নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

আমার প্রথম কবিতার বই ‘পাখি ও পাপ’ প্রকাশের জন্য আমি সময় নিয়েছিলাম আঠারো বছর নির্ঝর নৈঃশব্দ্য


 

[নির্ঝর নৈঃশব্দ্যমূলত কবিতা লিখেন। এর বাইরে গল্প লেখাসহ সাহিত্যালোচনা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এইসবও করে থাকেন। এবং ছবি আঁকেন। জন্ম : ২৪ আগস্ট ১৯৮১, চকরিয়া, কক্সবাজার। পড়াশোনা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রকলা।  প্রকাশিত বই : পাখি ও পাপ (২০১১, কবিতা), শোনো, এইখানে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয় (২০১১, মুক্তগদ্য), ডুবোজ্বর (২০১২, গল্প), কাপালিকের চোখের রং (২০১৩, কবিতা), পুরুষপাখি (২০১৪, মুক্তগদ্য), আরজ আলী : আলো-আঁধারির পরিব্রাজক(২০১৫, প্রবন্ধ), মহিষের হাসি (২০১৫, কবিতা), রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয় (২০১৬, গল্প), আকাশ ফুরিয়ে যায় (২০১৭, মুক্তগদ্য), হুহুপাখি আমার প্রাণরাক্ষস (২০১৭, কবিতা)। সম্পাদিত বই : ওঙ্কারসমগ্র : বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণের শ্রুতিলিপি (২০১৭)। সম্পাদিত ছোটোকাগজ : মুক্তগদ্য । এ ছাড়া পূর্বে আরো সম্পাদনা করেছেন জলপত্র, চারপৃষ্ঠা মেঘইত্যাদি। তার সঙ্গে ২০১৫ সালে ‘ঘুমঘোর কবিতার কাফে’-এর পক্ষ থেকে কথা বলেছিলেন কবি শাফিনূর শাফিন । সেইদিনের আলাপচারিতা পুনর্বার প্রকাশ হলো কথাবলি’র পাঠকদের জন্য।]

 

আমাদের আলোচনা শুরু হোক আপনার প্রকাশিতব্য বইটির শিরোনাম দিয়ে। কেনো এই কবিতাগ্রন্থের নাম ‘মহিষের হাসি’?

কবিতা আমার কাছে মূর্তিমান কিছু নয়। আর মহিষের হাসিও মূর্ত কোনো বিষয় নয়। মহিষের হাসি একটা ইমেজারি। আর মহিষের হাসি নামে উক্ত বইতে একটা কবিতাও আছে।

এই বইয়ের কবিতাগুলো মূল কী কী বিষয়কে কেন্দ্র করে সাজিয়েছেন। যেমন জীবনানন্দের কবিতায় ফিরে ফিরে মৃত্যুচেতনা আসে, ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায় আসে স্মৃতি ও প্রকৃতি। আপনি কোন কোন বিষয়ের কাছে ফিরে যান?

আমার কবিতায় আমার মনে হয় মন্ময় মানবিক যাতনা প্রকাশ পায়, যা প্রকৃত অর্থে অস্তিত্বের যন্ত্রণা থেকে নিঃসৃত। আমি অস্তিত্বের যন্ত্রণা থেকে কবিতা লিখি। জীবনকে প্রায়শই আপত্তিকর মনে হয়, মনে হয় কেন যাপন করছি এই জীবন? আর অস্তিত্বের সঙ্গে প্রেম, কাম এইসব অনুষঙ্গ সরাসরি জড়িত। আমি সব সময় মনে করে এসেছি ব্যক্তিসত্তা সামগ্রিক সত্তার পূর্বগামী। এই ভাবনা আমার মধ্যে জঁ পল সার্তে ঢুকিয়েছে কিনা মনে নেই। তবে যখনই মনে হয় আমি অস্তিত্বশীল। তখনই প্রশ্ন জাগে এই অস্তিত্ব কেনো? এইটাই যন্ত্রণা। এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে আমার আদিগন্ত শূন্য হয়ে যায়। আর সেই শূন্যতার নগণ্য একটা ব্যাপ্তিকে সাময়িকভাবে ভরাট করার জন্য কবিতার শরণ নিই।

একটা নতুন কবিতার সন্ধান আপনি কীভাবে করেন? ছন্দ, প্রোসোডিক্যাল এলেমেন্ট, ফর্ম, ইত্যাদি ছাড়া আর কোন অনুষঙ্গকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কি? কখন মনে হয় একটি কবিতার সৃষ্টি পূর্ণ হয়েছে, এতে আর হাত দেবার নেই?

