নির্মলেন্দু গুণ

শেখ মুজিব আমাকে 'আপনি' করে বলেছিলেন নির্মলেন্দু গুণ

 

[নির্মলেন্দু গুণ। জন্ম ২১ জুন, ১৯৪৫। তিনি কবি হিশেবে ব্যাপক পরিচিত লাভ করলেও তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী ও গদ্যকারও বটে। কবিতার পাশাপাশি তিনি গদ্য এবং ভ্রমণকাহিনী ও শিশু-কিশোর সাহিত্য লিখেছেন প্রচুর।  ১৯৭০ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রেমাংশুর রক্ত চাই প্রকাশিত হবার পর জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এ-গ্রন্থের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা ‘হুলিয়া’ কবিতাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে এর উপর ভিত্তি করে তানভীর মোকাম্মেল একটি পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়াও তাঁর স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো কবিতাটি বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তিনি ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি, ২০০১ সালে একুশে পদক এবং ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। সম্প্রতি তিনি স্বাধীনতা পদক অর্জন নিয়ে ব্যাপক আলোচিত ও সমালোচিত পাঠক এং কবি মহলে। তার জীবন, কর্ম, সাহিত্য, বন্ধুত্ব, ও আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে কথা তার সঙ্গে কথা বলেছেন গিরীশ গৈরিক। এটি পূর্বে বাংলামেইলে প্রকাশিত হয়। কথাবলি’র পাঠকদের জন্য আবার প্রকাশ হলো।]

 

জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতি বছর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। স্বাধীনতা পদক দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। গত ২৪ মার্চ আপনি সেই গৌরবোজ্জ্বল পদক পেলেন, এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই?

স্বাধীনতা পদক পাওয়া বাংলাদেশের যে-কোনো কবি, লেখক ও গুণীজনের জন্য আনন্দের। আমার জন্যতো বটেই। আমি আনন্দবোধ করছি, ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে- যার হস্তক্ষেপ ছাড়া এ বছর আমার পক্ষে কোনো ভাবেই স্বাধীনতা পদক অর্জন সম্ভব ছিল না। কারণ গত ৭ মার্চ সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৬ সালের স্বাধীনতা পদকের জন্য ১৪ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সেখানে আমার নাম ছিলো না, তাই আমি ক্ষুব্ধ হয়ে ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে একটা স্ট্যাটাস দেই। এতে করে ফেসবুকসহ মিডিয়ায় আলোরণ তৈরি হয়, মনে নেই তোমাদের বাংলামেইল সকলের আগে এই বিষয়টি নিয়ে নিউজ করেছিলো। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরেও আসে। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর রবিবার (২০ মার্চ) আমাকে স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত করে আদেশ জারি করে।

অবশ্য আমার বিপক্ষেও কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলো। তারা আমার ক্ষোভের বিষয়টি বুঝতে পারেনি। আমি আমার মতো, আমাকে অন্য কোনো কবিদের সাথে মিলালে হবে না। আমার মতো, ছোটো হতে ভয় না-পাওয়া কনফেশনাল ঘরাণার কবি যারা পূর্বে দেখে নি, আমার আনপ্রেডিকটেবল বিহেবিয়ার তাদের কাছে অচেনা ঠেকছে বলেই তারা আমাকে নিন্দামন্দ শুধু নয়, গালমন্দও দিচ্ছে। আমার ক্ষোভকে তারা লোভ বলছে। যদিও আমি একটি কবিতায় বলেছি :
`আর কিছু তো আরাধ্য নয়
কাব্য এবং নারী ছাড়া,
ওটা পেলে জাহান্নামেও
যেতে আমি এক পা খাড়া।'

প্রশ্ন উঠেছে, আমি স্বাধীনতা পদকের জন্য নিজে থেকে দাবি তুলেছি কেন? আমি স্বাধীনতা পদক চেয়েছি এই জন্যই যে, আমি চাই এই পদকটি সসম্মানে সচল থাকুক। আমি যা কিছু বলি সোজাসাপ্টা। আমার কোনো বিষয় গোপন করতে চাই না, সত্য জানার অধিকার সকলের আছে। তাই আমার মাহাজীবনের কাব্যগ্রন্থে জীবন সম্পর্কে যা কিছু বলার তা অকপটে বলে দিয়েছি।

পদকের এত পরিমাণ অর্থ দিয়ে কী করবেন?

