সৈয়দ শামসুল হক

নয় মাসে যুদ্ধটা শেষ হয়ে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে সৈয়দ শামসুল হক


 

[Talk to SATV-এর পক্ষ হতে সৈয়দ শামসুল হক-এর এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছিলো ২০১৩ সালে। সাক্ষাৎকারটি কথাবলির পাঠকদের জন্য শ্রুতিলিখন করেছেন শিশির মোরশেদ।]

 

আপনার লেখালেখির পরিসর বিস্তৃত, আপনার অনেক লেখার সাথে আমরা পরিচিত, আপনি কলাম লেখেন, প্রবন্ধ লেখেন, আপনি কবি, সাহিত্যিক, আরেকটু নির্দিষ্ট করে যদি বলি আপনি অনেক উপন্যাস লিখেছেন এবং আপনার উপন্যাসের অনেক পাঠক রয়েছে। মঞ্চ নাটক লিখেছেন সে ক্ষেত্রেও আপনি সফল। সবগুলি পরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টা আপনার কাছে সবচেয়ে বড়ো মনেহয়?

কবিতা হচ্ছে ভাষার সর্বোত্তম সর্বোচ্চ সবচেয়ে সাংকেতিক প্রকাশ। কাজেই যিনি কবিতা লিখেন তাকে কবিই বলতে হবে এবং তার অন্য সব লেখা ওই কবি কাঠামো থেকেই উঠে আসে।

 

একটু পেছন থেকে শুরু করি, আপনি খুব ছোটবেলায় মুম্বাই চলে গিয়েছেন। কেন গিয়েছিলেন? কি চিন্তা করে গিয়েছেন? কোন সময় গিয়েছিলেন?

আমি বোম্বে যাই ১৯৫১ সালে, তখন আমার ১৬ বছর বয়েস।  ততদিনে ফজলে লোহানীর অগত্যা পত্রিকায় ১৯৫১ সালের মে মাসে আমার একটি গল্পও ছাপা হয়। এদিকে বাড়িতে চাপ ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। এই অবসরে আমি পালিয়ে গেলাম। কোথায় যাবো জানি না, শুনতে পেলাম যে আধঘন্টার মধ্যে বোম্বেতে একটা ট্রেন যাচ্ছে, বোম্বের টিকেট কেটে উঠে পড়লাম এবং সেই ট্রেনেই এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হলো যার এক বন্ধু বোম্বেতে সিনেমায় ক্যামেরায় কাজ করতো। তিনি আলাপ করিয়ে দিলেন যে এই ছেলেটিকে দেখে রেখো, উনি এমনি দেখে রাখলেন যে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন চলচ্চিত্র মহলের তখনকার সবচেয়ে নামকরা পরিচালক কামাল আমরোহীর সঙ্গে। আমি তার শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিলাম। ঐখানে আমরা এরকম পাঁচ জন ভবঘুরে বাঙালি সন্তান একটি ছোট্ট ঘরে ( দশ হাত বাই দশ হাতের বেশি হবেনা) ভাড়া করে থাকতাম। রাত্রিরে যে যার কাজ থেকে ফিরে সবাই মেজেতে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকতাম। একদিন সকাল বেলায় বাহান্ন সালের বাইশে ফেব্রুয়ারী কাগজ আমার বুকে পড়েছে, আমি যথারীতি কাগজটা খুলেই প্রথম পাতায় দেখি ঢাকায় গুলি, ছাত্রদের উপরে গুলি, ছাত্ররা নিহত,গোটা পূর্ববাঙলা ভাষার জন্য উন্মাতাল। আমি একেবারে স্তম্ভিত, হতবাক, নিজের ভিতরে একটা প্রচণ্ড আলোড়ন এবং দেশের জন্য টান অনুভব করতে লাগলাম এবং বাহান্ন সালের অক্টোবর মাসে চলে এলাম। কামাল আমরোহী সাহেব উর্দুতে আমাকে বললেন, যাচ্ছ যাও, তোমার জন্য আমার দরজা খোলা রইল তুমি পাগল অহিহ বেওকুবভি”।