নতুন কবিতার সন্ধান আমি করি না। অচেতনে রক্ষিত সেইসব সামাজিক-অসামাজিক, জাগতিক- পরাজাগতিক ইত্যাকার বিষয় থেকে সহসা সিঙ্গল কোনো ইমেজারি তৈরি হয়ে মাথার ভিতর ঘুরতে থাকে। মানে প্রথম লাইনটা এইভাবে আসে। অনেকের কাছে যেটা ইন্সপিরেশন আমার কাছে সেটা অচেতন। অচেতনই আমার মিউজ, সরস্বতী।

কবিতার সবচে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে ইমেজ এবং ম্যাটাফোর। বাকিগুলিকে আমার তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় হয় না। কারণ আপনি চাইলেই লিখতে পড়তে জানে এবং একটু বুদ্ধিমান কাউকে কয়েকঘন্টার মধ্যে ছন্দ শিখিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ইমেজ কিংবা ম্যাটাফোরের জন্য যে সৃজনশীলতা এবং মস্তিষ্ক দরকার তা আপনাকে কোনো বিদ্যালয় শেখাতে পারবে না। তারজন্য আপনাকে বছরের পর বছর পড়তে হবে, লিখতে হবে, কল্পনা করতে হবে। সুতরাং কবিতা সহজ, এই কথাটা খুবই সস্তা।

আর কবিতা কখনোই সম্পূর্ণ হবে তা আমি ভাবি না। পৃথিবীর কিছুই পরিণত নয়, সেইখানে কবিতাও একই রকম। আমি আমার ১৫ বছর আগে লেখা কবিতাও হাতের কাছে পেলে এডিট করতে বসে যাই।

আপনার কবিতার একটি লক্ষ্যনীয় বৈশিষ্ট্য হলো এতে অসংখ্য ইমেজের সমাহার। আপনার কি মনে হয় আপনার চিত্রশিল্পীসত্তা এদিক থেকে আপনার কবিসত্তা প্রভাবিত করেছে?

না, সেটা মনে হয় না। কারণ আমি চিত্রকলার ছাত্র নাহলেও একই ব্যাপার ঘটতো। প্রকৃত অর্থে একজন চিত্রী আর একজন কবির মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য নেই। দুজনেই ইমেজ তৈরি করেন প্রথমে মাথার ভিতর। তারপর দুইজন দুই মাধ্যমে সেটার প্রকাশ ঘটান। তবে চিত্রীর যে সীমা, সেটা কবির নেই।

আমাদের দেশের মুক্তগদ্যের কথা এলেই আপনার নাম আসে। মুক্তগদ্যের সঙ্গে কবিতার মূলগত পার্থক্য কী আমাদের জানান।

মুক্তগদ্যের সঙ্গে কবিতার র‌্যাডিকাল কোনো পার্থক্য নেই। মুক্তগদ্যও এক ধরনের প্রলম্বিত কবিতা। মানে মুক্তগদ্য আসলে টানাগদ্যে লেখা কবিতারই একটা প্রলম্বিত রূপ বা খসড়া বা প্রাথমিক রূপ। অথবা কবিতার কাঁচামাল। এর থেকে এক বা একাধিক কম্প্যাক্ট ( যখন কম্প্যাক্ট হওয়াকে আমি কবিতার পূর্বশর্ত বলে আমি মনে করি) কবিতা বের হতে পারে।

আর ধরেন, প্রত্যেক কবিরই এই রকম কিছু রচনা আছে। যেইগুলির প্রতি তার গভীর মমতা বিদ্যমান। কিন্তু বাহুল্য দোষে দুষ্ট বলে প্রকাশ করতে চান না বা ফেলে দেন। মুক্তগদ্য জেনরে আমরা সেইসকল বা সেই প্রজাতির লেখাকে প্রকাশ করার একটা চেষ্টা নিচ্ছি। এইসব লেখা আসলে কবিতার ভাষা তৈরিরও একধরনের প্লাটফর্ম। অনেকেই কবিতা লিখতে চান, কিন্তু ভাষা জানেন না বলে লেখাগুলি ঠিক কবিতা হয়ে উঠে না। সেই ক্ষেত্রে এই রকম একটা মুক্ত প্লাটফর্মে চর্চাটা করলে পড়া/পড়ানোর মাধ্যমে একসময় আমরা একটা ভাষা পেয়ে যাচ্ছি। যা পরবর্তীতে কবিতায় কম্প্যাক্ট রূপে প্রকাশ করার পথ পাচ্ছি। এমন অনেক তরুণ কবির সঙ্গে আমার পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে যারা এই ধরনের গদ্যের দরজা দিয়ে ঢুকে পরবর্তীতে অনেক ভালো কবিতা লিখছেন। আমি অন্যত্র আমার ‘মুক্তগদ্যের ইশতেহার’ এ এই বিষয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়াস পেয়েছি।

