেছি।

পদ্মা : দাদা,, একটা জিনিশ কিন্তু আপনি বলেন প্রায়ই, আজকেও বললেন যে, গানটা আপনার লাইফে চলে এসেছে। মানে কি, গানটা করতে চান নি?

অঞ্জন : না গানটা আমি ছোটবেলা থেকেই গিটার বাজাচ্ছি। দার্জিলিং এর  অধিকাংশ মানুষই গিটার বাজায়। ছোটবেলা থেকেই গিটার বাজাচ্ছি। ছোটবেলা  থেকেই হিন্দি গান গাইছি। কিন্তু এটা আমার একটা প্যাশন ছিলো । মনে মনে কিন্তু একটা দুটো সুমন ছিলো । গান করতে চাইনি, তা না। তবে অভিনয়টা চেয়েছি। আমি যদি প্রকাশ্যে গান না ও করতাম, হয়তো আমি এই গানগুলি নিজের জন্য করতাম। বাড়িতে সারাক্ষণ গিটার বাজাচ্ছি, গান করছি,  কলেজে গাইছি, গাইছি, অমুক করছি, তমুক করছি। আমি সবসময় করছি। আমি চাকরিতে কাজ করতাম, আমি থিয়েটার করতাম, আমি অভিনয় ছাড়তাম না। কিন্তু গানটা আমার ছিলো, কিন্তু গানটা আমার এতটা থাকবে, সে ভাবে আমি বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম ভেবেছিলাম সিনেমাতে হয়ে যাবে। কিন্তু গানটা আমাকে অনেক সাকসেস দিয়েছে, আমার বং কানেকশন যখন হিট হয়ে গেলো তখন আমার গানের সাকসেসের প্রয়োজন  ছিলো না, মানে তখন গান না হলেও চলে।   

শিমুল : হুম 

অঞ্জন : কিন্তু প্রোগ্রাম হচ্ছে আমি করছি।

শিমুল : দাদা, আপনার তো আর্ট ফিল্ম দিয়ে আপনার যাত্রা শুরু হলো। দীর্ঘ সময় আপনি আর্ট ফিল্ম এ অভিনয় করলেন। তারপর গান এলো। এবং এখন   আমি যেই সিনেমা বানাচ্ছেন, আমি সর্বশেষ  আমরা গণেশ টকিজ দেখলাম। যে আপনি একটা ব্যাপক আইটেম সং ব্যবহার করেছেন, ‘তোমার ঝাল লেগেছে, আমার ঝাল লেগেছে,’ এবং এটাও কিন্তু সেই আর্টি  সিনেমা এবং এই  মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, এই বিষয়গুলিই আছে। প্রেম এবং মজার বিষয় হলো চাচার সঙ্গে ভাতিজীর প্রেম, এবং চাচা আবার...।  

পদ্মা : ওটা আরেকটা,ওটা দত্ত ভার্সেস দত্ত। 

শিমুল : আমিতো গণেশ টকিজের  কথা বলছি ।

পদ্মা : গনেশ টকিজের অন্য ধরণের কাহিনি। আইটেম-সং ছিলো । বাট তুমি দুটা গুলিয়ে ফেলছো।

অঞ্জন :  আ হমম। আইটেম সঙের টা গনেশ টকিজ। আর প্রেমের টানাপোড়েনের টা দত্ত ভার্সেস দত্ত।

শিমুল : ও আচ্ছা।

পদ্মা : আমি বলছিলাম যে, আপনি কেন আর্ট ফিল্মের দিকে এলেন? মানে আপনি বলছিলেন যে, হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম আর্ট ফিল্ম করতে। 

অঞ্জন : না ঠিক আর্ট ফিল্ম না। আমি চেয়েছিলাম এই মেশাতে। মানে আমি এন্টারটেইনমেন্ট, মনোরঞ্জন এবং রুচিবোধটাকে মিলিয়ে এক ধরণের সিনেমা করতে চেয়েছিলাম। যেটার কোন দর্শক ছিলো না তখন। 

শিমুল : আপনার কি মনে হয়, এখন সেই দর্শক তৈরি হয়েছে?

অঞ্জন : নিশ্চয়। কারণ আমার গানতো দুর্বোধ্য তো গান নয়। আমার গানতো যে কোন লোক ধরতে পারে, আমার গান আমি যেরকম লন্ডনে গাই, যে সব প্রত্যন্ত জায়গায়, বর্ধমান ছাড়িয়ে, গ্রামে গিয়েও গাইছি। লোকে শোনছে, তো আমার  গানতো একটা দুর্বোধ্য, ইন্টেলেকচুয়াল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নয় আমার গান। আমার গান পপুলার পপ মিউজিক। আধুনিক গান মানে এটাতো উচ্চাঙ্গ সংগীত নয়। তেমনি সিনেমাতে আমি অভিনয় করেছি এক সময়। আর্ট ফিল্ম দিয়ে আমার শুরু হয়েছে কিন্তু আমি যখন পরবর্তি কালে বারাদিনের পরে ওয়েট  করেছিলাম, আট বছর ওয়েট করেছিলাম। যে একটা সময় যাক, আমি আমার মতোনই ছবি আমার করে যেতে হবে। আমি এর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কিছু করতে পারবো না। আমি তথাকথিত আর্ট ফিল্ম করবো না। অথচ আমি এন্টারটেইনিং ছবি করবো। এই করে করে করে করে প্রায় আট বছর পর একজন ভদ্রলোক আমাকে এসে বললেন যে, আপনি একটা ছবি করবেন? বও ব্যারাকস ফরএভার, ছবি করবেন? ইংরেজি ছবি। আমি বললাম যে, হ্যাঁ, করবো। কিন্তু ওটা আমার মতো করে  করতে হবে। Bow Barracks Forever  ছবিটি আমি করলাম, ইন্টারন্যাশনালি একলেইমড হয়ে গেলো। বোম্বের এক প্রডিউসার কিনে নিলো। এবং ইট ওয়াজ বক্স অফিস হিট। কারণ বও ব্যারাকস ফরএভার রিলিজ হয়েছে দুহাজার চার এ। ২০০৪ কিন্তু মাল্টিপ্লেক্স মানে সিনেপ্লেক্স চলে এসছে, ২০০৪-এ কিন্তু লোকে একটা অন্যরকম সিনেমা দেখতে চাইছে। ২০০৪-এ শহরের মানুষ আর ওই...

শিমুল : দিল ওয়ালে দুলহানিয়া অতটা দেখতে চাচ্ছে না।

অঞ্জন : দিল ওয়ালে দুলহানিয়া অতটা মানে তাঁরা একটু সিরিয়াস সিনেমার দর্শকরা, একটু অন্য রকম ছবি চাইছে। ইংরেজি সিনেমা যারা দেখে, আর্ট সিনেমা এবং কমার্শিয়াল সিনেমার বাইরে কিছু একটা দেখতে চাইছে। বং কানেকশন লেগে গেল যখন, ঋতুপূর্ণ আমার আগে, ঋতুপূর্ণ যেটা করলো, ঋতুপর্ণ ছবিতে এসে, সেটা হচ্ছে একটা মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত অডিয়েন্স হলে এসে সিনেমা দেখতে আরম্ভ করলো। ঋতুপূর্ণ’র ছবিতো, প্রথমে যখন রিলিজ করেছিলো। ভুঁড়ি ভুঁড়ি এ্যাওয়ার্ড, ভুঁড়ি ভুঁড়ি কিছু পায়নি। কিন্তু একটা অডিয়েন্সকে হলে নিয়ে এলো আবার , যারা হল থেকে সরে গিয়েছিলো। স্বপন সাহা আর অঞ্জন চৌধুরী’র ছবির দর্শক গ্রামের লোকেরা, কিছু মনে করবেন না, অশিক্ষিত মানুষ দেখতো । অশিক্ষিত মানুষদের জন্যে অশিক্ষিত জিনিশ  দরকার।  

শিমুল : সরল জিনিশ দরকার।   

অঞ্জন : আজকে তারা চামেলি দেখছে, তামিল তেলেগু সিনেমার রিমিক দেখছে। ওদের লজ্জাও নেই, তারা দেখছে। যারা করছে তাদেরও কোন লজ্জা নেই।

শিমুল : আপনি কিন্তু সেই যে মধ্যবিত্ত বনেদী ফ্যামিলি আপনার ছিলো, সেরকম বনেদী একটা শিল্পবোধ থেকে এই কথা বলছেন যদি আমি বলি—

