মুজিব মেহদী

যে অভিজ্ঞতা কবি নিজে ছুঁয়েছেন, অর্জন করেছেন, তা-ই সে কবিতার ভিত মুজিব মেহদী


[মুজিব মেহদীর জন্ম ১৯৬৯ সালের ৩ জানুয়ারি, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার কুকরাইল গ্রামে। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে অধিকারভিত্তিক একটি বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে সমন্বয়কারী হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : কবিতাগ্রন্থ : ‘মমি উপত্যকা’ (শ্রাবণ ২০০১), ‘ময়দানের হাওয়া’ (পাঠসূত্র ২০০৭), ‘চিরপুষ্প একাকী ফুটেছে’ (অ্যাডর্ন ২০০৯), ‘ত্রিভুজাসম্ভাষ’ (শুদ্ধস্বর ২০১৩), ‘জঙ্গলের নিজস্ব শব্দাবলি’ (ঐতিহ্য ১০১৪), 'ধূলি ওড়ানোর ভঙ্গি' (ঐতিহ্য ২০১৮) 'বাইকুশতক' (ছোট কবিতা ২০১৮)। উভলিঙ্গ রচনাগ্রন্থ : ‘শ্রেণিকরণ এমন এক সংকীর্ণতা যা সৃষ্টির মহিমাকে ম্লান করে দেয়’ (প্রতীতি ২০০৩), ‘বৃষ্টিগাছের তলায়’ (বাংলাপ্রসার ২০০৬), ‘খড়বিচালির দুর্গ’ (ঐতিহ্য ২০১১)। অনূদিত জেনগল্পগ্রন্থ : ‘সটোরি লাভের গল্প’ (পাঠসূত্র ২০০৯) অনুসন্ধানগ্রন্থ : ‘মাদ্রাসা শিক্ষা : একটি পর্যবেক্ষণ সমীক্ষা’ (বিএনপিএস ২০০১), ‘হাওর : জলে ভাসা জনপদ’ (আইইডি ২০০৫), ‘ইকোপার্ক উন্নয়ন : জীববৈচিত্র্য রক্ষার নামে জীবন ও প্রতিবেশ বিনাশী তা-ব’ (আইইডি ২০০৫), ‘মুক্তিযুদ্ধ ও নারী’, রোকেয়া কবীরের সঙ্গে যৌথভাবে (আইইডি ২০০৬ ও ঐতিহ্য ২০১২)। সমন্বিত গ্রন্থ : ‘চন্দ্রাবতীর কয়েকজন সন্তান’ (বইপাড়া ১৯৯৭)। সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন : ‘সিঁড়ি’ (১৯৯১), ‘একজন’ (১৯৯৩), ‘অবয়ব’ (১৯৯৩), ‘শিরদাঁড়া’ (২০০২-২০০৩)। সম্পাদিত জার্নাল : ‘নারী ও প্রগতি’ (২০০৫-২০১৭)। পুরস্কার ও সম্মাননা : ‘লোক সাহিত্য পুরস্কার ২০১১’। এই কবির সঙ্গে কবিতা ও নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ছোটোকাগজ ‘কঙ্কাল’-এর সম্পাদক কবি মনজুর কাদের]।

 

মনজুর কাদের : আপনার কবিতাভাবনা প্রসঙ্গে বলুন।  

মুজিব মেহদী : সচল কবির কবিতাভাবনা এতটাই অস্থির থাকে যে প্রায়ই এর চেহারাসুরত মুখস্থ থাকে না। দিনকয় পর পর মূলতক বদলে গিয়ে নতুন অবয়ব ধারণ করে। প্রায় তিন দশকের আমার কবিতালগ্নতা থেকে বিভিন্ন সময়ে এ ব্যাপারে অনেক ভেবেও একটা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় পৌঁছুতে পারি নি। এই পরিস্থিতিতে এখানে সর্বশেষ ভাবনাটা জানাবার চেষ্টা করে দেখতে পারি; যদিও এ ভাবনার মোটমাট কতদিন আয়ু সে ব্যাপারে আগাম কোনো আভাস দেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।

এই মর্মে একটি রুশ প্রবাদ আছে যে, `সে কোনো মুক্ত মানুষই নয়, যে কখনো ‘কিছুই না’ করে না”। এই প্রবাদোক্ত ‘কিছুই না’ করা ব্যাপারটা অত সহজ নয়, যেহেতু জীবন মানুষকে সবসময় কোনো-না-কোনো ‘কিছু’র মধ্যেই থাকতে বাধ্য করতে চায়।

বাংলাদেশসহ অনেক দেশে অবশ্য অর্থকরী কাজ না-করাকেই ‘কিছুই না’ করা ভাবা হয়। গার্হস্থ্য ও প্রজনন কর্মভারে পীড়িত আমাদের নারীসমাজ ওই উদ্দেশ্যমূলক ভাবনার প্রত্যক্ষ শিকার। কিন্তু প্রবাদোক্ত ‘কিছুই না’ করা একেবারেই অন্য জিনিস। প্রস্তাবিত ‘কিছুই না’র সঙ্গে লিঙ্গশোষণমূলক ব্যাপারস্যাপারের কোনো সংস্রব নেই, সংস্রব আছে অন্তর্গত মুক্তি ও পূর্ণাবসরের। এই মুক্তি কেবল বাহ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দায় থেকে নয়, বরং ভেতরগত চিন্তনভার থেকেও। ‘কিছুই না’ কাজেই দেহে-মনে পরম এক শূন্যময়তার আর্তিসমগ্রতায় সমর্পিত হওয়া।

চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়াকে আমার মাঝেসাঝে মূর্তিমান এক অভিশাপ বলে মনে হয়। জন্মাতাম যদি কাঠবিড়ালি কিংবা নিদেনপক্ষে ঝুঁটিশালিক হয়ে, একমনে খাদ্যাহরণ ও কামোদযাপনে পার হয়ে যেতে পারত একটা জীবন। কিন্তু মানুষ হয়ে রীতিমতো ফেঁসে গেছি। অভিশাপদগ্ধ এই মনুষ্যজন্ম আমাকে প্রায়ই ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের ভবিষ্যযাপনচিন্তার গর্তের মুখে ঠেলে দেয়। ক্বচিৎ কখনো উৎফুল্ল হলেও প্রায়শই হতাশায় ডুবে যেতে হয়। এর মধ্যেও সৌন্দর্যলিপ্সা জাগে। রক্তমাংসের তাড়নায় ভুগি। তদুপরি কিছু মানুষের কাণ্ডকীর্তিদৃষ্টে জগৎসাধন ব্যাপারে বিবমিষা জাগে। কখনো-বা ক্রোধোন্মত্ত হয়ে উঠি। আগাগোড়াই নিষ্ফল যদিও।

