কাজী তাহমিনা

খুব অল্প পরিসরে হলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করবো কাজী তাহমিনা


 

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি কাজী তাহমিনার সঙ্গে। তার জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩,  সিলেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি সাহিত্যের  ছাত্রী ছিলেন; এখন পড়াচ্ছেন ঢাকায় ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। প্রথম কবিতার বই 'ব্রতচারী মেয়ে’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১০ সালে বইমেলায়। এবারে ‘চৈতন্য’ থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার মুক্তগদ্যের সংকলন ‘অসুখের কাল, সুখের কাল।’তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের বিচিত্র সব জবাব দিয়েছেন। আসুন  এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

ঠিক বুঝতে পারছি না। বইটা হাতে পাওয়ার পর বুঝতে পারবো বোধ হয়। আমার এমন হয়-প্রায়ই -প্রায় সবসময়ই এমন হয়। যে জিনিসটার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছি- অনেক পরিশ্রম করেছি-তা পেয়ে গেলে পরে, কেমন দুকূল ছাপানো এক শ্রান্তি, শূন্যতা আর অচেনা এক তীক্ষ্ণ বিষাদের ঢেউ আছড়ে পড়ে চারপাশে,তারপর শীতের সন্ধ্যার জন্ডিসরং মন খারাপের প্রজাপতি দুরুদুরু উড়তে থাকে বুকের ভেতর। আর সবকিছু অর্থহীন লাগতে থাকে। বইটার ব্যাপারে আপাতত এটাই অনুভূতি।


ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ছোটবেলায় বেশ টাকাপয়সার টানাটানি ছিল আমাদের। আমার আব্বু উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তার ঘুষবিহীন বেতনের অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন আর গ্রামবাসীর মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে প্রায় সন্ত জীবন যাপনের কারণে আমাদের শৈশব  কেটেছে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন দেখে দেখে। তাই ছোটবেলায় আমি চাইতাম যে আমার অনেক টাকা পয়সা হবে, আর আমি ইচ্ছামত চকলেট, আইসক্রিম, টেডিবিয়ার আর কৌটাভর্তি গুড়োদুধ কিনবো। মুদি দোকানি, কাচের বাক্সে গোল গোল হাওয়াই মিঠাই নিয়ে ঘোরা হাওয়াই মিঠাইওয়ালা, খেলনার ফেরিওয়ালা, সাইকেল বিক্রেতা, পোশাকের দোকানমালিক থেকে শুরু করে আরো অনেক কিছুই হতে চেয়েছিলাম। 

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালিখি করছেন?

ছোটোবেলা থেকেই তো লিখি। তখন বুঝে, না বুঝে লিখতাম। মাঝখানে অনেকদিন তেমন কিছু লিখি নাই। ২০১৬ থেকে সিরিয়াসলি লেখালেখির ভাবনাটা ভাবছি।

আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

কেন লেখালেখি শুরু করেছিলাম, মনে নাই। তবে, একসময় লেখালেখি করে বিখ্যাত কেউ হয়ে যাবো- এই ছেলেমানুষি লোভ আর ইচ্ছাটা ছিল। হা হা! তবে এখন লেখালেখিকে আমি একটা ‘থেরাপি’ হিসাবে নিয়েছি। আমার ব্যক্তিগত বেদনা ও হতাশাসমূহ, বারবার ফিরে আসা বিষণ্ণতা ও অতি সংবেদনশীলতার রোগ সামলাতে লেখালেখি আমাকে সাহায্য করে। আমার আছে  অমোচনীয় 'মেসাইয়া সিনড্রোম'। আমি চোখ মেললেই চারদিকে শুধু ডুবে যাওয়া মানুষ দেখি। আহত, নিহত, জীবন্মৃত মানুষের সারি দেখি, তাই পলকহীন দ্রুততায় আবার চোখ মুদে ফেলি, বানানো ভানের জীবনে রজনীগন্ধার মত ডুবে থাকি। রাতের সুস্বাদু খাবার খেতে খেতে আমার মনে পড়ে যায়, ঠিক এই শীত শীত মৃদু রাতে পৃথিবীর আনাচেকানাচে জুড়ে কত অগণন মুখ ক্ষুধা এবং আশ্রয়হীনতাকে আশ্রয় করে আকাশকে ছাদ বানিয়ে মাটি মাটি গন্ধে শীত ঢেকে জন্মকে অভিসম্পাত দেবে। আমার ঈষদুষ্ণ কোমল শয্যাপ্রান্তে কন্যাকে ঘুমের রাজ্যে পাঠিয়ে তার গায়ে মায়াবী রোদের মত নকশীকাঁথা টেনে দিতে দিতে, আমার নিজেকে-নিজের মাথার উপরের ছাদ আর আরামের, সুস্বাদের জীবনকে খুব স্বার্থপর মনে হতে থাকে। নিজের জন্য বেঁচে আছি। এই একলা একলা সুখী থাকা জীবন আমাকে পীড়িত করে প্রতিদিন। আর মানুষের বেদনায় বেদনার্ত বোধ করা ছাড়া, আর কিছু না করতে পারার বেদনা, এক অসহায় ক্রোধ আর অক্ষমতার বোঝা নিয়ে আমি শূন্যতা বুকে বসে থাকি। আর আমার ওলটপালট হয়ে যাওয়া পরিবার,উল্টানো কাছিমের মত জীবন, মৃত বাবার মুখ, মৃত বন্ধু ও বড় বোনের মুখগুলোকেও ভুলে থাকতে- ভালো থাকতে লেখালেখিই আমার প্রধান আশ্রয়।

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

শেষ পর্যন্ত আমি আসলে কিছুই হতে চাই না! কেইবা ক হয় বলেন! আর হয়েই বা ক লাভ হয়? কবি-লেখক, শিক্ষক বা গৃহী যে পরিচয়েই মানুষ আমাকে জানুকনা কেন, আমি চাই, অন্তত কিছু মানুষ, আমার বন্ধু, আত্মীয়পরিজন, ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে’কাছের মানুষ’ হিসাবে জানুক, ভালোবাসুক। ‘সফল’ হওয়ার চেয়েও সুখী  হওয়াতে, সুখী থাকাতেই আমার বেশি আগ্রহ!

আপনার কাছে কবিতা কী?

অনেক কিছু, আবার কিছুই নয়!শীর্ষ সুখের মতো আনন্দ, আবার গাঢ় লালর বেদনার মতো, অনন্ত অভিমান,বিরহ, ভালোবাসা আর আশা-নিরাশার মতো যেইসব ভাষা আমি সারাদিন কথা বলে সব বলা হয়ে যাওয়া কথার মাধ্যমেও কাউকে বোঝাতে পারিনা- কবিতয় আমি সেইসব বলার চেষ্টা করে যাই।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

কেমন কেমন করে যেন চলে আসে-এটা আমিও নিজেও বুঝিনা। যখন লেখা বা চিত্রকল্পগুলো আসে- শব্দগুলো মাথার ভেতর পরপর চলে আসে খানিকটা। বাকিটা পরে ঠিকঠাক করি।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

একসময় প্রবলভাবে জীবনানন্দ প্রভাবিত ছিলাম। তাই জীবনানন্দ পড়াই ছেড়ে দিয়েছি। এই মুহূর্তে সচেতনভাবে আমি কাউকে দিয়ে প্রভাবিত বলে মনে করি না।

