জয়ন্ত জিল্লু

আমার কবি হতে চাওয়ার আর কিছু নেই, আমি কবি জয়ন্ত জিল্লু


 

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি জয়ন্ত জিল্লুর সঙ্গে।  তার এই প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘ক্যালেন্ডার সিরিজ।’ আর ‘পৃথিবীর কোথাও রাস্তা দেখি না’ কবিতার বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণ, প্রকাশক তৃতীয় চোখ। তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আসুন,  এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য]

 

নিজের বই নিয়ে অনুভুতি কী?

বই মূলত নিউরনের প্রদাহ ও অন্যান্য উত্তেজনা। এভাবে ভাবি বলেই নিজের বই নিয়ে মাথার ভেতর একটা ঘোরলাগা বিদ্যমান। এই যে, ঘুমোতে গেলাম, অফিসে হাঁটলাম, চুপচাপ অন্ধকারে শুয়ে থাকলাম; সবকিছুর ভেতর ‘নিজের একটা বই হচ্ছে’ এই ঘোরটা কাজ করে। আমি বিষয়টি আপাত ধনাত্মক হিসেবে দেখি। তবে, নিজের বই নিয়ে আমার আত্মঅহং বা আত্মতৃপ্তি কোনোটাই নেই। বারবার মনে হয়, নিজের কবিতাটা নিজের বইয়ে নেই।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

হতে চাওয়াটা কিছুটা আপেক্ষিক। যেমন, ছোটোকালে একবার পত্রিকার হকার হতে চেয়েছিলাম। এটা চূড়ান্ত নয়। তবে, চূড়ান্তভাবে হতে চেয়েছিলাম একজন ‘চিত্রশিল্পী’ ও একজন ‘ফুটবলার’।

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালেখি করেন?

শুরুটা ঠিকটাক হিসেবে নিলে অনেক দিন। আমি এনজিওর ‘ব্র্যাক স্কুলে’ পড়তাম। তখন ‘আলো’ ও ‘গণকেন্দ্র’ নামক দুটি ম্যাগাজিন আমাদের স্কুলে পাঠানো হতো। ওই ‘আলো’ পত্রিকায় প্রথম আমার ‘ছড়া’ প্রকাশিত হয়। তখন আমি হয়ত চতুর্থ ক্লাসে পড়ি। তাছাড়া, স্কুলে আমাদের দেয়ালিকা আঁকতে হতো। আমার মনে আছে, তখন আমিই একমাত্র ছন্দে দেয়ালিকার ছবিগুলোর বর্ণনা দিতাম। তারপর কাগুজে প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে। এইসব ছিল লেখালেখির সামান্য প্রয়াস। সেটাও যদি হাতে গুণি তবে তের-চৌদ্দ বছর তো হচ্ছেই।

আপনার লেখালেখি শুরু কেনো বলে মনে হয়?

আমার লেখালেখির শুরু মূলত বইয়ের অনুষঙ্গের কারণে। ওই যে বলেছিলাম ব্র্যাক স্কুলের অনুষঙ্গই মূলত আমাকে লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। কারণ, ব্র্যাকের তরফ থেকে আমার বাড়িতেই বিরাট একটা লাইব্রেরী করে দেওয়া হয়েছিল। আমি সে সময়েই মহাকবি ফেরদৌসি’র ‘শাহনামা’র মতো বই পড়ার সুযোগ পাই। তাছাড়া, আমার একাকিত্বও লেখালেখি শুরুর একটা কারণ হতে পারে।

আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, না অন্যকিছু?        

আমার কবি হতে চাওয়ার আর কিছু নেই, আমি কবি। আমি মনেপ্রাণে এটা বিশ্বাস করি। তাছাড়া, কবি হওয়া কোনো প্রক্রিয়া না, যে এভাবে ওভাবে কবি হতে পারে কেউ। তবে, শুধু ইচ্ছের কথা যদি ধরি, তাহলে শেষ পর্যন্ত আমি মানুষ হতে চাই।

আপনার কাছে কবিতা কী?