বোম্বে থেকে ফেরত এসে আমি ফজলে লোহানীর সঙ্গেই উঠা-বসা করতে শুরু করি, উনি আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন এবং একটা কথা খুব মনে পরে সওগাত পত্রিকা অফিসে তখন পাক্ষিক সাহিত্য সভা বসতো। সে সাহিত্য সভায় উনিশ বাহান্ন সালের নভেম্বরের শেষ দিকে আমার মনে আছে শীতকাল আমি একটা গল্প বলেছিলাম, প্রথম প্রকাশ্যে আমার গল্প পড়া এবং ওই অগত্যায় গল্প ছাপার পরে আমার দ্বিতীয় গল্প ছিলো এটি। আলোচনা হতো সব লেখা পড়ার পরে, তো গল্পটা পড়বার পরে আমারটা আলোচনা করতে উঠে আমাকে এমন ধোয়া ধুয়ে দিলেন যে এটা কিছুই হয়নি, বললেন যে পৃথিবীতে যত গল্প লেখা হয়েছে তার ভিতরে নিকৃষ্টতম গল্প এটি। আমার চোখ ফেটে পানি পড়বার উপক্রম, আমি চুপ করে এক কোনায় গুটিসুটি হয়ে বসে রইলাম। মন খুব খারাপ, একেবারেই ভেঙে গেছে, আমি সবার অলক্ষে বেরিয়ে ওই প্রেস এর সামনে অন্ধকারে একটা ডালিম গাছের নিচে চুপ করে দাড়িয়ে আছি যে সবাই বেরিয়ে যাক তারপর আমি বেরোবো। সবাই সভা শেষে বেরিয়ে যাচ্ছেন রাত তখন আটটা সাড়ে আটটা হবে আমি চুপ করে দাড়িয়ে আছি একেবারে নিজেকে লুকিয়ে। হঠাৎ আমার কাধে একটা হাত চমকে তাকিয়ে দেখি ফজলে লোহানী। উনি বললেন মন খারাপ? ওর ওই প্রশ্ন শুনেই আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করেছে। তখন উনি বললেন, ওই যে দেখছো ওরা যারা যাচ্ছে ওরা কেউ থাকবেনা তুমি থাকবে।

 

সেটি কি সত্যি হয়েছে পরবর্তীতে?

সেটা অন্য সবাই বলবে। অন্তত আমি যে লেগে আছি এটা সেই কারণেই। আমি যে সাহিত্যে এখনো লেগে আছি, এই যে আজকে ষাট-একষট্টি বছর হয়ে গেলো এটার কিন্তু কারণ আমার মনেহয় ওই ফজলে লোহানী। অনেক বাড়িয়ে বলেছিলেন তিনি যে ওরা কেউ থাকবে না তুমি থাকবে। ওরা অনকেকেই আছেন, আমারই সমসাময়িক তারা, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সায়ীদ আতিক উল্লাহ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আনিসুজ্জামান আমাদের সমসাময়িক ওরাও হেঁটে যাচ্ছিলেন ওরা সবাই আছেন, আমিও আছি। কিন্তু ওই উৎসাহটার দরকার ছিলো।

 

আপনার সাথে আপনি অনেকের সাহচর্যের কথা বললেন। ফজলে লোহানীর কথা বিশেষভাবে বললেন। আপনার লেখা থেকে আমরা জানি যে আপনার খুব নিকটজন একজন ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। তার সাথে আপনার পরিচয় নৈকট্য কীভাবে হয়েছিল?