এত পরিমাণ নয়, মাত্র তিন লক্ষ টাকা। অন্য সকল দেশের গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারের বিবেচনায় নগন্যই বলা চলে। আমার স্বাধীনতা পদক থেকে পাওয়া টাকার অর্ধেক ‘নির্মলেন্দু গুণ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র’-এর প্রকল্পে ব্যয় করা হবে। কিছু পাবে আমার কাশবন, কিছু রাখবো আমার জন্য।

আপনি এ মাসেতো কয়েকটি পুরস্কার পেলেন।

সে কথা আমিতো আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করেছি। মার্চ মাসে প্রাপ্ত পুরস্কারগুলিকে আমি ক্রিকেট খেলার সাথে দেখতে চাই। একটি সিঙ্গেল (জীবনানন্দ দাশের নামে প্রবর্তিত "রপসী বাংলা" পুরস্কার, অর্থমূল্য ৫ হাজার টাকা), একটি বাউন্ডারি (আবিষ্কার সাহিত্য পুরস্কার- ২৫ হাজার টাকা) এবং একটি ওভার বাউন্ডারি (স্বাধীনতা পুরস্কার- ৩ লক্ষ টাকা)। এরকম পয়মন্ত মার্চ আমাদের জাতীয় জীবনে এলেও আমার ব্যাক্তিজীবনে আর কখনও আসেনি আগে। ধন্যবাদ হে মার্চ। তুমি চিরজীবী হও।

রফিক আজাদ গত হয়েছেন। তাঁর কোনো স্মৃতি কি আপনাকে ভাবায়?

আমি নেত্রকোণা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদে ভর্তি হতে এসে কবি রফিক আজাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম তখনকার ঢাকা হলের একটি আড্ডামুখর কক্ষে। ঐ আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন রফিক আজাদ। অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন প্রশান্ত ঘোষাল, শহীদুর রহমান ও মাহবুবুল আলম ঝিনু। ঝিনু তখন স্বাক্ষর পত্রিকায় মার্কিন বিট কবি লরেন্স ফার্লিংঘেট্টির ‘আন্ডারওয়্যার’ কবিতাটি অনুবাদ করে খুব নাম করেছিলেন। জন্ম টাংগাইলে হলেও রফিক আজাদের বেশ কিছুটা সময় কেটেছে নেত্রকোণায়। তাঁর বড় ভাই সেখানে সরকারি চাকরি করতেন। রফিক আজাদ ঐ ভাইয়ের বাসায় থেকে নেত্রকোণা কলেজ থেকেই আইএ পাশ করেন। নেত্রকোণা থেকে তখন উত্তর আকাশ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সম্পাদক ছিলেন সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী। ঐ পত্রিকায় রফিক আজাদ কবিতা লিখতেন। সেই উত্তর আকাশে প্রকাশিত "জনৈক কেরানির রবিবার" নামে তাঁর একটি কবিতা তখন আমি প্রথম পড়ি। তখন শুনতাম রফিক আজাদের কবিতা ঢাকার পত্রিকাতেও ছাপা হয়। সমকাল কবিতা সংখ্যায় তাঁর কবিতা " কারুকার্যময় হে দরোজা" স্থান পেয়েছিল। সেইসূত্রে তাঁর ছবি ছাপা হয়েছিল জনপ্রিয় ইত্তেফাক পত্রিকায়। উত্তর আকাশে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৬১ সালে। ঐ কবিতায় ( নতুন কান্ডারী) নজরুল ও কবি রফিক আজাদের প্রভাব ছিলো। মনে মনে রফিক আজাদের মতো কবি হওয়ার কথা ভাবতাম। ঢাকা হলে পরিচিত হওয়ার পর নেত্রকোণার প্রতি স্মৃতিকাতরতার কারণে তিনি আমাকে সময় ও সঙ্গ দিয়েছিলেন। এবং তাঁদের পিছু পিছু প্রেস ক্লাবের উল্টোদিকে অবস্থিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ইউসিস ভবনে যেতে দিয়েছিলেন। তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল গুলিস্তানেল রেক্স রেস্তোরা। একজন নবাগত তরুণকে সেখানে নিয়ে যাবার নিয়ম ছিলোনা। নামে চেনা কবি শহীদ কাদরী ছিনেন ঐ আড্ডার কন্ট্রোলার। সেই প্রথম পরিচয়ের ৫২ বছর পর গত ১২ মার্চ অপরাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে কবি ও মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদের নিথর, শান্ত-শীতল কপাল স্পর্শ করলাম। তাঁর নয়ন মুদিত। নাসারন্ধ্রে সাদা তুলো গোজা। গালে সামান্য খোঁচা দাড়ি। মুখে তাঁর জীবনের শেষ সূর্যের কনে দেখা ম্লান আলো। আমাকে শেষবারের মতো তাঁকে একনজর দেখার সুযোগ দেবার পরই তাঁর দুই পত্নীর দুই পুত্র পিতার মরদেহ এম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলো বারডেমের হিমঘরের দিকে।

