গিরীশ গৈরিক

আমার ধারণা কোনো কবি পাঠকের সাথে আপোষ করতে গেলেই তার মৃত্যু হবে গিরীশ গৈরিক

(গিরীশ গৈরিক মূলত কবি, তাছাড়া তিনি কবিতার পাশাপাশি অনুবাদ ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। তিনি ১৫ আগস্ট, ১৯৮৭ সালে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর করেছেন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতা। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ‘ক্ষুধার্ত ধানের নামতা-২০১৬’ ও ‘মা : আদিপর্ব-২০১৭’। সম্পাদনা করেছেন : ‘দ্বিতীয় দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা-২০১৭’। এছাড়া তিনি ‘গীতাঞ্জলি সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি’। তার জীবন ও কবিতাবোধ নিয়ে কথা বলেছেন : সুব্রত বিশ্বাস)

 

প্রথমেই আপনার কবিতার বোধের বিষয় জানতে চাই। আপনার কবিতার নেপথ্যকথা জানতে চাই। অর্থাৎ আমি জানতে চাচ্ছি- আপনার কবিতার লেখার কারণ। যদিও আপনি এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নন।

বাধ্যতার প্রসঙ্গে কোনো কবিই উত্তর দিতে প্রস্তুত নয়। কারণ কবিতার কাজই বাধ্যতার বাইরে। তবে প্রত্যেক কবিরই কবিতা লেখার অন্তরগত কারণ থাকে। আমার অন্তরগত কারণ হলো : আমার অনেক কথা বলার আছে, যে কথাগুলো কারও সম্মুখে কিংবা ভাব প্রকাশের অন্য কোনো শাখায় বলা সম্ভব নয় অথচ কবিতায় বলা যায়। তাই আমি কবিতা লিখবার প্রচেষ্টা করি। প্রচেষ্টা কেন বললাম- তা খুলে বলি : আমি কাগজ কলমে কবিতা লিখি। যখন কবিতা লিখি তখন কাগজকে মনে করি আমার হৃৎপি- আর কলমকে মনে করি ছুড়ি। তাই আমি হৃৎপি-কে রক্তাত করে কবিতা লিখি। সেই কারণবশত আমার প্রতিটি কবিতা- আমার জীবনেরই অংশ। অথচ আমার জীবন থেকে কবিতা অনেক বড়। সেজন্য কবিতা আমার থেকে অনেক দূরে-দূরে বসবাস করে। যদিও আমি তাকে প্রাণপণে কাছে পেতে চাই। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি : মাটির অনেক গভীরের জল যেমন সুপেয়। তেমনি করে জীবনের অনেক গভীরতম বোধই- আমার কাছে কবিতা। তাই আমি কবিতার মাধ্যমে নিজেকে খনন করি। গর্ভবতী নারীর মতো পুলক অনুভব করি, দুঃখ অনুভব করি।

আমার কৃষক পিতা যেমন লাঙলের মুঠোটা শক্ত করে ধরে  শস্যক্ষেত্র তেরি করে ফসল ফলায়। আমিও তেমনি করে কলম হাতে কবিতার শস্যক্ষেত্র চাষ করি। তবুও মনে হয়- আমার কলমের কালির কী এমন সাধ্য আছে, যা- পিতার গায়ের ঘামের তুল্য হয়। তাই আমার কবিতা প্রতিতুলনাহীন আজন্ম ক্ষুধার্ত। আমার গৃহিণী মা যেমন ধানের মলন শেষে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ে এবং সেই ঘুমলি অবস্থায় পিতাকে একান্ত কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। আমার কাছে কবিতা আনেকটা তাই, যা- ঘুমন্ত অথচ কামহীন নয়।