এই প্রতিক্রিয়াগুলোর প্রতিটিই দেহ-মনকে সতত ব্যস্ত রাখে। আর নানারূপ অনুভূতির জন্ম হতে থাকে। তাতে বেজায় ভার বোধ হয়। যাপনস্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে ওই ভার মাথা থেকে নামিয়ে ফেলবার দরকার হয়। নইলে স্বস্তি মেলে না। 

আমার কবিতা করা, ভেবে দেখেছি, কণ্টকাকীর্ণ বিচিত্র ওই অনুভূতিভার খালাস করে মস্তিষ্ককে খালি করবার প্রয়াস থেকেই জাত। শুরুতে ফেনা ফেনা গাদ ওঠে। গাদ সরে গেলে একসময় ঝিলকে ওঠে পরম শূন্যের কাছাকাছি অঞ্চলে চরে বেড়ানো নিখাদ মেঘপুঞ্জের মতো শ্বেতশুভ্র হাতি-ঘোড়া, পরাহ্ণমনের আলো ঠিকরে পড়লে যাতে লালাভার উচ্ছ্বাস জাগে। ওই মেঘানুভূতিমালার শব্দ-বাক্যকৃত অনুবাদই আমার কবিতা।

কবিতা না-করে অন্য কোনো নিরর্থকতায় সমর্পিত হয়েও এ বাবদে নির্ভার হওয়া যায় না তেমন নয়। হওয়া যায়। হইও। কিন্তু শূন্যময়তার সন্ধানে ‘কিছুই না’ করার দিকে যাত্রার মাধ্যম হিসেবে কবিতাকেই আমার সবচেয়ে মোক্ষম অবলম্বন বলে মনে হয়।

 

মনজুর কাদের : আমরা অনেকেই দশক বিচারে বিশ্বাসী নই। কিন্তু একজন কবির আবির্ভাবকাল নির্ণয়ে দশক গণনার রেওয়াজ চালু আছে। দশক বিচারে আপনি নব্বইয়ের দশকের কবি। নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

মুজিব মেহদী : কবির উত্থানকালকে চিহ্নিত করবার জন্য দশক ট্যাগিং বুদ্ধদেব বসুর তেমন কোনো মন্দ আবিষ্কার ছিল না, যতটা নিন্দামন্দ একে করা হয়। বিষয়টা নিয়ে কথা উঠলে আটানব্বইভাগ পাবলিক একইসঙ্গে দশক ও বুদ্ধদেব বসুকে তুলাধুনা করে ছাড়েন দেখেছি। অথচ দশকের সুবিধা নিয়েই এই তেড়েফুড়ে আসাদের নব্বইভাগের কবিনাম বেঁচে আছে। এই বিবেচনা অকার্যকর হয়ে গেলে তাদের অনেকের অস্তিত্বই ইতোমধ্যে বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের কাতারে না-খুঁজলে উপলব্ধি করা মুশকিল হয়ে যাবে। 

বস্তুতপক্ষে সচল কবি দশকের মধ্যে বন্দি থাকতে পারেন না। কবি যদি প্রকৃত সৃজনশীল হন, সমসময়ের শ্বাসপ্রশ্বাসে জারিত মহাকালের সওদাপাতি যদি কিছু থাকে তাঁর, তাহলে একটা কোনো দশ বছর সময় তথা দশককাল তাঁর কবিতার জীবৎকালের সাপেক্ষে খুবই খণ্ড একটা মুহূর্তমাত্র। কাজেই দশক নয়, কবিকে তাঁর কবিতার শক্তি দিয়ে বিচার করাই একমাত্র ন্যায্য সাহিত্যিক বিবেচনা।    

        

মনজুর কাদের : দশকের ভিত্তিতেই কবিতার বাঁক বা পরিবর্তন নির্ণীত হচ্ছে। নির্ধারণ করা হচ্ছে আশির দশক থেকেই বাংলা কবিতার নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। এই সময়ের কবিতায় এই যে বৈচিত্র্যের ঘ্রাণ রস, এখানে চিন্তার জায়গাটা নিয়ে কিছু বলবেন, প্লিজ?

মুজিব মেহদী : মোটাদাগে কোনো দেশের যে কোনো সময়ের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিই ঠিক করে দেয় সে সময়ের শিল্প-সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি কেমন হবে না-হবে। সত্তরের দশকে আমাদের কবিদের উচ্চকিত কবিতায় যে স্লোগানাধিক্য এসেছে, সেটার কারণ যেমন তৎকালীন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তেমনি আশির দশকের কলাকৈবল্যবাদিতাও ছিল তৎকালীন সামরিক খড়্গের পাশে মাথা না-উঁচিয়ে নীরবে চিরকেলে শিল্পশস্য ফলিয়ে চলার নিরাপদ কৌশল। আশির কবিতা সমাজ-রাজনীতির উৎকট উপস্থিতি মুক্ত হয়ে কেবল কবিতার দিকে ফিরেছে বলে মনে করা হয়, যেটা তৎকালীন শিল্প-সাহিত্য বাস্তবতায় তরুণতমদের পক্ষ থেকে ছিল একটা বিদ্রোহতুল্য ঘটনা। 

সত্য যে, সাহিত্যের ইতিহাসের সকল সময়ই একসঙ্গে বিচিত্র মেজাজের কবি-লেখক উপস্থিত থাকেন, কাজ করেন। কেউ কেউ প্রবণতার দিক থেকে হন ঠিক উলটো মেজাজের। কিন্তু এর মধ্যে একটি/দুটি ধারা নানা কারণে পাঠক-সমালোচকদের মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করে। সেই সূত্রে আশিতেও সত্তরের মতো উচ্চকিত স্বর উপস্থিত থাকলেও নিম্নস্বরের মগ্ন-গভীরতার দিকে যাত্রার আন্দোলনটিই নেতৃত্বের জায়গায় ছিল। কারণ দীর্ঘ আওয়াজের পর নিবিড় নীরবতায় স্বস্তি খুঁজতে চাওয়াটা তখন অনিবার্যই ছিল মনে হয়।

আশির নবযাত্রা কোন চিন্তায় ভর করে কীভাবে পথ হেঁটেছিল তা প্রথমে হাবিব ওয়াহিদ সম্পাদিত অনিন্দ্য-এ ১৯৮৫-তে ও পরে সংশোধিত হয়ে তপন বড়ুয়া সম্পাদিত গাণ্ডীব-এ ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘সমগ্রবাদী ইশতেহার’-এ মনোযোগ দিলেই পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। শোয়েব শাদাব, শান্তনু চৌধুরী ও সাজ্জাদ শরিফ স্বাক্ষরিত ওই আটদফা ইশতেহারের চূড়ান্ত পাঠে বলা হয়েছিল :