এইতো সাহিত্য সভাতেই, সেই থেকে আমার ঘনিষ্টতম বন্ধুদের একজন। তবে শামসুর রাহমান থেকেও বড় করে বলতে হয় হাসান হাফিজুর রহমানের কথা। উনিশ বাহান্ন সালের সেই ফেব্রুয়ারির একুশ, পরের বছর তিপান্ন সালের ফেব্রুয়ারি আসার আগেই হাসান সিদ্বান্ত নেয় যে একুশের ওপরে একটা সংকলন গ্রন্থ করবে যেটি তিপান্ন সালের মার্চ মাসে বেরোয়। ওই সংকলনটির কাজ যখন চলছিল তখন হাসান আমাকে বললো যে আপনিতো গল্প লিখেন আপনার জন্য এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ করলাম। আমি যেহেতু একেবারেই নতুন লেখক কাজেই আমার জন্য এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু একপৃষ্ঠার ভিতরে গল্প আর কিছুতেই লিখে উঠতে পারিনা। তাগাদার পর তাগাদায় হাল ছেড়ে দিয়ে একসময় বললাম যে হাসান আমার দ্বারা হচ্ছে না। হাসান বিরক্ত হয় ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে বললেন গল্প লিখতে না পারেন কবিতা লিখে নিয়ে আসুন। আমি ভেবেছিলাম যে গল্পই আমার ক্ষেত্র। হাসানের এই কথাতে আমি চমকে উঠলাম। হাসান বললো, যদি কবিতা লিখতে না পারেন আপনি বাদ পড়ে যাবেন সংকলন থেকে। তাতো হয়না, এতো বড়ো একটা সুযোগ, এতো বড়ো একটা আয়োজন তার ভেতর থেকে আমি বাধ পরে যাবো? রাতে ফিরে এসে একটা কবিতা লিখে ফেললাম এবং সেই কবিতাটি যখন হাসানকে দিলাম একটিও শব্দ না কেটে ছাপলেন যেটা এখনও ওই একুশের সংকলনের, আমাদের সেই আদি একুশের সংকলন এখন মুদ্রিত হয় তাতে পাওয়া যাবে। কবিতা তেমন কিছুই হয়নি. কিন্তু যেটা হয়েছে, হাসান আমার জন্য একটা দরজা খুলে দিলো।

 

শামসুর রাহমান এর কথা বলছিলাম, উনার সাথে আপনার দীর্ঘ দিনের নৈকট্য ছিলো সেটি আমরা জানি। কখনো দূরত্ব তৈরী হয়েছিল?

দু-একবার দূরত্বতো হয়েছেই। বন্ধুত্বের এটাইতো শর্ত।

 

আপনি হৃৎ কলমের টানে লিখতেন এবং সেখানে আমরা দেখেছিলাম যে আমাদের এর একজন লেখক হুমায়ূন আজাদ তার সাথে কিছু কিছু বিষয়ে আপনি দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। যার প্রেক্ষিতে কবি শামসুর রাহমান আবার লিখেছিলেন। একটি মন্তব্য ছিল আমার মনে আছে, কাক কাকের মাংস খায় না। তার প্রেক্ষিতে আপনি আবার একটি প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন একটু কড়া ভাষায়। সে সময় কি কোনো দূরত্ব তৈরী হয়েছিল?

দূরত্ব শামসুর রাহমান এর সঙ্গে হয়নি। দূরত্ব হুমায়ূন আজাদ এর সঙ্গে হয়েছিল এবং তাকে লেখক বললে কম বলা হয় তিনি কবি, ভাষাবিদ. প্রবচনগুচ্ছ বলে তিনি একটা ছোট্ট বই লিখেছিলেন, যাতে একটি কথা ছিলো- বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রীই পতিতা। এই কথাটি আমাকে ক্ষুব্ধ করে। হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তিনি তার ছাত্রীদের সম্পর্কে এই কথা লিখছেন? আমি এটার প্রতিবাদ করেছিলাম। শামসুর রাহমান সম্পর্কে নয়। এই বিষয়ে প্রতিবাদ করে আমি দৈনিক সংবাদের হৃৎ কলমের টানে লিখেছিলাম।

তখন হুমায়ূন আজাদ ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন কাগজে আমার নামে অযৌক্তিক, অন্যায় অনেকগুলো আক্রমণ করে। বিভিন্ন কাগজে লিখেও তার শান্তি হচ্ছিলো না পরে হুমায়ুন আজাদ গিয়ে শামসুর রাহমানকে ধরে। কারণ হুমায়ূন আজাদ শামসুর রাহমানের খুব বড় একটা কাজ করেছিলো। "নিঃসঙ্গ শেরপা" নামে শামসুর রাহমান-এর ওপর আস্ত মস্ত একটা বই লিখেছিলো। শামসুর রাহমানকে গিয়ে বলে যে সৈয়দ হক আমাকে এইভাবে আক্রমণ করছে। শামসুর রাহমান ঐটা যখন লিখলেন, শামসুর রাহমানকে আমি তখন ফোন করে বলেছিলাম কাক কাকের মাংস খায় না ঠিকই কিন্তু উপমার সীমাবদ্ধতা আছে। আমার বন্ধুও যদি আপনি হন আপনার যদি কোনো কথার বিশেষ করে এই কোথায় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রীই পতিতা। এতে কি আপনি ক্ষুব্ধ হবেন না? তিনি বললেন ছি ছি তা কেন? হুমায়ূন এসে আমাকে ধরলো।  

