দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

কবিতা লেখাটাও আমার কাছে একটা কৌশল বা বেঁচে থাকার সর্বশেষ অবলম্বন দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

 

[দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, মূলত কবি। পাশাপাশি তিনি কথাসাহিত্যিক, গদ্যকার, ক্রিটিক, দর্শন-ভাষ্যকার। তার কবিতা থেকে গানও সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অনিয়মিতভাবে সম্পাদনা করেন চিন্তা ও চিন্তকের একটি ছোটোকাগজ নাম ‘ধীস্বর’। তার গ্রন্থসংখ্যা ১০-এর অধিক। তার আটটি কাব্যগ্রন্থের সংকলন এক মলাটে ‘বিদ্যুতের বাগান সমগ্র’ নামে পাওয়া যায়। তার প্রকাশিত দুইটি উপন্যাস ‘কাফের’ এবং ‘জ্যোৎস্নার বেড়াল’ আমাদের অন্য এক পোয়েটিক-ফিকশনের জগতে নিয়ে যায়। এছাড়া তার আরো প্রায় দশটা পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অপেক্ষায়। তার জন্ম ১৯৭০ সালের ৩০ নভেম্বর, বাঙলাদেশের সিলেট জেলার মাতৃমঙ্গলে। আর পৈতৃক নিবাস বিশ্বনাথে।

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু, সেই কবি যিনি সততই বলে থাকেন যে ‘একজন্মে মানুষ কবিতা লিখতে পারে না, মানুষ কবিতা লিখে মৃত্যুর পরে।’ এই ভাব-বাক্যের সম্প্রসারণ আসলে একটা দীঘল পুস্তকের ধারণের ক্ষমতা আছে বলেও আমি সংশয় করি। আমি চমকে উঠি যখন তিনি বলেন, ‘নারীর রক্তে রোদ লাগবে, ধীরে তা দুধ হয়ে যাবে…’ বিংবা যখন বলেন, ‘হাত থেকে পড়ে ভেঙে যাবে চাঁদ…’ এই জাতীয় কথা। জীবনদাশের পরে যেকজন কবি স্বকীয় স্বর বা নিজস্ব স্টাইল দাঁড় করিয়েছেন বাঙলা কবিতায় তিনি নিঃসন্দেহে তাদের একজন। হাজার কবিতার ভিতর নাম মুছে দিয়ে তার কবিতা ছেড়েও দিলেও তার নামেই জ্বল জ্বল করবে সেই কবিতা। বিশেষ কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে এই কবির জন্ম হয়নি। ইনি উদ্ভিদের মতো ভূমি থেকেই অজানিত বৃক্ষরূপে উদ্গত হয়ে বিস্তারিত হয়েছেন আপন নামে। তিনি জীবনের প্রয়োজনে দীর্ঘদিন রাশিয়ার মস্কোতে ঘুরাঘুরি করে-টরে জীবন ও জীবিকার এক পর্যায়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে চলে যান। আর সেখানে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বসবাসের পরও তার কবিতা হয়ে উঠেনি বিদেশি কবিতা।তার কবিতায় এখনো এই অঞ্চলের কনটেস্টে বাহিত রতি-রক্ত-মদ, জঙ্গল-জলা, নদী, হাওড় ও হাওয়ার শৃঙ্গারসমগ্র পাঠকের জ্ঞানকে মথিত করে, মূদ্রিত করে। তিনি যেহেতু কয়েকযুগ ধরে দেশের বাইরে, প্রচারবিমুখ বা কীভাবে নিজেকে প্রচার করতে হয় সেটা তিনি জানেন না, আর সাহিত্যক্ষেত্রে যেহেতু তার কোনো উম্মতবেষ্টনি নেই যেহেতু তাকে অনেকেই পড়েননি বা সেইভাবে পড়ার সুযোগ পাননি। আমার আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো তার সমসাময়িক বড় বড়(?), খ্যাতিমান, পুরস্কারধারী, লিটলম্যাগের সম্পাদক, সাহিত্য-সম্পাদক বন্ধুরাও তার লেখা চেয়ে নেন না, বা তার সম্পর্কে কোনো কথা বলেন না বা বলতে চান না। এর একমাত্র কারণ আমার মনে হয় ঈর্ষাপ্রসূত ভয়।