কোনো কোনো শিশুর জন্মের পূর্বে তার নাম রাখ হয়। আমার কবিতা তাই নয় কী? হয়তোবা তাই! অথচ আমার কোনো কবিতার মা বাপ নাই এবং নাই কোনো মৌলিক জন্মবীজ। কারণ আমি জীবনের নামতা পাঠে জেনেছি- শিল্পসাহিত্যে মৌলিক বলতে কিছু নাই, এমনকি নাই কোনো মৌলিক কবি কিংবা জ্ঞান। বস্তুত সকল জ্ঞান কিংবা কবিতা আমরা বস্তুজগৎ ও প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করি মাত্র। সেই অর্থে আমি একজন কবিতা সংগ্রহকারী। প্রকৃত প্রস্তাবে নই কোনো কবি।

জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবিএইকেউ কেউবাকারও কারওকবি হয়ে ওঠায় ঐশীপ্রাপ্তির কোনো ঘটনা থাকে কি? নাকি পুরো ব্যাপরটাই রেওয়াজ নির্ভর? আপনার কী মনে হয়?

ঐশীপ্রাপ্তির বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। একদম গাজাখোরি গল্প। I am break event point of atheist. আমি কবিতার কাছে চারটি বিষয় চাই- মা মাটি মদ মাগী। ঐশীপ্রাপ্তি বলে কিছু নেই। কবিতা শিল্প সাধনার বিষয়। একজন কবির যদি শিল্পজীবন না থাকে সে যতই চেষ্টা করুক; কখনো সে মহৎ কবিতা লিখতে পারবে না। তাই কবিতার জন্য প্রয়োজন শিল্পজীবন। আমরা অসলে কবি হবার অভিনয় করি মাত্র, তাই আমদের কবিতা খুব অল্পদিনের মাঝেই মৃত হয়ে যায়। আমরা জীবিত হয়েও মৃত কবি, এই কারণেই যে সকল কবি মহৎ কবিতা লিখেছেন- অথচ তারা শারীরিকভাবে পৃথিবী থেকে অনেক আগেই প্রস্থান করেছেন, তাদের কবিতা চিরন্তন হয়ে থাকে। কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘কবিতার কথা’ প্রবন্ধে তাই বলেছেন ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। এই কথাটি ঘুরিয়ে জীবনানন্দের বন্ধু কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য- ‘কবি জীবনানন্দ দাশ’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘সকলেই কবিতার পাঠক নয়, কেউ কেউ কবিতার পাঠক’।

অর্থাৎ শুদ্ধতম কবিতার পাঠক না হলে- শুদ্ধতম কবি খুঁজে বের করা কঠিন। আমাদের এখানে অশুদ্ধতম কবিতার পাঠক বেশি হওয়ার দরুন জীবিত হয়েও মৃত কবিরা জীবদ্দশায় প্রশংসা ও সম্মান পেয়ে থেকে। তাই জীবদ্দশায়- জীবনানন্দ দাশ, বিনয় মজুমদার, শিকদার আমিনুল হকের মতো কবিরা অগোচরে থেকে যায়।

ঐশীপ্রাপ্তি প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলি : একজন মানুষের মস্তিষ্কে কখন কীভাবে একটি শুদ্ধচিন্তা জন্মগ্রহণ করে? এর সোজা উত্তর হলো : বস্তু ও জীবন ঘনিষ্ঠ কল্পনাপ্রবণ শিল্পজীবন হওয়া চাই। এই জীবন আমাদের ভূখণ্ডে কম হওয়ার কারণে আমরা একটি মৌলিক দর্শনের বই লিখতে পারি না, ভালো কোনো বিজ্ঞানীর জন্ম হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধার করার প্রবণতা বেশি, আমাদের থাকা সত্ত্বেও। যেমন আমাদের ঋগে¦দের ‘আত্মানাং বৃদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো। অথচ! আমরা সক্রেতিসের ‘know thyself’ আমদানি করলাম। যদিও সক্রেতিসের ২০০০ বছর আগে ‘আত্মানাং বৃদ্ধি’ লেখা হয়েছিলো।

এসময়ের কবিদের কবিতায় ছন্দ তেমন একটা পাওয়া যায় না? আমার প্রশ্ন কবিতার জন্য ছন্দের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? কবিতার স্বতঃস্ফর্ত বিস্তারে ছন্দ আপনার কাছে সহায়ক নাকি প্রতিবন্ধক?

