হাসান জুবায়ের

দুঃখই শুধু মানুষকে লিখায় না, উৎপল আনন্দধারাও অনেককিছু উৎসারিত করে হাসান জুবায়ের


 

[হাসান জুবায়ের। মূলত কবি। জন্ম ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১। নোয়াখালী জেলার মুজাহিদপুর। পড়াশোনা ইসলামিক ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজির যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগ থেকে বিএসসি। ‘শীতউত্তরীয়’ তার প্রকাশিতব্য প্রথম কাব্যগ্রন্থ। যন্ত্রমুখ অধীন মানুষ, চেতনাজাত অবস্থান থেকে কবি তুলে এনেছেন বর্ণমালার স্বাদে। চৈতন্য প্রকাশনী থেকে এবারের বইমেলায় এটি প্রকাশ পাবে। তার কবিতা, কাব্যবোধ ও আগ্রহ নিয়ে কথা বলেছেন রাসেল রানা।]

 

আপনার প্রকাশিতব্য প্রথম কাব্যগ্রন্থের কথা দিয়েই শুরু করছি। ‘শীতউত্তরীয়’ নামটি আপনার কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতার নাম। এই কবিতাটির কোন গল্প আছে কী?

আমার বাসার পাশে একটা বিশাল মাঠ আছে, আগে ব্যালকনি থেকে দেখা যেত। এখন নগরায়নের কবলে পড়ে বারান্দাটা ঢেকে গেছে, মাঠে বসতি পত্তনের প্রস্তুতি চলছে। আগে অফিস থেকে ফিরে রাতে মাঠে হাঁটাহাঁটি করতাম। দিন বিগত হলে মনে পড়লো পুরনো কথা, তাই আত্মা দৈন্য শীতে উত্তরীয়খানা খুঁজে নেই, ফসলহীন মাঠময় হেঁটে বেড়ায়।

আপনার কবিতা লেখার শুরুটা কখন?

আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখন কোনো এক সাময়িকীতে একটি গল্প পড়েছিলাম, গল্পের নাম মনে নেই, কিন্তু নায়কের কথা মনে আছে। সে ছোটবেলায় হাস্যখেলায় বলেছিল কবি হবে এবং জীবনের পরবর্তী পর্বে সে অতিদুঃখে লিখা শুরু করে-তখন মনে হয়েছিলো দুঃখই শুধু মানুষকে লিখায় না, উৎপল আনন্দধারাও অনেককিছু উৎসারিত করে।

সেই সময় কি কবি হওয়ার কথা ভাবতেন?

সচেতনভাবে না। সে সময় কয়েকলাইন প্রলাপ বকেছিলাম, তারপর একাদশ পর্যন্ত একবারে চুপ। ঐ সময় হুমায়ূন আজাদের কবিতা পড়ে ভালো লেগেছিল, তারপর জীবনানন্দ দাশের হাত ধরে কেমন জানি শান্ত পুকুর পাড়ে বসে পড়লাম।

মূলত কবি হওয়ার কথা কি ভাবা যায়? কিন্তু কবিতার প্লট আপনি আবিষ্কার করেছেন। যেখানে সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনার করেও অনেকে তা পারছেন না। কিন্তু তারা হয়তো কবিতা লিখতে চান। এটা কি কখনও দ্বান্দ্বিক মনে হয়?

ভেবেচিন্তে কবি হওয়া যায় কিনা আমার জানা নেই, প্লট চোখের সামনেই আছে, ফ্রিকোয়েন্সিটা অন্তরে অনুভব করতে হয়। সাহিত্য পঠনপাঠনের যে পদ্ধতি চালু আছে তাতে সাহিত্য গবেষক হয়তো হওয়া যায়, তাই হিসেবকরা ছকে নকশা করতে গিয়ে বেশিরভাগ সময় মনের নয়, মাথার সাহায্য নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন।

আপনার কবিতায় সচেতনভাবে কোন মতবাদ এসেছে নাকি সময়ের অখন্ডতায় কবিতা তার ধারক?

সমসাময়িক বিষয়ে দৃষ্টিপাত করে শ্বাশত কিছু খোঁজার চেষ্টায় আছি। গঠনতন্ত্র আর পারিপার্শ্বিক [আমাদের সৃষ্টি এবং আমরা উপেক্ষা করতে পারি না] বৈপরীত্যে মিশেল জগতে সংশয়বাদ যুগোপযোগী।

রবীন্দ্রনাথ আপনার কেমন লাগে?

রবিঠাকুর বিশাল ভান্ডার খুলে বসে আছেন। লিরিকে অসাধারণ। বলতে গেলে তাকে হাজারো আঙ্গিকে, হাজারো আলোকোজ্জ্বল বিচ্ছুরণে দেখতে পাই।

সমসাময়িক কবিতা কেমন লাগে? কার কার লেখা পড়েন?