আমার কাছে কবিতা মানেই কবিতা। এটা কঠিনও না, সহজও না। এটা সিরিয়াস কিছুও না, আবার ফেলনাও না। যেহেতু কবিতা একটা টার্ম, এর টীকাটিপন্নী দিতে বললে শুধু বলব, কবিতা গণিতের পরম মানের [absolute value]এর মতো বিষয়। মানে পরম মানের মতো ধনাত্মক ঋণাত্মক সমবায়। তাছাড়া, আমার কাছে কবিতা এককথায়, একটা একা-একা ট্রেন।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

আমার অধিকাংশ কবিতা হাঁটতে-হাঁটতে লেখা। আমি বিশেষভাবে কবিতাকে অবচেতন মনের আংশিক প্রকাশ হিসেবে দেখি। সুতরাং ইমেজ কিংবা হেক্সাডেসিমাল পিক্সেল হচ্ছে মূলত দেখা, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা; যা অবচেতন মনে জমা থাকে। আর অবচেতন মনের সেই ইমেজ যখনই অনু্ষঙ্গের নাগাল পায়, তখন কবিতা ধরা দেয়। কবিতার ইমেজ বিষয়টা হয়তো সেভাবেই আসে।

বিশেষ কারও কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

আমি তো স্থির-জড়, বিশেষভাবে প্রভাবিত হতে চায় না। তবে, কবিতায় প্রভাবিত হওয়া বলতে আমি বুঝি, যদি একটি কবিতা পড়ার পর আমারও একটা কবিতা লিখতে ইচ্ছে হলো; এমন কিছু। এদিক বিবেচনায় আল মাহমুদ, ভাস্কর চক্রবর্তী, জহরসেন মজুমদার, জীবনানন্দ দাশ কিংবা আমাদের সময়ের অনেকের কবিতায় আমাকে কবিতা নিয়ে ভাবতে কিংবা কবিতা লিখতে হাতে কলম ধরিয়ে দেয়। এটাই কি প্রভাবিত হওয়া?

আপনার নিয়মিত কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

কারও কবিতা আমি নিয়মিত পড়ি না। অনেকের কবিতা পড়ি। কাউকে আজ পড়লাম তো একমাস পড়লাম না। যেমন, প্রিয় আল মাহমুদ বিগত আট বছর ধরে পড়ি না, জীবনানন্দও পড়া হয় না বছর পাঁচেক। ভাস্করকে একবার পড়ে এক বছরের বিরতি। জহরসেন মজুমদারকেও বিরতি দিয়েছি। তাহলে বাকি যারা থাকে তাদের বেলায়ও তাই। তবে, ফেইসবুকে কারও কবিতা নিয়মিত ভেসে উঠলে টুকটাক পড়া হয়। তবে, এটাও আংশিক; একদম নিয়মিত না। তবে, প্রতিমাসে অন্তত একবার অরুণেষ ঘোষের ‘নারীকে—ক্রুশকাঠের দিকে’ কবিতাটি পড়া হয়। এটা কেনো পড়ি? এর হয়ত কোনো পষ্ট কারণ নেই, তবে কবিতাটির এই পঙ্‌ক্তি ‘গা-গঞ্জে বিতরণ কোরো, সবাইকে বোলো এই মাংসের কথা’-তে এলে আমি কেমন যেন হয়ে যায়। ঠিক কেমন হয়ে যায়, সেটা অদৃশ্য, দৃশ্যাবলীর বাইরে।

কবি এবং কবিতায় দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

অধিকার না-থাকলে দায় বিষয়টার অস্তিত্ব থাকে না। যেহেতু কবি ও কবিতাতে কোনো অধিকার নেই, সুতরাং দায়ও নেই। তাছাড়া, এটা কোনো ন্যস্ত হওয়া ক্ষমতাও না। কবি ইচ্ছে করলে লিখল, ইচ্ছে হলে লিখল না। কেননা শিল্প একটা বিমূর্ত বিষয়, এটা কারও কাছ থেকে কোনো ধরণের আশা প্রত্যাশা করে না। বরং আমরাই কবিতা তথা শিল্পের বিষয়াবলী নির্ধারণ করছি। ধরুন, কবিতায় ছন্দ থাকবে না ইমেজ থাকব, না ম্যাজিক রিয়েলিজম থাকবে সেটা তো কবিতা দাবি করে না, বরং কবিই নির্ধারণ করে কীভাবে কবিতা হবে সেটা। তাছাড়া, দায় এক ধরণের আরোপিত বিষয়। কবি কোনো আরোপিত সত্তা না, কবিতাতো নয়। আর, কবিতার মতো স্বতঃস্ফূর্ত শিল্প মাধ্যমে কোনো দায় থাকে বলেও মনে করি না।

আপনার সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

আমার সমকালে প্রচুর কবিতা লেখা হচ্ছে। অনেক ভালো কবিতাও ইতোমধ্যে লেখা হয়েছে। কিন্তু এই সমকালের অনেককে আলাদা করে চেনা যায় না, মানে অনেক কবিরই এখনো স্বতন্ত্র স্বর তৈরি হয়নি। এখনো অনেকে প্রভাবিত কবিতা লিখছে। মূলত এই সময়ে তিনটা প্রভাব দেখা যায়। এক.  কবি উৎপল কুমার বসু ও কবি জহরসেন মজুমদারের প্রভাব। দুই. রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও কবি হেলাল হাফিজের প্রভাব। তিন. এন্টিপোয়েট্রির প্রভাব, বিশেষত কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের। এর বাইরে অনেকের কবিতা পশ্চিমা শব্দাক্রান্ত, অনেকের কবিতার স্বর, শব্দচয়ন এদেশের অনুষঙ্গের বাইরে। তাছাড়া, এই সময়ে যারা লিখছেন তাদের শব্দের ব্যঞ্জনা নিয়ে কাজ কম, এমনকি ছন্দের কাজও কম। তবে, এটা সত্য এই সময়ে বেশ ভালো কবিতা লেখা হয়েছে।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?       

এই সময়ের কবিতা বিষয়ে একটু আগেই বলেছি। আর, স্ট্যান্টবাজি আছে কিনা জানি না, তবে গ্রুপ ভিত্তিক একে অপরকে পিঠ চুলকে দেওয়ার বিষয়টা এখনো রয়েছে।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

আমি দশক বিভাজন পছন্দ করি না। কবিতাতো আসলে দশকের কাজ না, এটা মহাকালের কাজ। দশক দিয়ে কবিতা ও কবিকে ফ্রেমবন্ধি করা একটা উপরচালাকিও বটে! যেমন, ২০২০ এর পর কি আমাকে গণনা করা হবে না? নাকি নতুনদের দশকবন্দি করে অবহেলা করা হবে?

শিল্প-সাহিত্যেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?       

পুরস্কার ভূমিকা রাখে কি রাখে না, সেটা কিছু অনুষঙ্গের উপর নির্ভর করবে। যদি পুরস্কার একজন যোগ্য সাহিত্যিকের হাতে উঠে তাহলে তাহলে মনে করি পুরস্কার ভূমিকা রাখে। যদি যেনতেনপ্রকারণে হয়, তাহলে এর কোনো ভূমিকা নেই। তবে, পুরস্কার না দিলেও যে খারাপ সাহিত্য হবে এমন না। তাই প্রকৃতপ্রস্তাবে পুরস্কার সামান্য অনুঘটক মাত্র, এর চেয়ে বেশি কিছু না।

সবশেষে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।     

আমি মাসে অন্তত একজন গরিব চক্ষুরোগীর চোখের ছানি ফ্রি অপারেশনের ব্যবস্থা করে দিতে চাই। এবং এর জন্য আমার তরফ থেকে এখনো চেষ্টা অব্যাহত আছে।