দারুণ প্রশ্ন। ছন্দবিমুখতার আগে আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার কবিতায় ছন্দ কেন প্রয়োজন? ছন্দ কবিতার ধ্বনিকে সুরালো করে অর্থাৎ কবিতাটি গীতল হয়। যাতে করে কবিতা পাঠ করতে কোনো পাঠক বাঁধাপ্রাপ্ত না হয়। তবে কোনো কবি যদি ছন্দে না লিখে তার কবিতার ধ্বনিকে সুরালো বা পাঠের জন্য স্মুথ করতে পারে, তাহলে কবিতা হবে না কেন? আসলে ছন্দ কবিতার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র। তা না হলে ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনেক বড় কবি হতো।

আবার একই সঙ্গে ছন্দ কবিতাকে নির্দিষ্টতায় আবদ্ধ করে। এই আবদ্ধ হলো- ছন্দের মাত্রা। মাত্রা কি? মাত্রা হলো- যার দ্বারা কোনো কিছু নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা যায়। এখানেই প্রশ্ন- কবিতা যদি মক্তচর্চা হয় তবে কেন ছন্দের মাত্রা দ্বারা আবদ্ধ হবে। এই সমস্যা থেকেই মুক্তকছন্দের আবিষ্কার হলো, অর্থাৎ মাত্রাহীন ছন্দ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি- কোনো কবির কবিতায় মাত্রাহীন ছন্দের স্পন্দন নিয়ে বোধের বিষয়টি ঠিক থাকলেই ভালো কবিতা হবে।

কবিতার দশক নিয়ে বিভিন্ন মতাভেদ আছে তবুও আপনার দশকের অন্যান্য কবিদের কবিতা থেকে নিজের কবিতাটিকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয় আপনার?

দশকওয়ারী মূল্যায়নের আগে বলতে চাই- বাল্মীকি ও হোমার কোন দশকের কবি। তাদেরকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করবো। সাহিত্যের মহাকালের গর্ভে দশক একটি অতিতুচ্ছ বিষয় মাত্র। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাতামাতি করি। তা-না হলো এই সময় এই প্রশ্নটির জন্ম হতো না। আমি যখন কবিতা লিখি তখন আমি মনে করি- হাজার হাজার বছরের কাব্যযাত্রার মিছিলে আমি একজন অংশীদার। আমি এই মিছিলের সভাপতি সম্পাদক সদস্য কিনা তা আমার কাছে প্রাসঙ্গিক নয়। আমি মিছিলে আছি এটাই প্রাসঙ্গিক। কারণ আমি মনে করি মিছিল অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। দশক মূল্যায়ন প্রসঙ্গে পূর্ণেন্দু পত্রী একটি উক্তি করেছিলেন : ‘দশবছর পরে পরে সত্যিই কি ন্যাড়া হয়ে যায় সাহিত্যের মাথা আর তাতে গজায় নতুন নতুন চুল।’ এই উক্তির উত্তর আমার ভালো জানা নেই। তাই আমি বলবো দশকওয়ারী মূল্যায়ন কিছু কিছু অগৌণ কবিদের জন্য খুবই প্রয়োজন। তা-না হলে যে তাদের অস্তিত্ব টিকে থাকে না। তবে সাহিত্যের যুগকে আমি মানি। যেমন বাংলা সাহিত্যের বৈষ্ণব যুগ, চৈতন্য যুগ, নাথ যুগ, মঙ্গলকাব্যের যুগ, রবীন্দ্র যুগ, কল্লোল যুগ, হাঙরি যুগ, বাংলার স্বধীনতার যুগ, কৃত্তিবাস যুগ ইত্যাদি। খেয়াল করে দেখেন এখানে আমি আধুনিক যুগের কথা উল্লেখ করিনি। আমার কাছে মনে হয়- যে কবি যে সময়ে বসে কবিতা লেখে সে কবি সেই সময়ের আধুনিকতাকে স্পর্শ করে, তাই আধুনিকতা নামে আলাদা কোনো যুগ থাকতে নেই। আমরা যাদেরকে আধুনিক কবি মনে করি তারা-কি ১০০ কিংবা ১০০০ বছর পরে অধুনিক থাকবেন। তাহলে ভেবে দেখেন বাল্মীকি হোমার কিংবা কালিদাসের মতো অসংখ্য কবি যারা আধুনিক কবি নয় কিন্তু তারা শত শত হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। তাই আমার কাছে আধুনিকতা হলো- কাব্যযাত্রার আরেকটি নতুন রাস্তা তৈরি করে ভবিষ্যতের বিষয় নিয়ে পিছনে ফিরে যাওয়া।

এই প্রশ্নটির আরেকটি বিষয় ছিলো- আমার নিজের কবিতা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপাদানসমূহ কী বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে আমি বলবো : এখনো আমি কবি হয়ে উঠতে পারিনি, তবে চেষ্টায় আছি এবং আমার এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে মৃত্যু পর্যন্ত।

তিরিশের দশক থেকে শুরু করে দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত- প্রত্যেকটি দশকে থেকে যদি চারজনের নাম করতে বলা হয় আপনাকে- কারা আসবেন? উল্লিখিত কালখণ্ডে কোন দশকটিকে আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়?

দশক সম্পর্কে যা বলার তা আমি পূর্বেই বলে দিয়েছি। তিরিশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক দশকের চারজন কবির নাম দশকওয়ারী বলাটা আমি সমীচীন মনে করি না। তবে ১৯৩০ সালের পর থেকে যাদের কবিতা আমার ভালো লাগে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো : জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বিনয় মজুমদার, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, নির্মেলন্দু গুণ, সিকদার আমিনুল হক, রণজিৎ দাশ, ভাস্কর চক্রবর্তী, আবিদ আজাদ, জহর সেনমজুমদার, শিহাব সরকার, সুব্রত সরকারসহ আরো অনেকে।

বর্তমান সময়ের কবিতার বিরুদ্ধে জনবিচ্ছিন্নতা দুর্বোধ্যতার অভিযোগ বিষয়ে কিছু বলেন। কবির কি পাঠকের রুচির সাথে আপোষ করে কবিতা লেখা উচিত? বর্তমানে বাংলা কবিতার পাঠক কারা?

এক সঙ্গে অনেক প্রশ্ন। প্রথমে বলবো শব্দটি জনবিচ্ছিন্নতা নয়। শব্দটি হবে পাঠকবিচ্ছিন্নতা। কারণ কবিতা রাজনীতি নয় যে জনগণের সাথে লেগে থাকতে হবে। কবিতার পাঠক সব দেশে সব সময়ে নির্ধারিত ছিলো। কবিতা পাঠের জন্য একজন পাঠককে প্রস্তুত হতে হয়। এজন্যই কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্য বলেছেন : ‘সকলেই কবিতার পাঠক নয়, কেউ কেউ কবিতার পাঠক’। দুর্বোধ্যতার যে অভিযোগ করা হয়- আসলে যিনি অভিযোগকারী পাঠক সমস্যাটা তার। ধরেন আমি গণিতের ক্যালকুলাস করতে পারি না। তাহলে এই সমস্যাটা আমার, ক্যালকুলাসের নয়। কবিতার ভেতরের যে বোধ যে শক্তি যে ভাষা- তার ভেতরে ঢুকতে না পারলে তার সমস্ত দায় পাঠকের। তবে কোনো কবি যদি কবিতার বোধ, শক্তি ও ভাষা সহজ করে প্রকাশ করতে পারেন, তাহলে আরো ভালো।

