নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

কবিতার মধ্যে ধর্ম-দর্শন ইত্যাকার আপাত-মাতাল বিষয় ঢুকালে সেটা আর কবিতা থাকে না নির্ঝর নৈঃশব্দ্য


[নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। মূলত কবিতা লিখেন। এর বাইরে গল্প লেখাসহ সাহিত্যালোচনা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এইসবও করে থাকেন। এবং ছবি আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, কক্সবাজার। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ চিত্রকলা। প্রকাশিত বই : পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা), শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প), কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা), পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য), মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা), আরজ আলী : আলো আঁধারির পরিব্রাজক (২০১৫, প্রবন্ধ), রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয় (২০১৬, গল্প)। সম্পাদিত ছোটোকাগজ : মুক্তগদ্য। এ ছাড়া পূর্বে আরো সম্পাদনা করেছেন জলপত্র, চারপৃষ্ঠা মেঘ ইত্যাদি। তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন দুপুর মিত্র। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ হয়েছিলো অলস দুপর-এ ৭ মে ২০১২-তে। কথাবলির পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশ হলো।]


আপনার মতে বাংলাদেশের অধিকাংশ কবিরা ঠিক কি কারণে কবিতা লিখতে শুরু করে ?

বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে সব কবিই অপরিণত বয়সে কবিতার মতো কিছু লেখার চেষ্টা করে। আর সেটা করে প্রেমে পড়ে কিংবা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অবদমিত কাম কিংবা নিঃসঙ্গ থেকে। আমার জানা মতে একমাত্র ব্যতিক্রম সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তিনি হয়তো পরিণত বয়সে লেখা শুরু করেছিলেন। তার সময়টাও একটা ফ্যাক্ট।

কবিতায় পরিণত বয়স বলে কিছু আছে কি, একেবারে সুকান্তকেই যদি কাছ থেকে দেখি।

অপরিণত বয়স বলতে আমি অর্বাচীন সময়টাকে ধরছি। মনে করেন ১০/১১ বয়স। এটা আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলা। এর পরও অপরিণত সময় ধরা যায়। যেমন যারা কবিতা লিখেন, তারা প্রথম দিকের অধিকাংশ কবিতাই ফেলে দেন, সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতার সংখ্যা কিন্তু বেশি নয়। তার মানে এই নয় যে তিনি এতো কম কবিতা লিখেছেন। সত্য হচ্ছে তিনি বেছে ফেলে দিয়েছেন। যেগুলি শিল্পোত্তীর্ণ মনে করেছেন তাইই গ্রন্থিত করেছেন।

সমসাময়িক কবিদের কোন সংস্কৃতিকে আপনি মেনে নিতে পারেন না বা আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে সমস্যাজনক বলে মনে হয়?

লিটলম্যাগ এবং দৈনিক পত্রিকার সাময়িকী কেন্দ্রিক দলবাজি, গালাগালি এবং নিজেকে প্রচার করার প্রবণতা। সোজা কথায় আমি সব ধরনের স্টান্টবাজি, দলবাজিকে ঘেন্না করি।

কবিতার বিষয়গুলো দিন দিন এক ধরনের প্রোপাগান্ডার দিকে এগুচ্ছে। আপনার কি তাই মনে হয়?

আগে এটা ছিল না। আগের সম্পাদক এবং কবিদের মধ্যে যে বিচারবোধ এবং শিক্ষা ছিল। এখন সেটা কমই দেখা যায়। এখনকার কবিরা অন্যের লেখার চেয়ে নিজের লেখা পড়তে পছন্দ করেন বেশি। সমালোচনা নিতে পারেন না। চাটুকার পোষতে পছন্দ করেন।

সমসাময়িক কবিদের কোন সংস্কৃতিকে আপনি মেনে নিতে পারেন না। বা আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে সমস্যাজনক বলে মনে হয়?

লিটলম্যাগ এবং দৈনিক পত্রিকার সাময়িকী কেন্দ্রিক দলবাজি, গালাগালি এবং নিজেকে প্রচার করার প্রবণতা। সোজা কথায় আমি সব ধরনের স্টান্টবাজি, দলবাজিকে ঘেন্না করি।

মিডিয়া নির্ভরতা কি কবিতাকে নষ্ট করে দেয়?

দলগত মিডিয়া কবিতাকে নষ্ট করে। মিডিয়া যদি প্রকৃত কবি ও কবিতাকে পাঠকের কাছে নিতে পারে তাহলে সেটা সদর্থক। যদিও কবি পাঠকের কথা ভেবে কবিতা লেখেন না। কিন্তু লেখার পর এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় পাঠকের কাছে যাওয়ার ।

কবিতা কি মার্কসবাদী হতে পারে? মানে মার্কসবাদকে সামনে রেখে কবিতা লেখা যেতে পারে?

কবিতা শুধু মার্কসবাদী কেনো, কোনো বাদীই হতে পারে না। আমি শিল্পকে অবিমিশ্র এবং নিত্য মনে করি। কবিতার ভিতর কোনো রাজনীতি, দর্শন, ধর্ম নৈতিকতা ইত্যাকার আপাতমাতাল বিষয় প্রবিষ্ট করালে সেটা আর কবিতা থাকে না লিফলেট হয়ে যায়। কবিতা স্বতঃস্ফূর্ত সুন্দর। এটা তৈরি হয়, এটা তৈরি করা যায় না। কবিতার মধ্যে কোনও কিছুই আরোপ করা যাবে না। কিন্তু সবকিছু পাওয়া যাবে যেহেতু এই দৃশ্যমান জীবন ও জগত বস্তু সাপেক্ষ। কবিতার উপাদান উদ্গত হওয়ার বিষয়, বপন করার নয়।

সাম্প্রতিক কবিতায় কোন বিষয়টি অতিমাত্রিক ব্যবহার হচ্ছে বলে চোখে পড়েছে?

আমরা প্রতিদিন অনেক কবিতা পড়ি, অনেক অকবিতা পড়ি। কবিতায় অতিমাত্রা দেখা যায় না, কবিতা শেষ পর্যন্ত কবিতাই। এবং সুন্দর। আর অকবিতায় কি হচ্ছে সেটা বলা বাহুল্য। আর কবিতার বিষয় তো বহুমাত্রিক, পতঙ্গ থেকে ড্রাগন, মূত্র থেকে মধু, মদ্য থেকে মৃদঙ্গ, আকাশ পাতাল সমস্ত।

দশক বিভাজন বা সংকলন এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

আমরা কবিতার দশক বিচার করি কারণ আমাদের পূর্বের কবিরা তাদের যৌবনের মতোই কবিতা লিখেন, তারা সময়কে ধরতে জানেন না। যেমন শামসুর রাহমানকে আমার ৫০দশক বলি। তিনি মৃত্যুর আগেও তার দশকের মতো কবি লিখতে গেছেন। কিন্তু তিনি ফুরিয়ে গিয়েছিলেন। বোনের মৃত্যু, কবরের জায়গা এইসব বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতেন। আর দেশের জাতীয় দৈনিকে ছাপা হতো। শহীদ কাদরী মূর্খ ভক্তদের পাল্লায় পড়ে নতুন কবিতা লিখে কাব্যগ্রন্থ বের করেছিলেন এবং নিজের সর্বনাশ করেছেন। একটাও জাতের লেখা হয়নি। কেননা, তিনিও ফুরিয়ে গেছেন।
একমাত্র ব্যতিক্রম শঙ্খ ঘোষ(মৃতদের মধ্যে বিনয় মজুমদার), যাকে কোনো দশকে ফেলা যাবে না। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে নবায়ন করেন। তিনি বলতে গেলে সর্ব বিষয়ে পণ্ডিত।

দশবছরে অনেক কিছুই পাল্টায়, ভাষা পাল্টায় রাস্তা পাল্টায়, নারী পাল্টায়, ভুরু পাল্টায়, গতি ও প্রগতি পাল্টায়, যেটার ছাপ, চিহ্ন স্বতঃস্ফূর্ত কবিতার মধ্যেই থাকে। সুতরাং দশক বিচার না করলে সব লেজে গোবরে হয়ে যায়। আবারও বলছি সময় সবচে' বড় ফ্যাক্ট। আপনি দশককে গালি গালাজ করে জীবনানন্দ আর উৎপলকে পাশাপাশি রাখেন। তবে যে কোনো একজন মাইর খাবেন। অথচ দুজনেই নিজেদের সময়ে (দশকে) উজ্জ্বল। আপনি সুধীন নাথ আর জীবনদাশের মধ্যে তুলনা করতে পারেন। কিন্তু উৎপলকুমার আর বিষ্ণু দের মধ্যে তুলনা দিতে পারেন না। এই বার বলেন, দশক বিচার জরুরী কিনা?