সমসাময়িক কবিতার চেয়ে অন্যান্য লেখা বেশি পড়া হয়। তবে সৈয়দ আহমদ শামীম ভালো লাগে। তাঁর ‘অবলীলাদের বাড়ি’ আর ‘অনৈতিহাসের লোকগান’ গ্রন্থ দুটি খুবই ভিন্ন স্বাদের। শোয়েব করিমের লিখার দরদটুকু খুবই ভালো লাগে।

রবীন্দ্রপরবর্তী কবিদের মধ্যে কাদের কথা বলবেন ?

ত্রিশের দশকে জীবনানন্দ দাশ ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। এরপর আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান। হুমায়ূন আজাদ, আবুল হাসান তো আছেই।

তাদের কবিতার সঙ্গে নিজের কবিতা মেলাতে বললে কী বলবেন?

কবিতা মেলানোর মানে কীভাবে না প্যাটার্নে নাকি রূপকে? শুরুতে কারো প্রভাব সচেতনভাবে অনুভব করতাম, এখন আর তা হয় না। তাদের মতো চিন্তা করে লিখতে আমি পারবো না বা তারাও অনাগত আমার চেতনায় মিশে গিয়ে লিখেননি।

কাব্যের উত্তরাধিকার বলে একটা কথা প্রচলিত, এ বিষয়টি কিভাবে বিবেচনা করেন?

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ি তখন আমার খাঁটসংলগ্ন দেয়ালে লিখেছিলাম-
‘আমার বানানো পথে আমার হাঁটা
আমার জগতে আমার জীবন সাদামাটা’’
তার কিছুদিন পর আমি উইলিয়াম আর্নেস্ট হেনলি’র ‘ইনভিক্টাস’ এ পড়েছিলাম-
আই অ্যাম দ্য মাস্টার অব মাই ফেট
আই অ্যাম দ্য ক্যাপ্টেন অব মাই সোল
এখন কাব্যের উত্তরাধিকার বলতে যদি অচেতন জগতের চিরন্তন ধারার প্রবাহ বোঝায়, তাহলে মানতে হবে সেটা আছে।

কবির কি অন্যকোন দায়িত্ববোধ থাকে কবিতা ছাড়া? আবার কবিতা কি একটা দায়িত্ব?

দায়িত্ববোধ ব্যাপারটা পার্সপেক্টিভ এর সাথে জড়িত। শ্বাশ্বত সংবিধান থাকলে বোঝা যেত।

বর্তমানে একজন কবিকেও মাঝে মাঝে প্রকাশক হতে হয়। এ পরিস্থিতির শিকার কবিদের জন্য কী বলবেন?

নিভৃতচারীর জন্য ব্যাপারটা প্রতিকূল। জীবনানন্দ দাশকে তাহলে পাওয়াই যেতো না মনে হয়।

কবিতায় ছন্দের ব্যবহার নিয়ে অনেকেই নিরীক্ষা করছেন, আপনার চিন্তা কী এক্ষেত্রে?

এক্ষেত্রে আমি মনে করি লেখক নিজের আনন্দে একটা সুন্দর নকশার খোঁজ করেন।

কবিতার স্টান্টবাজি সম্পর্কে আইডিয়া রাখেন নিশ্চয়! অথবা পুরস্কারপ্রাপ্তি। এ দুটো বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?

খেল দেখিয়ে দর্শক খুশি করার কিছু নেই, অনুরণনটা টের পেলেই হয়। পুরস্কারতো লিখাটাই আর সেই ধ্যানের সময়টুকুর স্থিরতা।

আপনার কাব্যগ্রন্থটিকে ঠিক কোন সময়ের রূপরেখা ভাববেন?

কোনো বিশেষ সময় এতে পাওয়া যাবে না, আমি অনেকটা সময়-সম্পর্ক ছিন্ন।

লেখালেখির ক্ষেত্রে অনেক বিখ্যাত লেখকদেরও ফর্ম বদল হয়, আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টি কাজ করেছে? মানে এ কাব্যগ্রন্থেতো আপনার ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের লেখা কবিতাগুলো আছে। এরমধ্যে কখনো মনে হয়েছে, আপনার লেখার ধরন পাল্টে যাচ্ছে?

আমাদের মনোগত সুরের উপর জাগতিক সুরের একটা প্রভাব আছে। এই প্রভাবে কিছু সময় ফর্ম বদল হয়। আপনি যে সময়টার কথা বলছেন তখন ঠিক হয়নি, তবে ইদানিং আগের ছকে আর থাকতে পারছি না।

বর্তমানে কোন লেখা পড়ছেন?

হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা ‘নভেরা’।

কবিতার বাইরে সাহিত্যের অন্যান্য অঙ্গনে আপনার আগ্রহ কেমন?

আমি বেশিরভাগ সময় গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ বা অনুবাদ পড়েই সময় কাটাই। কবিতা কম পড়া হয়, তবে যে কোনো ভালো লিখা পড়লেই শান্তি শান্তি লাগে।

পরের বার কি লিখবেন ভাবছেন?

একটি বড় কবিতা শুরু করেছি, শেষ করার ইচ্ছে আছে।