১. প্রচলিত পঙ্কস্রোত থেকে মুক্তি দিতে হবে কবিতাকে।

২. কবিতার শব্দ হবে এমন, যা পাঠকের চেতনায় আছড়ে পড়বে হাতুড়ির মতো; গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবে চৈতন্যের ইট।

৩. আমরা এবং একমাত্র আমরাই নির্মাণ করব শব্দের অতিব্যক্তিক সংরক্ত চরিত্র।

৪. পাঠকের জন্য কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা হবে মৃত্যুযন্ত্রণার মতো। কবিতা শাণিত কৃপাণের মতো ঢুকে যাবে পাঠকের মনোরাজ্যে; আর পাঠক আর্ত ঘোড়ার মতো ছুটতে ছুটতে দেশকাল পেরিয়ে পৌঁছে যাবে এক আতীব্র বোধের চূর্ণিত জগতে।

৫. থুতু ছুড়ি তথাকথিত সুন্দর ও কুৎসিতের স্থূল কাব্যবন্দনায়। কেবল আমাদের অভিজ্ঞানে রয়েছে রহস্যময় সংবেদনের আবর্ত।

৬. এইমাত্র জন্মান্তর ঘটেছে প্রাজ্ঞ অশ্বত্থের, তার অনন্ত শিকড় শুষে নেবে প্রতিটি রসকুম্ভের আত্মাআর তার মহাবিস্তৃত প্রশাখার করতল অধিকার করে নেবে সমগ্র বিশ্ব এবং অবিশ্বকে।

৭. চাই চামড়া ছাড়ানো দগদগে আদিমতা আর রক্তের ফেনময় ঘূর্ণিনাচ।

৮. ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাকরণ অগ্রাহ্য করে কবিতায় প্রয়োগ করতে হবে বিন্দুবাদী প্রক্রিয়া।

কবিতার ইশতেহার কবিতার সমার্থক নয়, তবে বিশেষ কোনো ইশতেহারের অনুসারীদের কাছে নির্দিষ্ট ইশতেহারটি কবিতাযাত্রার একটা বাতিঘর অবশ্যই। এই ইশতেহারের দিকেও প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে তাকিয়ে পরবর্তী সময়ের অনেক কবি মনে বিদ্রোহ পুষে স্বাধীনভাবে পথ হাঁটার প্রেরণা লাভ করেছিলেন। সেই বিবেচনায় অন্য সব কাব্যধারার প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রেখেও নতুন কবিতাযাত্রায় সমগ্রবাদী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে স্বীকার করে নেওয়াই সদাচার হতে পারে।

জারিকৃত ইশতেহারের উল্লিখিত তিন প্রবক্তার মধ্যে শোয়েব শাদাব দীর্ঘদিন ধরে স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জীবন্মৃত, সাজ্জাদ শরিফকে কবিতার চাইতে কবিতা-রাজনীতিতেই অধিকতর স্বচ্ছন্দ দেখতে পাওয়া যায়। এক শান্তনু চৌধুরীই তাঁর বিরলপ্রজ স্বভাবসহ সক্রিয় থেকেছেন। যতদূর জানি, এখন তিনিও নিষ্ক্রিয়প্রায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে যে, আশির দশকের মাঝামাঝিতে তারুণ্যের শক্তিসম্ভব তাঁদের সমুদয় কীর্তি পরবর্তী কবিতাযাত্রায়ও বিশেষায়িত বেগ সঞ্চারে সক্ষম হয়। এর বাইরে তখন অন্যদিকে অন্য আরো কয়েকটি ছোটকাগজের মাধ্যমেও অনেক উজ্জ্বল কবি তাঁদের শব্দ ও শিল্পরুচির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট করেন। তাতে বাংলা কবিতার বহুবিচিত্র অবয়বে একটা সম্পন্ন চেহারা ফুটে ওঠে। 

এখানে সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রসঙ্গ সামনে আনা জরুরি মনে হচ্ছে। ত্রিশের আধুনিক কবিগণ রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে মুক্ত হবার জন্য ইউরোপকে বাতিঘর ঠাওরেছিলেন। আশির দশকসহ ত্রিশপরবর্তী কবিদের একটা বড়ো অংশই ত্রিশের আধুনিক কবিতাধারারই উত্তরাধিকার বহন করেছেন বলে তাঁদের কবিতাকৌশলের কেবলাও মোটমাট ওইদিকেই। কবিতার মালমশলার জন্য এই ধারার কবিগণ যতটা ইউরোপের দিকে তাকিয়ে থাকেন, ততটা বাংলার দিকে, বিশেষ করে বাংলার মানুষ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিকে তাকান না। এই ইউরোপিয়ানা তথা ইউরোপমুগ্ধ এই প্রবণতার কারণেই বাংলার নিজস্ব কবিতাধারার সঙ্গে আধুনিক কবিতার বড়ো ধরনের বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়ে গেছে। এই বিচ্ছেদ ক্রমে এতই চরমে উঠে গেছে যে, এই ধারাবাহিতরা জীবনানন্দ দাশের ‘আটবছর আগের একদিন’কে উচ্চ নম্বর দিলেও, জসীম উদ্দীনের ‘কবর’কে পাস নম্বরও দিতে চান না। অর্থাৎ বিষয় হিসেবে এঁরা বিপন্ন বিস্ময়ঘটিত আত্মহত্যাপ্রয়াসী সৃজনশীলতার গুণকীর্তন করলেও পরম্পরাবাহিত স্বাভাবিক মৃত্যুর চিরন্তনতাকে পাশ কাটিয়ে যান।

এই কারণে আধুনিকতাবাহিত ইউরোপীয় কলাকৌশলের সদ্ব্যবহার অক্ষুণ্ন রেখেও আমাদের কবিতায় বাংলার আত্মাকে সংস্থাপন করবার প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে এখন বিভিন্ন প্রান্তে কথা উঠছে। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক কবিদের একাংশের মধ্যে একটা সচেতনতাও তৈরি হয়েছে দেখা যায়। এই চেতনরাজ্যে শক্তিমান কবিদের অন্তর্ভুক্তি সম্ভব হলে এর মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে হয়ত একভাবে ভারতাত্মা, আরো সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাত্মার সাথে পুনরায় আমাদের কবিতার হারানো সেতুবন্ধ রচিত হলেও হতে পারে।

 

