মলয় দত্ত

মাথায় ঘোমটা, হাতে প্রদীপ, তিনি ঢুকে যান শাদা কুয়াশার মতন মগজের গলিপথে, এটাই তো কবিতা মলয় দত্ত


 

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি মলয় দত্তের সঙ্গে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মায়ের হাঁসগুলিরে জংলা খালে দেবতার মতন লাগে'। প্রকাশক ভিন্ন চোখ ।’ তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের বিচিত্র সব জবাব দিয়েছেন। আসুন  এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য] 

 

 

আপনার তো প্রথম বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে। নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

হ্যাঁ এটা আমার প্রথম কবিতার বই। আর এই অনুভুতি হয়তো কোনো শব্দশ্রমিকই বলে বোঝাতে পারবে না। তবু দুয়েক লাইনে যা বলি অনুভুতির কথা তা হলো ‘আমার মরণ ঈশ্বরের কানের দুইপাশ দিয়ে চলে যাবে, তাও আমি চন্দনবনের পাশে ঈশ্বরের চোখ হয়েই জ্বলে উঠবো ফের ।’

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ছোটবেলায় খেলনা বলতে গাড়িই বেশি ছিল আমার, ব্যাটারির, দড়ি দিয়ে টানা, বিয়ারিং-এর, মোটরের। বাসে করে কোথাও যাবার সময় আমি বসতাম ড্রাইভারের পাশের ইঞ্জিন কভারে। ছোটবেলায় আমি গাড়ি আর ইঞ্জিন জগতের কেউ হতে চাইতাম। অবাক করা তথ্য হলো ২০১২ সালে আমি খুলনা পলিটেকনিকে অটোমোবাইলস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেই সুযোগ পাই। গাড়ি আর ইঞ্জিন নিয়েই ভবিষ্যৎকালের একটা দিক এখানেই তৈরি।

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালিখি করছেন?

আমি ডায়েরি লিখতাম ছোট থেকেই, আর চিঠি লিখতাম খুব। তবে শব্দ সাজিয়েছি ২০১৩ সাল থেকে, সেটা কবিতা কিনা জানি না, তবে হুটাহাট কিছু লাইন জট বেধে আসতো মাথায়, লিখে ফেলতাম।

আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

আমার জিলা স্কুলে পড়াকালীন সময় অনেককে দেখতাম কারো ওপর রাগ হলেই নির্মম ভাবে মারছে, দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও তখন ভালোনা, মিছিল লেগেই আছে, আমি ভাবলাম আমি আমার কথা, ক্ষোভ, ভালোবাসা এগুলো স্রেফ লিখে ফেলি, আর দেখলাম লিখে ফেললেই শান্তি। নির্মমতার দরকার নেই ।

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

আমি কবি না। সামান্য শব্দশ্রমিক, মাঝে মাঝে অসহ্য যন্ত্রণা হয় মগজের গলিপথে তখন একদম নিস্ব হয়ে লিখে যাই ঈশ্বরীদের আর আমার দ্যাখা জীবনটাকে। এই লিখে যাওয়া আমাকে যতদুর নিয়ে যাবে আমি ততদুর হতে চাই।

আপনার কাছে কবিতা কী?

বেঁচে থাকাই তো কবিতা। একটি আলোর রেখা গায়ে পড়াই তো কবিতা। মাথায় ঘোমটা, হাতে প্রদীপ, তিনি ঢুকে যান শাদা কুয়াশার মতন মগজের গলিপথে, এটাই তো কবিতা। যার নেই কোনো নিয়ম, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, নয় পাচ নয়, যাকে আটকাতে পারে না, মায়ের সাথে কথা বলি ব্যাকরণ না মেনেই, প্রেমিকার প্রবল দাপট চুমুতে নিয়মের ছিটেফোটা নেই, আমার কাছে কবিতা একটা ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর। এবং অবশ্যই পৃথিবীর সব থেকে বড় মিছিল।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

আমার শৈশবের গ্রাম আর সেই গ্রামের পরিবেশ খুব বড় ভুমিকা রাখে, আর আজকাল যেহেতু বন্দী যান্ত্রিকককতায় হঠাৎ করেই মাথায় আসে একটা আবছা দৃশ্য, দেখি একটা মিছিল শ্লোগানহীন বসে আছে, একটু পরেই দ্যাখি দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া মায়ের মুখ, দ্যাখি বাবাকে সর্বত্র ঈশ্বরের মতন, এরপর মাথা যন্ত্রণা করে, দৃশ্যটা লিখে ফেললেই শান্তি। বটের পাখায় ভিড় করে ফিরে যাওয়া কবুতরগুলো ফিরে তাকায়না আর, তাই বসে থাকি জন্মান্ধ হয়ে একটি অন্ধ কক্ষে আর কালো বিড়াল পাহাড়া দেয় আমাকে, এরপর লিখি, কবিতা বা দ্যাখা জীবনটা লিখি।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

