রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আচরণে যদি মহত্তের সূত্রগুলি মেনে চলতে পারি তবেই আমরা আত্মপ্রকাশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


 

[রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আলবার্ট আইনস্টাইন-এর মধ্যে প্রথম দেখা হয় ১৯২৬ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর। সেইবার রবিনাথ দ্বিতীয়বারের মতো জার্মানিতে যান। সেইদিন সকালে তার সম্মানে জার্মানির সংস্কৃতি মন্ত্রী এক চা-চক্রের আয়োজন করেন। আমন্ত্রিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আইনস্টাইনসহ জার্মানির অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। একইদিন বিকেলে আইনস্টাইন রবিনাথকে চা-চক্রে আপ্যায়িত করেন। রবিনাথ বিকেলে কাপুথে (Caputh) আইনস্টাইনের বাসভবন 'আইনস্টাইন ভিলায়' যান। সেখানে তাদের মধ্যে যে আলাপচারিতা, তার অংশবিশেষ ১৯৩০ সালের ১০ আগস্ট নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয় Einstein and Tagore Plumb the Truth নামে। প্রতিবেদক ছিলেন জার্মানির সাংবাদিক দিমিত্রি মারিয়ানফ।

১৯৩০ সালের জুলাই মাসে রবিনাথ আবার জার্মানি সফর করেন এবং ১৪ জুলাই আইনস্টাইনের বাসভবনে তাদের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দেখা হয়। আইনস্টাইন তখন বার্লিনের কাইজার ভিলহেলম ফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। কবি ও বিজ্ঞানীর মধ্যে সেদিন অনুষ্ঠিত দীর্ঘ আলোচনার সময়ে উপস্থিত ছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। তাদের মধ্যে তৎকালীন বিশ্বপরিস্থিতি, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং ইহুদি ও ফিলিস্তিন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।

রবিনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যে তৃতীয়বার সাক্ষাৎ ঘটে ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তাদের মধ্যে চতুর্থবার এবং শেষবার দেখা হয় ১৯৩০ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমেরিকার নিউ ইয়র্কে। সেইবার রবিনাথ নিউইয়র্কে এক চিত্রশিল্পীর বাসায় আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন এবং আইনস্টাইন সেই বাসায় এসে রবিনাথের সঙ্গে দেখা করেন। আইনস্টাইনের সঙ্গে রবিনাথের শেষ দুটি আলাপচারিতা পৃথকভাবে বা একত্রিত অবস্থায় অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যতদূর জানা যায় The Modern Review-তে প্রকাশিত আলাপচারিতাটি দেখে আইনস্টাইন তাতে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। এছাড়া The American Hebrew-তে এই সাক্ষাৎকার পুনঃপ্রকাশিত হলে, আইনস্টাইন প্রথম প্রকাশনার কতকগুলি অংশ কেটে বাদ দেন। ২০০১ সালে The Kenyon Review (vol. xxiii, number 2) দিমিত্রি মারিয়ানফ্ এবং অমিয় চক্রবর্তীর সমন্বিত নোট, শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আর্কাইভস ভিত্তি করে বিস্তৃততর সমন্বিত ভাষ্য প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য যে আইনস্টাইন-রবিনাথ সংলাপের সংক্ষিপ্ত বাঙলা অনুবাদ ১৯৩১-এ বিচিত্রা পত্রিকায় বেরিয়েছিল। আজ কথাবলির পাঠকদের জন্য সেইসব আলাপচারিতার সমন্বয়ে একটি সংক্ষিপ্ত এবং সম্পাদিত রূপ প্রকাশ করা হলো।]

 

আইনস্টাইন : আপনি দৈবশক্তিকে বাস্তবজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হিশেবে বিশ্বাস করেন?