আপনার বন্ধু আবুল হাসান নিজেকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখতেন। কিন্তু আপনি তো রাজনৈতিক সচেতন কবি। তাহলে বন্ধুত্বের বন্ধন এত গাঢ় হলো কিভাবে?

আমরা দুজন আপাদমস্তক কবি। আবুল হাসান তো জাত কবি। জীবদ্দশায় সে কবিতার বাইরে কিছুই ভাবত না। কবিতাই ছিল তার আরাধ্য। এমনকি নারীর প্রতিও তার লোভ ছিল না। আমরা দুজন আলবেয়ার কামুর দ্য আউটসাইডারের নায়কের জীবনযাপন ফলো করতাম। হাসানের আমার মতো হুলিয়া না থাকলেও জীবনযাপনে সে এক প্রকার স্বঘোষিত হুলিয়া জারি করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পড়তাম বটে, তবে কখনো ক্লাস কিংবা পরীক্ষা দিতাম না। আমি বাংলায়, ও ইংরেজিতে পড়ত। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আমাদের সাইনবোর্ড। এই সাইনবোর্ড লাগিয়ে আমরা বন্ধু, ভক্ত, পৃষ্ঠপোষক ও পরনির্ভর জীবন চর্চা করতাম। এটাই আমাদের বন্ধুত্বের জন্মবীজ ও তার শস্যক্ষেত্র। তবে মাঝে মাঝে রাজনীতি নিয়ে আমাদের তর্ক হতো। হাসান রাজনীতিকে শঠ ও অসভ্য দর্শন মনে করত। মনে করত, রাজনীতি করা কোনো কবির কাজ হতে পারে না। একবার ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে উৎসর্গ করে সে ‘অসভ্য দর্শন’ কবিতাটি লেখে।

এমন কোনো স্মৃতি আছে যেটি রাজনৈতিকভাবে দুজনকে এক করেছিল?

আগে থেকে জানতাম, শেখ মুজিব সম্পর্কে তার দুর্বলতা ছিল। সেটি হয়তো শেখ মুজিব ও তার গ্রামের বাড়ি একই মহকুমায় হওয়ায় কিংবা মুজিবের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধের কারণে হতে পারে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স মাঠে শেখ মুজিবের গণসংবর্ধনায় যোগ দিতে আমরা একসঙ্গে গিয়েছিলাম। গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে। সেই অনুষ্ঠানে মানুষ বন্যার জলের মতো এসেছিল। সংবর্ধনা সভার সভাপতি ছিলেন তত্কালীন ডাকসু ভিপি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রনেতাদের মধ্যে আরো অনেকেই ছিলেন। সেই দিনই আমরা প্রথম ১০ লক্ষাধিক জনতার মাঝে বসে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবের ভাষণ শুনি। তাঁর সেই দৃঢ়চেতা বিচক্ষণ ভাষণ শুনে আমরা তাঁর প্রেমের আগুনে আমাদের ভালোবাসার অর্ঘ্য দিয়ে দিলাম। ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটির প্রকৃত প্রস্তাবে নাম হওয়া দরকার ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা।