মনজুর কাদের : কবিতার গ্রামাটিক্যাল বিষয় বা ছন্দ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী? বিষয়ে বর্তমান সময়ের কবিতা সম্পর্কে বলুন।

মুজিব মেহদী : কবিতা রচনায় পৃথিবীর সর্বত্রই নানা ছাঁচ বা ডিভাইস ব্যবহৃত হয়। একজন কবিতাকর্মীকে এসব ব্যবহারের কায়দাকানুন শিখতে হয়। সবটা ঠিকঠাক শিখে তারপর কবিতা রচনায় হাত দিতে হয় ব্যাপারটা এমন নয়। তবে লিখতে লিখতে শিখতে শিখতে অনুসন্ধিৎসু কবি নিজের কবিতাকে একটা সম্পন্ন চেহারা দেবেন সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু মনে রাখতে হয় যে, সব ধরনের ডিভাইসই একজন কবির জন্য প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক নয়। আবার কোনো কোনো ডিভাইস নতুন কবিতায় ব্যবহৃত হয়ই না প্রায়, যেমন অন্ত্যমিল ও অনুপ্রাস। এ সময়ের কবিতায় সবচেয়ে বেশি মনোযোগ পাচ্ছে চিত্রকল্প। প্রায় সব কবিতাকর্মীই তাঁর তাঁর বুঝমতো চিত্রকল্পের দাস হতে পছন্দ করছেন। অবশ্য ছন্দের ব্যাপারে বিমিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কবিতার এই দুটি ডিভাইস, অর্থাৎ চিত্রকল্প ও ছন্দ নিয়ে বেশি কথা হয় বলে এ নিয়ে আমারও দুয়েকটি কথা বলবার সুযোগ নিতে ইচ্ছে করছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কবিতায় নতুন ও নতুনতর কবিতাকর্মীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ছন্দের চেয়ে চিত্রকল্পপ্রীতি চোখে পড়ে বেশি। অর্থাৎ, শব্দের ছন্দের চাইতে দৃশ্যের ছন্দের প্রতি তাঁরা বেশি যত্নবান। কিন্তু মুশকিল হলো একটা অংশের মধ্যে চিত্রমাত্রকেই চিত্রকল্প ভাববার একটা রেওয়াজ চালু হয়ে গেছে। আরেকদল কল্পনাকে এতটাই অবাধে চরতে দিচ্ছে যে, কাঁটাতার ডিঙিয়ে তারা পায়ে হেঁটে সাগর পাড়ি দিয়ে ফেলছে। চিত্রকল্পের দোহাই দিয়ে হাতিগুচ্ছকে তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে আকাশে, নদীকে পুড়িয়ে দিচ্ছে মাছের যৌনতাসহ। এটা যেন ফ্রি পেয়ে মাথার বাঁপাশে বাড়তি আরেকটা মাথা জুড়ে নেওয়ার মতো ব্যাপার। পাগলামি অনেক সময় উৎকৃষ্ট মনছবি আঁকতে পারে, তবে সেসব ছবি যে অদ্ভুত চিন্তায় ঠেস দেওয়া থাকে তার কোনো জাতকুল থাকে না প্রায়। এসব চিন্তা মানুষের পারসেপশনের আওতার মধ্যেই যেন আর থাকতে চাইছে না। হামেশাই ডিঙিয়ে যাচ্ছে বোধ্যতার সীমা।   

এদিকে ছন্দের ব্যাপারে একটা কথা প্রায়ই ওঠে, যে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দকে ভালো করে জানলেন না বুঝলেন না তিনি ছন্দ ভাঙবার অধিকার পাবেন কোন বিবেচনায়? খুবই সংগত কথা। জেনে ভাঙাই ভালো। কিন্তু যিনি ওটা ভালো করে জানবার-বুঝবার তাড়নাই বোধ করলেন না ভিতর থেকে, ভাবলেন একটা শৃঙ্খল, তাঁকে ব্রাত্য চিহ্নিত করবার অধিকারও কেউ রাখেন না।

প্রয়োগের উদাহরণসহ ভালো করে প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ শেখা সপ্তাহখানেকের ঘটনা মাত্র। নিজে প্রয়োগে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে মোটমাট আর তিন মাস। একজন লেখক তাঁর লেখক জীবনে কাড়ি-কাড়ি জটিল বইয়ের এদিক দিয়ে ঢুকে সম্পন্ন হয়ে যদি ওদিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন, তাঁর কাছে এক সপ্তাহের ওই কথিত আয়োজনটা যে গুরুত্বপূর্ণই মনে হলো না, এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখাও জরুরি বৈকি। কবিতা বস্তুত মুক্তি চায়। তা এমনকি বিখ্যাত কবিতাবলিঘনিষ্ঠ কাব্যিক ঐতিহ্য, তার আবহ, শব্দরুচি, বাক্যগঠনশৈলী, বিষয়ভাবনা থেকে শুরু করে তাত্ত্বিক ভার, আভরণের ঘটা, ছন্দ সবকিছু থেকেই। এই মুক্তির মন্ত্রে যিনি বুঝেশুনে দীক্ষা নেন, তাঁর কাছে খোঁয়াড়প্রতিম একটা আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতেই পারে।

প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দের নিটোল ব্যবহারে শাসিত অনেক কবিতার দিকে ঘনিষ্ঠভাবে তাকালে দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। মনে হয় ওখানকার শব্দেরা, বাক্যেরা যেন মাত্রাতিরিক্ত শাসন সয়ে রীতিমতো কাঁচুমাচু হয়ে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। বনসাই বনসাই একটা চেহারা। এ অবস্থা থেকে যত দ্রুত বেরোনো যাবে ততই মঙ্গল।

একটা কথা বলা হয় যে, ছন্দ কবিতাকে স্মৃতিতে রক্ষিত হতে সাহায্য করে। সে তো করেই। কিন্তু এ বিবৃতি কি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক তিন প্রবীণ ছন্দের বেলায়ই প্রযোজ্য? যিনি এই ছন্দগুলোর খড়্গের নিচে গলা বাড়িয়ে রাখেন না, তিনিও কি কবিতা ছন্দেই লিখেন না এক ধরনের? কবিতা হতে হলে টেক্সটের মধ্যে ভাষার যে সামঞ্জস্য তৈরি হতে হয়, গতি অব্যাহত রাখতে হয়, পাঠস্বাচ্ছন্দ্য স্থাপিত হতে হয়, এ কি কোনো ছন্দ তৈরি করে না? জীবনছন্দ কি ছন্দ নয়?

