ওমর ফারুক জীবন

আমার সমকালের কবিদের মধ্যে সৃষ্টির অস্থিরতা বেশি, আবার বিচ্ছিন্নতাও ওমর ফারুক জীবন


[ওমর ফারুক জীবন। জন্ম চট্টগ্রামে। মূলত কবি। একসময় গানও লিখতেন। অভিবাসী। তিনি অনেকবছর ধরে কুয়েতে আছেন। সেখানে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রানালয়ের অধীনে কোস্টগার্ডে কাজ করেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বাতাসের উৎকণ্ঠা’ প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০১৬-তে। তার সঙ্গে কথাবলির পক্ষ থেকে কথা বলেছি নানা বিষয় নিয়ে। —নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

আপনার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলেন।

আমার লেখালেখির শুরু খুব ঝাপসা, তবু যেটুকু মনে পড়ে ক্লাস ফোর-ফাইভে যখন পড়ি তখন ‘খেলাঘর’ করার সময় নাটকে অভিনয় করতাম আর ছড়া লিখতাম, পরে এসে গান লিখি, তারপর কিছু কবি বন্ধু আর চারুকলার বন্ধুদের আড্ডা থেকে, একদিন আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন-এর ফাঁসির বেশ এক দশক পরে কোনো এক পত্রিকায় তার বিপ্লবের বৃত্তান্ত পড়ি, তাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখি, সেই কবিতাটি এখনো অনেক পাঠক বন্ধুদের কাছে প্রিয়, আমার ও খুব প্রিয়।

 অভিবাসীদের অনেকেই নিঃসঙ্গতা থেকে লেখালেখি করেন। আপনার ক্ষেত্রেও কি তাইই হয়েছে?

এক সময় মনে হতো নিঃসঙ্গতা থেকে কবিতা আসে, আসলে তা নয়, কবি একাকীত্ব ভালোবাসে বটে, তবে কবি একা তা আমি বিশ্বাস করি না, কবিরা এখন একসঙ্গে আড্ডা দেয়, কবিতার নানা দিক নিয়ে সম্মিলিত নীরিক্ষার কথা বলে, একসঙ্গে লিটলম্যাগ, সাহিত্যানুষ্ঠান বা সম্পাদনার কাজ করে, এখন কবি ও কবিতা সন্মিলিত বন্ধুদের পরীক্ষা নীরিক্ষা থেকেও ভালো কিছু গঠনমুলক বের হয়,প্রবাসে এ ক্ষেত্রে কবি নিঃসঙ্গ হলেও, অন্যান্য কবিদের বই, অন্তর্জাল অভিবাসী কবিকে লিখতে সাহাযয় করে,আমি কোন নিঃসঙ্গতা অনুভব করি না, পড়ি এবং ভাবতে চেষ্টা করি, তখন হয়ত কিছু একটা লিখে ফেলি।

প্রবাসজীবন আপনার কবিতায় কেমন প্রভাব ফেলেছে?

প্রবাস জীবন আমাকে লিখতে উদ্দীপনা যুগিয়েছে, প্রবাসে থাকার কারণে আমি প্রচুর সময় পেয়েছি, তখনি পড়ায় লিখায় কাজে লাগিয়েছি, প্রবাসের সামাজিক অবস্তা সাংস্কৃতিক অবস্থাও প্রভাব ফেলেনি বলবো না, এখানকা জীবনাচারণও আমার কবিতাতে কোথাও না কোথাও আমার অজান্তে উঠে এসেছে।

আপনি কতো বছর ধরে কুয়েতে আছেন?

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আছি।

দেশে একেবারে ফেরার কি কোনো পরিকল্পনা আছে?

প্রতিবছরই তো দেশে একেবারে ফিরতে চাই, জানি না কবে ফিরব, তবে স্থায়ী ভাবে ফিরতে তো হবেই।

আপনার পেশা সম্পর্কে বলেন

আমি এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রানালয়ের অধীনে কোস্টগার্ডে আছি, আরব উপসাগরে তীরে ও জলে,কয়েকটা ছোট দ্বীপ আছে যেগুলিতে রাত্রিযাপন আর রাতে বর্ণিল মাছদের সঙ্গে স্বপ্নে ডুবে থাকা, সব অদ্ভুত অনুভুতি, স্পিডবোটে সমুদ্র চষে বেড়ানো, কী আর বলবো, বলতে পারেন যার জন্যে আমার লেখায়, জল মাস্তুল, নোঙর এই শব্দগুলি এতো বেশি ব্যবহার হয়েছে যা আমি নিজেও বিরক্ত হয়ে গেছি।

ওখানে বাঙলাদেশিদের কী অবস্থা? বাঙলাদেশি কমিউনিটি কি আছে?

বাঙলাদেশিদের প্রবাসে সব জায়গাতে একিই অবস্থা, কমিউনিটি আছে তবে তাও কোন না কোন রাজনীতির ছত্রছায়ায়, বাঙলাদেশের মতোই

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

ভালো কবিতা পড়লেই ইমেজ সৃষ্টি হয়, এটা আর কারো হয় কিনা জানি না, তবে আমাকে অন্যের ভালো গদ্য কবিতা কাজ দেয়, এমন কি মিউজিক, ভালো কোনো সিনেমা, এসবও আমার লেখায় কাজ করে।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে তাড়িত করে?

জীবনানন্দ দাশ, আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, জহর সেন মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, এ প্রজন্মের অনেকের কবিতা তাড়িত করে।

প্রথম কবিতা কখন লিখলেন?