রবিনাথ : বিচ্ছিন্ন করে নয়। মানুষের অনন্ত ব্যক্তিসত্তা বিশ্বপ্রকৃতিকে অনুধাবন করে। এমন কিছুই নেই যা মানবসত্তা বুঝতে অপারগ হয়, এবং এটাই প্রমাণ করে যে বিশ্বজগতের সত্য মানবসত্তার সত্য।

আইনস্টাইন : মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্বন্ধে দুটো ধারণা রয়েছে− বিশ্বসত্তার ঐক্য মানবিকতার উপর নির্ভরশীল, এবং বিশ্বসত্তার বাস্তবতা মানবিক কার্যকারণের উপর স্বনির্ভর।

রবিনাথ : যখন মহাবিশ্ব  মানুষের সঙ্গে সুসমন্বিত হয়, তখন সেটা হয় শাশ্বত, তখন তাকে আমরা সত্য বলে জানি, তাকে সুন্দর হিশেবে অনুভব করি।

আইনস্টাইন : এটা মহাবিশ্ব সম্পর্কে পুরোপুরি মানবিক ধারণা।

রবিনাথ : এই জগৎ হচ্ছে মানবিক জগৎ, বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরও জগৎ। অতএব আমাদের কাছ থেকে জগৎকে সরিয়ে রাখলে জগতের অস্তিত্ব থাকে না; এটা একটা আপেক্ষিক জগৎ এবং এর বাস্তবতা আমাদের চৈতন্যনির্ভর। কিছু আদর্শিক কারণ এবং আনন্দ আমাদের কাছে সত্যকে উপস্থাপিত করে। আদর্শ শাশ্বত মানুষ সেই, যার অভিজ্ঞতা সম্ভবপর হয়ে উঠে আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

আইনস্টাইন : এটি মানবসত্তার উপলব্ধি।

রবিনাথ : হ্যাঁ, এটি একটি অনন্তসত্তা। এটাকে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে আমাদের আবেগ এবং কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে। আমরা উপলব্ধি করি এমন পরমপুরুষকে, আমাদের সীমাবদ্ধতার বিচারে যার কোনো সীমাবদ্ধতা নাই। ব্যক্তির কাছে যা সীমাবদ্ধ নয়, বিজ্ঞান বিষয় সেটাই। এটি একটি নৈর্ব্যক্তিক সত্যের বিশ্বজগৎ। ধর্ম এসকল সত্যকে বাস্তবায়িত করে এবং আমাদের গভীরতর প্রয়োজনসমূহের সঙ্গে সংযোগ ঘটায়। আমাদের ব্যক্তিগত সত্যের সজ্ঞানতা বিশ্বজনীন মূল্য লাভ করে। ধর্ম সত্যের মূল্যকে প্রয়োগ করে এবং আমরা এর সঙ্গে নিজেদের মিলটাকে সুসমন্বিত করে সত্যকে মঙ্গলময় হিশেবে জানতে পারি।

আইনস্টাইন : সত্য, তারপর, বা সৌন্দর্য, এগুলি কি স্বনির্ভর মানুষের জন্য নয়?

রবিনাথ : না, আমি তা বলছি না।

আইনস্টাইন : যদি মানুষজাতির কেউ না থাকতো, তাহলে কি বেলভিডিয়ারের অ্যাপোলো সুন্দর বিবেচিত হতো না?

রবিনাথ : না।

আইনস্টাইন : সৌন্দর্যবোধের এই ধারণা সম্পর্কে আমি আপনার সঙ্গে একমত, কিন্তু সত্য সম্পর্কে একমত নই।

রবিনাথ : কেন নয়? সত্য তো মানুষের মধ্যে উপলব্ধির যোগ্য হয়ে উঠে।

আইনস্টাইন :  আমার ধারণা যে ঠিক, সে বিষয়ে আমি কোনো প্রমাণ দিতে পারব না। কিন্তু এটাই আমার ধর্মবিশ্বাস। আমরা তা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থাপন করি− আমাদের ভ্রান্তি এবং অন্ধ অনুকরণসমূহের দ্বারা,  সৃষ্ট অভিজ্ঞতার দ্বারা, আধ্যাত্মিক চেতনার দ্বারা।

রবিনাথ : সৌন্দর্য হলো যথার্থ সমন্বয়ের আদর্শ, যা বিশ্বচরাচরে বিদ্যামান। সত্য হলো বিশ্বসত্তার মননশীলতার যথার্থ উপলব্ধি। এ ছাড়া আমরা কি ভাবে সত্যকে চিনতে পারবো?

আইনস্টাইন : আমি প্রমাণ করতে পারবো না। কিন্তু আমি পিথাগোরাসের উপপাদ্যে বিশ্বাসী, যে সত্য মাননবসত্তার নির্ভরতামুক্ত। এটা অবিচ্ছন্ন যুক্তির সমস্যা।

রবিনাথ : সত্য বিশ্বসত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত, অবশ্যই মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় হবে। অন্যথা আমারা প্রত্যেকে সত্যকে অনুভব করবো। আমরা কোনো তাকে সত্য বলতে পারবো না। অন্তত সত্য বর্ণিত হবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে, এবং শুধু যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার কাছে পৌঁছাতে পারবো। অন্য কথায় তা হবে মানব তন্ত্রগত ভাবনা। ভারতীয় দর্শন অনুসারে ব্রহ্মাই পরমসত্য। একে ব্যক্তিবিশেষের মনের বিচ্ছিন্ন কল্পনা হতে পারে না বা বাক্যের দ্বারা প্রকাশ করা যায়। কিন্তু এই সত্য উপলব্ধিতে আসতে পারে অনন্তসত্ত্বার সঙ্গে শুধু ব্যক্তিসত্ত্বার মিলনেই। কিন্তু এই ধরনের সত্য বিজ্ঞানের জগতের নয়। আমরা যে প্রত্যক্ষতা নিয়ে আলোচনা করছি, তা হলো সত্যের প্রকৃতি; যাকে বলা যায়, মানুষের মনে যা সত্য হিশেবে প্রতিভাত হয়। যেহেতু এটা মানিবিক। এবং একে মায়া বা বিভ্রম বলা যেতে পারে।

আইনস্টাইন : এটা ব্যক্তিবিশেষের বিভ্রম নয়, এটা মনুষ্য প্রজাতির বিভ্রম।

রবিনাথ : এই প্রজাতির ঐক্য এবং মানবতাকে ধারণ করে। সেই জন্য সমগ্র মানব মননসত্তা সত্যকে উপলব্ধি করে, ভারতীয়-ইউরোপীয় মননসত্তা একই অনন্য উপলব্ধিতে মিলিত হয়।

আইনস্টাইন : প্রজাতি শব্দটি জার্মান ভাষায় সকল মনুষ্যসত্তাকে  বুঝায়; সত্যি কথা বলতে কি, এপ কিংবা ব্যাঙও এর ভিতরে পড়ে। সমস্যা হলো, সত্য সজ্ঞানতার স্বরনির্ভরতা কি না।

রবিনাথ : যাকে আমরা সত্য বলে জানি, তা বাস্তবতার বিষয়ীকেন্দ্রিক এবং বাস্তবভিত্তিক যৌক্তিক সমন্বয়ের মধ্যস্তরে। উভয়ই পরমপুরুষ ধারণ করে।

আইনস্টাইন : আমরা যা মনোজগতে যা ভাবি, এমনি কি প্রাত্যহিক জীবনে, এর জন্য আমরা দায়ী নই।  এর উপর নির্ভর করে মন এর বাইরের বাস্তবতাসমূহ সম্পর্কে জ্ঞাত হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, যখন বাড়িতে কেউ নেই, তখনও টেবিলটা যেখানে ছিলো সেখানেই থাকে।

রবিনাথ : হ্যাঁ, এটা ব্যক্তি মনের বাইরে থাকে, কিন্তু সর্বজনীন মনের বাইরে থাকে না। টেবিল হলো কোনো সজ্ঞানতার দ্বারা প্রত্যক্ষ করার বিষয়। যা চেতনায় থাকে।

