জাহেদ সরওয়ার

বাঙলা কবিতার নতুন ভোকাবুলারি দরকার জাহেদ সরওয়ার

 

[জাহেদ সরওয়ার বাঙলা কবিতার নয়ের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের একজন। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যা ৬টি। এছাড়াও তিনি গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ মিলিয়ে আরো ৭টি বইয়ের লেখক।১৯৭৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কুতুবজুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সম্প্রতি কথাবলির পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কবিতাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন নুপা আলম।]

 

আপনিতো মূলত কবিতা লিখেন। কবিতা আপনার কাছে কী?

কিছু একটা লিখবো বলে লেখা শুরু করি নাই । আমি আসলে একজন পাঠকমাত্র। নানা ধরণের বইপত্র পড়ার নেশা। এটা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয় অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই, বইপড়ার নেশার সঙ্গে হেরোইনখোরদের বা ড্রাগ অ্যাডিক্টেডদের খুব বেশি অমিল নাই। অমিল শুধু এক জায়গায় এক্সপ্রেশনে মানে প্রকাশভঙ্গিতে।পাগলের মতো বইয়ের প্রতি ঝুকে পড়া, বেতনের টাকা বাড়িতে না পাঠিয়ে প্রায় সবটাকা দিয়ে বই কিনে নেয়া, লাইব্রেরিগুলি থেকে ভাল বইগুলি চুরি করে নিজের সংগ্রহ বাড়ানো, বন্ধুদের কাছে বই ধার নিয়ে ফেরত না দিয়ে, এভাবেই একজন বইখোর হয়ে ওঠে। শুধু কবিতা বলে কথা নাই গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ ভ্রমণ কাহিনি সবকিছুরই আমি পাঠক। তো এইসব বইপত্র পড়তে পড়তে কিছু একটা না লিখে তুমি পারবা না। তুমি দৌড়াচ্ছো আর ঘামবা না তাতো হতে পারে না। ঘাম হচ্ছে লেখার মতো।তো এভাবেই পড়তে পড়তে লেখা। যদিও কবিতার বই বেশি আমার, তবে গল্প কবিতা উপন্যাস প্রবন্ধ সবই লিখি আমি।

তবে তোমার প্রশ্ন ধরে একটা কথা বলা যায় কবিতা বাক্যের সংশ্লেষণাত্মক রূপ হলেও কবিতাই সবচেয়ে বেশি কবিতাময় জীবন দাবি করে।মানে এই একমাত্র শিল্প যা জীবিকাকেও কেয়ার করে না।জীবনযাপনে কবি হতে না পারলে লেখাতো স্রেফ শব্দের ব্যায়াম।

বর্তমান বাঙলাদেশের কবিতা নিয়ে আপনি কী ভাবেন?

খালিচোখে দেখলে কবিতার মতো জাস্টিফায়েড অনেক মাল এইখানে উৎপাদিত হচ্ছে। অনেক দৈনিক পত্রিকা, অনেক অনলাইন পোর্টাল এখন। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে যার যার ফেবু ওয়ালতো আছেই। সবেতেই দেখতে পাবা অজস্র কবিতার মতো ছোট ছোট লেখা। শরতের কবিতা লেখা হচ্ছে, শীতের কবিতা লেখা হচ্ছে, বসন্তের কবিতা লেখা হচ্ছে। মানে কবিতা একটা মৌসুমি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে প্রায়। কিন্তু এসবকি আদৌ কবিতা? আমার মনে হয় অতিরিক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন কবিতার অন্যতম প্রধান শত্রু। কারণ এই চিৎকার অথবা শিৎকার তোমার নিরবতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।কবিতো একজন সুফি দার্শনিক।কবির এই ঘোরের জায়গাটা নষ্ট হয়ে কবিতা হয়ে উঠছে খবরের কাগজের সংবাদ। এইজন্য কবিতার যে সন্যাস, কবিতো এক মায়াবি সন্যাসি- ব্যাপারটা প্রায় নাই হয়ে যাচ্ছে আর কি।

এখানে এখন আরো সমস্যা হচ্ছে তিরিশের দশক কবিতাকে প্রায় জনশুন্য করে ছেড়েছে। তারা এইরকম একটা হেজিমনি তৈরি করতে পেরেছিল যে কবিতার কোনো দায় নাই। তো সামলাও ঠেলা কবিতার দায়হীন কবিতো বাঙলা সাহিত্যে নাই হয়ে গেছে। তাদের ছানাপোনাদের চিৎকার আর পাঠকের কাছে পৌছায় না। তিরিশিদের মধ্যে কারো লেখাতো এখন আর পড়ি না আমরা। পড়ো কি? বুদ্ধদেব বসু,সুধীন,বিষ্ণুদে, অমিয় চক্রবতী কে পড়ে এখন আর? কিছুটা জীবনানন্দ চর্চা এখনো হয় নাকি? কারা পড়ে?