কিন্তু আমরা দুর্বোধ্যতার নামে অধিকাংশ অবোধ কবিতা লিখি। এই সমস্যাটি কবির- পাঠকের নয়। কারণ ওই কবিতা ভাঙলে বা বিশ্লেষণ করলে কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। কেননা ওই কবিতার ভেতর তো কিছুই নেই। তাই দুর্বোধ্য কবিতা মহান যেমন- জীবনানন্দের ‘ঘোড়া’ ও ‘গোধূলি সন্ধির নৃত্য’ কিংবা লালনের ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে...’ গানটি। তাই দুর্বোধ্য কবিতা ও অবোধ কবিতা এক নয়।

আরেকটি বিষয়- কবি কেন পাঠকের সাথে আপোষ করতে যাবে? আমার ধারণা কোনো কবি পাঠকের সাথে আপোষ করতে গেলেই তার মৃত্যু হবে। কিন্তু কবিদের পাঠকের জীবনবোধের সাথে আপোষ করতে হয় অথবা কবিরা আপোষ করতে বাধ্য। তা-না হলে কবিতা অসার হয়ে যাবে। এ বিষয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা লেখা আছে, ‘একজন কবি এবং একজন পাঠকের মধ্যে ফারাকটা হচ্ছে এক ডিগ্রি, একজন লিখে আরেকজন লিখে না। কিন্তু দু’জনের অনুভূতির সচেতনতা কোথাও একটা একই রিডে থাকতে হয়।’

আর বাংলা কবিতার পাঠক আগেও যেমন ছিলো এখনও তেমন আছে। বাংলা কবিতা পাঠক প্রসঙ্গে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠির উদ্ধতি দিয়ে বলতে চাই : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার সিগনেট প্রেসকে চিঠি লিখে জানিয়ে ছিলেন যে- তার এই নতুন কাব্যখানি যেন ৩০০ কপি ছাপা হয়। 

দুই বাংলার কবিতায় আপনি কি ধরনের পার্থক্য দেখতে পান? দুই বাংলার ভাষা এক, অথচ রাজনৈতিক সাংস্কৃতি আন্দোলন ভিন্ন যেমন : ভাষা আন্দলোন, মুক্তিযুদ্ধ স্বৈরতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন এবং পশ্চিমবাংলায়ও নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ উল্লেখযোগ্য কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন- এসমস্ত কিছুর আলাদা আলাদা প্রভাব কবিতায় কতোটা পড়েছে বলে মনে করি?

আমার কাছে প্রশ্নটি কিঞ্চিৎ আপত্তিকর। আমি বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করতে চাই না। রাজনৈতিক ভ’খ- অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলা আসাম, উড়িশ্যা ও ত্রিপুরাসহ দু’টি স্বতন্ত্রদেশ। বাংলা এখানে একটি ভাষা। যেমন আমি নিজেকে বাংলাদেশের কবি মনে করি না। কারণ আমি বাংলা ভাষার কবি। আমাদের বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরতন্ত্রবিরধী আন্দোলন ও ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ কিছু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন দু’টি দেশেরই বাংলা কবিতায় আলাদা আলাদা ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। যেমন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির গীতিকার ও সুরকার ভাষা আন্দোলনের সময় কাজটি করেছিলেন বলে- এই মহান শিল্পটির তৈরি হয়েছিল। যদি এই গীতিকার ও সুরকার ওই একই কাজটি অন্য সময়ে করতেন তাহলে আমার মনে হয় এই গানটি এত মহান হতো না। আমি বলতে চাইছি সময় একটি ফ্যাক্টর, সেটা যে কোনো দেশের যে কোনো ভাষার জন্য।