আবুল হাসানের সঙ্গে পরিচয় কীভাবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আমাদের প্রথম পরিচয়। তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মলয় ভৌমিক। পরিচয়ের প্রথম সূত্রেই ‘কণ্ঠস্বর’—এ প্রকাশিত তার কবিতার জন্য ধন্যবাদ দিলাম। সেও আমাকে জানায়, আমার কবিতা আজাদ, সংবাদ ও সমকালে পাঠ করেছে। সে আমাকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আবেগে তার হাত কাঁপছিল। সেই আবেগে কম্পিত হাতটি বহু সময় ধরেছিলাম। এমনকি আমার মনে হয়, আমি তার হাত মৃত্যু অবধি ধরেছিলাম।

শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আর কে কে আসতেন?

কণ্ঠস্বর পত্রিকায় যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই আসতেন। তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন কবির, সাযযাদ কাদির, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোহাম্মদ রফিক, রাজীব আহসান চৌধুরী এবং মাঝে মাঝে রফিক আজাদ আসতেন। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছাড়া পল্টনের আউটার স্টেডিয়াম মাঠের কোনো এক কোনায় আমাদের আরেকটি আড্ডার স্থান ছিল। সেখানে শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, রশীদ সিনহা ও দিলু ভাই আসতেন। দিলু ভাই মানে কবি দিলওয়ার। দিলু ভাই আমাদের সবাইকে কবিতার জীবনবোধ ও সমাজ সচেতনতা নিয়ে কথা বলতেন। তার কথা কিছুটা আমি মানলেও হাসান পাত্তা দিত না। আমি ও হাসান দুজন দুজনাকে প্রভাবিত করেছি কিন্তু আমাদের কাব্যযাত্রার পথ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচয়?

শামসুর রাহমানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ১৯৬৭ সালে। হাসানই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। হাসান শুধু শামসুর রাহমান নয়, আমাদের সমসাময়িক প্রায় সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার পরিচয় করে দিয়েছিল। রাহমান ভাই তখন পুরান ঢাকার আওলাদ হোসেন রোডের পৈতৃক বাড়িতে থাকতেন। সন-তারিখ মনে নেই, কোনো এক সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গেলাম। বাড়ির চারপাশে উঁচু উঁচু দালান থাকায় সে বাড়িতে অনেকটা গোধূলি আলোর মায়া লেগে থাকত। এ বাড়িতে বসেই তিনি ‘দুঃখ’, ‘রূপালি স্নান’, ‘কখনো আমার মাকে’-এর মতো অনেক বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন। আমাদের আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে গিয়ে তিনি চা-বিস্কুট খাইয়েছিলেন। সম্ভবত আমাদের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর কিছুদিন আগে এই সাক্ষাৎ ঘটেছিল। তাঁর বাড়িতে বসে ভেতরে ভেতরে তাঁর স্ত্রী জোহরা বেগমকে এক নজর দেখার গোপন ইচ্ছাটা আমাদের সেদিন পূরণ হলো না। তাই মনঃকষ্ট নিয়েই বিদায় নিতে হলো।

কোনো পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্ক হয়নি?

আরে বলে কী? আমি তো চলচ্চিত্রের লোক। জহির রায়হান একদিন আমাকে বলল, চলেন কবি, এফডিসিতে শুটিং আছে, আপনি থাকবেন। আমিও গেলাম। শুটিং ছিল ববিতাকে নিয়ে। ববিতা তখন হালকা-পাতলা এক সুন্দরী। রায়হান ভাই আমাকে জিগায়, আমার পছন্দ কি না। তখন তাকে কিছু না বললেও ববিতা দর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

কলকাতার পরিচালকদের সঙ্গে কোনো স্মৃতি?