তরুণ কবিদের মধ্যে অল্প কয়েকজন সদস্যসম্বলিত একটি গোষ্ঠী বাংলা প্রাতিষ্ঠানিক ছন্দ তো বটেই, এমনকি সংস্কৃত ও বৈদিক ছন্দেও কবিতা লিখছেন এবং ছন্দে না-লিখলে কবিতা কবিতা হয়ে উঠবে না বলছেন। এর বিপরীতে অন্য আরেকদল ছন্দকে অপ্রয়োজনীয় বলে সম্পূর্ণ বর্জন করবার পক্ষে উচ্চকিত ভাষণ দিচ্ছেন এবং ছন্দে লিখলে কেবল ছড়ামাত্র হয়ে উঠতে পারে বলে দাবি করছেন। সাময়িক বিরতি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এঁরা প্রায়ই বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক ছাপিয়ে রীতিমতো বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ব্যক্তিগত সম্পর্কে ইতি টানেন। আমার কাছে এই দুই দলের কার্যকলাপকেই আপত্তিকর মনে হয়, দুই দলের সদস্যদের মধ্যেই গোঁড়া মৌলবাদী বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি দেখতে পাই। 

জানা কথা যে, শিল্প-সাহিত্যে কোনো সর্বজনীন মত নেই, থাকা সংগতও নয়। ফলে নিজ নিজ শিল্পরুচির অনুকূলে নিজের কাজটি করবার পাশাপাশি অন্যের শিল্পরুচির প্রতি শ্রদ্ধা থাকাটাও আবশ্যক। অনেকরকম লেখায় কবিতাঙ্গন বর্ণিল হয়ে উঠলে কার কেন কীভাবে সমস্যা তৈরি হয় তা বোঝা মুশকিল। ক্ষুদ্র একটি লেখকসমাজের বৈচিত্র্যময়তাকে যাঁরা মেনে নিতে পারেন না, তাঁরা বাংলার বহুত্ববাদী সমাজচরিত্রের হাজার বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখায় কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবেন বলে তো মনে হয় না। এসব লেখক দিয়ে আমরা কী করব আখেরে? 

সবিশেষ, আমাদের দরকার উৎকৃষ্ট কবিতা। কবিতাটা কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে উঠল, শৃঙ্খলের ভিতরে থেকে নাকি বাইরে এসে, সেটার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। কিন্তু শৃঙ্খল ছিল বলে মুক্তির পক্ষে কিংবা মুক্ত ছিল বলে শৃঙ্খলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে তরবারি শানানো অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার।     

 

মনজুর কাদের : কেউ কেউ মনে করেন, কবিতার চেয়ে কথাশিল্প বেশি জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে আপনার অভিমত কী?

মুজিব মেহদী : এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সমীক্ষাতথ্য নেই। নাকি আছে? না-থাকলেও, মেলার সময় প্রকাশক ও পুস্তকবিক্রেতাদের দেওয়া তথ্য মতে, কবিতার চেয়ে উপন্যাসের জনপ্রিয়তাই বেশি বলে প্রতিভাত হয়। এটা শুধু বাংলা কবিতার বেলায় নয়, অন্য ভাষার কবিতাও জনপ্রিয়তার দৌড়ে উপন্যাসের থেকে পিছিয়ে। অবশ্য এই তথ্যের পাশে শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আটশত বৎসর আগের সুফি কবি জালালউদ্দিন রুমি আমেরিকার পাঠক সমাজে জনপ্রিয়তায় শীর্ষস্থানে পৌঁছে গেছেন। গত কয়েক বছরে ওখানে লক্ষ লক্ষ কপি রুমি বিক্রি হয়েছে। এখনো হচ্ছে। এই ব্যতিক্রমী তথ্যটা এখানে এনে এই সত্যটা খারিজ করা যাচ্ছে না যে, উপন্যাস কবিতার চেয়ে জনপ্রিয়। তবে তথ্যটা এটার প্রমাণ হিসেবে এখানে হাজির রাখা হলো যে কবিতারও জনপ্রিয় হবার সক্ষমতা আছে।

বিষয়টি নিয়ে কাজেই বিতর্ক তুলে বিশেষ ফায়দা নেই। বরং কবিতা উপন্যাসের চাইতে কম জনপ্রিয় এটা মেনে নিয়ে এর কারণ খুঁজে দেখবার চেষ্টা করা যেতে পারে। এর অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে আমার কাছে মনে হয় উপন্যাসের তুলনায় কবিতার কম জনপ্রিয় হবার তিনটে কারণই প্রধান :

ক. মোটের ওপর কবিতা সাধারণ পাঠককে বিনোদিত করে না;

খ. কবিতা সাধারণত উপন্যাসের তুলনায় দুর্বোধ্য ও দুর্ভেদ্য হয়;

গ. কবিতা পাঠককে বিস্তারিত গল্প আস্বাদনের সুযোগ দেয় না।

এই কারণগুলো দূর করে এসবের উলটো লক্ষণের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে কবিতার জনপ্রিয়তার মাত্রা আরেকটু বাড়বে সন্দেহ নেই, কিন্তু কবিতার কবিতাত্ব তাতে বিপুল মাত্রায় হ্রাস পেতে পারে সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

 

মনজুর কাদের : তিরিশের দশকের কবিদের কবিতায় বিদেশি কবি ইয়েটস্, টি এস এলিয়টের প্রভাব পড়েছিল। আপনার কবিতায়ও কারো প্রভাব আছে? পাঠক হিসেবে যখন আপনি মুজিব মেহদীর কবিতা পড়েন তখন কোথায় কোথায় আপনার স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পান? এখানে মুজিব মেহদীকে ব্যাখ্যা করুন।

মুজিব মেহদী : বস্তুতপক্ষে আমি মৌলিক কবিতাই লিখতে চাই। একটা ভালো ও জনপ্রিয় কবিতা পড়ে তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে অস্থিরভাবে সেই কাঠামোর মধ্যে নিজের কথা পুরে আরেকটা কবিতা বানানোর বা বিদেশি কবিতার ভাবানুবাদকে নতুন বিন্যাস দিয়ে নিজের কবিতা বলে চালিয়ে দেবার মাধ্যমে নিজে কবিখ্যাতি অর্জনের ব্যবসায়ে আমি জড়িত নই।

