শাফিনূর শাফিন

শেষ পর্যন্ত আমি প্রচুর টাকার মালিক হতে চাই শাফিনূর শাফিন


 

[শাফিনূর শাফিন। মূলত কবি। গদ্যও লিখেন। একটা ইংরেজি ওয়েবজিন 'প্রাচ্য রিভিউ'র কবিতা বিষয়ক সম্পাদক। জন্ম ২১ এপ্রিল ১৯৮৭, চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। প্রথম কবিতার বই 'নিঃসঙ্গম'। তার কাছ থেকে ‘কথাবলি’র পক্ষ থেকে কবিতাসহ নানা বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তিনি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ও স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন। আসুন, পড়া যাক তার কথাবলি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

প্রথমে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

আমার আসলে স্বপ্ন-টপ্ন নাই। আমার যা আছে তা হলো জেদ। কিছু নিয়ে জেদ উঠলে দুনিয়া এফোঁড় ওফোঁড় করে হলেও আমি তা করে ছাড়ি।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

স্পাই, নান, নাবিক হতে চাইতাম। অশুভ সংকেত নামে সেবা’র অনুবাদের একটা বই পড়ে শয়তান হবার ইচ্ছেও হয়েছিল। ছোটবেলায় কিছু হতে চাওয়া মূলত ভালো লাগার বইয়ের চরিত্রকে কেন্দ্র করে হতো।

আমাদের তরুণ কবিদের কবিতার মধ্যে পাশ্চাত্যের কবিরা যেই টাইপের মেটাফোর ব্যবহার করতো সেই রকম মেটাফোরের ব্যবহার দেখা যায়।এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমি কীভাবে দেখছি তাতে কিছুই কি এসে যায়? (হাসি) এটা আসলে যিনি ব্যবহার করছেন তার ওপর নির্ভর করে। আর আমি মনে করি এমনটা ঘটছে প্রচুর পরিমাণে পাশ্চাত্যের বই পড়া, সিনেমা দেখা কিংবা গান শোনার কারণে। এটাকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখা উচিত না, কারণ যোগাযোগ সহজ হয়ে যাবার কারণে চিন্তাভাবনার আদান প্রদান অনেক সহজ হয়ে গেছে, যার কারণে পাশ্চাত্যের উপাদানগুলো দ্বারা তরুণ কবিরা প্রভাবিত হবেনই যেহেতু পাশ্চাত্য ডমিনেট করছে বিশ্বকে। তাই প্রভাব এড়ানো সম্ভব না। আরেকটা ব্যাপার, আমার আফ্রিকান কবি বন্ধুদের কবিতা যখন পড়ি, বা আফ্রিকান লেখকদের গল্প পড়লে আমি দেখি তাঁরাও পাশ্চাত্যের অনেক মেটাফোর ব্যবহার করছে কিন্তু সেটার আবার মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে আফ্রিকান নানা ফোক উপাদানের সাথে, যার কারণে তাঁদের লেখা ইউনিক হয়ে উঠছে। পাঠক হিসেবে আমি আফ্রিকান কবির কবিতায় আফ্রিকাকেই দেখতে চাইবো, ইউরোপ আমেরিকাকে না। তো সেইরকম আমাদের কবিতা যখন বাইরের বিশ্বের কোন পাঠক পড়বেন, তিনিও কিন্তু পাশ্চাত্যের মেটাফোর না প্রাচ্যকেই খুঁজবেন। আবার আমার দেশের সাধারণ পাঠক যিনি হয়তো পাশ্চাত্যের বই তেমন পড়েননি, তার কাছে এসব মেটাফোর গায়েবি দুর্বোধ্য আওয়াজের মতো লাগবে।

পাশ্চাত্যের মেটাফোর ব্যবহারকে আমিও নেতিবাচক হিশেবে দেখি না। আচ্ছা এইবার বলেন আপনার কবিতা লেখার পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

না।

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে?

অনার্স প্রথম বর্ষ থেকে।

আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

শুরুটা একধরনের ছেলেমানুষি থেকে। তখন নতুন ভর্তি হয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিনিয়ত শাটল ট্রেনে, ঝুপড়িতে অনেকের সাথে পরিচয় হচ্ছে। তাঁদের কেউ কেউ কবি, ছবি আঁকে, গান করে, আতলামি করে, রাজনীতি করে ইত্যাদি। তো যাই দেখি তাই ভালো লাগে। ঝুপড়িতে এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। আমাদের ফ্যাকাল্টির। সেই বড় ভাই প্রতিদিন জ্ঞানী জ্ঞানী কথাবার্তা বলতেন ঝুপড়িতে। সেইসাথে উনার অখাদ্য কবিতাও পড়াতেন। একদিন উনি কথায় কথায় তাচ্ছিল্য করে বললেন, “তোমার কোনো ক্রিয়েটিভিটিই নাই।“ আমার মেজাজ খারাপ হলো। মনে মনে বললাম, “আরে ব্যাটা, তুই যা কবিতা লিখিস, আমি ইচ্ছে করলে তারচেয়ে ভালো লিখতে পারি।“ সেইদিন বাসায় ফিরে একটা লেখা লিখে উনাকে টেক্সট করলাম। উনি বললেন, “বাহ তুমি তো ভালো লিখো! কবিতা ভালো হয়েছে।“

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

শেষ পর্যন্ত আমি প্রচুর টাকার মালিক হইতে চাই। নইলে আমার বহু ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যাবে।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

এটা নির্দিষ্ট কোন ভাবে আসে না। কারো সাথে কথা বলতে বলতে বা কোন শব্দ মাথায় ঘুরতে ঘুরতে কিংবা কোন দৃশ্য দেখে অথবা কিছু পড়লেও ইমেজ মনে আসতে পারে।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

প্রভাবিত কিনা জানি না। তবে সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন বা নাসিমা সুলতানার যেই কনফেশনাল পোয়েট্রির ধারা- এটা মনে হয় আমার মধ্যে আছে। সুতরাং ধরনটা কিছুটা হলেও থাকাটা অস্বাভাবিক না।

মেটাফোর ছাড়া কবিতা হয় না? আমার কাছে অবশ্য মেটাফোরকে তেমন গুরুত্ববহ কিছু মনে হয় না।

মেটাফোর তো আসলে এক ধরনের অলঙ্কার কবিতার। এটা ছাড়া কবিতা হতেই পারে, কিন্তু এটার ব্যবহারে কবিতাকে আরো ভালো লাগে, এই যা।

আপনার নিয়মিত কারো কবিতা পড়তে কি ভালো লাগে?

জীবনানন্দ দাশ, নাসিমা সুলতানা, সিলভিয়া প্লাথ, অ্যান সেক্সটন, টি এস এলিয়টের কবিতা নিয়মিত পড়তে ভালো লাগে।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কবিতার আবার দায় কীভাবে থাকে? কবির ব্যাপারে বলি। কবিরা তো মূলত সাধারণ মানুষ। কিন্তু যখন তাদের গায়ে কবি ট্যাগ পড়ে যায়, যখন তাঁরা অন্যদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন- তখন চাইলেও তারা অনেককিছুর দায় এড়াতে পারেন না। এখন কেউ যদি দায় অস্বীকার করতে চায় সেটা তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত।

আচ্ছা। আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

কাউকে কাউকে চেনা যাবে। যেমন ধরেন, আমার সময়ের হাসান রোবায়েত কিংবা ডাল্টন সৌভাত হিরা অথবা শাহ মাইদুল ইসলাম, এদের কবিতা থেকে নাম তুলে দিলেও কিন্তু আপনি পড়ে বুঝতে পারবেন কবিতা এদের লেখা। আরো অনেকেই আছে এমন। এদের ধরন ধরে ফেলা যায়।

আচ্ছা, তাই নাকি? দেখি একদিন নামটাম উঠিয়ে দিয়ে পড়ে দেখতে হবে। এইবার পরের প্রশ্ন, আপনি কবিতা কেনো লিখেন বলে আপনার মনে হয়?

লিখতে পারি বলেই লিখি।

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

সবার কবিতা পড়িনি। যাদের পড়েছি অনেকেই খুব ভালো লিখেন। এবং আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেকেই চেষ্টা করেন নিজেদের আলাদা ধরণ তৈরি করতে যাতে তাঁদের কবিতাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়।

কেনো জীবনদাশের কবিতা আমরা বারবার পড়ি?

কারণ উনার কবিতা এবং কবিতার ভাষাকে আমরা এখনো রিলেট করতে পারি।

সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না কেনো বলে আপনার মনে হয়?

তিরিশে যে আরও চারজন কবি আছেন, আপনি না পড়লে জানলেন কী করে?

আমি আসলে জানতে চেয়েছিলাম অন্য চারজনকে আমরা জীবনদাশের তুলনায় কম পড়ি কেনো। যাই হোক, এইবার বলেন, আপনার কাছে কবিতা কী?

কবিতা।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর আমি আগেই দিয়েছি। তবু আরেকটু বলি দ্বিতীয় দশকে এসে আমি দেখছি এর আগের ও এর পরে আবির্ভূত কবিদের কবিতায় নানা নিরীক্ষার কারণে বৈচিত্র্য আছে। অস্বীকার করছি না অনেক কবিতায় একঘেয়েমিও আছে। পরের প্রশ্নে আসি। ধরুন কেউ যদি নিজের লেখাকে ব্যতিক্রমীভাবে উপস্থাপন করেন, নিজের স্বর আলাদা করে চেনানোর চেষ্টা করেন সেটাকে আমি কেন স্টান্টবাজি বলবো? শেষ পর্যন্ত সবাই চায় টিকে থাকতে। এখন টিকে থাকার জন্য কবিতায় বা ভাষায় তো নতুন কিছু চমক আনতে হবে, তাই না? এটাকে স্টান্টবাজির মতো নেগেটিভ শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা না করাই ভালো।

নিজস্ব স্বর প্রকাশের ধরনকে আমি স্টান্টবাজি বলি নাই। বলেছি কবিতায় চমকপ্রদ শব্দ, স্ল্যাং এর ব্যবহার ইত্যাদি পূর্বের অতি চর্বিত পন্থার মাধ্যমে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টাকে। হোয়াটএভার, এইভার আপনি কনটেম্পরারি কবিতায় উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে বলেন।

কেউ কোন নির্দিষ্ট ফর্ম না মেনে লিখে যাচ্ছে, ভাষার কোনো নির্দিষ্ট ধরণ না মানার চেষ্টা চলছে, আবার অ্যাবস্ট্রাক্ট কিছুকে ধরার চেষ্টা আছে, কেউ কেউ তাচ্ছিল্যতা, প্যারাডক্স ইত্যাদিরও পরিচর্যা করছে- মানে উত্তরাধুনিকতার এলিমেন্ট বলতে গেলে সবই পাওয়া যাবে সমসাময়িক কবিতায়। শুধু একটা ব্যাপার বিরক্তিকর, আমিসহ সবাইরে ক্যান জানি মনে হয় ইনিয়ে বিনিয়ে দুঃখের, বিষণ্ণতার আলাপ করে যাচ্ছে বা নিজের বেদনা ছড়িয়ে দিতে চাইছে চারপাশে! আর বাকিরা সবাই আহা উঁহু করে তাতে সঙ্গত দিয়ে যাচ্ছে!

এই সময়ে এসে কবিতায় প্রথাগত ছন্দের প্রয়োজনীতা কি আছে? থাকলে কেনো আছে? মানে প্রথাগত ছন্দ বলতে মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত বা অন্যান্য শাস্ত্রগত ছন্দের কথা বলছিলাম আরকি…

অপ্রয়োজনীয় কেন হবে? আমি ছন্দে কবিতা লিখি না কিন্তু আমার সময়ের অনেকেরই যেমন হিজল জোবায়ের, আল ইমরান সিদ্দিকী, বা ডাল্টন সৌভাত হিরা, রিমঝিম আহমেদ, রওশন আরা মুক্তার বহু কবিতা আছে ছন্দে লেখা। প্রথাগত এবং সংস্কৃত ছন্দে লেখা। সেইসব ছন্দে লেখা কবিতার অনেক কবিতাই আমার ভালো লেগেছে, আবার অনেক কবিতাই ভালো লাগেনি। এই সময়ের কবি প্রথাগত ছন্দে লিখুন আর যেভাবেই লিখুন, মূল কথা হলো কবিতা হচ্ছে কিনা, পাঠকের তা ভালো লাগছে কিনা।

আমিও অতোটা অপ্রয়োজনীয় মনে করি না। (তবে আমি ছন্দের চেয়ে ভাষা দাঁড়াচ্ছে কিনা সেইটা বেশি দেখি।) আমার প্রশ্নে আমি আপনার কী মত সেটা জানতে চেয়েছিলাম আর কি ( হাসি)। আচ্ছা এইবার বলেন, লেখালেখি প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অন্তর্জাল লেখক কবিদের পত্রিকা (ছোট-বড়) মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে মুক্তি দিয়েছে। এখন কেউ বসে থাকে না কবে তাঁর লেখা কোন পত্রিকা বা লিটল ম্যাগে ছাপা হবে তা নিয়ে। আর সবচেয়ে ভালো যে ব্যাপারটা, লেখা প্রকাশের পর পরই লেখা নিয়ে প্রতিক্রিয়া সরাসরি পাওয়া যায়।

অনেকে মনে করেন কবিতায় দর্শন থাকতে হবে, এই থাকতে হবে, সেই থাকতে হবে…। কেনো থাকতে হবে, না থাকলে কী সমস্যা?