সুচিত্রা সেনকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটি তাঁকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কবিতাটিসহ একটি বই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মাধ্যমে সুচিত্রার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। সুচিত্রা কবিতাটি পড়ে আমায় নাকি দুষ্ট বলেছিল। কলকাতার এক অনুষ্ঠানে এই কবিতাটি পাঠ ও তার বিষয় উপস্থাপন করেছিলাম। সুচিত্রাকে নিয়ে এর আগে কোনো কবি কবিতা লেখেনি। এই কবিতা প্রমাণ করে, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে বাঙলাদেশের মানুষের আবেগ। আবার এ-ও প্রমাণ করে, কলকাতার মানুষের আবেগ। সেই অনুষ্ঠানে সুচিত্রা সেনের মেয়ে মুনমুন সেনও ছিল। মঞ্চ থেকে নেমে দর্শক সারিতে বসার সময় মুনমুন এসে পা ছুঁয়ে আমাকে প্রণাম করল। অথচ সে কিন্তু আমারই বয়সী। কিছুটা বিব্রত বোধ করেছিলাম। কারণ সে এত ছোট নয় যে আমি তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করি, আবার সে এত বড়ও নয় যে তাকে আমি প্রণাম করি। হয়তো এমন হতে পারে—আমি তার মাকে নিয়ে কবিতা লিখেছি, সে কারণে অথবা আমার চুল-দাড়ির কারণে সে আমাকে প্রণাম করেছে।

যেমন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বলেছিলেন। তখন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আহমদ ছফা, মুহম্মদ নূরুল হুদা বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আপনি নির্মলকে তুমি বলেন, ওকে আপনি বলছেন, আমাদের কানে লাগছে।’ শেখ মুজিব তখন বললেন, ‘দাবিটা উত্থাপিত হয়েছে অন্যদের মধ্যে—আমার মধ্যে নয়। বয়স বিচারে আমি তাঁকে তুমি বলতে পারি কিন্তু তিনি যে কবি, তাই তাঁকে আপনি বলছি। কবিদের কোনো বয়স নেই। সে সব সময়ই সবার বড়। একজন কবি মেধায় মননে না হোক সৃষ্টির কারণে সবার চেয়ে বড়।’ ভেবে দেখ, কিটস তো কত অল্প বয়সে কবিতা লিখেছেন, তা সারা পৃথিবীর মানুষ পড়ছে। তাঁর অনেক কবিতা পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। এই কবিতার জন্যই মুনমুন সেন আমাকে প্রণাম করেছে, বঙ্গবন্ধু আমাকে আপনি সম্বোধন করেছেন।

দৈনিক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে হলো?