অঞ্জন : বলতে পারেন। হতে পারে কিন্তু বং কানেকশন যখন, এটা কিন্তু লোক আনলো। কিন্তু অল্প বয়েসী বাঙালি ছেলে মেয়েরা তারা মাল্টি সিনে প্লাক্সে যাচ্ছে না। হিন্দি সিনেমায় যাচ্ছে। তারা অতটা, আমি বলবো,বাবা, মা, মাসী, মেসো । আমি বলবো যে ঋতুপূর্ণের অডিয়েন্স নাই। একদম অল্প বয়স্ক টুয়েন্টি ওয়ান, টুয়েন্টি টু, এইটিন, এমন না তারা হিন্দি ছবি দেখছে, ইংরেজি ছবি দেখছে, বাঙলা ছবি দেখছে না, বাঙলা ছবি দেখছে আমার গানের দর্শক যারা রঞ্জনা শুনলে লাফাচ্ছে, বেলা বোস      কলেজে পড়ছে, এইখানে পড়ছে, তারা বাঙলা সিনেমা বিলকুল দেখছে না। বং কানেকশন ছবিটা এই অডিয়েন্সটা নিয়ে এলো। তো এই মোড় ঘুরে গেলো। ঋতু প্রথম অডিয়েন্স নিয়ে এলো। আমি যেটা করলাম আমি অল্প বয়েসীদের আবার অডিয়েন্সে ঢুকিয়ে দিলাম। আমার অডিয়েন্স কিন্তু আমার গানের অডিয়েন্স, সিনেমার অডিয়েন্স এক। যারা আমার গান শুনে, তাঁরাই আমার সিনেমা দেখে।

শিমুল : সিনেমা দেখে, রাইট।

পদ্মা : আপনার গানের ও সিনেমার কমন দর্শক আছে। একমতো।

অঞ্জন : এবং সেটা শহরভিত্তিক একটা অডিয়েন্স। তাৎক্ষণিকভাবে এটা স্বীকার করতে হবে। এবং আমার ছবি ‘বং কানেকশন’ যদি আপনি দেখেন, ম্যাডলি বাঙালি  আপনি দেখেন... 

শিমুল : শেষ বলে কিছু নেই!

অঞ্জন : শেষ বলে কিছু নেই যদি দেখেন। রঞ্জনা আমি আর আসবো না, দত্ত ভার্সেস দত্ত যদি দেখেন, তাঁর মধ্যে কিন্তু একটা মজা আছে আবার তাঁর মধ্যে  একটা   

শিমুল : বেদনা আছে—

অঞ্জন :  সিরিয়াসনেসও আছে, হ্যাঁ, জটিলতাও আছে। গভীরতাও আছে। এই মিশ্রণটা। যদিও আমি মৃণাল সেন বুদ্ধদেব বাবুর অভিনেতা, আমার ছবি তাঁদের মতো নয়। তাঁদের কাছ থেকে আমি শিখেছি, তাঁদের কাছে থেকে আমি জেনে গিয়েছিলাম, সিনেমা কীভাবে করতে হয়। কিন্তু আমি সিনেমাটা বানিয়েছি  অন্যরকম করে।   

শিমুল :  অঞ্জন দা, আপনার জীবনের, আপনার এই কীর্তিময় জীবনের  পেছনে, আপনার শৈশব থেকে এখন পর্যন্ত যদি প্রথম পাঁচজন মানুষের কথ বলতে বলি আমি আপনাকে, আপনি কাদের কথা বলবেন। আপনি কাদের কাছে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ? 

অঞ্জন :  আ... আমার মনে হয়, মৃণাল সেন, বাদল সরকার, আ...

শিমুল :  না, ততটা না

অঞ্জন :  তবে বব ডিলান, রবার্ট ডি নিরো- অভিনেতা আর ডিরেক্টর হিশেবে আলফ্রেড হিচকক।     

শিমুল :  দ্য বার্ডস-এর হিচকক, এটাতো জানা গেলো যে যাদের কাছে, আপনি কৃতজ্ঞ আপনার শিল্প সত্তার জন্য।

অঞ্জন : মানে এদের ইনফ্লুয়েন্স আমার ভিতরে প্রচণ্ড ছবি যদি আপনি দেখেন, ছবি কিন্তু প্রচণ্ড জটিল ছবি। ভয়ঙ্কর। কিন্তু প্রচণ্ড হিট করেছে প্রত্যেকটা ছবি। এইটাই বলছি মানে এইটাই হচ্ছে, হি ইজ নট মেকিং রাবিশ। কিন্তু হি ইজ পপুলার মানে ডিলান অসম্ভব জটিল গায়ক।

শিমুল : বাট হি ইজ পপুলার।

অঞ্জন : ভেরি পপুলার। কবীর সুমন খুব জটিল, কবীর সুমন পপুলার। মৃণাল সেন আমায় শিক্ষা দিয়েছেন, আমি মৃণাল সেনের জন্যে বার্লিন গেছি, কান গেছি। কতকিছু... উনি আমাকে পৃথিবীর সিনেমার দরজা খুলে দিয়েছেন আমার সামনে।  

শিমুল : কিন্তু মৃণাল সেনতো পপুলার না, আপনি যে রকম পপুলার।   

অঞ্জন : না মৃণাল সেন, আমি যখন, আমি যখন ইয়াং, তখন মৃণাল সেনের সঙ্গে গিয়েছি, পৃথিবী মানে, ইউরোপে তাঁর সিনেমার সেক্টরে, মৃণাল সেন ওয়াজ হিউজ, মানে দাদা,গিরি অন্য লেভেলের। মানে ফার্স্ট উনি আমাকে ব্রায়ান বলে ডাকতো। এবং আমি দেখেছি, তাঁর এই তাঁর মুনশিয়ানা কানে, বার্লিনে, ভেনিসে, ইউরোপে... তা প্রচণ্ড পপুলারিটি ইউরোপে। তো এর প্রায় পরে, একটাই নাম মৃণাল সেন। সাহেবদের মাঝখানেই এই পপুলারিটি। আমি আমার দেশে পপুলার। দেশে এসে মৃণাল সেন কটটুকু পপুলার আমি জানি না। কিন্তু বিদেশে সাংঘাতিক পপুলারিটি ছিলো। সেই জিনিশটা কমে গেছে, এখন আর ভারতীয় সিনেমা সেই জায়গায় নেই। এখন কোরিয়া, ইরান, ইরাক সেই জায়গায় চলে গেছে।  

 

   

শিমুল : ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’ একভাবে আপনার আত্মজীবনী, কিন্তু আপনি যাদের কথা বললেন, রবার্ট ডি নিরো’র মতো অভিনেতা। আপনার স্বপ্নের কোনো  ক্যারেক্টার আছে কী, যেখানে আপনি অভিনয় করতে চেয়েছিলেন? বা বেস্ট অ্যাক্টিং, অঞ্জন দত্তের বেস্ট এক্টিং কোনটা আমরা জানতে চাই। 

অঞ্জন : আমি জানি না, বলো আমাকে এখনও আমি সেরকম কী করেছি আমি, বলো। আমার বেস্ট অ্যাক্টিং বলা কঠিন। করেছি আমি, ঠিক আছি, মোটামুটি ঠিক আছি প্রায় সব ক্যারেকটারেই, অনেক ভাবতে হবে...

শিমুল : আপনাকে যদি দিতে হয় একটা একটা ক্যারেক্টার নিয়ে

অঞ্জন : খুব ডিফিকাল্ট লেগেছে আমার করতে, খুব শক্ত লেগেছে আমার  অন্তরীণ। বিকজ আর কোন ক্যারেক্টার নেই। আমি একাই কথা বলছি। খুব শক্ত ছিলো। এছাড়া আমি তো ভাঙছি। আমি বীরেনের সময় সময় একরকমভাবে করছি। রঞ্জনার সময় আরেক রকম করছি, এটাতো  আমার পার্ট এন্ড পার্সেল, চলছে একেক রকম। 

শিমুল : হুম। শেষ বলে কিছু নেই, কেমন ব্যবসা করলো দাদা,? 

অঞ্জন : শেষ বলে কিছু নেই, ভালো, ভালো ব্যবসা, এখন তো যা টাকা উঠার    স্যাটেলাইটে ভালো বিক্রি করে উঠে যায়।

শিমুল : আপনি সন্তুষ্ট?