আপনার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

কাহলিল জিবরান, টিএস এলিয়ট, জন কিটস, সিলভিয়া প্লাথ, নিজার কাব্বানি, মাহমুদ দারভিশ, পাবলো নেরুদা, জীবনানন্দ দাশ, রণজিৎ দাশ, আবুল হাসান, আল মাহমুদ সহ আরো অনেকের কবিতাই পড়তে ভালোবাসি। কেন ভালোবাসি, জানি না। ভালো লাগে, তাই পড়ি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কবিতার দায়ের চেয়ে কবির দায় বেশি সম্ভবত। কবিরা তো মানুষ, তাদের সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র ইত্যাদির কাঠামোর ভেতরে থেকেই কবি হতে হয়।। তাঁরা অন্যদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন;  তাই তাদের আরো নির্মোহ আর ব্যক্তিগত জীবন আচরণে নিষ্ঠ থাকা উচিত; কলমে ও আচরণে, মনে ও মুখে এক হওয়া উচিত  বলে আমি মনে করি।  

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

আমার সমকালীন কবিদের কবিতা খুব বেশি পড়া হয়নি আমার। তাদের নিয়ে বলার মতো  যোগ্যতা তৈরি হয়েছে কিনা, এ বিষয়েও আমি নিশ্চিত নই।

সাহিত্যের ক্ষেত্রে দলবাজি/সিন্ডিকেট এই ব্যাপারগুলিকে কীভাবে দেখেন?

আজকাল ছড়া লিখছি। ছড়ায় বলি!

সকলেই বড় কবি,
কেউ ছোট নয়,
কবিতে কবিতে শুধু,
লাঠালাঠি হয়।

এ বলে,'আমি বড়',
ও বলে,'বটে!
পা-সমান বুদ্ধিও,
নাই তোর ঘটে।'

নিজেকেই ডাকে তারা,
নানাবিধ নামে,
ধামাধরা আছে গুরুর,
ডানে আর বামে।

কবিদের ও আছে বেশ,
জোট, মহাজোট,
পাঞ্জাবী, শাড়ি, টিপ,
উপরেতে কোট!

এক কবি গালি দেয়,
'ছন্দ কী, জানিস?
আমি বেটা,মহাকবি,
করে দেবো ভ্যানিস!'

কেউ আছে, ধরে গিয়ে,
দাদাদের পিছু,
মেলে যদি বা তাতে,
নিমন্ত্রণ কিছু!

কেউ আছে, মৌসুমী,
দলীয় কবি,
পলকে পলকে তারা,
পাল্টায় ছবি!

লাঠিয়াল কবিয়াল,
এক হয়ে যায়,
এসব দেখে সাধুর,
কবিতা পালায়!

কেউ কেউ পড়ে থাকে,
সকলের পিছে,
কবিতায় বসবাস,
তাও সবই মিছে!’

কী করতে ভালোবাসেন?

পড়তে, পড়াতে, ঘুরতে, খেতে, রান্না করতে ও আড্ডা দিতে পছন্দ করি। নির্জনতা ভালোবাসি, সবুজ, জল, ঘাস, মেঘদল ভালোবাসি। আর ভালোবাসি শিশুর মুখ, গান, বই আর প্রার্থনা।

সবশেষে আপনি আপনার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

আমার আম্মা খুব পরিশ্রমী, ভালোমানুষ, আর  ঘাসজল, মেঘদল, বৃক্ষ প্রেমী। আব্বু  ছিলেন আরো বেশি, অনেক গভীর থেকে পৃথিবীকে,মাটি জল আকাশকে আপন ভাবা গৃহবাসী সন্যাসী। সম্ভবত রক্তেই আমি এই ভালোবাসা বহন করে এনেছি, প্রজন্ম থেকে বয়ে যাওয়া প্রজন্মান্তরেবই পড়তে, ভাবতে, মানুষকে জানতে, ভালোবাসতে তারাই শিখিয়েছেন। তাদের দুজনকে আমি আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক মানি, যদিও আমার অনেক ক্ষোভও আছে তাঁদের উপর। আমার স্বপ্ন হচ্ছে- আমার আব্বু-আম্মুর নামে একটা ফাউন্ডেশন করে, খুব অল্প পরিসরে হলেও সুবিধাবঞ্চিত কিছু মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করা- যাতে করে আমি আমার বাবা-মার স্বপ্ন ও জীবন ভাবনা বহন করতে পারি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে