মোশতাক আহমদ

এখনকার কবিতা কখনো খুব ইঙ্গিতময়, কখনো বা শব্দের ব্যায়াম বলে মনে হয় মোশতাক আহমদ


 

[মোশতাক আহমদ। জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮। কবি ও কথা সাহিত্যিক। কবিতাভাবনা, ভাল লাগা বইয়ের আলোচনা আর স্মৃতিচারণমূলক লেখাও লিখে থাকেন, বিশ্বসাহিত্য থেকে কিছু কবিতার অনুবাদও করেছেন।  কবিতার বই চারটি- সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট (১৯৮৯), পঁচিশ বছর বয়স (১৯৯৪), মেঘপুরাণ (২০১০), ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি (২০১৫)।পড়াশোনা করেছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ আর জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন; আশি ও নব্বই দশকে যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে । জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিশেবে বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে আসছেন। ৮০-এর দশক থেকে সমানে লিখে যাওয়া এই কবির সঙ্গে আমি কথা বলেছি তার লেখালেখি, পেশা, শখসহ নানা বিষয়ে। —নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

আপনার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলেন

হীরক রাজার দেশের গায়ককে ‘পেয়াদা এসে ধরলে, বললে – গেও না।‘ গায়ক বলছে, ‘আমার যেইদিন থিক্যা জ্ঞান, সেই দিন থিক্যাই  গান!’  আমার শুরুটাও এরকমই । পড়ার টেবিলটা প্রিয় জায়গা ছিল। ক্লাশের পড়া তো আর তেমন  ছিল না, আঁকিবুঁকি করতাম। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের ছবি দেখি দৈনিক বাংলায়, লঙ্গরখানাও দেখেছি স্কুলে, আমরাও স্কুলে ‘বিলাতি দুধ’ আর হাই প্রোটিন বিস্কিট পেতাম।   লিখেছিলাম, “ চাষীরা কাটিছে ধান, কেহ বলে যে খাবার আন/ … ঘরে আছে একটি শশা, শশার ভিতর ওই যে মশা।“ অজ্ঞাতকারনে ক্লাশ টু থ্রিতেই বন্ধুরা, শিক্ষকগণ আমাকে ‘কবি’ বলে ডাকতেন। সারাজীবন ধরেই এই ডাকটা আমি পেয়ে আসছি। হয়তোবা ওই ভালোবাসার সম্বোধনের সম্মান রক্ষার্থেই আমি লিখেছি। তখন আর কবি না হয়ে উপায় ছিল না এভাবেও বলা যায়।

আপনি তো ক্যাডেট কলেজের স্টুডেন্ট ছিলেন, ওইসময়কার কথা বলেন, লেখালেখি পড়াশোনা এইসব নিয়ে

ক্যাডেট কলেজে সাহিত্যের ভাল ভাল শিক্ষক ছিলেন (রফিক কায়সার, আতম নাসির চৌধুরী, তৌফিক হোসেন চৌধুরী, আহসানুল কবির প্রমুখ) আর ছিল একটা দারুন লাইব্রেরী। ওই আরণ্যক পরিবেশে আমাদেরকে বাঙলা ও ইংরেজি সাহিত্য প্রতিযোগিতা করতে হত- বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, দেয়াল পত্রিকা, চারু ও কারুকলা), নিয়মিত কলেজ বার্ষিকী বেরুত, অনিয়মিতভাবে ‘ডাহুক’  নামের একটা সাময়িকী বেরুত। পরিস্থিতির কারণে এবং প্রয়োজনেই পড়তে হয়েছে, লিখতে হয়েছে। ক্লাশ সেভেনে আমার ‘দীপ্তপ্রভা’ নামের পাণ্ডুলিপির খোঁজ পেলেন ভূগোল শিক্ষক ফখরুজ্জামান স্যার। তিনি কয়েকটি কবিতা বা ছড়ায় পেন্সিলে লিখে দিলেন কোনটা কোন পত্রিকায় পাঠাতে  হবে। আলস্য কিংবা আত্মবিশ্বাসের অভাবে তা আর করা হয়নি। ঝুঁকে গেলাম কার্টুনে, আহসান হাবীবের কাছে কার্টুন পাঠাতাম; উন্মাদ তখন বন্ধ, উনি কিছু কিছু প্রকাশ করেছেন কার্টুন, বিচ্ছু আর আঙুলে! বই পড়া নিয়ে আমি ধারাবাহিকভাবে বইনিউজটোয়েন্টিফোরডটকমে স্মৃতিচারণ লিখছি, সেখানে সে সময়ের সামান্য পড়াশোনার কথা বলেছি; আসলে তা আর পুনরায় উল্লেখযোগ্য মনে করছি না এখানে বলার ক্ষেত্রে।

আপনি তো পেশাগতভাবে ডাক্তার ছিলেনএই পেশাটা আপনার কাছে কেমন লাগতো?

পেশা হিসেবে ডাক্তারিতো অসাধারণ; সম্মানেরও। সাধারণ একজন ডাক্তার হিসেবে এনজিওতে কাজ শুরু করলাম- এনজিওর   হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে কাজ করা ছাড়াও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কার্যক্রম দেখাশোনা করতাম। আমার রোগিদের সঙ্গে আলাপ করতে ভাল লাগত, রোগ নির্ণয়ও মন্দ করতাম না। একটা পর্যায়ে এসে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য জনস্বাস্থ্যে মাস্টার্স করলাম। এরপর থেকে ডাক্তারি অংশটা ভুলে যেতে হলো।

আর এখন কেমন লাগে?

এখন কেবল জনস্বাস্থ্য কর্মসুচি দেখাশোনা করার কাজ করছি। আমার মনে হয় আমার জন্যে এই কাজটাই ঠিক আছে, কেননা লেখালিখির কিছু অবসর করে নিতে পারি।

আপনার মাথায় কি কখনো হাসপাতাল, ডাক্তারি, রোগী এই সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে ইমেজ তৈরি হয়েছে? কবিতায় কি তা লিখেছেন?

ইমেজ তৈরি হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অবচেতন মন হয়তো এ বিষয়ে বেশি লিখতে নিষেধ করে।  ‘ন হন্যতে’ নামে একটা কবিতা  আছে, এ ছাড়া অনেক কবিতায় বিচ্ছিন্নভাবে ডাক্তারি শব্দ হয়তো এসেছে, আমি তা সাধারণ বা বাঙলা শব্দের ক্যামোফ্লাজে মুড়ে রেখেছি। ‘ ন হন্যতে ‘ কবিতায় শাদা পোশাকের নার্সের জন্যে ক্ষয়রোগে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আকুলতা তুলে আনতে চেয়েছি- ‘ তবুও অকস্মাৎ লিবিডোর চোখ/ শাদা পোশাকের রমণীর/ হন্যমান শরীরে।‘  দুয়েকটা গল্পে অবশ্য নিঃসঙ্কোচ প্রকাশ আছে। সঙ্কোচের ব্যপারটা শুরু হয় পাশ করার পর পেশাগত জীবন শুরু করতে গিয়ে; সেখানে কবি পরিচয় প্রকাশ হলে নেতিবাচকভাবে সাড়া পেয়েছি বলে মনে হয়েছে, সেই থেকে দুই ভূবনে দুই পরিচয় রাখতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি।

লেখালেখি করেন কখন?

কোনো কোনো সন্ধ্যাবেলা, কোনো কোনো রাত্রিবেলা; বাঁধাধরা নেই। যেদিন অফিস থেকে দেড়-দু ঘন্টার জার্নি শেষে বাসায় পৌঁছেই লেখা নিয়ে উপুড় হতে পারি, সেদিনই ভাল লেখাটা দাঁড়ায়।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

চলন্ত বাসে, চলন্ত যে কোনো যানবাহনে ; কখনো কখনো কোনো উপন্যাস পড়তে পড়তে; কখনো কখনো কোনো চিত্র সমালোচনা পড়তে পড়তে; কখনোবা মনে মনে শব্দের জট খুলতে খুলতে।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

শুরুতে শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, আবুল হাসান, আল মাহমুদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যথেষ্ট প্রভাবিত করেছেন। তারপর ফরিদ কবিরের নির্মেদ ভাষায় প্রভাবিত হই। আজকাল প্রভাবিত হতে চাই না, এক ধরণের সমঝদারিত্ব অর্জন করেছি; ( উচ্চহাস্য)।

প্রথম কবিতা কখন লিখলেন?