অবশ্য মৌলিক কবিতা বলতে আমি যা-ই বুঝি না কেন, বাস্তবিক অর্থে ওটা একটা ঘোড়ার আণ্ডা! যেদিকেই তাকানো যায়, দেখি কেবল ক্রাফটসম্যানশিপের বাহাদুরি, অন্যের জানালা দিয়ে আকাশ দেখার কেরামতি। যেন এই-ই হতে হয়, যেন এই-ই একমাত্র পথ, অবিকল্প। কেউ ট্রুকপি বানায়, কেউ শব্দ ধরে ঝুলে পড়ে, কেউ ছন্দ ধরে লাফায়। ঝুলতে ঝুলতে, লাফাতে লাফাতে যেখানে গিয়ে পৌঁছায়, তা আসলে অন্য কারো যতনে গড়ে তোলা বাড়ির আঙিনা বা অন্য কারো হাসিল করা চাষভূমি; অকর্ষিত কোনো প্রান্তর নয়।

এই-ই চলছে দিকে দিকে। এই চলার চলনদার যারা, দলেবলে ভারী বলে এরা সদাপট বিচরণ করে। উচ্চকণ্ঠে কথা বলে। বাণীশাসন চালায়। ঘটনাক্রমে এই বাণীবিদরা উজ্জ্বল, চলনে-বলনে ও দেখায়। এদের চেকনাই কাজেই নবাগতকে দুর্দান্ত আকর্ষণ করে। নবাগত হারিয়ে যায় চেনা ও অচেনার মিশ্রণ দিয়ে বানানো আ-ার ভোজে। এরা তখন জানপ্রাণ দিয়ে নামে বাণীবিদদের শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া কথা প্রচারে।

এই আড্ডাবাজরা সাহেবি সমাজের লোক, মাটি ও মানুষঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতাহীনতায় নিরক্ত, পা-ুরোগে ভোগা পাঠক। এরা পাঠ করে উপভোগের জন্য নয়, ছাঁচের সন্ধানে। পছন্দসই ছাঁচ পেলে পুরোনো কথা ফেলে নতুন কথা ঠেসে দেয়। কিছুক্ষণ চেষ্টা করে অচেনা বানাবার, আসলে হয় না। আগের বাড়ির পালানে যেখানে লিচু গাছ ছিল, সেখানে রেইনট্রি গাছ লাগায়; যেখানে ইঁদারা ছিল সেখানে নলকূপ বসায়। এ ছাড়া, নতুন পোশাকের ভিতরে আর সব একই থাকে। যে কারণে পড়তে গেলে নস্টালজিক লাগে, কেমন যেন একটা চেনা স্বাদ, আবার চেনাও নয় অবস্থা। এই চেনা-অচেনার মিশ্রণ ব্যাপারটা মাধুর্যের এক ঘোর তৈরি করে, ওই ঘোরই করে সম্মোহিত। অল্পপ্রাণ পাঠক তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার ওপরে। ভাবে, এটাই হয়ত চিরন্তন মাধুর্যপুরীতে পৌঁছুবার অবিকল্প সিঁড়ি!

মৌলিক কবিতা তত্ত্বীয়ভাবে কবিতা নির্মাণের এহেন সংস্কৃতি থেকে দূরে সদভিজ্ঞতাজাত, নতুন। যে অভিজ্ঞতা কবি নিজে ছুঁয়েছেন, অর্জন করেছেন, তা-ই সে কবিতার ভিত। কবিতা কমবেশি বানানো জিনিস সন্দেহ নেই, কিন্তু এর গভীরে কাজ করা অভিজ্ঞতাটা ধার করা হলে মুশকিল। যখন প্রত্যক্ষ সদভিজ্ঞতা কবিতা রচনার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করে, তখন সে কবিতার মৌলিক হয়ে ওঠবার সম্ভাবনা প্রভূত, যদি অন্তত চালাকি করে কোনো ছাঁচ এনে ওর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া না হয়। এরকম কবিতা পাঠকের কাছে মূলতক অচেনা লাগে, চাই কি অপ্রিয়ও। পাঠকের যাপনের নস্টালজিয়াবোধ জাগিয়ে তুলবার মালমশলা তাতে থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু সজ্ঞানে সেখানে চাপানো থাকে না পুরোনো কবিতার রূপরসগন্ধ। এসব বৈশিষ্ট্য ধরে বলেই কবিতা মৌলিক হয়ে ওঠে বা ওঠবার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বিষয়টা যতটা লেখকের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার, ততটা অন্যের বলে দেবার ব্যাপার নয়। লেখক নিজেই জানবেন তিনি আসলে কী লিখছেন। কপি করা খাপে কথা ঠেসে দিচ্ছেন নাকি নিজের অবিকল্প অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে গেঁথে তুলছেন। মৌলিক কবিতা তিনি কখনো লিখেন না, যিনি মনে করেন মৌলিক কবিতা লেখা অসম্ভব। মৌলিক কবিতা তিনি কখনো লিখেন না, যিনি প্রতিনিয়ত হাততালির বাসনায় কাতর হয়ে থাকেন। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন কবি শতভাগ মৌলিক কবিতা লিখতে পারেন কি না। আমি যে বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি কবি-লেখকদের শত-সহস্র লেখা পড়ছি, দেশি-বিদেশি সিনেমা উপভোগ করছি, চিত্রকর্মে বুঁদ হয়ে থাকছি, নাচ-গান দেখছি-শুনছি, এগুলোর কোনো ভালোমন্দ অভিক্ষেপ কি আমার মধ্যে পড়ে না? যদি পড়ে তবে তার কি কোনো প্রভাব নেই আমার কবিতায়? নিশ্চয়ই আছে। না-থেকে পারেই না, যদি জার্মান নাট্যকার লেসিংয়ের এই বক্তব্যটি সত্য হয় যে, ‘মাসুল না-দিয়ে কেউ পাম গাছের তলায় হাঁটতে পারে না’। গ্যাটে তাঁর ‘ইলেকটিভ এফিনিটিজ’ গ্রন্থে উদ্ধৃতিটি একই অর্থে ব্যবহার করেছিলেন জেনে বাক্যটির নিহিত গুরুত্ব আরো গুরুত্ব লাভ করে। এর মানে হলো, কিছু প্রভাব আছে যেগুলোকে বলা যায় স্বত:প্রভাব। এগুলো এড়ানো অসম্ভব।

এই প্রশ্নের শেষাংশের উত্তর করা বিশেষভাবে বিড়ম্বনাকর মনে হচ্ছে। এ জবাবের ক্লু তো পাঠকদের দেবার কথা। যাহোক, লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে দু’কথা বলিই বরং, যে, মুজিব মেহদীর কবিতা পাঠককে ফাঁকি দেয় না। ওখানে আর যা কিছুই না-থাকুক, অতি অবশ্যই আবেগের সততা থাকে। তা ছাড়া, এ বাবদে আর যে একটিমাত্র কথা বলা যায়, তা হলো, মুজিব মেহদীর কবিতা পাঠককে মুজিবের নামে দাগিয়ে অন্য কারো কবিতা পড়িয়ে নেয় না। নিজের কবিতা সম্পর্কে এ মুহূর্তে এর বেশি আর কিছু বলবার আগ্রহ ও রুচি কোনোটাই পাচ্ছি না। সরি!

