রুবেল সরকার

মূলত এ আমার আত্মার দাসখত, মস্তিষ্কের আনন্দভ্রমণ রুবেল সরকার


 

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি রুবেল সরকারের  সঙ্গে। এবারে ‘তৃতীয় চোখ’ থেকে প্রকাশ হতে যাচ্ছে তার প্রথম কবিতার বই ‘রুবেল সরকারের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’ তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের বিচিত্র সব জবাব দিয়েছেন। আসুন  এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য] 

 

আপনার তো প্রথম বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

হ্যাঁ, 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'—আমার প্রথম বই। অবশ্যই ভালো লাগার মতো একটা ব্যাপার। যেহেতু প্রথম বই, তাই আবেগটা আরও বেশি, আনন্দও। যদিও বইটা গতবছরই আসার কথা ছিল। তখন ব্যাটে-বলে হয়নি; এবার হলো। হা হা হা

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

প্রথমে ডাক্তার, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম (চাইতাম) মনে মনে। কোনোটাই আর সম্ভব নয়।   

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালিখি করছেন?

সুনির্দিষ্টভাবে মনে নেই। শুরুটা ২০০০ সালের একটু আগে-পরে হবে। আমার হিসেবে ১৫-১৬ বছর ধরে(সিরিয়াসলি লিখছি প্রায় ১০ বছর ধরে; মাঝখানে অবশ্য বেশ কয়েকবছর তেমন একটা লিখিনি)।

আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

মূলত ছোটবেলা থেকেই ছড়া, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গোয়েন্দাসিরিজ এসব টানতো খুব। বিশেষ করে ছড়া ও কবিতা। রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত প্রথম দিকে খুব আনন্দ দিত (এখনও টানে)। তারপর কীভাবে যে শুরুটা হয়েছিল, কেন হয়েছিল, তার কোনো স্মর্তব্য ঘটনা বা ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। তবে, একজনের কথা বলতে চাই, কবি সজল কান্তি দে—এ মানুষটা-ই প্রথম আমায় সাহিত্যপাঠে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং কবিতাকে ভালোবাসার কথা বলেছিল। আরেকজন কবি তাপস মল্লিক—আমার পড়া প্রায় ৫০% বই-ই তাপস মামার। এ দুজন আমায় নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং তাড়না দিয়েছেন। আমার বইটার (শ্রেষ্ঠ কবিতা) উৎসর্গলিপিতেও এ দুজনের নাম আছে।

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

আসলে 'কবি' হতে এ জগতে আসিনি। লিখতে লিখতেই এ কবিতার জগতে জড়িয়ে যাওয়া। একটি প্রকৃত কবিতার মতো কবিতা লেখার জন্যই আমি মূলত শব্দের দাস বনে যাই। মূলত এ আমার আত্মার দাসখত, মস্তিষ্কের আনন্দভ্রমণ। 'কবিতার ভিতরটা কবির, বাইরেরটা পাঠকের।'—আমি এটাই বিশ্বাস করি। তাই পাঠকই জানে আদতে আমি 'কবি' কি না... হা হা হা। অন্তত একটা গল্পের সংকলন ও একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে কয়েকবছর পর। (কিন্তু কেন জানি মনে হয়, তা আর হয়ে উঠবে না...)

আপনার কাছে কবিতা কী?

কবির জন্ম বিরহে, কবিতার জন্ম আবহে। আপাত বিরহ থেকেই জন্ম নেয় একেকটি পরম আনন্দময়ী কবিতা। কবিতা—সে তো পরমে বিচারী, অন্তরে মারে টান! সে তো মনের মানুষ—তারে ধরতে পারি, বাঁধতে পারি না; "এই তার দেখা পাই তো পরক্ষণেই শূন্যে মিলায়।" কবিতা—ছন্দ ও ভাবরসের এক অপূর্ব সম্মিলন, যুগপৎ বিক্রিয়া, চূড়ান্ত অবয়ব।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

একেকেটা একেকভাবে। মাঝেমধ্যে ফরমায়েশি লেখাও লিখি। স্বচক্ষে দেখা, বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করেও কিছু লেখা আছে আমার। কখনও শব্দ, কখনও পঙক্তি, কখনও ছন্দ, কখনও কোনো নাম, কখনও কোনো ঘটনা, কখনও নিরেট কল্পনা আমায় তাড়িত করে।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

শুরুতে রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। পরবর্তীতে আমায় সবচে' বেশি প্রভাবিত করেছে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। চরম সচেতনতার সাথে আমি তাঁর প্রভাব এড়িয়েছি ৩ বছরের প্রচেষ্টায়। জীবন, বিনয়, শক্তি, আল মাহমুদ, আবু হাসান শাহরিয়ার দ্বারাও প্রভাবিত ছিলাম একসময়। এখনও প্রভাবিত হই মাঝেমাঝে, ইচ্ছে করেই। তবে কখন, কার দ্বারা হই তা এখন মনেও থাকে না...

