মারুফ আদনান

জীবদ্দশায় পুরস্কারের একটা সাময়িক প্রভাব থাকে, প্রচারে সুবিধা হয়, আর তেমন কিছু না মারুফ আদনান

 

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি ও চিত্রী মারুফ আদনানের সঙ্গে। এই মেলায় প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রথম কবিতার বই ‘কিছুটা শরীর সহো’ প্রকাশক চৈতন্য। তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আসুন,  এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য] 

 

তোমার তো প্রথম কবিতার বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

এখনো ভালোই।প্রথম বই হিসেবে কিছুটা উত্তেজনা তো কাজ করছে।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতে?

এই ব্যাপারে তো কোন সময়ই নিশ্চত হতে পারি নি, এখনো না। তবে স্বরণ করতে পারি, খুব কৃষক হতে মন চাইতো। সমবয়সী যারা নিজেদের জমিতে কাজ-কর্ম করতো তাদের সাথে সারা দিন থেকে কাজ করে দিতাম এমন কি স্কুল ফাঁকি দিয়েও।

তোমার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালিখি করছো?

অষ্টম-নবম শ্রেণির দিকে বাড়িতে থাকা জীবনানন্দের কবিতার বই আর কিছু রাশিয়ান গল্পের বই পড়ে লেখালিখির ইচ্ছা জাগে। সেই বয়সে জীবনানন্দের প্রভাবযুক্ত প্রচুর কবিতা লিখেছিলাম। স্কুলের বন্ধু-বান্ধবীদের খাতায় চুরি করে জীবনানন্দের কবিতার লাইন লিখে দিতাম। পরবর্তী সময়ে বই পড়ার অভ্যাসটা বেড়েছে আর ফাইনালি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরই সিরিয়াসলি লিখবো ভেবেছি।

তোমার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

অই রকম কোনো কারণ নাই। পারিবারিকভাবে গান, ছবি আঁকা, বই পড়া এসবের কোনো প্রভাব থাকতে পারে।

তুমি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চাও, নাকি অন্যকিছু?

এই হতে চাওয়ার ব্যাপারে আমি কনফিউসড্। নতুন করে যতোদিন নিজেরে বদলানো যাবে লিখবো, না পারলে আর লিখবো না। কি হতে চাই সেটা জানি না।

তোমার কাছে কবিতা কী?

এটা একধরনের মানসিক পর্যায় হতে পারে যেখানে অবিশ্বাস আর সন্দেহের স্থান পোক্ত। ফলে নতুন করে দেখা কিংবা ভাবনা জন্মাতে সুবিধা হয়।

তোমার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

প্রথমত, অবিশ্বাস আর সন্দেহের মাধ্যমে আসে।

বিশেষ কারো কবিতা কি তোমাকে প্রভাবিত করে?

একেক সময় একেক জনের প্রভাব বুঝি। জীবনানন্দের প্রভাব নাই এখন।এক সময় নেরুদার ছিলো। কবি ছাড়াও কখনো কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কিছু সিনেমা প্রভাবিত করে।

কবি ও চিত্রী— এই দুইয়ের মধ্যে কোন সত্তাটা প্রাধান্য পায়?

এভাবে দুটা সত্তাকে আলাদা করা আমার জন্য কঠিন। আমার কাছে ছবি আঁকার সাথে কবিতা লেখার সম্পর্ক দ্বিবীজপত্র উদ্ভিদের মতোই। দুটি বীজপত্র মেলে একটি বৃক্ষ হয়। তবে সম্পর্ক বদলেও যেতে পারে, বলা যায় না। নতুন কোনো মাধ্যমে যদি আরো মজা পেয়ে যাই হয়তো ওটাই প্রাকটিস করবো।

তোমার বইয়ের কবিতাগুলি নিয়ে একটু বলো। বইয়ের সঙ্গে তো তোমার আঁকা ছবিও থাকছে, ছবির সঙ্গে কবিতার সমন্বয় আছে, নাকি দুটিকে আলাদা পাঠ করতে হবে?

বইয়ের প্রতিটা লাইনই আলাদা করে পড়া যায় আবার একসাথেও পড়া যায়। এজন্যই কবিতার আলাদা আলাদা কোনা নাম নাই। বই খুলে যে কোনো একটা লাইন পড়া যেতে পারে। তবে সম্পূর্ণ বই একই বিষয়কে কেন্দ্র করেই লেখা। পৃথিবীতে মানুষের দৃশ্যগত অস্থত্বের একমাত্র উপায় ‘শরীর’ সম্পর্কীয় যাবতীয় বিষয়কে ঘিরেই এ বই। কবিতা আর ছবি দুটোই মানুষের দৃশ্যগত অস্থত্বকে বিদ্রুপ(Satire) করে। বইটার কোনো শুরু বা শেষ নাই, যে কোনো লাইনে শুরু যে কোনো লাইনে শেষ, একটা বৃত্তের মতো। অথবা না পড়ে কেউ শুধু ছবিও দেখতে পারবে। প্রতি পৃষ্টায় পাঁচ লাইন কবিতার সাথে একটা করে ছবি থাকবে। প্রত্যেক পেইজের কবিতার সাথে প্রদত্ত ছবির মিল নাও থাকতে পারে তবে সম্পূর্ণ বই’র ছবিও কবিতার মতো একই বিষয়কে কেন্দ্র করে, মানুষের ‘শরীর’।

তোমার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

নিয়মিত বললে জীবনানন্দ আর জেন পড়তে ভালো লাগে। কারণ, নিজে জীবনানন্দের মতো লিখতে চাই না বলে হতে পারে আর জেন পড়ি এটা জেন বলেই।

কবি এবং কবিতার দায় সম্পর্কে তোমার মত কী?

ছবি যিনি আঁকেন তিনি পৃথিবীতে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি হলেও আঁকবেন, কবিও তাই। কারো কথা ভেবে কবিতা হয় না আসলে। দায়-টায় অন্যদের নির্মিত বিষয়।

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে তোমার মন্তব্য কী?

ভালো। অনেকেই নিজস্ব সময়টা বুঝেন।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলো। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করো না?

সময়কে অনুভব করা যায় কারো কারো লেখায়, নতুন কিছু। প্রচারের রাজনীতি ছাড়াও অনেকে সুন্দর লিখেন, খুঁজে পেতে একটু কষ্ট হলেও এটা ভালো। কারো কারো প্রচার ও লেখা দুটাই সুন্দর। স্টান্টবাজি তো সর্বকালেই ছিলো আছে থাকবেও।

দশক বিভাজন বিষয়ে তোমার মত কী?

এতে তেমন অসুবিধা নাই। নির্দিষ্ট একটা সময়কে বোঝা যায়।

শিল্প-সাহিত্যেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

জীবদ্দশায় পুরস্কারের একটা সাময়িক প্রভাব থাকে, প্রচারে সুবিধা হয়, আর তেমন কিছু না। সময় আসলে ঠিক করবে কে টিকবে।

সবশেষে তুমি তোমার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলো, যেটা বাস্তবায়ন করতে তোমার চেষ্টা আছে।

না, তেমন কোনো স্বপ্ন নাই।