তো মর্ডানিজমের এই কবিতাযাত্রা মুখ তুবড়ে পড়েছে এখন।ক্লান্ত হয়ে গেছে ইয়াং মর্ডানিস্টরা।তাদের সামনে কোনো পথ খোলা নাই। মনে হয় বাঙলা কবিতাকে আবার শহর থেকে দূরে সরে যেতে হবে। নতুন ভোকাবোলারির দরকার। নাগরিক পঞ্চাশটা শব্দের ভেতর থেকে বাঙলা কবিতা মুক্তি চায় এখন। কিন্তু সেইরকম ডেডিকেটেড শব্দপ্রেমি কতযুগ পরে আসে।এখন সবার কবিতা মোটামুটি একইরকম।আধুনিকতার প্রভাবের সবশেষ টিমটিমে আলো যেন কবিতা এখন।

কবিতার কি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান আছে?

প্রথমেই বলি পুরা জীবনটাই একটা রাজনীতি। তো কবিতা এর বাইরে যাবে কি করে। মানুষ মাত্রই যেহেতু রাজনৈতিক প্রাণি তখন তার যে প্রকাশনা তাতো রাজনৈতিক ইশতেহার হতে বাধ্য। কবিতা তথোধিক রাজনীতি বলেই অনেক দার্শনিক ধর্মপ্রণেতা কবিতাকে বা কবিকে তাদের আইডিয়ার জগত থেকে নির্বাসিত করেছেন।কারণ একজন মৌলিক কবি যা লিখে তাই তার সংবিধান যা কিনা ছদ্মবেশি গণসংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে কবি বলে আমার কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নাই, বুঝতে হবে সেটা আরেক রাজনীতি।কবির সমস্ত ক্ষোভ দ্রোহ প্রেম রাজনীতি থেকেই আসে।

এই রাজনীতি আসে কোত্থেকে?

অর্থনীতি থেকে। মানে রাজনীতি বা সংষ্কৃতি অর্থনীতির ওপরি কাঠামো। যেমন বাইরে কবিতা বা সাহিত্যের একটা ইকনোমিকাল ভেলু আছে যেহেতু তাদের সেই মাপের প্রচুর পাঠক আছে। যারা কিনা টাকা খরচা করে বইপড়ে আর সেই রয়ালিটি নিয়ে কবি বা সাহিত্যিক বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু বাঙলাভাষায় এই জিনিসটা এতদিনেও গড়ে উঠে নাই।ফলে কবি সাহিত্যিকরা বেঁচে আছে খুব মানবেতর ভাবে। এইখানে রচয়িতার পরিচয়ের চাইতেও বড় পরিচয় তিনি একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিনা।

তো একজন সৎ কবিকেও এখন বেঁচে থাকার জন্য অনেক ধরণের কাজ করতে হচ্ছে।কারণ ক্যাপিটালিজম সবারই শ্রম বিক্রি করবে। তার কাছে কবি নাপিত নুনের দালাল সাংবাদিক সবই একইরকম। তো কবিতাটা সে লিখবে কখন দৈনিক ৮-১০ঘণ্টা শ্রম বিক্রি করে?

তো আপনি কবিতা লিখেও একই সঙ্গে গল্প কবিতা উপন্যাস লিখছেন তাতে সমস্যা হয় না?

একজন রন্ধনশিল্পীর জন্য এই প্রশ্ন প্রযোজ্য নয়। তুমি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো না একই সঙ্গে আপনি পেয়াজ রসুন আদা মসলা দিয়ে কিভাবে একটা মাছ রান্না করেন?

অনেকের অভিযোগ আপনার কবিতায় প্রেম অনুপস্থিত...

এই প্রশ্ন আমার জন্য পুরনো। পহেলাই আমাদের ভাবতে হবে প্রেম জিনিসটা কী? এই যে ছেলে মেয়ে সেক্স করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য দিনের পর দিন বাঙলা সিনেমা বা সাবকন্টিনেন্টে সিনেমাগুলি, জনপ্রিয় ধারার অপন্যাস লেখকরা প্রেমসংক্রান্ত সে সব ভুষিমাল দিনের পর দিন অক্লান্ত ভাবে উৎপাদন করে যাচ্ছেন। তারা একটা প্রেমব্যবসার কারখানা খুলেছেন। সেই ব্যবসা এখনো চলছে। কিন্তু এটা হচ্ছে ভুলে থাকা। বাস্তবতাকে ভুলে থাকা। সাবকন্টিনেন্টের লোকজন অনেক সমস্যায় জর্জরিত। সে এসব কারনে তার লেখায় দায়িত্বকে এড়ায়। তো আমরা যদি প্রেমের এনাটমি দেখি।তুমি যাকে ফুল দিয়ে আকর্ষন করতে চাইছো তাকে বশ করে তুমি বিছানায় নিয়ে যাবে আর বাচ্চা পয়দা করবে এটাই সব? সেই বাচ্চাকে কেন্দ্র করে একটা সংসার গড়ে উঠবে। সংসার নারীপুরুষ উভয়ের জন্যই জোয়ালের মতো। কোনো বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এই দুনিয়ায় ভালবাসা বা আনন্দের কামনা করতে পারে না।কারণ পৃথিবী এক অসুখের কারখানা।আমার এক প্রিয় দার্শনিক অ্যান্থেস্থেনিস বলেছিলেন ‘আমি বরং আনন্দ লাভের চেয়ে উন্মাদ হবো’। কবিতায় শুধু প্রেম চর্চা করা কবিদের আমার যৌন উন্মাদ মনে হয়।এরা চরম স্বার্থপর ও ধান্ধাবাজ হয়।