আইনস্টাইন : কেউ যদি বাড়িতে নাও থাকে, তাহলেও টেবিলটির অস্তিত্ব কিন্তু থাকবে। কিন্তু ইতিমধ্যে তা আপনার দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে। এই কারণে টেবিলটা যে আছ ব্যাখ্যা বা প্রমাণ করতে পারবো না। বিষয়টা আমাদের দেখার উপর নির্ভর করে। মানবতানিরপেক্ষ সত্যের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের স্বাভাবিক বোধ ব্যাখ্যা কিংবা প্রমাণ করা যায় না। কিন্তু এই বিশ্বাস কেউ ত্যাগ করতে পারে না, এমন কি আদিবাসীরাও। সত্যকে আমরা পরমপুরুষ মূল্য দিই। অপরিহার্য এই বাস্তবতা যা আমাদের অস্তিত্ব, অভিজ্ঞতা এবং মানস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যদিও আমরা পরিষ্কার বলতে পারি না তার অর্থ কী।

রবিনাথ : হ্যাঁ,  যদি কোনো সত্য থেকে থাকে যার সঙ্গে মানবিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন হয়, তবে আমাদের জন্য সেটা হবে সম্পূর্ণই অস্তিত্বহীনতা।

আইনস্টাইন : তা হলে আপনার চেয়ে আমি বেশি ধার্মিক।

রবিনাথ : আমার ধর্ম হচ্ছে পরমপুরুষের সঙ্গে পুনর্মিত্রাতায়, সর্বজনীন পরমাত্মায়, আমার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তায়।

আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয়বারের কথপোকথন প্রকাশিত হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Asia নামক সাময়িকীর মার্চ ১৯৩১ সংখ্যায়। নিচে এই কথপোকথন তুলে ধরা হলো।

রবিনাথ : আমি আজ ডক্টর মেন্ডেলের সঙ্গে গণিতের নব্য আবিষ্কার সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম, যা বলছে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরমাণুরও কিছু করবার আছে; অস্তিত্বের নাটকীয়তা তার বৈশিষ্ট্যের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত নয়।

আইনস্টাইন : প্রকৃতপক্ষে এসব বিজ্ঞানকে এমনটি ভাবাচ্ছে, যা কার্যকারণবাদ ধারণাকে বাতিল করে না।

রবিনাথ : তা হয়ত করে না, দেখা যাচ্ছে যে কার্যকারণবাদ উপাদানের মধ্যে নিহিত নয়, কিন্তু অন্য কোনো শক্তি এর মাধ্যমে একটি সুসমন্বিত মহাবিশ্বের সৃষ্টি করে।

আইনস্টাইন : যে কেউ এটা বুঝতে চেষ্টা করছে যে উচ্চতর স্তরে কীভাবে এ ক্রমধারা আছে। ক্রমধারাটি আছে; যেখানে বৃহৎ উপাদান একত্রিত করে এবং অস্তিত্বকে চালিত করে; কিন্তু সূক্ষ্মতর উপাদানে এ ক্রমধারা দৃশ্যমান নয়।

রবিনাথ : এই দ্বৈততা অস্তিত্বের গভীরে বিদ্যমান, মুক্ত আকাঙ্ক্ষা এবং নির্দেশিত ইচ্ছার স্ববিরোধীতা, যা এর উপর কাজ করছে এবং একটি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতির উপর আবর্তিত হচ্ছে।

আইনস্টাইন : আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান স্বীকার করছে না যে তারা স্ববিরোধী। মেঘ দূর থেকে এক রকম দেখায়, কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখলে বিক্ষিপ্ত জলকণিকা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না।

রবিনাথ : আমি মানব-মনোবিদ্যায়ও প্রায় একই রকম দেখতে পাই। আমাদের আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষাগুলি অনিয়ন্ত্রিত, কিন্তু আমাদের চরিত্র এগুলিকে পরিপূর্ণভাবে আয়ত্বে নিয়ে আসে। বস্তুজগতে কি এমনটি ঘটতে পারে? উপাদানগুলি স্বতন্ত্র আবেগ দ্বারা অসংযত, গতিশীল? এবং বস্তুজগতে এমন কি কোনো নীতি আছে যা তাদের নিয়ন্ত্রণ করে একটি ক্রমনির্দেশিত সংগঠন?

আইনস্টাইন : এমনকি মৌলিক উপাদানগুলিও পরিসাংখ্যিক নিয়মমুক্ত নয়; যেমন রেডিয়মের অনুগুলিও সর্বদা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চছে, চলছে এবং চলবে; যেমন করে তারা সর্বদা চলে আসছে। তাহলে অবশ্যই বস্তু উপাদানও নিয়ন্ত্রিত।

রবিনাথ : অন্যথায়, অস্তিত্বের ঘটনাপ্রবাহ উদ্দেশ্যহীন হয়ে যাবে। এটা হলো সুযোগ ও লক্ষ্য এ দুয়ের একটা ধ্রুব সমন্বয়, যা চির-নতুন এবং সজীব করে রাখে।

আইনস্টাইন : আমি বিশ্বাস করি, যা আমরা করি কিংবা যা অস্তিত্বশীল তার সবকিছুরই কার্যকারণ রয়েছে; এটা ভাল, যদিও আমরা তার সবকিছু আগাগোড়া দেখতে পাই না।

রবিনাথ : মানুষের ক্ষেত্রে নমনীয়তার একটা বিষয় আছে, যার ছোট্ট পরিসরে কিছুটা স্বাধীনতা আছে, যেখানে সে তার ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে। এটা অনেকটা ভারতীয় সংগীতের মতো, যা পাশ্চাত্য সংগীতের মতো অতটা কঠিন নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ নয়। আমাদের সুরকারগণ এর একটা সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, সুরপদ্ধতি দিয়ে থাকেন এবং এর মধ্যে শিল্পী নিজেও কিছুটা স্বকীয়তার অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারেন। তাঁকে অবশ্যই সেই সুনির্দিষ্ট সুরের মধ্যে থাকতে হবে এবং এর মধ্যে থেকেই সে গায়কী-আবেগের স্বতস্ফুর্ত প্রকাশ ঘটাতে পারে। আমরা সুর সৃষ্টিতে সুরকারের মননশীলতার প্রশংসা করি, কিন্তু একই সঙ্গে আমরা শিল্পীর কাছে তার গায়কী এবং সংগীতালংকারে নিজস্ব দক্ষতা প্রত্যাশা করি। এই সৃষ্টিতে আমরা অস্তিত্বের কেন্দ্রীয় সূত্র মেনে চলি - কিন্তু আমরা যদি আমাদের এই দোদুল্যমনতা থেকে মুক্ত করতে না পারি - আমরা আমাদের ব্যক্তিত্বের মধ্যে থেকেও নিজের পরিপূর্ণ প্রকাশে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা পাই।

আইনস্টাইন : তা তখনই সম্ভব যখন সংগীতের প্রবল নান্দনিক ঐতিহ্য মানুষের মনকে উজ্জ্বীবিত করে। ইউরোপে সংগীত মানুষের জনপ্রিয় শৈলী এবং গণ-মানুষের আবেগ থেকে অনেক দূরে এসে গেছে এবং তা মূলতঃ স্বীয় প্রথা ও ঐতিহ্য প্রকাশের নিগূঢ় শিল্প হিশেবে দেখা দিচ্ছে।

রবিনাথ : আপনাকে অবশ্যই এ গূঢ় সংগীতের কাছে অনুগত থাকতে হবে। ভারতবর্ষে, নিজস্ব সৃজনশীল ব্যক্তিত্বই হলো একজন গায়কের স্বাধীনতার মাপকাঠি। সে একজন সুরকারের গান নিজস্ব ঢংএ গাইতে পারে যদি ঐ নির্দিষ্ট সংগীতের জন্য তার নিজের গায়কীর মধ্যে নির্দিষ্ট সুরের সাধারণ নিয়মাবলী প্রকাশের সৃজনশীল সক্ষমতা থাকে।