একজন কবির কখন তাঁর কবিতা গ্রন্থাকারে প্রকাশে উদ্যোগী হওয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন? অন্যভাবে বললে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশে কেমন সময় নেয়া দরকার এবং কেন?

নিজের কথাই বলি। আমি নিজেকে কবি মনে করি না, কবিতাকর্মী বলে মনে করি। কবি হওয়ার জন্য একটা জীবন যথেষ্ট নয়, এইটাও মনে হয়। তবে আমার কবি হওয়ার বাসনা আছে চিরদিন। আমার প্রথম কবিতার বই ‘পাখি ও পাপ’ প্রকাশের জন্য আমি সময় নিয়েছি আঠারো বছর। বইটির আগের আঠারো বছর আমার লেখা হাজার হাজার কবিতা(?) আমি ফেলে দিয়েছি, নিষ্ঠুরভাবে নষ্ট করেছি। আমি হয়তো মেধাবী নই। কেউ কেউ মেধাবী কবি আছেন যারা হঠাৎ করেই লিখতে শুরু করেন, এবং জ্বলে ওঠেন। তাদের কথা ভিন্ন। তাদের সংখ্যাও হাতে গোনা দুয়েকজন। আমার মনে হয় ১ম বই প্রকাশের জন্য যথেষ্ট সময় নেয়ার দরকার আছে। সেটা কেবল লেখার জন্য নয়, তারচেয়ে বেশি পড়ার জন্য।

কবিতা কতটুকু কবির কতটা পাঠকের? কোনো কোনো কবি বলে থাকেন লিখে ফেলার পর তাঁরা কবিতাটির দিকে ফিরেও তাকান না আর! এভাবে কি পাঠকের জন্য ছুঁড়ে ফেলা হয়?

কবিতা যতটুকু কবির ঠিক ততোটুকু পাঠকেরও। তবে পাঠ অবশ্যই ভিন্ন।এবং কবিতার পাঠকও সীমিত। কবিতা আমপাঠকের খাদ্য নয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষিত পাঠকরাই কবিতা পড়বে। কবিতাকে আমি শুদ্ধ শিল্প মনে করি। রোলাঁ বার্থ যখন আমাদের বলেন কবিতাখানি বিনির্মাণের ধারায় প্রবাহিত। পাঠক নির্দিষ্ট অর্থকেও বহু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখে এবং বুঝে নিতে পারে, তখন কিন্তু এক অর্থে কবির মৃত্যু হয়। মানে কবি লিখেছেন সেটা আর মুখ্য থাকে না, পাঠক কীভাবে কবিতাটির ডিসকোর্স করছেন সেইটাই মুখ্য। একই কবিতার ভিন্ন ভিন্ন অনেক ডিসকোর্স যখন সম্ভব তখন কবিতা এক অর্থে পাঠকেরই হয়ে যায়। তবে কবি কবিতাটি লেখার পর ফিরেও তাকান না এইটা সত্য নয়, তখন কবি নিজেও পাঠক।  

আপনার কবিতায় কারো কবিতার কিংবা কোনো কবির বা তত্ত্বের প্রভাব আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

আমার কবিতায় কোনো কবির প্রভাব আছে কিনা আমি জানি না। তবে সচেতনভাবে আমি কাউকে অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় মনে করি না। আমার প্রচেষ্টা যখন স্বকীয় স্বর রপ্ত করা তখন কারো প্রভাব থাকার কথা না। যেহেতু আমি অধ্যাপক নই সেহেতু তত্ত্বগুলি আমি জানার প্রয়োজন মনে করি না। নিজের প্রযোজনে যতটুকু দরকার ততোটুকুই রাখি। আর যেহেতু পড়াশোনা খানিকটা করেছি সিনথিসিস করার ক্ষমতাও খানিকটা হয়েছে।