ছোটবেলা থেকেই লিখি, তা কবিতা হয়ে উঠেছে কবে থেকে জানি না। ক্লাশ নাইনে একুশের কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। কবিতা যেটা জমা দিয়েছিলাম সেটা ছিল ‘ বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ এর ক্লোন ‘বাংলাদেশ কেঁদে ওঠে’! তাই কবিতাপাঠের আগের দিন বিকেলে আরেকটা কবিতা লিখে সেটা পড়েছিলাম। এর পরে ‘ডাহুকে’ দুটো লিমেরিক লিখেছিলাম। প্রথম বইতে ছাপা হওয়া ‘ভয়ভীতি’ (১৯৮৬) ছিল আমার এযাবৎ প্রকাশিত প্রথম কবিতা। আমার পঞ্চম কবিতার বইতে ১৯৮৪ সালে লেখা একটা কবিতা (বৃক্ষ রাজনীতি) থাকছে শেষ পর্যন্ত। পাঠকের কাছে এ আমার এন্টিক উপহার!

কার গান ভালো লাগে? 

গানের ক্ষেত্রে আমার রুচি বিচিত্রগামী- রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, হারানো দিনের গান, কৈশোরে শোনা সেই সময়ের ইংরেজী গান, এমনকি মেহেদি হাসান-জগজিত- নাজিয়া হাসান!

সিনমো দেখেন? দেখলে কেমন বা কার সিনেমা ভালো লাগে?

বাঙলা সিনেমাই ভাল লাগে, সত্যজিৎ রায় প্রথম পছন্দ, ঋতুপর্ণ  দ্বিতীয় পছন্দ; হিন্দি প্যারালাল যুগের সিনেমাগুলি ভাল লাগে। অমিতাভ- রেখার ছবি কিংবা উত্তম-সুচিত্রার ছবি ভাল লাগে না তাই বা কী করে বলি!

ছোটোবেলায় কি ডাক্তার হতে চাইতেন?

আমি কবিই হতে চেয়েছিলাম। ম্যাট্রিকে আচমকা দুর্দান্ত একটা ফল করে ফেলাতে পরোক্ষ একটা সামাজিক-পারিবারিক-মানসিক চাপ অনুভব করতে থাকি যে আমাকে আরো কিছু একটা হতে হবে, না হলে চলবে না। তাই ডাক্তার হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম এনেও বাবা-মা কী মনে করবেন ভেবে পরীক্ষা দেয়া হয়নি, সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে ভীতিকর। বাঙলা আর ইংরেজি এইম ইন লাইফ রচনায় সব সময় ডাক্তারই হতে চেয়েছি। ক্লাশ নাইন না টেনে একবার কবি-সাহিত্যিক হব লিখায় খাতার শেষ পৃষ্ঠায় বাংলার শিক্ষক আহসানুল কবির স্যার যা লিখেছিলেন তা পড়ে মনে হয়েছিল এসব কথা প্রকাশ্যে লিখতে নেই!

নিয়মিত কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে?

ফরিদ কবির, টোকন ঠাকুর, শুভাশিস সিনহা বা জিললুর রহমানের কবিতা কোথাও ভেসে থাকতে দেখলে তা আমি পড়বোই!

লেখকের দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

এটা খুব জটিল প্রশ্ন। কেউ সমাজের কাছে, কেউবা নিজের কাছে, কিংবা কেউ পৃথিবীর কাছে বেশি দায় বোধ করেন। লেখায় সেটার প্রকাশও সেই সেই পর্যায়ে বা লেভেলে হয়ে থাকে।

আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

সংশয় নিয়ে বললেন নাকি নিশ্চিত হয়ে বললেন।

নিশ্চিত হয়েই বললাম

এই প্রসঙ্গটা আমি  এড়িয়ে যেতে চাই। হা! হা! হা!

