নীলাঞ্জনা অদিতি

এখনকার কবিতা পড়ে মনে হয় অনেক ধরনের কবিতা লেখা হচ্ছে নীলাঞ্জনা অদিতি


 

[নীলাঞ্জনা অদিতি। তরুণ কবি ও অনুবাদক। জন্ম ১৭ এপ্রিল ১৯৮৮, ঢাকায়। পড়াশোনা ইউনিভার্সিটি অফ ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) থেকে ইংরিজি সাহিত্যে এম এ। তিনি কথাবলির সঙ্গে কথা বলেছেন তার পছন্দ-অপছন্দ, লেখালেখি পড়াশোনা ইত্যাকার বিষয়ে। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

লেখালেখি কখন থেকে করো?

প্রথম লিখছিলাম আমার চৌদ্দবছর বয়সে। তখন ডায়েরিতেই লিখতাম। এখনো তাইই লিখি।

কী লিখেছিলে, গল্প নাকি পদ্য?

কবিতার মতো কিছু একটা।

কবিতা কাকে নিয়ে, দেশ, মা নাকি প্রেমের কবিতা?

মন খারাপের কবিতা। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির দুপুর ছিলো। আর লেখার ঝোক উঠলো। আর লিখি।

বৃষ্টি কি সবসময় ভালো লাগে?

না সব সময় লাগে না। রাতের বৃষ্টি ভালো লাগে। গ্রামে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ বেশি ভালো লাগে।

কচুপাতায় বৃষ্টি পড়তে দেখেছো কখনো?

দেখছি।

কেমন লাগে?

ভালো লাগে।

লেখালেখির কারেণে কি কখনো বাসায় বকা খেয়েছো?

কবিতা লেখার জন্যে কখনো খাইনি।

কেউ কি উৎসাহ দিয়েছে?

হ্যাঁ, আমার বন্ধুবান্ধব, টিচার। এখন লেখালেখি সূত্রে পরিচিত অনেকেই উৎসাহ দেয়।

বাসার কেউ উৎসাহ দেয় না, মা বাবা, ভাই বোন?

হ্যাঁ দেয়।

স্বামী বিবেকানন্দকে কেমন লাগে?

খুব ভালো লাগে।

কী কারণে?

তাঁর জীবনদর্শনের জন্য। একধরনের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। দেশের জন্য ভাবতে ভেতরে শক্তি পাই।

নিজেকে সিস্টার নিবেদিতা মনে হয়?

না, এতোটা গুণী হতে পারিনি। অবশ্য আমার আর একটা নাম নিবেদিতা।

মানুষ আত্মবিশ্বাসের জোরেই গুণী হয়। তোমার কি আত্মবিশ্বসের অভাব?

কিছুটা।

ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে?

শক্তিতে আছে। মানে মনে হয় কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি আছে।

বিশেষ কারো কবিতা কি তোমাকে প্রভাবিত করে?

হ্যাঁ, আমাকে উইলিয়াম ব্লেক খুব প্রভাবিত করে আর বাঙলাভাষায় রবিঠাকুর আর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ।

ব্লেকের কবিতা কেনো প্রভাবিত করে?

ব্লেকের কবিতায় মানুষের চরিত্রের দুটা দিক আছে। যা ভাবায়।

কেমন?

যেমন ‘নার্সেস সং’-এ কোমলতা আছে, মায়া-মমতা আছে। একটা টেন্ডারনেস-এর ফিলিং আবার ‘দ্য টাইগার’-এর ভেতরের হিংস্রতা আছে—যেটা কিছু মানুষের মধ্যে ভীষণভাবে চিরদিন দেখা যায়। আমি প্রথমবর্ষে পড়েছিলাম, তখন ভীষণভাবে আক্রান্ত করেছিল এই চিন্তাটা।

আমার মনে হয়, ব্লেক যদিও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। কিন্তু বাইবেলভিত্তিক নৈতিকতা তাকে প্রভাবিত করেছে। যা তার কবিতায় এসেছে প্রতীক রূপে। সেই গুড-এভিলের বাইনারি...