 

মনজুর কাদের : বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের আলোচনা-সমালোচনা চর্চা কতটা গঠনমূলক কিংবা কেমন হচ্ছে?

মুজিব মেহদী : সমালোচনাসাহিত্য তো বিশেষ নেই-ই আমাদের। যা কিছু আছে তাও নানারকম সীমাবদ্ধতায় কাবু। বাংলা ভাষার লেখালেখির যে কয়েক রকমের সমালোচক আমার চোখে পড়েন, তাঁরা হলেন : ১. খুব কম খোঁজখবর রাখা বিশ্লেষণে অপারঙ্গম অলস প্রকৃতির একাডেমিক প্রাবন্ধিক; ২. প্রশংসাবিনিময়প্রত্যাশী কবিযশোপ্রার্থী এবং ৩. পেশাদার প্রশংসা ও অপ্রশংসাবিক্রেতা। এই তিন ধারার সমালোচকই উদ্ধৃতিকণ্টকিত এমন সব টেক্সট তৈরি করেন, যেগুলো আগাগোড়া পড়া তো দূরে থাক, কিছুক্ষণ ওদিকে তাকিয়ে থাকলেও চোখ ব্যথা করে। আপনি যদি নিজের রুচিকে হটিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়বার ব্যাপারেই মনস্থির করেন তো পড়তে পারবেন, কিন্তু ও থেকে কিছুই শিখতে পারবেন না। এতই উচ্চমাত্রার নিষ্ফলা টেক্সট ওগুলো।

ও হ্যাঁ, এর বাইরে আরেক ধরনের কিছু শক্তিশালী হাত আছে ও তৈরি হচ্ছে আমাদের, যাঁদের সমালোচনামূলক লেখা নির্দিষ্ট রচনার মনের কথা আবিষ্কার ও বিশ্লেষণে বিশেষ পারঙ্গমতা দেখিয়ে চলেছে। এমনকি তাঁদের ভাষাদক্ষতারও উচ্চ প্রশংসা করা যায়। কিন্তু সহস্র কবি-লেখকের দেশে এঁরা সংখ্যায় এতই কম যে এরকম সমালোচক আমাদের নেই বলাই সত্য বলা একভাবে। এই ধারার লেখকদের সংখ্যাপ্রাচুর্য তৈরি হোক সেটা চাই বলে এখানে এই বিরলপ্রজদের দুজনের নাম স্পষ্ট করেই লিখে রাখতে চাই— যার প্রথমজন হলেন আহমদ মিনহাজ এবং দ্বিতীয়জন অতি অবশ্যই জাহেদ আহমদ।   

 

মনজুর কাদের : ছোটকাগজ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? ছোটকাগজ লেখক জন্ম দেয়—এই দাবির যৌক্তিকতা কতখানি?

মুজিব মেহদী : শুনুন, ছোটকাগজের এই মর্যাদা একদিন খুব করে ছিল। সেটা বেশিদিন আগের কথা নয়। এমনকি তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিপ্লব ঘটবার আগপর্যন্তও ছিল। কিন্তু এখন ছোটকাগজ লেখক জন্ম দেয় না, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই কোনো কোনো ছোটকাগজ বা ছোটকাগজের মতো উদ্যোগের জন্ম দেয়।

যখন ছোটকাগজ লেখক জন্ম দিত, এ প্রশ্নে তখনকার কিছু স্মৃতি মনে পড়ল। তখন দেখেছি, কমবেশি এখনো দেখি যে, বেদনাকরভাবে ওসবের কোনো-কোনোটা আবার লেখকদের বনসাই, নিবীর্য ও খোজা বানিয়ে সম্পাদকের হেরেম দেখাশোনার কাজে নিয়োগ দিয়ে রাখে! 

নবাবিষ্কৃত সৃষ্টিশীল তরুণ লেখককে বিকাশের স্পেস দেওয়া তাঁকে লেখক হিসেবে একভাবে জন্ম দেওয়াই। শুধু এটুকুই যে ছোটকাগজগুলো করত ও করে সেগুলো সত্যিই ভালো। কিন্তু কিছু কাগজ ছিল ও আছে, যেগুলো বিকাশের স্পেস দেবার বিনিময়ে লেখকদের নির্দিষ্ট কাগজ কর্তৃক জারিকৃত আচরণবিধি পালনে বাধ্য করত ও করে। অর্থাৎ, ওই লেখকদের সাহিত্যিক জীবন কেমন হবে, কার সঙ্গে তাঁরা মিশবেন ও মিশবেন না, কী লিখতে পারবেন ও পারবেন না, কোন বই পড়বেন ও পড়বেন না, কাকে লেখক বলতে পারবেন ও পারবেন না, কোথায় যেতে পারবেন ও পারবেন না, কোথায় লেখা ছাপতে দিতে পারবেন ও পারবেন না তা নির্ধারণ করবার এখতিয়ার ওই নির্দিষ্ট কাগজ পরিষদের। ভাবা যায়! এরকম লেখক জীবন খুবই গ্লানিকর ও করুণাজাগানিয়া! শিল্পচর্চার মৌলিক শর্ত যে স্বাধীনতাবোধ, সেটা ভুলে পরাধীনতাকে গলার মালা করে নিলে একজন আর লেখক থাকেন কী করে?    

 

মনজুর কাদের : তরুণদের লেখা পড়েন? তাঁদের বিষয়ে কিছু বলুন।

মুজিব মেহদী : আমি তরুণদের লেখার অত্যাগ্রহী পাঠক। কিন্তু তাদের নিয়ে কিছু বলা প্রায়ই স্বস্তিকর নয়, নয় এমনকি স্বাস্থ্যকরও। এদের অধিকাংশেরই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নেবার মনমানসিকতাই তৈরি হয় নি। এই অবস্থা ততদিন ঘুচবে না, যতদিন তারা এই বিশ্বাসে উপনীত না হবে যে কবিতা অনেকরকম ও ব্যক্তিভেদে শিল্পরুচি ভিন্ন হয় এবং নিজের সঙ্গে পছন্দাপছন্দে বৈসাদৃশ্য থাকলেই কেউ বাতিল হয়ে যায় না।