আচ্ছা। এখনকার কবিদের কবিতা সম্পর্কে বলেন

এখনকার কবিতা কখনো খুব ইঙ্গিতময়, কখনোবা শব্দের ব্যায়াম মনে হয়। কেউ প্রকট ছান্দসিক হতে চান কেউবা ছন্দের ধারই ধারেন না। আসলে কোনো ফরমূলা নেই। কেউ কেউ আছেন স্রেফ পদ্যকার, তারা বোঝেন না যে তাদের প্রকাশিত হওয়াটাই একটা মস্ত অপচয়।

কবিতা কেনো লিখেন?

পাঠক পড়বে সেটা তো মাথায় থাকেই, কিন্তু মূলত নিজের আনন্দ আর বেদনা লাভের জন্যেই লেখা। একটা কবিতা লেখার পর বহুবার নিজে নিজে পড়ি, উপশম বোধ করি তাতে।

কবিতায় উত্তরাধুনিকতা নিয়ে বলেন

উত্তর আধুনিকতার আন্দোলনে শামিল ছিলাম ‘লিরিক’ গোষ্ঠী যখন চট্টগ্রামে এর সূত্রপাত করে। আমার উপর ৯৩-৯৭ পর্যন্ত উত্তর আধুনিকতার ভালোই ‘আছর’ ছিল। এটা হাতির কান দেখার মত দেখেছিলাম কীনা জানি না, আমি বেশ মেতেছিলাম উত্তর আধুনিক  কবিতা নিয়ে। ঐতিহ্য, উপকথা, আন্তর্বয়নের সমন্বয়ে লিখতে সাচ্ছন্দ বোধ করতাম; আমার কবিতার বড় একটা ঝোঁক এখনও আন্তর্বয়নের প্রতিই, এটুকুই হয়তোবা আমার কবিতায় উত্তর আধুনিকতার লালিত বৈশিষ্ট। 

আপনি কি কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিতা পড়েছেন, তিনি আপনার সমসাময়িকই হবেন। যদি পড়েন তার কবিতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এইমাত্র ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দুয়েকটা কবিতা পড়া গেল, আগে পড়িনি; অল্পবিদ্যা নিয়ে ভয়ঙ্কর কোনো পর্যবেক্ষণে যাওয়া ঠিক হবে না!

আপনার পরিবারের আর কেউ কি লেখালেখি করেন? লিখলে কী লিখেন?

বাবার একটা কবিতার খাতা ছিল, নাম শেফালিকা। বাবার সুন্দর হাতের লেখায় মোটা একটা রেজিস্টার খাতা ভরা ছিল কবিতায়। বড় মেয়ে শাশ্বতী স্কুলে থাকতে ইংরেজিতে টুকটাক লিখত, লেখার হাত ভাল। এখন ইংরেজী নিয়ে পড়ছে, ফরাসীও শিখছে। ছোট মেয়ে সপ্তর্ষি ক্লাশ থ্রি থেকেই ছড়া/ কবিতা/ গল্প/ সায়েন্স ফিকশন/ নাটিকা – সবকিছু লিখে আসছিল মাঝেসাঝে! সাত রং পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে গল্প, ছড়া, কবিতা। সম্পাদক এডিট করে ছাপতেন বলে ওর লেখায় বৈরাগ্য এসে গেছে। আমি নিশ্চিত আমার দুই কন্যাই লিখবে একদিন। আমার জীবনসঙ্গিনী সাহিত্য ভালোই বোঝেন, এক সময় হয়তোবা লুকিয়ে-টুকিয়ে কিছু লিখে থাকলেও লিখে থাকতে পারেন।  

আপনি তো গল্পও লিখেনআধুনিক গল্প কেমন হওয়া উচিত?