হাসান হলো সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটক। একদিন আমরা মতলব করে দুজন মিলে দৈনিক পাকিস্তানে গেলাম। মতলব ছিল, কবি আহসান হাবীবকে পটানো। তিনি সহজে পটতেন না, খুব কড়া মানুষ ছিলেন। কবিতা ছাপার আগে কবিদের শিল্প সাহিত্য ও কবিতার ছন্দ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। তাই বড় ভয় পেতাম। দৈনিক পাকিস্তানে এর আগে অনেকবার হাসানের কবিতা ছাপা হয়েছে। তাই হাসান তাঁর স্নেহাভাজনে সফল ছিল। তবে মূল ব্যাপারটা ছিল আমাকে নিয়ে। আহসান হাবীব সম্পর্কে ভয়ের মূল কারণটা ছিল তাঁর কবিতা পাঠ্যপুস্তকে পাঠ করেছি এবং পরীক্ষার খাতায় তাঁর ‘এই মন-এই মৃত্তিকা’ থেকে প্রশ্ন এসেছে। তাঁর রুমে ঢুকতেই দেখি, অনেক কবিতা ও পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি কাটাকাটি করছেন এবং অধিকাংশই ঝুড়িতে ফেলে দিচ্ছেন। একটি সিগারেট ধরিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। হাসান আমার পক্ষে হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে ওকালতি করছিল। হঠাৎ সে হাবীব ভাইকে বলল, আপনার কবিতা নির্মলের মুখস্থ। তখন তাঁর ‘এই মন, এই মৃত্তিকা’ কবিতাটি পাঠ করলাম। তাঁর হাসি দেখে বুঝলাম, ওষুধ কাজে লেগেছে। সেদিনকার মতো হাবীব ভাইয়ের মন জয় করে আমরা তাঁর রুম থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ওই দিনই আমরা কবি শামসুর রাহমান, কবি হাসান হাফিজুর রহমান, সানাউল্লাহ নূরী, আহমেদ হুমায়ূন, কবি ফজল শাহাবুদ্দিন ও কবি মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ওই সময় ফজল শাহাবুদ্দিনের ‘তৃষ্ণার অগ্নিতে একা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল। বইটির প্রোডাকশন ছিল চমত্কার। ওই কবিতার বইয়ের একটি কবিতা এখনো আমার স্মরণে আছে—‘শ্রাবণ মেঘেতে ভিজে দেহ যার ফুলে ওঠে/ঘন নীল উতলা সেমিজে/সেই মেয়ে তুমি ছাড়া আর কেউ নয়।’

আপনার ও আবুল হাসানের বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি?

একবার তো হাসান হাফিজুর রহমান আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ‘পরিক্রম’ পত্রিকায় একই পদে আমাদের দুজনকে চাকরি দিয়েছিলেন। আমাদের কাজ ছিল, লেখকদের লেখা সংগ্রহ ও প্রুফ দেখা। প্রথম প্রথম তাই মন কষাকষি হতো। পরে দুজনই মানিয়ে নিয়েছিলাম। যা মাইনে পেতাম ভাগ করে নিতাম। ধ্রুপদীকে যদি পাঁচ ভাই মিলে ভাগ করে নিতে পারে, আমাদের সমস্যা কোথায়? আরেকবার আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। বিষয় কবিতা—কে কাকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

সাযযাদ কাদিরের সঙ্গে কীভাবে সখ্য?

সাযযাদের সঙ্গে আবার সখ্য কী? আমরা তো একসঙ্গে মুহসীন হলের ২১১ নম্বর রুমে থাকতাম। রুমটি ওর নামে বরাদ্দ ছিল। ওই রুমে বসে অনেক সম্পাদনা, প্রুফ দেখার কাজ করেছি। প্রুফ দেখার কাজ সাযযাদই শিখিয়েছিল।

ছিলেন তো বেকার-গরিব-হাতশূন্য কবি। জুয়ার টাকা কোথায় পেতেন?

আগেই তো বললাম, কখনো প্রুফ দেখা, সম্পাদনার কাজ করতাম। মনে আছে, এক বিকেলে বাংলাবাজারের প্রকাশকের কাছ থেকে কিছু টাকা পেলাম। সে টাকা নিয়ে গেলাম হাক্কার জুয়ার আড্ডায়। উদ্দেশ্য, এই টাকা দিয়ে যদি আরো কিছু টাকা জমানো যায়। অথচ জুয়ার পটের মাছ, হাতি, ঘোড়া, ময়ূর সব খেয়ে নিল। তখন অভুক্ত আমি ক্ষুধায় আগুনের মতো জ্বলছি। অবশেষে সেই অঘটনটি ঘটালাম। গুলিস্তানের একটি হোটেলে খাবার খাওয়া শেষ করে বিল শোধ না করে দৌড়ে পালালাম।

সংবাদের সাহিত্য সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সারের কথা মনে পড়ে?