আপনার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

এমনিতেই খুব কম পড়ি আমি, ধৈর্য কম। গতবছর থেকে ফেসবুকেই কবিতা পড়ছি প্রচুর। মাঝেমধ্যে গুগলে সার্চ দিয়েও পড়ি। তবে, 'সঞ্চয়িতা' ও 'সোনালি কাবিন' বারবার পড়ি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, শামসুর রাহমান, ভাস্কর চক্রবর্তী, জহর সেন মজুমদার প্রমুখ—বেশি পড়া হয় (বাংলা কবিতায়)। একেকজনের কবিতা একেকভাবে টানে, তাই পড়ি। ভালোলাগা আপেক্ষিক; তাই এর ব্যাখ্যাও আপেক্ষিক... হা হা হা

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

বলতে গেলে অনেক কথা। দীর্ঘ আলোচনা হয়ে যাবে এ বিষয়টা নিয়ে। কেবল এটুকুই বলি : কবি (?) হিসেবে আমারও কিছু দায় আছে আমার ভাষার প্রতি, আমার দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি। বৈশ্বিক একটা দায়ও আমি অনুভব করি। আমার লেখাও (কবিতা) এ দায় এড়াতে পারে না। তবে আমি বা আমার লেখা কারও বাধ্যগত নই। এমনকি পাঠকেরও না। 

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

অসাধারণ লেখনি অনেকেরই। আমি নিজেও অনেকের লেখার ভক্ত। একটা আধা-অন্ধকার সময় পার হয়ে এখন আবারও কবিতা পাঠকের হয়ে উঠছে। এ কৃতিত্ব এ সময়ের কবিদের, নবীনদের।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

পরাবাস্তব ও প্রতি-কবিতারই জয়জয়কার এখন। তবে আমি আমার সমকালীন কবিদের কাছ থেকে নিটোল ছন্দের 'কবিতা' আশা করি। বিশেষ করে নবীনরা ছন্দ বিষয়ে উদাসীন। আমি সবার কাছ থেকে বানান-সচেতনতাও আশা করি। আমি চাই কবি ভার্সেটাইল হোক। তার ভিতরে 'বাংলা'ও থাকুক! স্টান্টবাজি অনেকসময় ভালো যদি তাতে যুক্তি ও সততা থাকে। তবে হালের স্টান্টবাজদের কেবল ফাঁকাবুলি আর মিডিয়া আছে, কবিতা নেইএটাই পীড়া দেয় বেশি। প্রকৃত কবি কখনও স্টান্টবাজ নয়; সে 'একার সন্ন্যাস' লালন করে। মূলত আমার সমসাময়িক যাদের আমি 'কবি' মনে করি তারা স্টান্টবাজ নয়। তারা কবিতা ভালোবাসে।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

যে কবি তার নিজের সময়কে উতরাতে পারে না, সে-ই দশকের কবি। প্রকৃত কবি দশক বা শতকে বাঁধা পড়েন না। কোনো-না-কোনোভাবেই প্রকৃত কবি কালে-কালে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেন। এটাই কবি ও কবিতার ধর্ম। 'দশক' স্রেফ একটা সময়কাল যা কবিকে বাঁধে না, অ-কবিকেই আশ্রয় দেয় কেবল।

শিল্প-সাহিত্যেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

টাকা, খুঁটির জোর, বিশেষ উদ্দেশ্যে (আপাত খারাপ) দেওয়া সব পুরস্কারই ফালতু। তবে এসব ছাড়া, কেবল লেখনির জোরে যে পুরস্কার---তাকে আমি সম্মান করি, গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। প্রকৃত কবি প্রশংসা-পুরস্কার কোনোটাকেই মাথায় তোলেন না। পাঠকের ভালোবাসাই সবচে' বড় পুরস্কার। তবে পুরস্কার নানাভাবে একজন লেখককে প্রভাবিত করে। সম্মান, টাকা এসবও একজন কবি/ লেখকের জন্য গুরুত্বহীন নয়; কেননা কবি/ লেখকও মানুষ।

সবশেষে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

একটা 'কাহিনি' (সিনেমা উপযোগী) আমার মাথায় আছে, কিন্তু লিখিনি। এ কাহিনিটি মিথ্যা নাটক সাজিয়ে অনেককে শুনিয়ে শুনিয়ে প্রশংসা পেয়েছি খুব (যদিও তারা পরে জানতে পারে যে কাহিনিটি আমার)। চাই, এ কাহিনিটি নিয়ে একটা সিনেমা হোক। কৃষ্ণ, গৌতম ও লালন---এ ত্রয়ীকে নিয়ে একটি উপন্যাস লিখতে চাই। তবে এখনও কোনো চেষ্ঠা নেই এসব নিয়ে। স্বপ্ন তো অনেক... জানি, ছুঁতেও পারবো না... আপাতত আমার 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' বইটা পাঠকের ভালো লাগবে, এ বইটা কিনে কেউ হতাশ হবে না---এটুকু স্বপ্ন মস্তিষ্কে লালন করছি।