হ্যাঁ, গুড আর এভিল।

ব্লেকের পেইন্টিং কেমন লাগে?

তার পেইন্টিং আমি দেখিনি।

তার সময়কার আর কারো কবিতা ভালো লাগে না?

অন্যদের কবিতা মনে তেমন দাগ কাটে নাই। কেন জানি না। আমি হয়তো তাদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবিনি।

তার পরে বোদলেয়ারের কবিতা?

বোদলেয়ারের ভেতরের অনুভূতিবোধ আছে যা কখনো ভাবায়।

নিয়মিত কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে?

নিয়মিত পড়তে ভালো লাগে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, হেলাল হাফিজের কবিতা। এছাড়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়ি।

যারা কবিতা লেখে, বা কবিতার পাঠক তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই দেখা যায় সুনীল, হেলাল হাফিজ বা রুদ্রের কবিতা কলেজেই ভালো লাগে। পরে বা পড়াশোনার পর আর ভালো লাগে না। যেমন আমারও লাগে না। তাদের চেয়ে বরং শঙ্খ ঘোষ, আল মাহমুদ কিংবা আবুল হাসান ভালো লাগে। আর সবসময় ভালো লাগে জীবনানন্দ। তোমার কেনো এখনো ভালো লাগে?

হেলাল হাফিজ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতার ভেতরে আমি আগুন পাই। একটা দ্রোহ। বিশেষ করে রুদ্র। এটা প্রবলভাবে আমাকে আকর্ষণ করে। আবুল হাসান বিষাদে ভালো লাগে। আর সুনীল-এর কবিতা পড়লে মনে হয় গল্প করছি।

জয় গোস্বামীর কবিতা পড়ো?

হ্যাঁ পড়ি মাঝে মাঝে

কেমন লাগে?

ভালোই লাগে।

তার কবিতা কিন্তু লিরিকাল। আমার মনে হয় সুনীলের চেয়ে ভালো

দেশ শারদীয়াতে জয় গোস্বামীর পিচ্চি পিচ্চি কবিতা আছে। এসব কবিতা বেশ লেগেছে। আর সুনীলের উপন্যাস বেশি পছন্দ করি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে তোমার মত কী?

কবিতার দায় যদি বলেন, আমরাতো পড়েছিলাম কবিতা হচ্ছে আমাদের শক্তিশালী আবেগের স্বতস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। কাজেই কবি বা কবিতার দায় থাকবেই। কবি সুন্দরের আরাধনা করবে, খারাপ সময়ে পুড়বে। সেই পোড়া থেকেই শুদ্ধ কবিতা হবে। আমার তাই মনে হয়।

কবিতা ছাড়া আর কী পড়ো? ফিকশন কার ভালো লাগে?

ফিকশনতো অনেকেরই পছন্দ। রবি ঠাকুরের ‘গোরা’ ভীষণ পছন্দের উপন্যাস । তার ছোটগল্প কিছু কিছু আর কিছু কবিতা ভীষণ প্রিয়।

গোরা? গোরা পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছিলো চায়ের দোকানে বসে আছি। খালি ভাষণ আর ভাষণ। চোখের বালি কেমন লাগে?

‘চোখের বালি’ ভালো লাগে নাই।

মানিক বা তারাশংকর?

হ্যাঁ তারাশঙ্কর ভালো লাগে। এদের কাউকেই বাদ দিতে পারবো না। আমার মনে হয় আমি একটা ভ্রমণ করছি। পথে তাদের সঙ্গে দেখা হলো। তারপর বিভূতিভূষণ, সুনীল, সুচিত্রা ভট্টাচার্য,  আর অবশ্যই হুমায়ুন আহমেদ। আসলে গল্পের ভালো লাগার কথা বলা কঠিন। এত্ত পড়েছি!

বাইরের কার লেখা ফিকশন বেশি টানে?