সম্প্রতি দশক দখল বলে একটা প্রসঙ্গ আসছে। এ ব্যাপারটি নিয়ে বলুন।

এই প্রসঙ্গে আসলে তেমন কিছু বলার নেয়। এইটা একটা নগ্ন রাজনীতি—যেটাকে সময় নিজেই ছুঁড়ে ফেলে দিবে। এই ক্ষেত্রে সময়ই বিচারক। এই নৃত্য শেষ হলে এর রেশ থাকবে না। কবিতার ক্ষেত এমন এক শস্যের ক্ষেত্র যেটা দখল করার না। আপনাকে মিডিয়া কভারেজ দেয়, আপনার পাণ্ডারা আপনাকে প্রচার করে—এর দীপ্তি ক্ষণস্থায়ী। এইভাবে কয়েকবছর দখলে রাখতে পারবেন, সময় যেদিন আপনাকে বমি করে দেবে আপনি হয় নর্দমায় গিয়ে পড়বেন, নাহয় ভাগাড়ে গিয়ে পড়বেন। সময় তখনি আপনাকে ধরে রাখবে—যদি আপনি সত্যিকারের কিছু সৃষ্টি করতে পারেন, চুরি, গায়ের জোর, গলাবাজি, টাকা, স্টান্টবাজি, চাটুকারিতা দিয়ে বেশিদিন দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

একেবারে নিজের সম্পর্কে বলেন, আপনি কেন কবিতা লিখেন?

কেনো লিখি সেই বিষয়ে পুরোপুরি জানি না, হয়তো কোনোকিছু (যেমন, দুঃখ, অতি আনন্দ, হতাশা, স্বপ্ন ইত্যাকার বিষয়) থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে লিখি। এইটুকু জানি কোনও সামাজিক/নৈতিক দায় থেকে লিখি না। দায় থেকে লিখলে সেটা আরোপিত এবং বানানো মনে হয়। শিল্পের জন্ম স্বাভাবিক সহজ, স্বতঃস্ফূর্তটায়। যেহেতু আমি সামাজিক জীব—সেহেতু আমার লেখা বা সৃষ্টির মধ্যে তার ছাপ থাকবেই। এটা আরোপ করার বিষয় নয়।

আপনি কি লেখায় কোনো কিছু করার চেষ্টা করেন না?

না, করি না।

স্বতঃ:স্ফূর্তটা আসলে কেমন? এটা কি বুঝিয়ে বলবেন?

দেখবেন আপনার মাথার ভিতর সারাক্ষণ নানা চিন্তা খেলা করে, নানা অনুভূতি বুকের ভিতর উঠানামা করে। এইসব নিজে নিজেই তৈরি হয় আপনার ভিতর। যখন লিখতে বসেন এইসব ভাবনা-কল্পনা-অনুভূতি থেকে যাকিছু আপনার খাতায় বা মনিটরে উঠে আসে সেটা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আসে। যদি আপনি কোনও বিষয় ধরে চিন্তা করেন, সেটা আপনি নিজে করেন। চিন্তাটা তৈরি হয় না। সেটা যদি লিখতে যান তবে সন্দর্ভ কিংবা লেকচার শিট হবে কবিতা হবে না। কারণ এটাই আরোপ করা।

আমরা একেবারে দার্শনিকতার দিকে চলে যাচ্ছি মনে হয়। বিতর্কটা অনেকদূর এগুতে পারে। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। আপনি গল্পও লিখেছেন। গল্প লেখকদের বিষয়ে, বাংলাদেশের গল্পচর্চার বিষয়ে কিছু বলুন।