কোনো সমস্যা নাই। যে যার মতো লিখুক। দেখেন, পূর্ব নির্ধারিত দর্শন বা বিভিন্ন ব্যারিকেড দিয়ে কবিতাকে বেঁধে তো কোন লাভ নাই। কারণ কবিতা যখন কবি লিখেন তখন তাঁর মাথায় যাই থাকুক না কেন, লিখে ফেলার পর ইন্টারপ্রিটেশানের কাজ পাঠকের ওপর চলে যায়।

জীবনদাশকে আমার পৃথিবীর সব থেকে বড় কবি মনে হয়...

আমার মনে হয়, জীবনানন্দ দাশের সাথে নাম নেয়া যায় এমন অনেক বড় কবি আছেন পৃথিবীজুড়ে।

আচ্ছা। বাঙলা কবিতাকেও আমার পৃথিবীর সব থেকে ভালো কবিতা মনে হয়। আপনার কী মত?

এই বিষয়ে সন্দেহ নাই। কারণ এই একটা ভাষা আমি ভালো বুঝি।

একই কারণে জীবনদাশকে আমার পৃথিবীর সব থেকে বড় কবি মনে হয়। যাক, এইবার আসি পরের প্রশ্নে, প্রেম আর কামকে আপনি কী রূপে দেখেন? প্রেম ছাড়া কী কাম পরিণতি পায়?

প্রেম ছাড়া কাম হতে পারে বলে আমি মনে করি না। প্রেম আর কাম দুটোকেই আমি অশান্তির রূপে দেখি।

একই মানুষের প্রতি ঘৃণা ও প্রেম পাশাপাশি কেমন করে চলে?

আমার ঘৃণা তীব্র। প্রেম সেখানে স্থান পায় না।

আধুনিক গদ্যে/আখ্যানে কাব্যিকতাকে ক্রিটিকগণ নঞ্চর্থক দৃষ্টিতে দেখেন। এই বিষটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

কোনো একটা অদ্ভুত কারণে আমাকে আপনার পণ্ডিত ঘরানার লোক মনে হয়েছে! তাই এতো কঠিন কঠিন প্রশ্ন করছেন! যাই হোক, আমার মতে যিনি লিখছেন বা পাঠ করছেন, তিনি খুব একটা দুনিয়াতে ক্রিটিকদের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মাথা ঘামান না। (আখিরাতে ঘামালেও ঘামাতে পারেন, ওইখানে যেহেতু আমি যাই নাই তাই বলতে পারছি না!)

আপনার কি মনে হয় ডিকন্সট্রাকশন থিউরির পরে আর কোনো থিউরির দরকার আছে?

কোনো থিউরিকে অন্তিম মনে করার কোন মানে হয় না এবং যেকোন থিউরির সাফল্য হচ্ছে যখন তাকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন আরেকটা থিউরির জন্ম হয়। সুতরাং ডিকন্সট্রাকশনের পরে থিউরির দরকার আছে।

আমি আসলে ডিকন্সট্রাকশন পূর্ব থিউরিগুলির বিষয়ে বলেছিলাম কথাটা। পরে অবশ্যই আরো থিউরি আসতে পারে। আচ্ছা এইবার পরের প্রশ্নে যাই, আপনি কি নিজেকে ফেমিনিস্ট মনে করেন?

আমার পরিবার বা সমাজে অনেক কিছুতেই নারী হবার কারণে আমি কম্প্রোমাইজ করতে বাধ্য হই। যেহেতু নিজের বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যবর্তী একটা দ্বন্দ্বে আমি থাকি, তাই ফেমিনিস্ট পুরোপুরি নই। তবে আমি খুব জেন্ডার বায়াসড এটা জানি।

আমার মনে হয় বিশুদ্ধ কবিতা শেষ পর্যন্ত অধিবিদ্যার দিকে ধাবিত হয়। আপনি কী মনে করেন?

অধিবিদ্যা শব্দটা ভীষণ কঠিন। কঠিন বা জটিল যেকোন অর্থের দিকে কবিতা ধাবিত হলে আমি ভয় পাই।

মহাভারত কিংবা গীতা পড়লে শ্রীকৃষ্ণকে আমার খুবই আধুনিক এবং কনটেম্পরারি মনে হয়। আপনার মত কী?

ধূর্ত যে কোনো কিছুই সবসময় খুব আধুনিক ও কনটেম্পোরারি।

আপনার কথা সত্য। তবে শ্রীকৃষ্ণকে অবশ্যই আমি ধূর্ত মনে করি না, জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান মনে করি। যাক সে বিতর্ক অন্য কোনোদিন হবে। এখন পরের প্রশ্ন, আপনার মধ্যে কি কখনো মৃত্যুচিন্তা কাজ করে?