আমার গল্পের ধারনাটা  কেমন কিংবা নিজের জন্যে গল্পের সংজ্ঞাটা কী সেটা বরং বলতে পারি। গল্প আর গল্প থাকবে না; প্লট কিংবা প্রথাগত নায়ক-নায়িকা নাও থাকতে পারে। কাহিনি বর্ননার চেয়ে মনোজগৎ নিয়ে খেলা থাকবে বেশি। জাদুবাস্তবতা এসে অতীত –বর্তমান-ভবিষ্যতকে একাকার করে দেবে।

আপনার প্রিয় গল্পকার কে এবং কেনো?

শহীদুল জহির আর শাহাদুজ্জামান। শাহাদুজ্জামান;  কেন প্রিয় তা বলা মুশকিল, আসলে আমার মনে হয় উনি আমার ইচ্ছেপূরনের গল্প লিখেন। আমার সাধ্য থাকলে হয়তো এমনটাই লিখতাম। শহীদুল জহির; এ এক জাদুর জগত, ঘোরের জগত! আমার ধারণা এঁরা বিশ্বসাহিত্যে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। লোকান্তরিত গল্পকারদের মধ্যে ইলিয়াস আমার প্রথম পছন্দ।

পরবর্তী বই কখন করবেন? সেটা কি গল্পের হবে, নাকি কবিতার?

আমার পরবর্তী বই মোট দুটি;  কবিতার বই ‘ বুকপকেটে পাথরকুচি’ (পঞ্চম কবিতার বই) – এ মাসেই বেরিয়ে যাবে চৈতন্য থেকে, আর প্রথম গল্পের বই ‘ স্বপ্ন মায়া কিংবা মতিভ্রমের গল্প’ আগামী বইমেলায় প্রকাশ করার ইচ্ছে আছে। 

গল্প না, কবিতা কোনটা লিখতে বেশি ভালো লাগে?

কবিতা লিখতেই ভাল লাগে।  অপেক্ষাকৃত ভাল গল্পগুলি আমার কবিতাহীনতার দিনে লেখা হয়েছিল। নিয়মিতভাবে গল্প লিখি না। গদ্য লেখার ভেতরে থাকলে কবিতা দাঁড়িয়ে থাকে গানের ওপারে, চৌকাঠের ওধারে!

আপনার কাছে কবিতা কী?

কবিতা একটা পরিপূর্ণ শিল্প, প্রতিটি স্বতন্ত্র কবিতাই তাই। প্রতিটি কবিতার কাছেই আমার সামান্য একটা চাওয়া থাকে, কবিতাটার  ভেতরে সমগ্রতার তান থাকবে, খণ্ডাংশ হবে না।

কেনো জীবননানন্দের কবিতা আমরা বারবার পড়ি, সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না?

আমার মনে হয়েছে অল্প সংখ্যক কবিতা বাদ দিলে বাকি চারজন ইউরোপের আধুনিক কবিতারই  বাঙলায়ন  করেছেন। আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হতে পারেননি তারা। এ ছাড়াও আছে এড়ানো যেত, এমন দুর্বোধ্যতা। অন্যদিকে জীবনানন্দ এক অনিঃশেষ হীরেমানিকের খনি। আমার নানাবাড়ি ঝালকাঠিতে। ম্যাট্ট্রিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত শুধু ‘ আবার আসিব ফিরে’ কিংবা ‘ তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও’ পর্যন্ত জানা ছিল; আর জানা ছিল ‘ হাজার বছর ধরে মি পথ হাঁটিতেছি’। এক অনিবার্য গম্ভীর চোরাস্রোতে ভেসে যেতাম। কিন্তু বাস্তবে যেমন সুগন্ধা ছাড়া আর কোনো নদীতে সাঁতার দেয়া হয়নি, তেমনি অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে ‘ ধানসিড়ি’ সহ জীবনানন্দের অন্যান্য নদী, বৃক্ষ,পাখি, গুল্মলতা। আমরা সারাজীবন ধরেই জীবনানন্দকে খুঁজতে পারি, কখন যে কোন কবিতার ‘চাবিকাঠি’ মিলে যায়, কে জানে!

গল্পে জাদুবাস্ততার প্রয়োগ বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন?