আইনস্টাইন : প্রকৃত সংগীতের মাহাত্ম অনুধাবন করার জন্য অত্যন্ত উঁচু দরের শিল্পের প্রয়োজন, যাতে করে কেউ এ ধরনের পরিবর্তন করতে পারে। আমাদের দেশে এ ধরনের পরিবর্তনও সুনির্দিষ্ট।

রবিনাথ : আমরা আমাদের আচরণে যদি মহত্তের সূত্রগুলি মেনে চলতে পারি তবেই আমরা আত্ম-প্রকাশের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারব। আচরণের নীতিটা সেখানেই, কিন্তু এই চরিত্র যা একে সত্য এবং স্বতন্ত্র হিশেবে তৈরি করে তা আমাদেরই সৃষ্টি। আমাদের সংগীতে স্বাধীনতা এবং সুনির্দিষ্টতার দ্বৈততা রয়েছে।

আইনস্টাইন : সংগীতের কথাগুলিও কি মুক্ত? আমি আসলে বোঝাতে চাইছি, সংগীতের কথাগুলি, এবং যা সে গাইছে, তার সঙ্গে একজন গায়ক কি সম্পূর্ণ একমত?

রবিনাথ : হ্যাঁ। বাঙলায় এক ধরনের সংগীত রয়েছে, যাকে আমরা কীর্তন বলি, যেখানে গানের সঙ্গে গায়ক তাঁর নিজস্ব ও পছন্দসই মতামত, কথা বা উক্তি জুড়ে দিতে পারেন। এগুলি আসলে প্রবল উৎসাহোদ্দীপক, গায়কের এ সকল সুন্দর স্বতস্ফুর্ত আবেগে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়।

আইনস্টাইন : এ ধরনের ছন্দোবদ্ধ গঠন কি খুবই কঠিন?

রবিনাথ : হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনি পদ্যরচনকৌশলের সীমাকে অতিক্রম করতে পারবেন না। একজন গায়ককে অবশ্যই তাঁর নির্দিষ্ট সুর ও সময়ের মধ্যে থেকেই পরিবর্তন করবেন। ইউরোপীয় সংগীতে সময়ের সঙ্গে গায়কের তুলনামূলক স্বাধীনতা রয়েছে কিন্তু সুরের সঙ্গে নয়।

আইনস্টাইন : বাণী ছাড়া কি ভারতীয় সংগীত হতে পারে? কেউ কি বাণী ছাড়া সংগীত বুঝতে পারে?

রবিনাথ : হ্যাঁ, অর্থহীন শব্দ দিয়েও সংগীত হতে পারে, এ শব্দগুলি কেবল কিছু সুনির্দিষ্ট সুরসঙ্কেত প্রকাশ করে। উত্তর ভারতে, সংগীত একটি স্বাধীন শিল্পকলা, বাঙলার মতো শব্দ এবং ভাবের প্রকাশ নয়। এ সংগীত অত্যন্ত দুর্বোধ্য এবং নিগূঢ়, এবং ইহা সম্পূর্ণরূপেই স্ব-ব্যাখ্যাত সুর।

আইনস্টাইন : এটা কি বহুস্বরিক নয়?

রবিনাথ : যন্ত্রসমূহ ঐকতানের জন্য ব্যবহৃত হয় না, সময়ের সাশ্রয় এবং মাত্রা ও গভীরতা বৃদ্ধির জন্য। ইউরোপীয় সুর কি আরোপিত ঐক্যতান দ্বারা আক্রান্ত?