মুক্ত প্রকাশমাধ্যমের এ সময়ে তরুণ ও তরুণতরদের লেখাপ্রকাশ ও তা নিয়ে পাঠকদের সাথে মতবিনিময়ের যে পরিসর তৈরি হয়েছে তা অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে এদের আলাদা করে দিয়েছে। অনেক শক্তিশালী হাতের নড়চড় এ পরিসরে টের পাওয়া যাচ্ছে, যাদের একাংশ সত্যি সত্যি ভালো কবি হয়ে উঠবে বলে মনে হয়। আর অন্য অংশ ফাঁপা ভিত্তি থেকে লাভ করা মাত্রাতিরিক্ত অহংকারের ভারে ক্রমে বনসাই হয়ে থেকে যাবে। অর্থাৎ, অচিরেই তাদের বিকাশ রহিত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা হয়। লাইক-রাজনীতির পাল্লায় পড়ে এদের বড়ো অংশই মানসিক রোগীতে পরিণত হয়ে গেছে। এদের কেউ কেউ যা খসড়া করে সঙ্গে সঙ্গেই তা ছাপিয়ে দেয়, তাতেই প্রশংসা আশা করে, বিস্ময়কর নয় যে পায়ও। কেউ কেউ ঘণ্টায় এক ডজন বা তারও বেশি পোস্ট আপলোড করে হরহামেশা অনলাইনে ফ্লাডিং করে। এই ছিঁটগ্রস্তরা নিজের ও বন্ধুদের একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে দেয়, ক্ষণে খ্যাপে ওঠে, ক্ষণে হতাশায় ভোগে, তুচ্ছ কারণে খোলা ময়দানে পরিচিত-অপরিচিত ও অল্প পরিচিত নির্বিশেষে যার তার সাথে ভীষণ দুর্ব্যবহার করে। এদের এ ধরনের আচরণকে বিকার ছাড়া আর কিছুই ভাববার সুযোগ নেই। 

 

মনজুর কাদের : আপনার লেখালেখির পেছনে মূল প্রেরণা কী?

মুজিব মেহদী : আমার লেখালেখির প্রেরণা একটামাত্র যুগ্মশব্দ দিয়েই মূর্ত করবার চেষ্টা করা যায়; আর তা হলো ‘যাপনসংঘাত’।

বলতে কী, এ বাবদে আমি গ্রিক পুরাণের দেবী মিউজের ওপরে ভরসা রাখতে পারি না। হিব্রু কাব্যতত্ত্বের বিশ্বাস অনুযায়ী শিল্পপ্রেরণা স্বর্গ থেকে আসা ব্যাপার কিংবা খ্রিষ্ট বিশ্বাস অনুযায়ী ঈশ্বরের তৃতীয় রূপ বা পবিত্র আত্মা আমার ভিতরে সুপ্ত কোনো সৃজনপ্রস্রবনে প্রাণসঞ্চার করে দেয়, এরকম মতেও আমার সায় আসে না। ইয়ুংয়ের মতানুযায়ী বংশগত স্মৃতির আর্কেটাইপে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি না এ কারণে যে, জানা ইতিহাস অনুযায়ী আমার পূর্বপ্রজন্মে শিল্পকর্মের সঙ্গে কারো যুক্ত থাকার ব্যাপারে কোনো তথ্য বা তথ্যচূর্ণের সাক্ষাৎ এ যাবৎ পাই নি। তবে মার্কসীয় শিল্পতত্ত্বভুক্ত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শের মধ্যকার অচেতন সংলাপে’র সাথে আমার লেখালেখির প্রেরণার কমবেশি সাদৃশ্য রয়েছে বোধহয়।

আমার লেখালেখির দিকে তাকালে আমি দেখতে পাই যে, আমি আসলে নানা বিবদমান পরিসরে সৌন্দর্যের মোড়কে আমার বিশিষ্ট মতেরই প্রকাশ ঘটাতে চাই। যে কারণে আমার লেখায় অচেতন সত্তার চাইতে সচেতন সত্তার শাসনই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অচেতন সত্তার উপস্থিতি যেখানে ‘প্রায় নেই’-এর মতো লীন হয়ে থেকে যায়।

 

মনজুর কাদের : জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানের জীবন সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী?

মুজিব মেহদী : জীবন লাভ করা মানে পৃথিবীর আর সব প্রাণের কল্যাণ সাধনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়া। একটাই জীবন বলে আমরা সে জীবন উপভোগে যতটা যত্নবান হই, একই যুক্তিতে অন্যের কল্যাণে মনপ্রাণকে ততটা নিবেশিত করি না। বস্তুতপক্ষে জীবনটা ফুরিয়ে গেলে ভোগের সুযোগ আমরা যেমন হারিয়ে ফেলব, তেমনি হারাব ত্যাগের সুযোগটাও। দুটোই সমানভাবে বেদনাকর।

জগৎটা প্রাকৃতিকভাবেই বৈচিত্র্যময়। এ বৈচিত্র্যের পক্ষে যে যত সহায়ক, সে জগতের জন্য তত প্রয়োজনীয়। নিজেকে, নিজের ধর্ম ও দর্শনকে, জাতি ও পরিচয়কে, লিঙ্গ ও বৈশিষ্ট্যকে, স্বজন ও বন্ধুকে, রচনা ও কথাকে, শরীর ও মনকে শ্রেষ্ঠ ভাবা জগতের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের প্রতি অমর্যাদাকর। এ ধরনের অনালোকিত জীবনদর্শন খুবই হেয়কর। এই দর্শন জগৎবৈচিত্র্যের সপক্ষে কোনো অবদান রেখে যেতে পারে না।

জন্ম ও মৃত্যু জীবের নিজের হাতে নেই। এ দুয়ের মাঝের ক্ষুদ্র জীবৎকালটা লো-প্রোফাইলে রেখে নিজের মতো করে যাপন করবার চেষ্টা করা যায়। সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছি আমি। এ যাপনটা অর্থময় হবে, যদি সজ্ঞানে আমার দ্বারা জগৎবৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি সাধিত না হয়।

 

মনজুর কাদের : একজন লেখকের ভেতরের ‘মানুষসত্তা’কে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

মুজিব মেহদী : জীবনের বৃহত্ত্বের কাছে কবিতা তথা সাহিত্য অতিশয় তুচ্ছ বাত। কাজেই আমার কাছে লেখকসত্তার চাইতে মানুষসত্তাই বড়ো। মানুষ হিসেবে হীন লেখকদের আমি পুছি না। সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বড়োর মতো দেখালেও বস্তুতপক্ষে কোনো হীন মানুষ কখনো বড়ো লেখক হয় না, হতে পারে না। এদের ব্যাপারে এর চেয়ে বেশি কথা খরচ করারও কোনো মানে হয় না। উঠি বরং। ম্যালা কাজ পড়ে আছে।