জাদুবাস্তবতা প্রয়োগ করে যে লেখাটা দাঁড়ায়, আসলে সেরকমের ঘটনাই হয়তো ঘটে কিংবা আসলে ঘটেছিল বা ঘটা উচিৎ বলে মনে হয়। অন্যথায় একরৈখিকভাবে বলা গল্পগুলি আসলে খণ্ডিত, যা যা ঘটে বা ঘটবে বা ঘটেছিল তা তুলে আনতে পারে না।  

আপনার গল্পের প্লট কীভাবে তৈরি হয়

আমার গল্পে কোনো প্লট থাকে না। লিখতে লিখতে এগিয়ে যাই।

গল্প লেখার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে গুরুত্ব দেন?

নিজের ভেতর দিয়ে অন্যকে দেখা- আমি নিজেও তো আমজনতারই একজন, তাই না? মানসিক টানাপোড়েন হয়তো বেশি চলে আসে।

আপনার লেখালেখির পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

ছাপা বইয়ের গন্ধ।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরস্কারগুলি প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে? রাখলে কীভাবে?

অনুপ্রেরণা হয়তো পাওয়া যায়। লেখককে আরো ভাল লেখার প্রনোদনা দিতে পারে। আমি ধনাত্মক দিকটুকুই বলতে চাই।

আপনার প্রথম বই কবে প্রকাশিত হয়? সেই প্রকাশের অনুভূতি অভিজ্ঞতা কী 

মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় প্রথম কবিতার বই ‘সড়ক নম্বর দুঃখ/ বাড়ি নম্বর কষ্ট’ প্রকাশিত হয়। আমার কার্টুনগুরু আহসান হাবীব ভাই তখন মাত্র ‘দিনরাত্রি’ প্রকাশনী খুলেছেন, কয়েকটা বই বেরিয়েছে, এর মাঝে কবিতার বই ছিল একটি- তাঁর বন্ধুর। আমি বায়নাই ধরে বসলাম যে বই করব। উনি বিনা প্রশ্নে রাজি হয়ে গেলেন। চট্টগাম থেকে ঢাকায় এসে একবার প্রুফ দেখলাম, উনি ফাইনাল  প্রুফ নিয়ে চলে গেলেন চট্টেশ্বরী রোডের হোস্টেলে। প্রচ্ছদ করেছিলেন আহসান হাবীব নিজেই, সাহায্য নিয়েছিলেন মাসুক হেলালের। তবে বই প্রকাশের আগ পর্যন্ত সেই প্রচ্ছদ আমার দেখা হয়নি। রঙিন প্রজাপতির মতো সেই বই, আহা!

বই প্রকাশের পর রাতারাতি চিটাগাং মেডিকেলসহ আরো কয়েকটা মেডিকেল কলেজে আমি কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করলাম। চট্টগ্রাম শহরে আর বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি সেই একুশেই তরুণ কবি হিশেবে পরিচিত হতে লাগলাম। শুধু যেসব দোকান থেকে বই কিনতাম (আমার বইও দিয়ে এসেছিলাম) তারাই আমাকে ঠিকঠাকমতো চিনতেন না। পূর্বকোণের শিশির দত্ত নিয়মিতভাবে আমার কবিতা  ছেপেছেন টানা কয়েক বছর। আমি পূর্বকোণের সাহিত্যপাতায় সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলাম একবার। চট্টগ্রাম ছেড়ে আসার পনের বছর পর আবার ঐ মুল্লুকে কাজের সূত্রে গিয়েছিলাম ‘মেঘপুরাণে’র কবি হয়ে! দেখলাম আমি চট্টগ্রাম- কক্সবাজারে এখনও ‘সড়ক নম্বর দুঃখে’র কবি!

লেখালেখি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অন্তর্জাল খুব কাজের একটা মাধ্যম। সহজেই যে কেউ চাইলে যে কোনো প্রান্ত থেকে লেখা পড়তে পারেন, লেখকও পৌঁছে যেতে পারেন সর্বত্র। ছাপা-বাঁধাইয়ের- বিপণনের হাঙ্গামাও নাই। বেশ তো!