শামসুর রাহমান আবার কারো কথা ফেলতে পারতেন না।  আমার এই বন্ধুটির এই একটি দুর্বলতা ছিল কারণ উনি এতোটা মগ্ন থাকতেন নিজের লেখা নিয়ে, নিজের কাজ নিয়ে, বাহিরে তিনি যত কম পারেন সেরে দিতেন। শামসুর রাহমান এরকমই, এই একসঙ্গে হাটছি বিড়বিড় করে ঠোঁট নড়ছে। আমি জানি কবিতার পদ তার মাথার ভিতরে ঘুরছে এবং তিনি বাসায় গিয়ে লিখে ফেলবেন। এতোটাই আত্মমগ্ন ছিলেন তিনি। তো যাইহোক হুমায়ুন আজাদ কিন্তু - আপনাকে এটা বলি দর্শকদেরও জেনে রাখা উচিত একটু কড়া কথাই বলেছি, পরে কিন্তু একটা আশ্চর্য জিনিস দেখতে পেয়েছি তিনি বাঙলা কবিতার একটি সংকলন করলেন যাতে আমার কবিতা শুধু নিয়েছেন তাই নয়, এতো বেশি নিয়েছেন যে অন্যান্য প্রধান কবিদের সমান জায়গা তিনি আমাকে দিয়েছেন। আমি তখন হুমায়ুন আজাদকে ফোন করি- আমি বললাম হুমায়ূন আমার হৃদয় কেঁদে উঠেছে তোমার এই মহত্ত দেখে। তখন হুমায়ূন আমাকে বললো যে আপনাকে বলিনি আমিও আমার ভুলটা দেখতে পেয়েছি কিন্তু আপনাকে আমি অনেক বড় কবি মনে করি।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে আপনি ইংল্যান্ডেই ছিলেন?

মুক্তিযুদ্ধের সময় নয়, আমি ঊনিশো একাত্তর সালের বাইশে সেপ্টেম্বর পযন্ত ঢাকায়ই ছিলাম। এই অবরুদ্ধ ঢাকায়ই ছিলাম। বাইশ তারিখে আমি রওনা হই দেশের বাহিরে যাবার জন্য। লন্ডনে যাই। অনেকেই বলেন যে দু-মাস পরেই স্বাধীনতা চলে আসছে আপনি দেশের বাহিরে চলে গেলেন ওই সময়ে। আমি বলি যে তখন কি তোমরা জানতে একাত্তর সালের ষোলই ডিসেম্বর স্বাধীনতা সময়ে?

 

আপনার চলে যাওয়ার পিছনে কি কারণ ছিল?

আমার স্বাস্থ্যটা ভেঙে গিয়েছিল তখন এবং সেখানেই আমার বন্ধু-বান্ধবের ছিল। ওখানে গেলে আমার সুবিধা ছিল আমি, স্বাস্থ্যটা ফিরে পাবো এবং ফিরে এসে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবো এরকম একটি ধারণা ছিল। আমার ধারণা ছিল বছর তিনেক অন্তত এই যুদ্ধ চলবে। চলাটা উচিত ছিলো। নয় মাসে যুদ্ধটা শেষ হয়ে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।

 

ঔপন্যাসিক হিসেবে পাঠক আপনাকে বেশি চেনে। সেটির কারণও আপনি ব্যাখ্যা করেছেন। আপনার প্রিয় উপন্যাসের নাম যদি জানতে চাই, কোন উপন্যাসটা বেছে নেবেন?

যা লিখেছি সবাইতো আমার কাছে প্রিয়. তার কারণ ওই যে লোকে বলেনা- পিতার কাছে সব সন্তানই প্রিয়, আলাদা করে বলা যাবেনা যখন যে সামনে থাকে তখন। আপনি বলুন কোনটা আপনার ভালো লেগেছে?