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমার ছবিতো, কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করে না, আমি যা মোটামুটি ভাবে...

শিমুল : দাদা, কোটি টাকা ব্যাবসা করে না, এটা আপনি বললেন!

অঞ্জন :  না করে না। আমি এইটুকু বলতে পারি যে আমার ছবি লস করে না।

পদ্মা : এত মানুষ তো দাদা, আপনার ছবি দেখছ!

অঞ্জন :  দেখছে বলেই তো আজ অব্দি টাকা লস করেনি কিন্তু যে টাকা হয়, বং কানেকশন বা রঞ্জনা বা ম্যাডলি বাঙালি প্রচুর টাকা! বা ব্যোমকেশ প্রচুর টাকা তুলেছে। কিন্তু দত্ত ভার্সেস দত্ত, শেষ বলে কিছু নেই, চলো লেটস গো, যে টাকা ইনভেস্ট হয়েছে, সেটা উঠেছে। আমার লস করলে দশ লাখ টাকা, লাভ করলে পঞ্চাশ লাখ টাকা।

শিমুল : মানে কোটির ঘরে যায় না, না?

অঞ্জন : না আমি খরচা করেছি ধরুন, সব দিক মিলিয়ে, দু কোটি, আড়াই কোটি টাকার বাজেট হচ্ছে। এরকমই উঠে আসে, এই এদিক ওদিক থেকে ওইটা উঠে  আসে। লস হচ্ছে না। লস হচ্ছে না, সেটাতো বড়। ব্যবসা করে লস না করাটাই তো ভালো।

পদ্মা : কিন্তু দাদা, লাভ লোকসানের কথা কি মাথায় রাখেন যখন সিনেমা বানান?

শিমুল : হ্যাঁ,, মাথায় রাখেন?

অঞ্জন : না। একদম না। কিন্তু এ কথা ঠিক। কমার্শিয়াল আর্ট আমাকে সবসময় ভাবতে হয়, যাই করি এই টাকাটা যাতে একদম জলে না যায়। সেটা ভাবতে হবে।

পদ্মা :  মনবাক্স করছেন তুষার ভাইয়ের সঙ্গে। স্ক্রিপ্টটা কি আসলে? মানে ঠিক কোন বিষয়টা আসলে আপনাকে রাজী করালো? কেন মনে হলো এটা বানাবেন?

অঞ্জন : কারণ এটা আমি যেরকম ছবি করি সেরকম স্ক্রিপ্ট। আমি যে ছবির, বং কানেকশনের মোড়টা ঘুরালাম, যেরকম ধরণের ছবি করে, মনবাক্স সে রকম ধরণের একটা স্ক্রিপ্ট। এখানে, আধুনিক একটা মনোরঞ্জন আছে। আবার গল্প আছে, মানে একটা আজকের গল্প আছে, আজকের আধুনিক সমাজের, সময়ের গল্প আছে। আবার অত্যন্ত সিরিয়াস গভীর কাব্য আছে।      

পদ্মা : যেমনটা আপনি চান!

অঞ্জন : এই ব্লেন্ডটা আছে। মন বাক্স যদি একেবারেই একটা ভীষণ রগ রগে গল্প হতো আমি নিতাম না, বা মন বাক্স শুধুই যদি প্রচণ্ড দুর্বোধ্য হতো আমি করতাম না। এই মিশ্রণটা আমি পেয়েছি। এবং এই গভীরতা আমার ভেতরে কাজ করেছে। একটা জিনিশকে মনোরঞ্জন করে তুলবে যে মেকার, আমি।  

শিমুল : অফকোর্স।

অঞ্জন : তুষার আবদুল্লাহ তো মেকার না। তুষার আবদুল্লাহ আমাকে গভীর একটা স্ক্রিপ্ট দেবে। তুষার আবদুল্লাহ কিন্তু মনোরঞ্জন করবে না। তুষার আবদুল্লাহ কিন্তু হাসি ঠাট্টা মজা চুটকী এসব দেবে না। তুষার আবদুল্লাহ গভীর একটা গল্প, মনটা টাচ করে এমন একটা গল্প দেবে। সেটাকে আধুনিকভাবে, এনজয়েবল, মনোরঞ্জন করে প্রেজেন্ট করার দায়িত্ব কিন্তু  আমার । আমি আমার ডিরেকশন ইউনিট অনুযায়ী, ক্যামেরাতে সেটা করবো। নীল তাঁর গান টান দিয়ে সেটা করবে।

শিমুল : আচ্ছা।

অঞ্জন : তুষার আবদুল্লাহর স্ক্রিপ্টটা খুব গভীর। এই গভীরতাটা আমায় টেনেছে। এবং গভীর কিন্তু গ্রামের গল্প নয়। শহরের গল্প। সেটা আমি রিয়ালাইজ করছি।এই সময়ের গল্প।  

শিমুল : দাদা,, এই প্রথমবার বোধহয় কোন চলচ্চিত্রে আপনি কাজ করছেন, যেখানে আপনার লিখা কোন গান ব্যবহৃত হচ্ছে না। 

অঞ্জন : না এবং আমার লিখা স্ক্রিপ্টটা নয়। মানে গান হচ্ছে প্রথম রিজন আর দ্বিতীয় হচ্ছে আমি ভাবছিলাম শেষ বলে কিছু নেই এর আগে থেকে, বেশ কিছু দিন আগে থেকেই যে, বাঙলা ছবি এবার করবো না। মানে কলকাতায় করবো না, বোম্বে গিয়ে একটা ছবি করার কথা ভাবছিলাম। তো আমার কাছে এসেছিলো, ওই রণদীপ হুদা আর মাহি গিল।

শিমুল : আচ্ছা।

অঞ্জন : এরা দুই জন আমায় ডেট দিয়ে দিয়েছিলো।কিন্তু আমি আবার দেখলাম যে, বাঙলাদেশে ফিল্ম করলে আমি আবার ওই যেটার জন্যে বোম্বে যাচ্ছি অন্য একটা লোকজন, ইউনিট, অন্য একটা পরিবেশে গিয়ে কাজ করবো, নিজেকে চ্যালেঞ্জ করবো সেটা বাঙলাদেশে করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। নিজের লোকজন রইলো এবং বেশিরভাগ লোকই নতুন অভিনেতা বা নতুন মুখ আমার কাছে, আমার কাছে নতুন নতুন পরিবেশ, অজানা মানুষের সঙ্গে কাজ করছি। এই চ্যালেঞ্জটা—

শিমুল : আবার নিতে ইচ্ছা করলো । আপনার হ্যালো বাঙলাদেশ, বাঙলাদেশ প্রচণ্ডভাবে নিয়েছিলো। 

অঞ্জন : হ্যাঁ, হ্যালো বাঙলাদেশতো ওই কারণেই করা। কলকাতায় ওটা রিলিজই হয়নি। এখানেই রিলিজ হয়েছিলো।  

শিমুল : হ্যাঁ, এখানে রিলিজ হয়েছিলো। এবং আমার শৈশব বা আমরা মানে আমাদের প্রজন্ম দিয়েছিলাম আপনাকে সেটা। দাদা,, হ্যালো বাঙলাদেশে একটা গান ছিলো, লাকি আখন্দ কে নিয়ে, গানটা ছিলো এরকম—

দুজনেই থাকে দুটো দেশে,

দুজনেই গান বেচে খাই,

গানে গানে কোন এক মঞ্চে

হঠাৎ দেখা হয়ে যায়।

এরকম একটা গান এবং ওই অ্যালবামে একটা ঘোষণা ছিলো যে এরপর আসলে আপনি বাঙলাদেশ নিয়ে আরও অনেক কাজ করতে চান।

অঞ্জন : না না, ঘোষণা ছিলো না আমার, লাকী আখন্দের গানটা কীভাবে এলো সেটার গল্প ছিলো। 

শিমুল : আচ্ছা ছিলো।

অঞ্জন : লাকি আখন্দ’র গানটা কীভাবে এলো সেটা একটা গল্প হয়েছিলো আর কি!

শিমুল : হ্যাঁ, মঞ্চে হঠাৎ উঠে আসার গল্পটা। 

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমি তখন প্রথম ঢাকায় এসেছি এবং স্টেজ শো করছি, মাকসুদ এসেছে, আইয়ুব বাচ্চু এসেছে। মাকসুদ এসেছে, মাকসুদ আগে থেকে আমার গান শুনেছে, মানে আমি ওকে পছন্দ করি। তো মাকসুদকে আমি বলে রেখেছিলাম যে তুমি, ম্যাক একটা গান করবে? বললো হ্যাঁ, করবো। তারপর আমি উঠে শো তে বাজাচ্ছি-টাজাচ্ছি। আমার যে অরগানাইজার ছিলো এখানে নিমা, নিমা রহমান...

শিমুল : নিমা রহমান। গানে গানে ভালোবাসা করেছিলেন যে যার সঙ্গে...

অঞ্জন : হ্যাঁ, তো নিমা আমাকে বললো যে পুরনো একজন লোক এসেছেন, লাকী আখন্দ, তিনি এসেছেন, উনার কথা একটু বলবেন, এক সময়ের খুব নাম করা মানুষ ছিলেন কিন্তু তারপরে উনি একদম গান বন্ধ করে দিয়েছেন কারণ ভাই হ্যাপি...

শিমুল : হ্যাপি আখন্দ দারুণ গাইতেন।

অঞ্জন :  হ্যাপি মারা যাবার পর লাকি আর গান করেন না। তো তিনি  কোথাও যান না, কি রকম একটা হারিয়ে যাওয়া মানুষ, নিমা বলছে, আমার খুব ভাল্লাগছে, ও বললো উনি এসেছেন, আপনি এরকম একটা কথা, কি আপনি বলবেন, স্টেজে উঠে, যে উনাকে স্টেজে ডাকবেন? তো, আমি স্ট্রেইট গিয়ে বললাম যে, এখানে যদি লাকী আখন্দ নামে কেউ থেকে থাকেন, আমি  আপনাকে চিনি না, একটু চলে আসুন ওপরে। লাকি একটা টুপি পড়েছিলো, টা টা টা টা করে চলে এলো।

শিমুল : হা হা হা। 

অঞ্জন : আমি বললাম, আপনি কিছু বাজাবেন? বললো, আমি কিবোর্ড টা বাজাই। আমি বললাম তাহলে চলুন? তারপরে, আমি জানি না কি হবে। দর্শক বসে আছে। দর্শক কি মনে করছে, তুমুল উত্তেজিত। আমি হেঁটে হেঁটে আস্তে আস্তে লাকীর কাছে গিয়ে  বললাম, যে আচ্ছা আমার কোন গানটা আপনি বাজাবেন? উনি বললেন, আপনার কোন গান আমি শুনিনি। 

শিমুল : হা হা হা।

পদ্মা : হা হা হা।

শিমুল : হা হা হা। এটা কি আপনাকে আহত করেছিল?

অঞ্জন : না আমার কিচ্ছু এসে গেলো না। আমি বললাম যে আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে একটা কাজ করুন ইংরেজি, ডি এইটে বাজান, আমি দুটো মানুষ গানটা আমি গাইলাম উইথ আউট মাই গিটার । আর কি অসাধারণ পিয়ানো বাজালো পেছনে , দুটো মানুষের পেছনে। বাজিয়ে গেলো,  মাঝখানে থেমে গেলো আবার সোলো বাজালো আবার বাজাচ্ছে বাজাচ্ছে বাজাচ্ছে আবার আমার দিকে তাকালো আমি আবার ফিরে এলাম, টেবিল ল্যাম্পের আধো অন্ধকারে...

শিমুল : ভাঙাচোরা মন দুটি গুমড়ে গুমড়ে মরে!

অঞ্জন : সে এক দুর্দান্ত গান। পুরো ব্যান্ড চলে এলো এবং এভরিবডি। এবং লাকি তো সাঙ্ঘাতিক বাজালো। তারপর ব্যাক স্টেজে আলাপ হলো, তারপর যা হয় আর কী! প্রচণ্ড মদ্যপান, তারপর একসঙ্গে দুজনে মিলে চলে গেলাম। তারপর যা হয় বলতে পারেন, অমুক তমুক। হা না তা না বিরাট ভাব। বললাম আপনি আর গান করেন না কেন? বলে, ধুরর আর ইচ্ছে করে না। এইটা ঘটনাটা যখন  ঘটলো তখন এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব হয়ে গেলো, আমরা সারাদিন কাটালাম, তারপর  আমার হোটেলে চলে এলো। ওর বাড়িতে গেলাম, ওর স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেলো। আমি যেদিন চলে যাই ঢাকা থেকে আমার মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। জানি না কেন? এগুলি ঘটে। আমার খুব হয়। লাকির গানও আমার খুব ভালো লেগে গেলো। পুরনো সফট গান।

শিমুল : লাকী আখন্দের গান, অন্য রকম গান, একটু পুরাতনই, এমন মনে করেন আপনিও?

অঞ্জন : পুরাতন না, লাকি আখন্দের গান আধুনিক বাঙলা গান। আমার গান একটু মনে হবে পপ রক। কিন্তু তিনি সেটা জানে, তিনি পপও জানে, রক এন্ড রোলও জানে। শচীন দেব বর্মণ শুনেছেন, ও জানে, হি নোজ এভরিথিং। হিন্দি ছবি ও জানেন, পিয়ানো, অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে জানেন, অসাম মিউজিশিয়ান। দারুণ। তো আমার তখন একটা, যখন হ্যালো বাঙলাদেশ করার কথা হচ্ছে তখন আমি ভাবলাম যে কলকাতার কারও কথাতো আর বলবো না। বেইলি রোডের ধারে বলে একটা গান লিখেছিলাম—

শিমুল : বেইলি রোডের ধারে আমি দেখেছি তোমায়

অঞ্জন : আমার বৌবাজারে আমি দেখেছি তোমায়, রাতের অন্ধকারে আমি দেখেছি তোমায়—

শিমুল : খুব স্ট্রাইকিং লাইন ছিলো, “এখানে তোমার দাম পঞ্চাশ ওখানে কত জানি না’। 

অঞ্জন : এখানে ঘোলাটে গঙ্গার জল ওখানে ইছামতী, নোংরা নষ্ট—

শিমুল : হাজার কষ্ট তবু বয়ে চলে ঠিকই

অঞ্জন : এরকম তো আরও একটা গান ছিলো ঢাকা ওয়ান টু ওয়ান ফোর—

শিমুল : লিখে লিখে হাত মন পেন ভেঙে গেছে তবু উত্তর আসে নাই, ওই গানটা।  

অঞ্জন : একজনকে লিখছি কিন্তু সে উত্তর দিচ্ছে না, মানে আমি একটা কোলকাতার ছেলে, ঢাকার একটা মেয়েকে একটা চিঠি লিখছি কিন্তু সে উত্তর দিচ্ছে না। আর আমি ভাবি কবে সে উত্তর দেবে কিন্তু সে উত্তর টা দেয় না।

শিমুল : হা হা হা।

অঞ্জন : এইরকম গান আমি লিখেছিলাম। করতে করতে আমার মনে হলো যে একটা গান লিখি লাকি আর আমার আমাকে নিয়ে, তখন আমি এটা লিখেছিলাম যে (গান)

দুজনেই থাকে দুটি দেশে,

দুজনেই গান বেচে খাই,

গানে গানে কোন এক মঞ্চে

হঠাৎ দেখা হয়ে যায়।

একজন বাজায় গিটার।

আর একজন কিবোর্ড, 

দুজনেই গান গেয়ে চলে,

একজন দেয় সঙ্গত      

মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় গান,

সেদিনের সেই জলসায়। 

একাকার হয়ে যায় ঠিকানা

কলকাতা কিংবা ঢাকায়।

এটা কাছে আসার গল্প।

এটা গানের গল্প নয়।

একজন যদি হয় অঞ্জন,

আর একজন লাকি আখন্দ।

শিমুল : অসাধারণ।

অঞ্জন : এটা মনে হয়েছিলো আমি দিয়ে দিতাম। তারপর লাকি আমায় ডেকে পাঠালো, আপনি চলে আসুন, আপনি এখানে আমার লিখা আমার সুরে গান করবেন। আমি বললাম, চলো। তারপর সে এমন শক্ত সুর, আমি গাইতে পারছি না।

শিমুল : হা হা হা।

অঞ্জন : লাকী আমাকে গাওয়াবেই। নাকি শিক্ষা দেবে মানে, তো যাই হোক যে ভাবে করে একটা অ্যালবাম হয়েছিলো। কিছু গান করেছিলাম। হ্যালো বাঙলাদেশ করেছি।

শিমুল : বাপ্পার সঙ্গে—

অঞ্জন : বাপ্পার আমায় ফোন করলো, সরাসরি বললো যে, দেখুন আমার নাম বাপ্পা, আমার দলছুট নামে একটা গানের দল আছে। আমাদের খুব একটা পরিচিতি নেই। আমি জানি আপনি সবাইকে চেনেন, টেনেন। আমাকে ফ্রাঙ্কলি বললো যে, আমাদের তেমন কোন পরিচিতি নেই, যদি আপনার দুটো তিনটে গান থাকে, তাহলে আমাদের অ্যালবামটা বেচতে সুবিধে হবে। আপনি গাইবেন? তো আমি বললাম চলো। ওঁরা  অ্যারেঞ্জ  করলো। তো এই ভাবে না গানে আমার খুব একটা হয় না। 

শিমুল : চাকরি আমার খুব জরুরী(গান)।  

অঞ্জন : হ্যাঁ, আর আরেকটা গান ছিলো আকাশ।

শিমুল : হ্যাঁ, ওইটা আবার দারুণ গান। আকাশ...

অঞ্জন : আর একটা ব্লু দিন, একটা ব্লু টাইপের গান।  এখন দলছুট বিরাট বড়  হয়ে গেছে। তো এই লাকির অ্যালবাম, বাপ্পার অ্যালবাম, হ্যালো বাঙলাদেশ, গানে গানে ভালোবাসা, নিমা রহমান, এই অ্যালবাম জাতীয় জিনিশে কলকাতা এবং ঢাকার সঙ্গে আমার অনেক ইন্টারএক্সচেঞ্জ হয়েছে। এই মনবাক্সতে, তুষার আবদুল্লাহর মনবাক্সতে সিনেমার এক্সচেঞ্জ হচ্ছে।  

পদ্মা : দাদা, এই সিনেমার কিন্তু গানগুলি আপনি লিখেন নি।

অঞ্জন :  না।

পদ্মা : শুনেছেন তো। গানগুলি কেমন হয়েছে?

অঞ্জন : দারুন। দেখুন গান তখনই ভালো হবে সুর সৃষ্টির পরে আর সিকোয়েন্স অনুযায়ী গানগুলি, এ শহর মন শহর বা মনের শহর, যাই হোক, যাই লিখছে, আমার গল্পের সঙ্গে যাচ্ছে। এবার সুর টুর দিয়ে যখন দাঁড়াবে, তখন সেটা হবে। আমার ছবিতে আমি গান লিখি না সব সময়, কখনও সৃজিত মুখোপাধ্যায় লিখছে, কখনো শ্রীজাত লিখছে, কবি, কখনও নচিকেতা লিখে দিয়েছে,  ওই যে ওই গানটা নচিকেতার লেখা। কে আছো কোথায়? ম্যাডলি বাঙালির একটি গান। তো বিভিন্ন লোক লিখছে। 

শিমুল : দাদা, এবার আপনার লাকি ভাইয়ের সঙ্গে কোন রকম যোগাযোগ হয়েছে?

অঞ্জন : আমি জানি যদি আমি যোগাযোগ করি, লাকী এটা দেখবে, লাকী যোগাযোগ করলেই আমি লাকীর বাড়ি যেতে হবে, কিন্তু এ সময়টা আমি দিতে  পারবো না। আমিতো ছবির ব্যাপারে আসলেই ব্যস্ত। আমি না পেরেছি লাকির সঙ্গে যোগাযোগ করতে, না পেরেছি ম্যাকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, না পেরেছি আইয়ুবকে ফোন করতে, আমি কাউকেই যোগাযোগ পারিনি করতে, সবাই খুব  দুঃখ পাবে, যে অঞ্জন এলো এবং আমাদের কারও সঙ্গেই দেখা করলো না। এখন সে ভুলে গেছে, এখন সিনেমার লোক হয়ে গেছে, সে স্বার্থপর, আপনি যেরকম বলেছেন, এখন সে নোট খুঁজছে...

শিমুল : হা হা হা, অঞ্জন দা,

অঞ্জন : বুঝতেও পারবে না তাঁরা, জানতেও পারবে না যে, আমি অনেক, ওই  রকম নোটের জন্যে সিনেমা করছি না।  কিন্তু সিনেমা, কি করবো? কিন্তু যখন ওই ছবি টবি হয়ে যাবে আবারতো দেখা হবে...   

পদ্মা : দাদা, একটা সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যখন যাদের সঙ্গে কাজ করেন তাদের সঙ্গে আপনার প্রেম হয়ে যায়। ওই সময় অন্য যাদের সঙ্গে  কাজ  করেন না, তাদের সঙ্গে আর অতটা আর যোগাযোগ রাখেন না।

শিমুল : প্রিয়া সিনেমায় ছবি দেখতে গিয়ে নচিকেতাকে নাকি দেখেও চিনতে পারেননি! 

অঞ্জন : না আমার কথাটা হচ্ছে আমি যখন, অনেক সময় যাদের সঙ্গে কাজ করি তাঁরা আমার ভীষণ ইম্পরট্যান্ট হয়ে যায়। আমার সঙ্গে তাদের ওই যতটুকু শ্যুটিং, যতটুকু কাজ তার বাইরেও একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। তাদের সঙ্গে রাত্তিরে বসে আড্ডা মারা, তাদের সঙ্গে কাজ শেষ হবার পর, আমিতো আরেকটা জিনিশের সঙ্গে কাজ করতে চাই, তখন তাঁদের সঙ্গে আরেকটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। যেহেতু আগে শুধু কাজের সম্পর্ক ছিলো না, তাই তারা ভাবে যে আমি তাদের অবজ্ঞা করছি। আবার আর একজনের সঙ্গে সম্পর্ক করছি যাঁদের সঙ্গে কাজ করছি। আমার কাজ টা এবং আমার প্রেমটা এক সঙ্গে মিলে মিশে থাকে। আমি ওই সুইচ অন, সুইচ অফ করে করতে পারি না। ধরুন যারা এখানে আমার এসোসিয়েট ডিরেক্টর যারা,বা আমার যারা অ্যাসিসটেন্ট ডিরেক্টর, আর্ট ডিরেক্টর, আমার যারা স্ক্রিপ্ট রাইটার, আমার ডিরেকশন টিম, আমার ইলেক্ট্রিশিয়ান টিম, আমার একটর, যারা আমার অভিনয় করবে আমার সঙ্গে, তাঁরাতো আমার ভীষণ ভীষণ কাছের হয়ে যাবে আমার সঙ্গে, ভীষণ কাছের হয়ে যাবে।

শিমুল : আপনি তো ইতোমধ্যেই মনবাক্সের পুরো বিষয়টা গুছিয়ে এনেছেন অভিনেতা এবং......  

অঞ্জন : না আমি পুরোটা এখনও পারি নি। অনেক চরিত্রের জন্য ঠিক লোকটা পছন্দ হয়নি।

শিমুল : অভিনেত্রী ঠিক করা হয়েছে?

পদ্মা : বিদ্যা সিনহা মীমই করছে শুনছি আপনার মেয়ের চরিত্র। আই মিন তুষার ভাই তো তাই বলছেন। তাই না?

অঞ্জন : হ্যাঁ, তো আমি মীমের সঙ্গে অসম্ভব গভীর সম্পর্কে আমি চলে যাবো। আমি মিমের বাবা করছি। অদ্ভুত একটা বাবা মেয়ের সম্পর্কই আমাদের হবে। তো চলে যাবার পর আমি যখন রাইমা’র সঙ্গে কাজ করতে যাবো, মিম ফোন করলে আমি বলবো, আই উইল কল ইউ ব্যাক। মিমের মন খারাপ লাগতেই পারে। 

শিমুল : হা হা হা।

অঞ্জন : কিন্তু আমি কোনদিনও সেটা শুনবো না। কোনদিনও ভুলবো না আবার এটাও হতে পারে, মিমকে আমি ডেকে নেবো কলকাতায়। তুমি চলে এসো কলকাতার একটি ছবিতে। আমার ডাকতে হবে না, ওটার জন্যে ওকে অন্য কেউ ডেকে নেবে। 

শিমুল : দাদা, আপনি বললেন যে, আপনার সিনেমার জন্য কবিরা গান লিখেছেন, যাঁদের যাঁদের নাম বললেন, মানে মূলধারার কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কেমন?