কবিতা বা সাহিত্যের শত্রু মিত্র কারা?

একজন কবি যেমন শব্দের ক্ষেত্রে পরীক্ষাপ্রবণ তেমনি তার জীবন নিয়ে সে পরীক্ষা দেয়। শব্দের কবিতামাত্রার কাছে পৌছুতে গেলেও তাকে কিছু পরীক্ষা দিতে হয়। এসব বিষয় নিয়ে রিলকে বদলেয়ার কিছু গদ্য লিখেছিলেন। যেমন এই যে অতি প্রচার। অতি আত্মপ্রচারকারী লোকজনকে তুমি অকবি বলতে পারো। আত্মপ্রচারের বাসনাকে এড়িয়ে যেতে হয় তাকে। কারণ এই প্রচার তার সৃজনকেন্দ্রে তরঙ্গ তুলে।এইটা যে বুঝতে পারে না সে কবি হতে পারে না। আবার কিছু আছে যারা অন্যের কবিতা মেরে দিয়ে তাড়াতাড়ি খ্যাতি পেতে চায়। আবার কিছু আছে একসময় কবিতা লিখতো বা সাহিত্য করতো পরে তারা জীবনধারণ করতে গিয়ে ব্যথ হয়ে যায়। এরা পরে সাহিত্যের রাজনীতিটা নিয়ন্ত্রণ করে। এরা সবাই কবিতা বা সাহিত্যের শত্রু।আরেক ধরণের লেখক দেখবো যারা চৌযবৃত্তিতে সিদ্ধহস্ত। তারা সাহিত্যকে উপরে উঠার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করে। আমি এইরকম দুইএকজনকে জানি যারা ইতিহাসের বই থেকে টুকে নিয়ে দুএকটা ক্যারেক্টারের মুখে সংলাপ বসিয়ে সেসব ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে চালায়। এসবকে পুরস্কারও দেয়া হয়েছে। মুখ পাঠকও বাহবা দিচ্ছে সেসব জোচ্ছোরদের। এসবই কবিতা বা সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। এরা ক্রমাগত সাহিত্যের পরিবেশটাকে নষ্ট করে দেয়। তুমি দেখবা সাম্প্রতিক সময়ে কত বড় বড় ঘটনা ঘটছে আমাদের এখানে। কিন্তু তরুণরা ঐতিহাসিক উপন্যাসে মুখ ডুবিয়ে পড়ে আছেন। এসব শক্তিহীন লেখক। শক্তিমান লেখকরা নিজের সময়কে ধরে।

সাহিত্যের সিন্ডিকেটবাজি নিয়ে আপনি সবসময় সোচ্ছার।

প্রথমেই আমরা ভাবি সিন্ডিকেটটা কী। এটা একটা ভরকেন্দ্র। যেখান থেকে চাপ তৈরি হয়। মাস্তানদের সিন্ডিকেট আছে, প্রতারকদের সিন্ডিকেট আছে, দালালদের সিন্ডিকেট আছে, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আছে। অপহরণকারীদেরও আছে। তারা সিন্ডিকেট করে কোনো কিছুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা বা হরণ করার জন্য।কিন্তু কবিতা বা সাহিত্য এমন একটা কাজ যেখানে তোমাকে কেও সহযোগিতা করতে পারে না। এটা একা একাই সারতে হয়।এটা তোমার নিজস্ব পাঠ, জীবনাভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ে গড়ে উঠে। যে কবি বা সাহিত্যিক সিন্ডিকেট করবে তখন তুমি বুঝবে তার একক কোনো শক্তিমত্তা নাই।নিজেকে ও তার মতো আরো কিছু অকবি অসাহিত্যিককে নিয়ে এই ক্ষেত্রটাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই সিন্ডিকেট তৈরি করে। এখানে সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য পত্রিকা সবই এখন সিন্ডিকেটের দখলে। এরা ভুল জায়গায় ভুল সময়ের ফসল। তাদের উচিত দলিয় কোনো ছাত্র সংগঠনে যোগদান করা। সাহিত্য তাদের জায়গা না।