প্রথম কবিতা কোনো এক দুপুরে প্রচণ্ড ক্ষুধায় রাস্তায় একা একা হাঁটছি পকেটে আটআনা পয়সা ছিল, একটা দোকান থেকে মুড়ি কিনে খেয়ে সেই টোঙায় লিখেছি' ‘হৃদয়ের খোলা উদ্যানে দুঃখরা নিশিদিন পাথর ভাঙে/দিগন্তজোড়া চোখে শুধুই অগ্ন্যুৎপাত সময় অসময়ে…’

তখন ক্লাস নাইনে কি টেন-এ পড়ি, এই কবিতাটি পরে কারো নামে বেগম পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।

কার গান ভালো লাগে?

হেমন্ত মুখার্জির আধুনিক, রবীন্দ্র, অঞ্জলী ঘোষের নজরুল, বড়ে গোলাম আলীর রাগ, অনুপ জলোটার ভজন, অজয় চক্রবর্তী আরো অনেকেই।

ছোটবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ছোটবেলায় রাখাল আর মাঝি হবার খুব শখ ছিল।

নিয়মিত কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে?

নিয়মিত জীবনানন্দ পড়ি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কবি এবং কবিতার দায়,তার সময়কে সামনে তুলে ধরা, যুগে যুগে লোরকা, বেঞ্জামিন, সুকান্ত, নজরুলদের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এবং কবিতাকে বিজ্ঞানময় করে তোলা।

আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

 কনটেম্পরারি কবিতা থেকে কবির নাম উঠিয়ে দিলে কবিকে চেনা যাবে কিনা তার জন্যে আরো কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে।

 এই সময়ে এসে কবিতায় প্রথাগত ছন্দের প্রয়োজনীতা কি আছে? থাকলে কেনো আছে?

কবিতার ছন্দ ছন্দই, প্রথা অপ্রথা বলতে কিছু নেই কারণ ছন্দ সবসময় ছিল আছে এবং থাকবে, ছন্দের বাইরে লিখতে হলেও একজন কবিকে ছন্দ জানতেই হবে, ছন্দ শুধু হিশেব করে করে বসালেই হবে না, কানে শোনার ছন্দ, হৃদয় স্পন্দনের ছন্দ এগুলি বুঝতে হবে কবিকে, মুক্তগদ্যতেও যে ছন্দের কাজ করে যিনি লিখেন এবং যিনি বোদ্ধাপাঠক তারাই উপলব্ধি করতে পারবেন, ছন্দকে কোনো মতেই বাদ দেয়া যাবে না।

আপনার কবিতা লেখার পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

কবিতা লেখার পেছনে প্রেরণা যাদের ছিল, তারা কবিতার মতোই অস্পৃশ্য এবং অদৃশ্য হয়ে আছে।

কবিতা কেনো লিখেন?

কবিতা এই জন্যেই লিখি, কবিতা ছাড়া আর কিছু পারিনা বলে,আর কবিতা তো প্রত্যেকেই লিখে না সমাজের কিছু মানুষ লিখে, যাদের উপর কবিতা ভর করে।

আপনার সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে বলেন

আমার সমকালের কবিদের মধ্যে সৃষ্টির অস্থিরতা বেশি, আবার বিচ্ছিন্নতাও, তবু বিশ্বসাহিত্য মানের দিকে সমকালের কবিদের কবিতায় প্রচেষ্টা আছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গুরুত্ব আছে এখনকার কবিদের কবিতায়।

কবিতা কী?

 যা কিছু নয় আবার অনেক কিছু সেই কবিতা, কবিতা অবচেতনের গোপন ভাষা

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

দশক হয়ত একজন কবিকে চিহ্নিত করার জন্যে পরিচয় পত্র হিশেবে, কবি ও কবিতার আসলে কোনো বিভাজন নেই, দুটো বিষয়ই মহাকালের দিকে ধাবিত।

লেখালেখি প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

লেখালেখি প্রকাশের জন্যে অন্তর্জাল ভালো, তবে লেখাটি অনেক লেখার ভিড়ে কিছুদিন পর খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে, কিন্তু লিটলম্যাগাজিন হলে তা সংরক্ষিত থাকবে বহুদিন, আর লিটলম্যগের প্রকাশনার আনন্দই আলাদা এক সঙ্গে অসংখ্য কবি সাহিত্যিক উপন্যাসিক প্রাবন্ধি সমালোচক লিখবে সেটা মুল্যায়ন অন্তর্জালের চেয়ে অনেক বেশি মর্যাদার আমার কাছে।

আপনার কি গদ্য লেখার ইচ্ছা আছে?

 আমার কিছু গদ্য আছে,কিছু হারিয়ে গেছে, তবু আবার লিখব।

কেনো জীবননানন্দের কবিতা আমরা বারবার পড়ি, সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না?

তিরিশের দশকের অন্য চার কবির চেয়ে জীবনানন্দ দাশ এই জন্যে বেশি পঠিত হয়। এখনো পর্যন্ত মনে হয় পাঠকের চেয়েও কবিরা জীবনান্দের অবচেতন সৌন্দর্যবোধকে অতিক্রম করতে পারেনি, কনটেম্পোরারি কবি কেন, আমার তো মনে হয় বাঙলা কবিতায় জীবনানন্দের রাজত্ব আরো অনেক কাল চলতে থাকবে।