অঞ্জন : ভালো। আমি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আমার অতি, ভীষণ ভালোবাসতেন আমাকে। আমার থেকে অনেক বড় ছিলেন।

শিমুল : সন্দীপনের লেখা আপনি পছন্দ করতেন? 

অঞ্জন : প্রচণ্ড ভালবাসি আমি সন্দীপনের লিখা। অলিভ গ্রিন আমাকে চেগুয়েভারার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার সন্দীপন বাবুর জন্যে অসম্ভব ভালোবাসা। 

শিমুল : আপনার চলচ্চিত্রে সন্দীপন বাবুর ভীষণ প্রভাব রয়েছে সেটা কি আপনি স্বীকার করেন?

অঞ্জন : হ্যাঁ, সন্দীপন আমার কাছে খুব ইম্পরট্যান্ট। সন্দীপন ভীষণ ইম্পরট্যান্ট  আমার জীবনে। এই জন্যেই ঊনষাট এর একটা গান আছে যেমন, সেখানে সন্দীপনের কথাও আছে।  

পদ্মা : শোনা হয়নি আমাদের।

শিমুল : শোনা হয়নি কারণ দাদা, অ্যালবামটা পাওয়া যাচ্ছে না এখানে।

অঞ্জন : সে গানটা ছিলো আমি... এখানে আর কি কি পাওয়া যাচ্ছে, আমি   এখানেই বিক্রি করেছি, গ্রামীণ ফোন বিক্রি করেছে। ফোনে পাওয়া যাচ্ছে। কলকাতায় রিলিজ করলো আর কি। তবে শুধু গ্রামীণ ফোনই বিক্রি করছে।  

শিমুল : আচ্ছা। 

অঞ্জন : তো প্রথমে একটা গান আছে যে, আমি তোমার জন্য রেখে গেলাম, এটা তোমার জন্য রেখে গেলাম, এটা তোমার জন্য রেখে গেলাম। আমার বয়স হয়েছে, ঊনষাট বছর বয়স হয়েছে, এখন আমার অনুভূতিগুলি। সেখানে একটা লাইন আছে, এর বেশি আর কিছুই রেখে যেতে পারছি না, পুড়িয়ে বাড়ি আমার আজীবন, যদি পারো ছিনিয়ে নিও আমার বব ডিলানকে, আর হয়তো একটা দুটো সন্দীপন। 

শিমুল : আহ গ্রেট। দাদা, মানে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে আপনি বোরড হচ্ছেন না তো?

অঞ্জন : না, না। তোমার বউকে তো দেখছি।

শিমুল : হা হা হা।

পদ্মা : হি হি হি।

শিমুল : দাদা, আপনার কাছে জানতে চাচ্ছিলাম যে, আপনি বলেছেন যে সমস্ত কিছু আপনি করেন আপনার সেই শিল্পী সত্ত্বাকে তৃপ্ত করার জন্য।

অঞ্জন : লেখা, ডিরেকশন, আর গান করা। আমি ছবির গান, কমার্শিয়াল মিউজিক আমি বুঝি না। ওটা নীল করে । অন্য লোকরা, আমি করি না।   

শিমুল :  আপনার কাছে আর্ট বা শিল্প যেটা আপনি খুঁজে  বেড়ান, আপনার সৃষ্টিগুলির মধ্যে সেটা কি জিনিশ? সেটাকে কীভাবে মানে সেটা কি মুখ নিঃসৃত শব্দ দিয়ে অনুভূতির মতো ব্যাখা করতে পারেন?

অঞ্জন : সেটা একটা দর্শন।

শিমুল : হোয়াট ইজ দ্যাট ফিলোসফি?

অঞ্জন : আমার মনে হয় শিল্পসত্তার চেয়ে বড় জিনিশ পৃথিবীতে নেই। শিল্প মানুষকে এক করতে পারে, একমাত্র একটা জিনিশ, একটা জিনিশ পৃথিবীকে, মানুষকে এক করে দেয়। যে কোন ধর্ম, যে কোন জাতি, যে কোন পার্টি, যে কোন রং, যে কোন জেন্ডার, এক করছে শিল্প। আমি যদি আজকে একটা ভালো গান শুনি, আমার পাশের লোকটা জু না ফেসি, খ্রিশ্চিয়ান না হিন্দু, আমার জানার দরকার নেই। একটা ভালো সিনেমা, অনেক মানুষকে এক করে দেয়, একটা ভালো বই সব মানুষকে এক করে দেয়। ভাগ করে ধর্ম, ভাগ করে রাজনীতি,ভাগ করে কাঁটাতার। রাজনীতি আর ধর্ম মানুষকে আলাদা করে, শিল্প মানুষকে এক করে।  আমি মনে করি আমি কম বেশি করে ছোট করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজটির সঙ্গে জড়িত।  আমি এটা বিশ্বাস করি। আমার কাছে আজান কিন্তু একটা শিল্প,

শিমুল : আপনি আপনার একটা গানে বলেছেন

অঞ্জন : কীর্তন একটা শিল্প, আমার কাছে মস্ক একটা আর্কিটেকচার, সেখানে ঈশ্বর থাকে কি না আমি জানি না। কিন্তু মস্ক যদি না থাকতো, মন্দির যদি না থাকতো, চার্চ যদি না থাকতো, তাহলে আমরা আর্ট হারিয়ে ফেলতাম। একটা আর্ট, ইতিহাস ধরে, এই আর্ট, শিল্প তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছে।   

শিমুল : দাদা, আপনার শৈশবের সবচেয়ে পেছন দিকের কোন স্মৃতিটা আপনার মনে আছে? আপনার একেবারে শৈশবের।  

অঞ্জন : মুশকিল বলা, আমার যে কি রকমের.....যত রকমের খারাপ কাজ তো করেছি ওই সময়। 

শিমুল : হা হা হা

অঞ্জন : আমার মনে পড়ছে না। আমার খালি মনে পড়ছে, প্রথম কবে সিগারেট খেয়েছি, কবে প্রেম করেছি, প্রথম কবে মদ খেয়েছি...   

পদ্মা : দাদা, প্রথম কবে প্রেম করেছেন, সেটাই বলেন।

অঞ্জন : চৌদ্দ বছর বয়সে।

পদ্মা : এটা কোথায়?

অঞ্জন : স্কুলে। আমার মিউজিক শেখাতেন যিনি অসম্ভব সুন্দরী একজন আইরিশ মহিলা, তাঁর প্রেমে পড়ে আমি রাত্রি বেলা কাঁদতাম।

শিমুল : কাঁদতেন? এমন প্রেমে পড়েছেন?

অঞ্জন : তারপর সে বুঝতে পেরেছিলো, বুঝতে পেরে আস্তে আস্তে কাছে টেনে আমাকে বুঝিয়েছিলো, যে এই প্রেমটা মানে, আমি তোমার থেকে বয়সে অনেক বড়। তারপরে আবার একটু বড় হয়ে লোরেটো কলেজ, একটু বড় হয়ে কলেজের মেয়েদেরকে আবার ভাল্লাগতো...এ রকম কাউকে কাউকে ভাল্লাগতো আর কি।  

শিমুল : হা হা হা।

পদ্মা : ওকে দাদা, আর একটা জিনিশ যেটা জানতে চাচ্ছি, এই প্রসঙ্গে আমরা কিছু কথা বলবো সেটা হচ্ছে, আপনার আপকামিং সিনেমায় আপনি নায়কের চরিত্র করছেন, এবং সেটা আবার বাবার চরিত্র।

শিমুল : আমি ধরেছি, আমি ধরেছি।

পদ্মা : কলকাতায় বাবার চরিত্র করেছেন অনেক। আপনার লাস্ট ফিল্মটাই ছিলো। একজন ড্রাগ এডিক্টের বাবার চরিত্র। কলকাতার বাবা আর আমাদের দেশের বাবা মানে, নতুন যে চরিত্রটা করবেন, পার্থক্যটা মনে হয় নি কোন?

অঞ্জন : পার্থক্য নেই। পার্থক্য নেই কোন।

শিমুল : পৃথিবীর সব বাবাই কি একরকম?

অঞ্জন : না তুষার আবদুল্লাহ যে বাবাকে লিখছে সেটা আমি, আমার মতোন।  চরিত্রটা লিখেছে সে। এবং আমাকেই এপ্রোচ করেছিলো চরিত্রটা করতে। এটা আমাকে এটা... রঞ্জনা দেখেছেন?  