পূর্ব বাংলার উদীয়মান নেতা শেখ মুজিবকে উৎসর্গ করে প্রথম কবিতা আমিই রচনা করি। সেটি সংবাদের সাহিত্য পাতায় ছেপেছিলেন তিনি। প্রথমে অবশ্য ছাপতে চাননি। তখন ১৯৬৭ সাল, সময়টা বেশ খারাপ ছিল। আমাকে জানালেন, তোমার ‘প্রচ্ছদের জন্য’ কবিতাটি ছাপলে সংবাদ আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি তোমার-আমার বিপদ ডেকে আনতে পারে। সাতপাঁচ না ভেবে তবুও তাঁকে চাপ দিচ্ছিলাম এবং একটি চিরকুট লিখে জানালাম, আমার কবিতাটি আপনি না ছাপলে গভর্নর মোনায়েম খানকে উৎসর্গ করে আরেকটি কবিতা লিখে ‘পয়গাম’ পত্রিকায় ছাপব। তখন রিস্ক নিয়ে তিনি কবিতাটি ছাপলেন। পরে ১৯৬৯ সালে রণেশ দাশগুপ্তের কাছে শুনেছি—‘শেখ সাহেব আমার কবিতাটি পাঠ করে খুব খুশি হয়েছিলেন।’ এ জন্যই বলেছি কবিতা আমার নেশা, পেশা এবং প্রতিশোধের হিরণ্ময় হাতিয়ার।

ইদানীং কবিদের নামের আগে বিশেষণ যোগ করা হয়। যেমন সব্যসাচী কবি, তারুণ্যের কবি, জাতিসত্তার কবি। এ সম্পর্কে মতামত?

একজন কবির সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কবি। কবির নামের আগে কোনো বিশেষণ যুক্ত হলে তার কাব্যের কিংবা তার কবিশক্তি বৃদ্ধি পায় কি না জানা নেই। আজ তোমরা যে সৈয়দ হককে সব্যসাচী লেখক বলো, এ বিষয়ে একদিন তাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় বলেছিলাম, আপনাকে আমি কবি বলব না সব্যসাচী বলব? এ কথা আমাকে একটু বলে দেন। (হাসি) কথাটি একদমই ঠাট্টা ছিল। তবে ভেবে দেখ, সুনীল [গঙ্গোপাধ্যায়] শতাধিক বই লিখেছে। তাহলে আমরা তাকে কী বিশেষণে বিশেষায়িত করব?

এক সময় তো শুভেন্দু ছদ্মনামে লিখতেন।

এর কোনো কারণ নেই। আমার কাকার নাম ছিল শুভেন্দু। এই নামে ট্যাবলয়েড ফর্মে আজাদের রবিবারের মজলিসে ‘ফটোগ্রাফ অটোগ্রাফ’ নামে একটি সাপ্তাহিক কলাম লিখতাম। ওই পাতার দায়িত্বে ছিলেন মোস্তফা ভাই। ১৯৬৯ সালের শেষ দিকে বাংলাবাজার থেকে একটি সিনেমা পত্রিকা বের হতো, নাম ‘জোনাকি’। পত্রিকাটি মাসিক ঘারানার এবং সম্পাদক ছিলেন আবদুল মতিন। বেশ কয়েক মাস পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এই পত্রিকায়ও শুভেন্দু ছদ্মনামে ‘ফসল বিনাসী হাওয়া’ কলামটি লিখতাম। তবে পত্রিকার তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যার হদিস ছাড়া আর কোনো সংখ্যা আমার কাছে নেই।

প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কীভাবে বেরোলো?

প্রথম বই প্রকাশের জন্য ১৯৭০ সালে নওরোজ কিতাবিস্তান, মাওলা ব্রাদার্স এবং বইঘর প্রকাশনীতে ধরনা দিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছি। কোনো প্রকাশকই আমার বই প্রকাশের ঝুঁকি নিতে চায়নি। কবিতার বইয়ের তখন কাটতি কম থাকায় আল মাহমুদের ‘লোক লোকান্তর’ কবি-সাহিত্যিকদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ পেয়েছিল। আবদুল মান্নান সৈয়দ তার প্রথম বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ নিজের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন। অবশেষে খান ব্রাদার্স নিজ থেকে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এমন সৌভাগ্য আমার কাছের কবিদের মধ্যে আমারই প্রথম ঘটে।