না ,আমার তেমন মনে হয় না , তবে পাঠকের মতামত ভিন্ন ।

আপনার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

জীবনান্দকে পড়ি, খুব পড়ি, কারণ উনি জীবনবাবু বলে, কারণ উনি ধানসিড়ি বলে। আর সমকালীনদের মধ্যে চিৎকার করতে হলে পড়ি সোয়েব মাহমুদকে। তমসা ভেদ করে আসা শিউলির ঘ্রাণ পেতে পড়ি নির্ঝর নৈঃশব্দ্যকে। শুভ্র খরগোসের মুখখানি এড়িয়ে যখন ভাবি প্রিয় নারীদের তখন পড়ি রাকিবুল হায়দার কে। আর এদের পড়তে ভালোলাগে কারণ বিশ্বাস রাখি কবিতায় এরা ফতোয়া লেখেনা, লিখে যায় ছেড়া পাঞ্জাবির বোতামে এইসময়ের যুদ্ধদিন আর প্রেমগুলি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

আমি এত জটিল ব্যাপার বুঝি না , আর স্রেফ লিখতে গেলে এতকিছু বুঝতেও হয় না , আমি কবি বলতে বুঝি প্রতিটি সত্য ভাষণ উচ্চারনে দ্বিধা করেন না যিনি । আরেকটা কথা, শিল্প যেমন জমজমাট তেমন নাট্যশালাও , এখানে কবিতার দায় শব্দটি ভুল ব্যাখাই বেশি হয়েছে বলে মনে হয়।

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

হাতেগোনা সাতআটজন বাদে কাউকেই আমার ভালো লাগে না। অনেকে ভালো লিখলেও ভাল লাগেনা কারন তারা বিক্রিত বলে, অনেকে অনুজদের মশা মাছি ভাবে বলে, অনেকে অহংকারী এবং স্রেফ শো অফ করতে লেখে তাই। আর আমি বিশ্বাস করি ভালো লিখলেই তিনি সবটুকু নন, অবশ্যই তাকে হতে হবে ভালো মানুষ। এরা শুধুই দুরত্ব বাড়ায় কবি -পাঠক ।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

হ্যাঁ, স্টান্টবাজি লক্ষ্য করি, প্রায়জনই নিয়ম করে বসে কবিতা লিখতে, মানে দিনের একটা টাইম আলাদা করে রাখে কবিতার জন্য, ওইসময় তারা বসে এবং কবি খেয়ে বেচেঁ থাকে, আর পা ধরাধরি করে এই পত্রিকার সেই পত্রিকার, ওমুক পেইজ, অমুক ব্লগ, অমুক ম্যাগাজিন, অমুক ওয়েবজিন অমুক সংকলনে একটা লেখা দেবার জন্য, আর মেয়েবাজি তো আছেই। তবে, এইসময়ে আমাদের কিছু দুর্দান্ত কবি আছে, যদি বিক্রি না হয় তারা তবে বাংলা কবিতার মোড় পালটে যাবে খুব শীঘ্রই। তবে আফসোস অনেক তরুন কবিই নিয়ম মেনে লিখতে গিয়ে হারাচ্ছে মৌলিকতা।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী ?

আমার তো মনে হয় দশকের সীমারেখাই টানা উচিতকর্ম নয়। দশক বিভাজনের ছকে ফেলে কাউকে বিচার করাও আমার অস্বস্তিদায়ক লাগে। তবে এই দশক রাজনীতি বেশ মজার, যারা বিশ্বাস করে বসে আছে আগে দশক পরে লেখা।

শিল্প-সাহিত্যেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

জীবনানন্দের একটা কথা ছিল, সবাই কবি না, কেউ কেউ কবি। এই কেউ কেউ কবিদের পুরস্কার লাগে না। যারা লিখতে আসছে প্রেম ও বিপ্লব তারা লিখেই যাবে, পুরস্করের ভুমিকা আমি অন্তত দেখি না।

সবশেষে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়া এবং স্বপ্নবিষয়ক বেশ কয়েক বছর সময় নিয়ে একটা গবেষণাগ্রন্থ লেখা।