গল্প আর কবিতার কাঠামো কিন্তু ভিন্ন। কেননা গল্প এখনো প্রথাগত কাঠামোতেই আটকে আছে। প্লটের ক্ষেত্রেও আমাদের গল্পকারবর্গ স্টেরিওটিপিক্যাল। স্টেরিওটাইপ থেকে বাহির হওয়ার চেষ্টাও তাদের নাই। যে দুয়েকজন বের হওয়ার চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে প্রকটভাবে মার্কেস এবং বোর্হেসকে পাই। এ ক্ষেত্রে আমি শহীদুল জহির এবং শাহাদুজ্জামানের নাম করতে পারি। আর তরুণ অন্যরকম লেখার চেষ্টাকারী গল্পকারবর্গ এদের দুজনের অনুকরণ করার চেষ্টা করেন। গল্পে আমরা মুহূর্তকে বর্ণনা দিতে পারি না, গল্পকে আমরা উপন্যাসের উপাদান দিয়ে ভারাক্রান্ত করি। সংলাপের খেলা তৈরি করে অকারণ প্রলম্বিত করি। মঞ্চ নাটকের আবহ তৈরি হয় ফলত। লেখক হওয়ার পূর্বশর্ত পাঠক হওয়া। আমাদের প্রধান সমস্যা হলো আমরা পাঠক হওয়ার আগে লেখক হতে চাই। আমরা জানতে চাই না যে আমাদের জন্যে এটা খুবি খারাপ। এবং দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা গোগোল না পড়েই গল্প লিখতে বসে যাই। দস্তয়ভস্কি না পড়েই উপন্যাসিক হয়ে যাই। এমন কি আমরা রবিনাথও পুরোপুরি পড়ি না। আমরা পুরাণ-কুরান, দর্শনবিজ্ঞান, ইতিহাস ভাসাভাসা জানি, একলাইন মাইকেল পড়িনি। কিন্তু ভাবালুতা করে বলি কবিতা। লিখতে গেলে আমাদের সাহিত্যের মহান ওল্ডমাস্টার (মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতি, মানিক, তারাশঙ্করসহ সবাই )দের সব লেখাই পড়তে হবে তাও জানি না। কারণ আমাদের ধৈর্যের বড় অভাব। সানগ্লাস পরে, দামি কাগজমলাটে চারফর্মা বীর্য ছাপিয়ে লেখক হয়ে যাই। কিংবা মদগাঞ্জা খেয়ে আজিমপুরে কোনো কবির কবরের ওপর পড়ে কান্নাকাটি করি। আহ্ একেই বলে লেখক!
আমরা লিখতে গেলেই অন্য অনেক লেখকের নকল হয়ে যায়। ধরা পড়লে বলি, আমিতো তার লেখা কখনোই পড়ি নাই। কিংবা বলি এইটা হইলো, নৈর্ব্যক্তিক অবচেতনের ফল।
এইসব বলে হয়তো কিছু সময়ের জন্যে পার পেয়ে যাই। কিন্তু সময় যে কী কঠোর জল্লাদ তা আমরা জানি না। জানি না যে সময় ঠিকই আমাদের গলা কেটে নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে রেখে যাবে, হয়ে যাবো ইঁদুর আর গন্ধমুষিকের আহার। আহা!
আমরা জানি না যে, অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার জন্যে, নিজস্ব ধরন তৈরি করার জন্যেই পড়তে হবে।
আমরা মনে করি লেখক হওয়া অনেক সহজ, অনায়াসে হওয়া যায়—যেনো লিখতে পারলেই লেখক। কিন্তু জানি না যে, এ বড় কঠিন কাজ, অনেক সাধনার, অনেক পাঠপরিক্রমার। উদ্ভিদের মতো বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম, তারপর চারা, ক্রমশ বৃক্ষ এবং বৃক্ষের বয়স। বালিকার স্তন গজানোর মতো—দিনের পর দিন প্রতীক্ষা, অনেক রক্তের স্রোতে সাঁতার, ভয়, আনন্দ, সংকোচের ভিতর বন্ধুর পথে হেঁটে হয়ে উঠা গোপনগোলাপ।
সংলাপ যতটা সম্ভব বর্জন করা উচিত। আমি মনে করি, গল্পের ভাষা কম্প্যানক্ট হওয়া উচিত। এবং আয়তন ছোটো হওয়া দরকার। পাঠকের জন্যে স্পেস থাকা উচিত।

 

[এই সাক্ষাৎকারটি কপিলেফ্ট। এর যে কোনো অংশ অবিকৃত রেখে যে কেউ শুধুমাত্র অবাণিজ্যিক বা অলাভজনক উদ্দেশ্যে নকল ও পরিবেশন করা যাবে।]