শিমুল : হ্যাঁ,

অঞ্জন : রঞ্জনার অবনীর সঙ্গে একটা মিল, একটু বোহেমিয়ান, ওই অদ্ভুত একটা কাব্যিক, রোম্যান্টিক, দায়িত্বহীন, ওই এইরকম একটা ব্যাপার আর কি। বদমাশ নয় কিন্তু ওই ওইরকম। মানে বাবা বাবা নয়। তো সেই রকম একটা চরিত্র। তুষার আবদুল্লাহ লিখেছেই, আমার জন্য। তো এটা যে একটা বাবা মানে, আহা মেয়ে  কেমন আছিস, তুই ভালো আছিস? খা রে বাবা আর মেয়েও বাবাকে বাবা বাবা করে ওই রকম না। মানে খুব আধুনিক। বাবা হচ্ছে ওই সন্দীপনের মতো একজন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর মতো এরকম একটা কবি, বাউন্ডুলে   আজ বাড়িতে আছে, কাল বেরিয়ে যাচ্ছে কোথাও। এইরকম একটা লোক। ছবি আঁকে, গিটার বাজায়।  

শিমুল : সে লেখে—

অঞ্জন : সে লেখে উল্টো পাল্টা। হ্যাঁ,?

পদ্মা : একেবারেই আপনার নিজের মতো চরিত্র পেয়ে গেলেন তাহলে?

অঞ্জন : আমার নিজের মতো।   সাজগোজ ওই রকমই হবে  আমি দেখছি । (নিজের ব্রেসলেট দেখিয়ে) সে হাতে এমন একটা ব্রেসলেট ও পড়তে পারে।

পদ্মা : দাদা, আপনার একটা ছোট্ট সিনেমা...

শিমুল : না টেলিফিল্ম ।

পদ্মা : কি জানি না সন্দ্বীপ রায়ের করা...

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমি অভিনয় করেছিলাম।

পদ্মা : সত্যজিৎ রায়ের ছোট গল্প নিয়ে,  দরিদ্র এক বাবা যে তাঁর পুরনো এক বন্ধুর কাছ থেকে... 

অঞ্জন : বন্ধুর কাছে টাকা চাইতে এসছিলো, দুই বন্ধু!

পদ্মা : আপনার মনে আছে ওইটার  কথা দেখছি । তো ওই ছোট্ট একটা ফিল্মে। ছোট্ট সাধারণ একটা চরিত্র। নিজেকে এমন করে ঢাললেন কি করে? এতো অসাধারণ ছিলো আপনার এক্সপ্রেশন? কোনভাবেই ওই হতদরিদ্র লোকটাকে অঞ্জন দত্ত মনে হয়নি।

অঞ্জন : আমার মনে হয় একজন এক্টরের কাজই তো তাই। একজন এক্টরের কাজই হলো, চরিত্রে মিশে যাওয়া। আমি শিল্পী বলে একটা ছবি করেছিলাম, মদন তাঁতির  চরিত্র , আমাকে প্রথমতো ওই ভাষা শিখতে হয়েছিলো, আমায় খালি গাঁয়ে খাটো ধুতি পড়ে, শুধু ধুতি পড়ে রোদ্দুরে হাঁটা চলা করতে হয়েছিলো। আমায় তাঁত চালানো শিখতে হয়েছিলো। তো একদম প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে বোলপুর থেকে চল্লিশ মিনিট দূরে একটা গ্রামে, যেখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। যেখানে শুটিং করা হয়েছে লন্ঠনের আলোতে, আমাকে দুমাস ওখানে তাঁতের কাজ চালিয়ে তাঁতি হতে হয়েছিলো।   

শিমুল : একেই বলে পারফেকশনিস্ট। 

অঞ্জন : করতেই হবে। আমার ডিরেক্টর বলে দিয়েছে কর।   

শিমুল :  দাদা, আপনিতো মৃণাল সৈনিক, মৃণাল দা’র হাত ধরে একভাবে, সত্যজিৎ আর ঋত্বিক’র মধ্যে আপনার প্রিয় কে বেশি?

অঞ্জন : আমার সবাই প্রিয় জানেন, কারণ আমি ব্যক্তিগত ভাবে—

শিমুল : না না এই দুজনের মধ্যে

অঞ্জন : মানে বলা খুব মুশকিল। তিনজনই আমার কাছে অসম্ভব প্রিয়, মানে  সত্যজিৎ রায়ের কিছু ছবিতো জীবনে ও আমি কোনদিনই করতে পারবো না।  ঋত্বিক ঘটকের কোন একটা ছবি। এটা করা মুশকিল জানেন? জানি না কি বলবো।

শিমুল : দাদা, এজ এ ডিরেক্টর আপনি ডিপ্লোমেটিক উত্তর আপনি দিচ্ছেন। 

পদ্মা : হি হি হি 

অঞ্জন : না না না,অরণ্যের দিন রাত্তির কথা জীবনেও আমি অস্বীকার করতে  পারবো না। আপনি যদি বলেন তিনটে ছবি নিয়ে আমায় চলে যেতে হবে একটি দ্বীপে, আমি কিন্তু বহুদিন ধরে ছিলো, ট্যাক্সি ড্রাইভার, রেস্ট লেস আর অপুর সংসার , এর অনেক পরে অপুর সংসারের বদলে আমি ঠিক করি ওটা অযান্ত্রিক হবে।   ইদানীং মনে হচ্ছে, কখনও মনে হচ্ছে,আবার ওটা না, পথের পাঁচালী, অপরাজিত আবার মনে হচ্ছে, ওটা না তাহলে ঋত্বিক বাবুর ছবি একটা নিই। আর এটা বলতে পারবো না। 

শিমুল : হা হা হা। নিজের কোনটা নিচ্ছেন?  

অঞ্জন : না,  নিচ্ছি না আমি। বাকি ছবিতে চার্লি চ্যাপলিন নিতে গেলে মনে হচ্ছিলো ওকে বাদ দেয়া হলো

পদ্মা : হি হি হি     

শিমুল : হা হা হা

অঞ্জন :   ক্রিয়েটিভ মানে আমি কাকে বাদ দেবো? এদের নিয়ে বলা মুশকিল  আপনি জানেন? এদেরকে নিয়ে বলা খুব মুশকিল।

শিমুল : আপনি নিজের কোন ছবিটা নেবেন?

অঞ্জন :  আমি নিজের কোন ছবি নেবো না। আমি নিজেকে নিয়ে থাকবোই না।  আমি সারাজীবনের জন্যে একটা দ্বীপে চলে যাচ্ছি। নিজেকে নিয়ে কেন থাকবো কেন? 

শিমুল : আপনি নিজেকে ছাড়া থাকবেন?

পদ্মা : এটা কেমন করে হয়...

অঞ্জন : কিন্তু আমিতো নিজেই যাচ্ছি। নিজের ছবি দেখতে হবে না। আমার এরকম একটা কিছু দেখতে হবে যেটা বার বার বার বার বার দেখে যেতে পারি মনে হবে গান হতে হবে, মনে হবে বার বার শুনে যেতে পারি।

পদ্মা : তো আপনি আর্ট ফিল্ম বানাতে চেয়েছেন।  যেসব সিনেমা বানিয়েছেন সেগুলি কিছুটা ফিউশন টাইপ, মানে আপনার ভাষ্য মতে। এই যে নিজের এতোগুলি কাজ, এর মধ্যে কোনটা আপনার পছন্দ হয়নি? মনে হয়নি, এটা একটা আর্ট পিস হয়ে দাড়িয়েছে?বা বারবার দেখতে ইচ্ছে হয়েছে? কোনটা নিয়েই গর্ব হয়নি?

অঞ্জন : হ্যাঁ, আমি রিয়েলি প্রাউড। অফকোর্স, আমি ভেরি প্রাউড অফ মাই ওয়ার্ক এবং সেটা শুধু আমি নই, আমার কলিগ যারা তাঁরা বলে, আমার পরের জেনারেশন সেটা রিকগনাইজ করে, বং কানেকশন না হলে তাঁরা করতো না, আই এম রিয়েলি প্রাউড অফ দ্যাট। কিন্তু সেই ছবিটা রোজ চালিয়ে বসে দেখার আমার কোন আগ্রহ নেই।  

শিমুল : বিষয়টা ভিন্ন, কিন্তু দাদা, একটা সময় আপনি কাজ করেতেন  এবং এখন যেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার সিনেমা, কলকাতার সিনেমা কেন বলি, কলকাতার সিনেমা আসলেতো দিল্লী বা মুম্বাই সিনেমার একধরণের বড় পার্থক্যের জায়গা আছে। বাজেটে বলেন, ক্রিয়েটিভিতে বলেন, কিন্তু গত পাঁচ বছরের কথা যদি বলি, আপনি মুম্বাই থেকে কলকাতাকে কতটা পিছিয়ে রাখবেন?