 

আমার প্রিয় হচ্ছে "দূরত্ব" "বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ" এর পরে রাখবো আমি। "বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ" আমি দুবার পড়েছি প্ৰথমবার আপনি প্রথম যেটা লিখেছেন, এর পরে একটি সংস্করণে আপনি কিছু পরিমার্জন এনেছেন। সত্যি কথা, সেটি আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। আমি তখন আহতবোধ করছিলাম যে নতুন যারা আপনার এই বইটি পড়বে তারা তো এই পরিমার্জিত রূপটি পড়বে। আপনার মোলিক যে উপন্যাসটি ছিলো সেটি একসময় হারিয়ে যাবে। এটি কি আপনি মনে করেন আপনি ঠিক করেছিলেন?

হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই ঠিক করেছি। না হলে তো আমি পরিমার্জনা করতাম না। নতুন করে লিখেছি কারণ ওই উপন্যাসটি দুটি খন্ডে বেরিয়েছিলো এবং বেরোবার পর আমি পড়ে দেখি যে আমি বেপারটাকে ঠিকমতো গোছাতে পারিনি। এখানে কারো কোনো হাত নেই। শিল্পের ক্ষেত্রে, ওই একটা ক্ষেত্রে স্বৈরাচারিতা চলে।

 

আপনি বলছিলেন একটি ক্ষেত্রেই লেখকরা স্বৈরাচারী হতে পারেন।

লেখক নয় শিল্পী।

 

আপনার পরিমার্জিত যে রূপটি "বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ" এ সেখানে আমার যতটুকু মনে আছে আমি অনেক দিন আগে পড়েছি, আপনি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ এবং বঙ্গবন্ধুর কিছু বিষয় এর মধ্যে অন্তুর্ভুক্ত করেছেন।

শুধু বঙ্গবন্ধুর নয় মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেশ-বিদেশে যা ছাপা হচ্ছিলো ওগুলোর উদৃতি আছে, এমনকি তার অনেক আগেরও অনেক তথ্য সরাসরি তুলে দেওয়া আছে। সব মিলিয়ে পরিমার্জনটি আমার কাছে তৃপ্তিকর মনে হয়েছে, যদি কারো ভালো না লাগে সেখানে আমার কোনো হাত নাই।

 

ম্যাজিক রিয়ালিজম বা বাঙলায় যেটাকে বলে যাদুবাস্তবতা যেটি আমরা ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যে দেখে থাকি, যা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এর লেখায়  খুব স্পষ্ট।  আপনার দূরত্ব উপন্যাস পড়তে গিয়ে এবং এর বাইরেও বেশ কিছু উপন্যাসে জাদুবাস্তবতার একটা ছবি আমার কাছে মনে হয়েছে বা অনেক পাঠকের কাছে মনে হয়ে থাকতে পারে। এই বিষয়টি কিভাবে এসেছে আপনার লেখা-লেখিতে?

জাদুবাস্তবতার কোথায় প্রথমেই আমরা আপত্তি আছে। এখানকার যারা এখন তরুন তারা বোধহয় খুব বেশি পেছনে খোঁজ খবর নিয়ে দেখেন না বা তাকান না। যার জন্যে মনেহয় যে ল্যাটিন আমেরিকা থেকেই আমরা যাদু বাস্তবতা পেয়েছি। এই যাদু বাস্তবতা আমাদের দেশে রূপকথায় রয়েছে, পূর্ববঙ্গ গীতিকায় রয়েছে। একবার চিন্তা করে দেখুন পূর্ববঙ্গ গীতিকায় রয়েছে, স্বামী বাণিজ্যে গেছে স্ত্রী বারো বছর নদীর চরে দাঁড়িয়ে আছে কখন স্বামী ফিরবে। আমিতো উপন্যাসে আজকের দিনে এটা লিখতে গেলে তিনবার চিন্তা করবো। বারো বছর দাঁড়িয়ে আছে কেউ তাকে অপহরণ করছে না, সে কি খাচ্ছে, কোথায় গুমাচ্ছে। এটা হচ্ছে এক ধরনের যাদু, বর্ণনার জাদু। এটা আমাদের ভেতরেই আছে।

 

আপনি সাহিত্যের ভাষা বাঙলা ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা করে গেছেন, এখনো করেছেন। আপনার মর্জিনা মন্তব্য পড়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। যখন ইংল্যান্ডে ছিলেন, আপনার তখনকার লেখাগুলিতেও আমরা দেখতে পাই, যে বাক্য আপনি চরিত্রের মুখ দিয়ে বলছেন সেটি অনেকটা ইংলিশ ভাষার বাক্য গঠনে  মতো।