আইনস্টাইন : কখনো খুব ভালোভাবেই আক্রান্ত। কখনো ঐকতান সম্পূর্ণ সুরকেই ছাপিয়ে ফেলে।

রবিনাথ : সুর ও ঐক্যতান হলো অনেকটা ছবির রেখা এবং রংশিল্পের মতো। একটি রৈখিক ছবি পরিপূর্ণ সুন্দর হতে পারে; যাতে রংয়ের ছোঁয়া ছবিটিকেই অস্পষ্ট ও গুরুত্বহীন করে তুলতে পারে। তবে রং ও রেখার সমন্বয়ে ও একটি ভালো ছবির সৃষ্টি হতে পারে, এর মূল্য না ছাপিয়ে বা নষ্ট না করে।

আইনস্টাইন : এটা একটা চমৎকার উদাহরণ, রেখা আসলে রংয়ের চেয়ে অনেক বেশি গভীর। মনে হয় আপনাদের সুর এর কাঠামোয় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। জাপানী সংগীতও আমার কাছে তেমনি মনে হয়।

রবিনাথ : আমাদের মানসিকতা দিয়ে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সংগীতের প্রভাব অনুধাবন করা খুবই কঠিন। পাশ্চাত্য সংগীত আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়; আমি মনে করি এটা মহান, এটা মহান এর গঠনে এবং এর সুরে। কিন্তু আমাদের সংগীত এবং এর মৌলিক গীতিআবেদন আমাকে আরো বেশি স্পর্শ করে। ইউরোপীয় সংগীত চরিত্রের দিক থেকে মহাকাব্যের মত; এর একটা বিশাল আবহ আছে এবং ইহা অনেকটা গথিক  প্রকৃতির।

আইনস্টাইন : আমরা আমাদের সংগীতের সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত যে এ প্রশ্নে উত্তর আমরা ইউরোপীয়রা জানি না। আমরা জানতে চাই আমাদের সংগীত ঐতিহ্যের না মৌলিক মানবীয় আবেগের, এ ঐক্য এবং অনৈক্যের আবেগ যা স্বাভাবিক, অথবা কেবল ঐতিহ্যের দ্বারা যা আমরা অর্জন করি।

রবিনাথ : যেকোনো উপায়ে পিয়ানো আমাকে বিস্মিত করে। বেহালা আমাকে অনেক বেশি আনন্দ দেয়।

আইনস্টাইন : এ গবেষণা খুবই আনন্দের হবে যে, একজন ভারতীয় যে যুবাকালে কখনোই ইউরোপীয় সংগীত শোনে নি তার উপর এ সংগীত কেমন প্রভাব ফেলে তা জানা।

রবিনাথ : একদা আমি একজন ইংলিশ সুরকারকে আমার জন্য কিছু ক্লাসিক্যাল সংগীত বিশ্লেষণ করতে বলেছিলাম, এবং এর সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে বলেছিলাম।

আইনস্টাইন : সমস্যা হল, প্রকৃত ভালো সংগীত, তা প্রচ্যেরই হোক কিংবা পাশ্চাত্যেরই হোক, বিশ্লেষণ করা যায় না।

রবিনাথ : ঠিক, যা গভীরভাবে প্রভাবিত করে শ্রোতা আসলে তখন তার নিজের মধ্যে থাকে না।

আইনস্টাইন : একই ধরনের অনিশ্চয়তা আমাদের অভিজ্ঞতার প্রায় সকল মৌলিক বিষয়েই রয়েছে, শিল্পকলা সম্পর্কে আমাদের প্রতিক্রিয়া, তা হোক ইউরোপে কিংবা এশিয়ায়। এমনকি আপনার টেবিলের এই লাল ফুল যা আমি দেখছি তাও আপনার কাছে এবং আমার কাছে একই নাও হতে পারে।

রবিনাথ : অতএব, এ সবকিছুর মধ্যেই এক ধরণের মিলনক্রিয়া চলছে, ব্যক্তিবিশেষের রুচি সর্বদাই একটি সর্বজনীন আদর্শের অনুগত।

 

সূত্র :

NewYork Times, August 10, 1930, by Dmitri Marianoff]

সংগীতচিন্তা। রবিনাথ ঠাকুর। বিশ্বভারতী। ২৫ বৈশাখ ১৩৯২।

http://www.onushilon.org/corpus/robi/robi-ein.htm