অসুস্থ হলে করে।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

কবিতার ইতিহাস পড়তে বা লিখতে গেলে কোন কবির আবির্ভাব কোন দশকে- তথ্যটুকু দেয়া ছাড়া দশক বিভাজন কবি বা কবিতার কোন কাজে আসে না। দশক কবিকে টিকিয়ে রাখে না।

শিল্প-সাহিত্যে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

অনেকক্ষেত্রেই সাধারণ পাঠককে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক-কবি-শিল্পীর কাজের প্রতি বা তাকে জানার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এছাড়া পুরস্কারপ্রাপ্তির পর ধরেন- পুরস্কার অপাত্রে গেছে কি যায়নি আদৌ বা পুরস্কারটা আসলে কতটা গ্রহণযোগ্যতা হারালো বা বাড়ালো এ’নিয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে নানা তর্ক বিতর্ক শুরু হয়। অনেক লোক এইসব অভিমতের পক্ষে বিপক্ষে মাথা ঘামিয়ে যেভাবে নানা যুক্তি দাঁড় করায়, মানে মানুষের মাথা খাটানোর একটা পথও যে তৈরি করে দেয় পুরস্কার- এসব তো একরকমের ভূমিকা রাখাই বলা যায়।

আপনার কী ফিকশন লেখার ইচ্ছা আছে?

লিখছি। মানে শুরু করেছি।

খুবই ভালো খবর। আচ্ছা, আপনার প্রথম কবিতার বইয়ের ফ্রন্ট কভারে কবির নাম নেই, কিন্তু পুটে এবং ব্যাক কভারে আছে, ব্যাপারটা এমন হলো কেনো?

আমার সবসময় বইয়ের প্রচ্ছদ দেখতে যতটা ভালো লাগে, তার উপরে যেকোন লেখা থাকলে ততটাই বিসদৃশ ঠেকে। নিঃসঙ্গমের ক্ষেত্রে কিছুটা এই ভাবনা মোটিভেট করেছে। আর এছাড়া দেখতে চেয়েছিলাম, বইয়ের উপর কবির নাম না থাকলেও কেউ শুধুমাত্র কবিতা পড়ে বা বইটা উল্টেপাল্টে দেখে কবিতা পড়তে আগ্রহী হয় কিনা। প্রথমে ঠিক করেছিলাম ফ্রন্টে, পুটে বা ব্যাক কাভার কোথাও কবির নাম থাকবে না। পরে আমার বন্ধুরা (যাদের সাথে বিষয়টা শেয়ার করি) বলে এটা আসলে খুব একটা ভালো ব্যাপার হবে না, অনেক বেশি রিস্ক নেয়া হবে প্রথম বই হিসেবে। পরে বিধানদা প্রচ্ছদ করার সময় বলেন, ফ্রন্টে না থাক কিন্তু পুট আর ব্যাক কভারে নাম থাক। চৈতন্যের রাজীব ভাইও তাই বললেন। রাজীব ভাই যে প্রচ্ছদে নাম ছাড়াই বই প্রকাশে রাজী হয়েছিলেন সেটাই আমাকে যথেষ্ট অবাক করেছিল। ভেবে দেখলাম, প্রকাশক তো ব্যবসায়িক একটা চিন্তা থেকে বইটা বের করছেন। তাই পরে কভারের উপর নাম না রেখে ওভাবে পুটে বা ব্যাককাভারে নাম রেখে বইটা আনার সিদ্ধান্ত নিই।

আপনার কবিতার বইয়ের নাম ‘নিঃসঙ্গম।’ নিঃসঙ্গমের অর্থ আমার কাছে সঙ্গমহীনতা বলে মনে হয়। আপনার ব্যাখ্যা কী?

নিঃসঙ্গ যে সঙ্গম। বা যে সঙ্গমের জন্ম নিঃসঙ্গতা থেকে। কবিতা তো তাই, না?

প্রাচ্য রিভিউ নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

আমাদের আপাতত পরিকল্পনা হলো, যতো বেশি এটাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করা যায় এবং অবশ্যই ভালো ভালো লেখা প্রকাশ করে যাওয়া।

নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

বইটার কাভার ছিঁড়ে ফেলে রেখে দিয়েছিলাম অনেকদিন পর পড়লে কেমন লাগে দেখার জন্য। দেখলাম পাঁচ-ছয়টা কবিতা ছাড়া বাকি সব ট্র্যাশ। এরপর পুরো বইটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এখন আর বইটার জন্য কোন অনুভূতি নাই।