লন্ডনের পটভূমি লেখা আমার উপন্যাসগুলোতে (পাঁচটা উপন্যাস) ইংরেজ চরিত্রতো আসছেই দু-চার জন, কিন্তু বাঙালীরাও যখন নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলেছেন  তখন এরকম করেছিলাম। এর একটা উপায় ছিলো যেটা সবাই করে থাকেন যে ইংরেজিতে সংলাপটি লিখেন বাংলা হরফে। আমার মনে হলো এটা খুব একটা ভালো লাগছে না আমার কাছে। তখন আমি ওই দুরত্বটা বোঝাবার জন্য, বাংলা ভাষায় নয় অন্য ভাষায় বলা সংলাপ গুলোর ক্ষেত্রে সাধু ভাষা ব্যবহার করেছি।আমি হই ভালো, তুমি হও ভালো.. এই রকম।

 

আপনার এইযে ভাষা নিয়ে নিরীক্ষা এবং আপনার প্রস্তুতি, এটি কি আপনি নতুন লেখনকদের লেখায় দেখতে পান?

অনেক ভিতরে দেখতে পাই আবার অনেকের ভিতরে পাই না। সার্বিক ভাবে বাংলা ভাষা সম্পর্কে চেতনার অভাব, মনোযোগের অভাব আমি লক্ষ্য করি। এটা শুধু সাহিত্য নয়, জন-জীবনেও আছে। যে ভাষার জন্যে রক্ত ঝরেছে এবং ওই সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধের এর মাধ্যমে স্বাধীনতা পেয়েছে এই বাংলাদেশ সেই ভাষা এটা, এবং এর কারণও আছে, কারণটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা। মূল্যবোধের প্রতি আঘাত। বঙ্গবন্ধুর পর জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় আসেন,  তিনি প্রথম বাংলা ভাষাকে পদাঘাত করেন। আমাদের সংবিধান বাংলায় রচিত। বিশ্বের একটা সেরা সংবিধান বাহাত্তরের সংবিধান। সেই সংবিধানে জিয়াউর রহমান একটা সংশোধনী আনেন যে যদি সংবিধানের কোনো অংশ বা কোনো বিধি বিধান নিয়ে অস্পষ্টতা আছে বলে মনেহয় সে ক্ষেত্রে বাংলা নয় ইংরেজি অনুবাদকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

আপনি একটু আগে বলেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধ তিন বছর হবে বলে আপনি মনে করেছিলেন এবং আপনি এখনো মনে করেন যে এটা আরো দীর্ঘ হওয়া উচিত ছিল। না হওয়াতে ক্ষতি হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি সম্পুরক একটি প্রশ্ন করতে চাই। সাম্প্রতিক সময়ে আমার দেখতে পাচ্ছি শাহবাগ আন্দোলন নাম যেটি পরিচিত। তরুণরা একটি আন্দোলন করছে, কোনো রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী না, তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এটি আপনি কি ভেবে দেখেছেন? এটি কি আপনি আশা করেছিলেন, নাকি আপনার কাছে এটি একটি অভাবনীয় বিষয় বলে মনে হচ্ছে?

আমি আশা করেছিলাম। আমি জানতাম বাঙালি কখনো পড়ে থাকবার নয়, বাঙালি তরুণেরা কখনোই পড়ে থাকেনি। সে বাহান্ন সালে দেখেছি. বাষট্টিতে দেখেছি, ছেষট্টি দেখেছি, ঊনসত্তর দেখেছি, একাত্তর দেখেছি বারে বারে দেখেছি তরুণেরা জেগে উঠেছে। আমি মনে করি, ইতিহাসতো আর ফেরাতে পারবো না কিন্তু নয় মাসের জায়গায় যদি বছর তিনেক যুদ্ধ হতো তাহলে এই জাতি পোড় খেয়ে, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং পৃথিবীর বৃহত্তম গণহত্যার ভিতর দিয়ে এই জাতি জেগে উঠতো। আমরা যদি আরো কিছু দিন দ্বগ্ধ হতে পারতাম। ওই হত্যা আর রক্তের ভিতর দিয়ে আরো কিছুদিন পার করতে পারতাম তাহলে পরবর্তীকালে বার বার যে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লাথিমারা হয়েছে, ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে তাহলে বহু আগেই, এই শাহবাগের আগেই জেগে উঠতো দেশ।