দস্তয়ভস্কি, জেন অস্টেন, লিও তলস্তয় আরো অনেকের

জেন অস্টেনকে কেনো ভালো লাগে? তার কোন চরিত্রটা তোমাকে আছন্ন করে?

জেন অস্টেনকে ভালো লাগার কারণ হলো তীব্র গল্পের সাবলীলতা। তার চরিত্রগুলোকে না ভালবেসে থাকা যায় না।

কবিতা কেনো লিখো?

কবিতা কেন লিখি এইটা আমি জানি না। আমার তাড়না হয়। তখন আমি ডায়েরি খুলে বসি। ভেতর থেকে লাইন চলে আসে। কবিতার মতো লাগে। একটা নাম দিই আমার মুক্তগদ্যের শিরোনামের মতো, ‘যা আমাকে লিখিয়ে নেয়া হয় অবচেতনে...’

না চাইতেই কি কাউকে লেখা ছাপানোর জন্য পাঠাও?

না। মানুষ আমাকে ক্যাপাবল মনে করলে চাইবে? যাওয়ার আস্তে আস্তে আগানোই ভালো । অল্প আশা বেশি প্রাপ্তি জীবন সুখী। মাঝে মাঝে লোকজন লেখা নেয়। দেওয়ার পর বলেও না পাবলিশ হলো কিনা। এইটা একটু খারাপ লাগে কিন্তু আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করি না কিছু।

তোমার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

কবিতা থেকে কোনো সময়ের কোনো কবির নাম উঠিয়ে দিয়ে পড়লে কবিদের চেনা যায় না। সবারই একটা সময় থাকে... সময় থেকে মানুষের মনে গ্রহণযোগ্যতা তৈরী হয়। কেউ থাকে কেউ হারিয়ে যায়। যেমন কিট্স মারা গেছেন পঁচিশবছর বয়সে। এখনো তো পড়া হয়।

কিন্তু যে জীবনানন্দের কিছু কবিতা আগে পড়েছে, তার বলার ধরন ধরতে পেরেছে সে তো নাম উঠিয়ে দিলেও জীবনানন্দের কবিতা চিনতে পারবে। এই বিষয়ে তোমার মত কী?

জীবনানন্দের কবিতায় এতো সুন্দরভাবে কল্পনা আর উপমার মিশেল ঘটেছে আর প্রকৃতিকে এত সুন্দরভাবে এনেছেন যে যখনই পড়া হয় আলাদাভাবেও বোঝা যায় ।

সেটাই তো স্টাইল। জীবনানন্দের কবিতা স্টাইলের কারণেই বোঝা যায়। এই রকম বিনয় মজুমদারের কবিতাও। কিংবা রবিনাথের কবিতা। আরো অনেকের...

হ্যাঁ

অবসরে কী করো?

আমি সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখি। এমনিতে বই পড়তে, গান শুনতে আর মুভি দেখতে ভালোবাসি বিশেষত পিরিওড মুভি, ওয়ার মুভি, রোমান্টিক ড্রামা।

লেখালেখির বাইরে আর কী করতে পারো?

লেখালেখির বাইরে আমি গান করতে পারি।

এখনকার কবিতা নিয়ে তোমার পর্যবেক্ষণ কী?

এখনকার কবিতা পড়ে মনে হয় অনেক ধরনের কবিতা লেখা হছে। নানা স্টাইলে। এইটা ভাল। যে কোন সৃষ্টিশীল মাধ্যমে পরিবর্তন ভাংচুর জরুরী। একই টাইপ সব সময় ভাল না।

তুমি তো অনুবাদও করো। তো, অনুবাদ করতে গেলে কোন বিষয়টা মাথায় থাকে?

এমনভাবে অনুবাদ করি যেনো অর্থটা বজায় থাকে। আমি অবশ্য আক্ষরিক অনুবাদ করি। তাও চেষ্টা করি যেন মেসেজটা থাকে। বেশির ভাগ কবিতাই করেছি। চেষ্টা থাকে যেন কবিতা নষ্ট না হয়। এখনো শিখছি। নতুন বলে।