অঞ্জন : কন্টেন্ট বাই পিছিয়ে রাখবো না।

শিমুল :  কোথায় পিছিয়ে রাখবেন?

অঞ্জন : আরেকটু বাজেট হলে কিন্তু আমাদের সিনেমায় আমরা, আমি বলবো যে   থ্রু বং কানেকশন, যারা যারা ছবি করছে কৌশিক গাঙ্গুলী, সৃজিত মুখার্জী...

শিমুল :  হ্যাঁ,

অঞ্জন : অল্প বাজেটে   কাজ করতে গিয়ে টাকা ফেরত দিতে হয় প্রোডিউসরকে। স্মার্ট  ছবি করছে, তাঁর ওই বাজেট  যদি আমাদের যদি দেয়া  হয়, আমরা অনেক ভালো কাজ করতে পারবো।  অনেক ভালো কাজ করতে পারি। আমাদের কাহানীর মতো বাজেট দেয়া হোক, আমাদের হাইওয়ের মতো বাজেট দেয়া হোক। আমরা কি বাজেটে কাজ করছি, দু কোটি, ওরা দশ কোটি, লাঞ্চ বক্স , লাঞ্চ বক্স পাঁচ কোটি টাকার ছবি এবং লাঞ্চ বক্স রোজগার করেছে বাইশ মিলিয়ন ডলার।    

শিমুল :  দাদা, আপনার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাই। আপনি কতটা স্ট্রং আছেন? শারীরিকভাবে মানসিকভাবে?

অঞ্জন : জানিনা। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি।

শিমুল : হা হা হা

অঞ্জন :    দুদিন ধরে, তিন দিন ধরে

শিমুল : না এখানেতো পরিশ্রম যাচ্ছে।

অঞ্জন : কিন্তু এমনিতে ঠিক আছি আমার কোন 

শিমুল : মানে পানটা  কি নিজের কন্ট্রোলে রেখেছেন?

অঞ্জন : না না না না পাগল নাকি, আমি সন্দীপনের ভক্ত।

শিমুল :   হা হা হা (হাত তালি)।

অঞ্জন : কেন? কেন? কেন? দেখুন দেখুন সিগারেট খাওয়া আইনত অপরাধ যতক্ষণ না হচ্ছে, আমি সিগারেট খাবো, আইনত অপরাধ যদি হয়ে যায়, আমি ছেড়ে দেবো। সেটুকু মনের জোর আছে। যতক্ষণ আইনত অপরাধ নয়, আমি আইনত অপরাধতো কিছু করছি না। হ্যাঁ, যদি কারো অসুবিধা হয়, আমি অন্য জায়গায় গিয়ে খাবো। অন্য জোন করে দেয়া হয়েছে তো! 

শিমুল : আপনার ভক্তরা চায় আপনি আপনার শরীরের প্রতি আরও নজর দিন।

অঞ্জন : কিন্তু সেই শরীরের প্রতি নজর দিতে গিয়ে সারাদিন ধরে আমি স্যালাড খেয়ে, জিম করে আর দই খেয়ে একটা বোকা লোক হয়ে যেতে আমি রাজি নই। আমার যদি রাত্তির বেলা রোজ দু পেগ করে হুইস্কি খেতে হয়, আমি খাবো, আই এনজয় দ্যাট। সে রকম একটা ভালো গান শুনবো, একটা ভালো বই পড়বো।

শিমুল : মানে সেই ঘোরটা কি আপনি এনজয় করেন?

অঞ্জন : ঘোর হয় না আমার , আমি এনার্জি পাই। আমি সারাদিন কাজ করে যখন আসি, সারাদিন পরিশ্রম করি বা কনসার্ট করার পর আমিতো জীবনেও কোনদিন কনসার্ট করার সময় মদ খাই না।   

শিমুল : আচ্ছা এটা জানতে চাওয়ার ছিলো আমার, আপনি গানের সময় খান না?

অঞ্জন : নো নেভার

শিমুল : পেশার সময় খান না?

অঞ্জন : নেভার। শুটিং এর সময় আমি নেভার, এডিটিং যত রাত্তি হোক, নেভার। এডিটিং হয়ে যাবার পর আমার একটা যদি খেতে ইচ্ছে হয়, আমি খাবো। কে আমায় আটকাবে ভাই, এটা ভাই বেআইনি হলে, আমি একটা ছবি করেছি, ছবির নাম শেষ বলে কিছু নেই, ছবিটা নেশার বিরুদ্ধে, এবং অনেকেই অবাক হয়ে বলছে, অঞ্জন দত্ত নেশার বিরুদ্ধে ছবি করছে? অফকোর্স। এবিউজ ইজ ডেঞ্জারাসলি ব্যাড এবং সেটা আমায় বলতে হবে,  ইটজ নট মানে গাজা নয়, মানে হচ্ছে কোকেন, হেরোইন। শেষ হয়ে যাচ্ছে একটা জেনারেশন, শেষ হয়ে যাচ্ছে,সব শুষে নিচ্ছে। কন্টিনিউয়াসলি একটা ছেলে যদি সিরাপ খেয়ে যায়, ড্রাগ ইজ নট হেলদি। ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সো আই হেভ টু সে দ্যাট। ড্রিংকিং, আমি এর বিরুদ্ধে নই, আমি এবিউজের বিরুদ্ধে।          

শিমুল : দাদা, প্রথম মদ খেয়েছিলেন কবছর বয়সে?

অঞ্জন : ষোল না পনেরো, বিয়ার খেয়ে.. 

শিমুল : বিয়ার?

পদ্মা : আচ্ছা দাদা, আমরা আসি, পেছন থেকে আমাদের মার  দেবে।

শিমুল : মার দেবে, হা হা হা।      

পদ্মা : শেষ করি আমরা? এই যে আপনার সিনেমার কাজ কদিন বাদেই শুরু করবেন বলছেন। তো কি প্রত্যাশা আপনার? এই সিনেমাটা কেমন হবে?

অঞ্জন : আমার প্রত্যাশা আমি বাঙলাদেশে একটা বং কানেকশন করতে চাই। আমার মনে হচ্ছে আমি একটা নতুন কিছু করতে আসছি, আমি একা করছি না, তুষার আবদুল্লাহ সেটা করছে, আমি সেটা করছি, অনেকে মিলে সেটা করছি, মিম ও সেটা করবে, আমরা সবাই সেটা করবো। হয়তো মিম এমন ধরণের ছবিতে কাজ করেনি, সো হোয়াট?      

শিমুল : রাইট।

অঞ্জন : রাইমাও বং কানেকশনের আগে এমন ছবিতে কাজ করেনি। রাইমা কমার্শিয়াল নায়িকা ছিলো, বং কানেকশন পরে এখন ও  দুরকমের ছবি সে করছে। তো আমি সেরকম এক্সাইটিং কিছু করতে চাচ্ছি। এবং আমি চাইছি, আমার মনে হয় যে অল্প বয়সী আরবান যে বাঙালি ছেলে পুলে আছে, যারা কলেজে পড়ছে, বারিস্তায় যাচ্ছে, ঘুরছে করছে, বাঙলা রক শোনছে, তাদের জন্য বাঙলা সিনেমা দিতে হবে একটা।

শিমুল : দাদা, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা আমাদের পক্ষ থেকে। আর আপনার ভক্তদের জন্য যদি কিছু বলেন? 

অঞ্জন : ভালো থাকুন, সুস্থ থাকবেন। বেশি দেশি মদ খাবেন না, বেশি সিগারেট খাবেন না।

শিমুল : হা হা হা

অঞ্জন : এন্ড নো সাবসটেন্সড নো ড্রাগ, প্লিজ। প্লিজ, প্লিজ। নো ড্রাগস। আর ছবিটা দেখবেন।     

পদ্মা : থ্যাঙ্ক ইউ দাদা,।

শিমুল : অনেক ধন্যবাদ।

পদ্মা : অনেক সময় নিলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ। দেখা হবে।

অঞ্জন : তোমরা নিজেদের ভালোবাসাটা রেখো। দেখা হবে।