কবির অন্য নাম কালেশ্বর। দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুকে কালেশ্বর রূপে ধারণ করতে হলে তার কাব্যস্থিত তড়পে-ওঠা তরুর ক্রন্দন অনুধাবন করা জরুরী। তার মতে, কবিতা হচ্ছে অগ্রন্থিত আয়ুর বর্ণনা এবং ধ্যানের সর্বোচ্চ ধ্রুপদ যা গভীর ভাষা ও গহন আঙ্গিকে বিধৃত। কাব্যকাল চিহ্নিতকরণের জন্য এই কবিকে নব্বইদশকের কবি বলা হলেও তার শক্তিকে অবদ্ধ করা যাবে না কোনো দশকের নর্দমায়। আমি তাকে দশকোত্তীর্ণ বা অনন্তদশকের বলে কবি জ্ঞান করি। যিনি সর্বগ্রাসী, মেঘের উর্ধ্বতন যিনি দীর্ঘ হাঁটেন তিনি কোনো মাস, বছর, কালের কবি নন; অখণ্ড সময়ের কবি। তিনিই সংযোগ ঘটাতে পারেন কবিতার সঙ্গে গর্হিত আত্মহত্যার অথবা ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার।

কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু হলেন আমার পড়া শক্তিমান, প্রভাবশালী কবিদের একজন। যেহেতু আমারও একজন কবি হওয়ার বাসনা আছে সেহেতু আমি তার কবিতা/লেখা কম পড়ার চেষ্টা করি। তাহলে তার মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে খানিকটা, তিনি এতটাই প্রভাব বিস্তারকারী। আর এইটা বলাবাহুল্য যে, এর মধ্যে অনেক পরিচিত ও কথিত খ্যাতিমান কবির জন্ম হয়েছে কবি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্গার থেকে।

কথাবলির পক্ষ থেকে আমাদের জীবদ্কালের এই শক্তিমান কবির একটা সাক্ষাৎকার গ্রহণের চেষ্টা নিয়েছি আমি। তিনি উত্তর দিয়েছেন কবিতা, সাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, জ্ঞানকাঠামো, অধিবিদ্যা, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, নারী, প্রেম, কাম, রাজনীতি, তার লেখালেখি, ছেলেবেলা, জীবনযাপন, পছন্দ-অপছন্দসহ নানা বিষয় ওপর। আমি তুচ্ছ মানুষ, আমার একার পক্ষে যথার্থ প্রশ্নবিন্যাস করার ক্ষমতা ছিলো না বলে আমি আরো দুইজন সৃজনশীল মানুষের সহায়তা নিয়েছি। দুইজন হলেন আমার প্রিয় দুইজন মানুষ কবি মুক্তি মণ্ডল আর কবি আন্দালীব। সাক্ষাৎকারগুচ্ছকে আমি তিনপর্বে বিভাগ করেছি। আমি (নির্ঝর নৈঃশব্দ্য) যেহেতু এই আলাপচারিতার সঞ্চালক সেহেতু আমার পর্ব দিয়ে শুরু করছি। জগতের সকল প্রাণি সুখি হোক।]


নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে আলাপচারিতা

 

আপনার কবিতা লেখার পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

আমার কবিতা লেখার প্রেরণা হচ্ছে সাপ। ক্ষিধে পেলে ঐ সাপটি আপন শরীর আহার করে যে কোনো মধ্যরাতে...

আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে?

লেখালেখির শুরুটা অনেকটা এরকমই—‘পুড়ে যাওয়া দীর্ঘ বনষ্পদ পাড়ি দিতে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে বাঘ ও ময়ূর...’ জীবনে প্রথম কবিতা লিখি নবমশ্রেণিতে যখন পড়ি, ১৯৮৪ সালে। আশির দশকের শেষপ্রান্তকে লেখালেখির প্রকৃত শুরু বলে ধরে নিতে চাই;

আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

বাতাসে হাত-পা-আঙুল দেখবো বলে কিংবা ঈশ্বর হয়ে উঠবো বলে লেখালেখি শুরু হলেও এখন মনে হয় (১০/১২টা গ্রন্থ প্রকাশের পর) লেখালেখি আসলে শুরুই করিনি। আর বিবিধ প্রযত্নে আমি তো বলতে চেয়েছি, একজন্মে মানুষ কবিতা লিখতে পারে না, মানুষ কবিতা লিখে মৃত্যুর পরে... এই অর্থে আমি এখনো লেখালেখি শুরুই করিনি!

অভিবাসীদের অনেকেই নিঃসঙ্গতা থেকে লেখালেখি করেন। আপনার ক্ষেত্রেও কি তাইই হয়েছে?

শুধু অভিবাসীরাই কি নিঃসঙ্গ? মানবমনের যেমন কোনো শূন্যাবস্থা নেই তেমনই মানুষ পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হতে পারে না...। আর তাছাড়া নিঃসঙ্গতাও তো একপ্রকার সঙ্গ…। জীবনের অর্ধেকেরও বেশিসময় পিতৃ-মাতৃ ভূমির বাহিরে কাটালেও নিজেকে কখনো অভিবাসী/প্রবাসী/ডায়াস্পোরা মনে করিনি; আমি তো এই গ্রহেরই সন্তান, সৌরশিশু। আমি অভিবাসী নই।

কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

এখন আর কবি হতে ভালো লাগে না... মাঝে মাঝে গাছ হতে ইচ্ছে করে, গাছের পাতায় পোকামাকড় হয়ে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে...।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

দৃশ্যমান সূর্যটিকে বয়স্ক, ক্লান্ত মনে হলেই হয়তো মাথার ভেতরে কচি কচি সূর্য এমনিতেই জন্ম নেয়; জন্ম নেয় মগজের জন্মকুঞ্জ বা যোনিকুঞ্জ বেয়ে, হঠাৎই... অথবা হাঁটতে হাঁটতে পায়ের নিচে ঢালাইয়ের ছাচের মধ্যে বন্দী হয়ে-যাওয়া কচি পাথরগুলিকে এক সময় নিজের সন্তান মনে হতে পারে, আর তখনই হয়তো লিখতে হয়, ‘ওহ শিশু! পাথর শাবক!’

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

বিশেষ কারো লেখা আমাকে প্রভাবিত না করলেও আত্মবিধ্বংসীদের ভালো লাগে; বুক মুচড়ে দেয়। যে সব লেখায় জলের চোরা-টান নেই, তীব্রতা নেই, তা ভালো লাগে না। শমসের আনোয়ার, শোয়েব শাদাব, কেদার ভাদুড়ীর কিছু লেখা আছে যা পড়লে মনে হয় এই কথাগুলি তো আমার রক্তের মধ্যে ঘুমন্ত ছিল, উনারা শুধু জাগিয়ে তুলেছেন এবং চিহ্নিত করেছেন। অতএব বলা যায়—প্রভাবের চেয়ে অন্তরের আত্মীয়তা অতিরিক্ত এবং মাত্রাতিরিক্ত।

আপনার কবিতা খুবই প্রভাব বিস্তারকারী বলে আমার মনে হয়। অনেকেকই আপনার লেখাকে অনুকরণ করে লিখতে দেখা যায়।

মানুষ মূলত অনুকরণ করে প্রকৃতির। কবিতা প্রকৃতির অংশ হয়ে উঠলে যে কেউ অনুকরণ করতেই পারেন; এতে দোষের কিছু দেখি না... প্রকৃত লেখক আপন শক্তিমত্তায় মোহ-মায়া ছিদ্র করে একসময় বেরিয়ে আসবেন; তৈরি করবেন নিজস্ব জগত, ইন্দ্রজাল... আমার কুড়ি বছর আগের কিছু কবিতা প্রায় হুবহু নিজ নামে ছাপিয়ে দিয়েছেন একজন লেখক; ছাপা হয়েছে দৈনিক পত্রিকায়। কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে বলেছেন। আমার কাছে বিষয়টা হাস্যস্পদ লেগেছে; কবির জন্য মায়াও লেগেছে—চল্লিশোর্ধ কবি এরকম কাণ্ড করতে পারলেন!

এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অতি বিজ্ঞাপিত কবিদের কেউ কেউ আমার কিছু মৌলিক ভাবনা, মৌলিক উপমা, শব্দের প্রয়োগ চালাকি করে নিয়েছেন; এতেও আমার বিশেষ মাথা ব্যথা নেই... চালাকরাই তো বহু বিজ্ঞাপিত হয়!

মেটাফোর ছাড়া কবিতা হয় না? আমার কাছে অবশ্য মেটাফোরকে তেমন গুরুত্ববহ কিছু মনে হয় না।

এতো ভাবনা চিন্তা করে লিখলে কবিতার কাঠমিস্ত্রী হওয়া যায়; কবি হওয়া যায় না... কী দিয়ে যে কবিতা হয় সে কথা বলা যেহেতু প্রায় অসম্ভব, মেটাফোরের বিষয়টাও আপেক্ষিক।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন? এই যেমন আমি হতে চাইতাম রেলগাড়ির ড্রাইভার। এই রকম কিছু কি হতে চাইতেন?

ছোটবেলা ইটভাটার ইটকামলা (বাক্সের ভেতর চিকনা মাটি ভরে ইট বানিয়ে রোদে শুকোতে দেয়ার কাজ) ইচ্ছে হতো... একটু বড় হয়ে নবম-দশম শেণিতে যখন পড়ি, আমার মনে হতো—সবাই ধান চাষ করে, আলু চাষ করে; আমি বিজ্ঞানের চাষাবাদ করবো, বিজ্ঞানচাষী হবো।

আপনার এই বাসনার সঙ্গে আমার খানিকটা মিল পেলাম। আমার একটা আশ্রম কাম ইশকুল করার বাসনা আছে, যেটার নাম হবে ‘জ্ঞান বিদ্যালয়’ (স্কুল অব নলেজ)। যাই হোক, আপনার নিয়মিত কারো কবিতা পড়তে কি ভালো লাগে?

নিয়মিত কারোর কবিতা পড়তে ভালো লাগে না, নিয়মিত বেঁচে থাকতেও ভালো লাগে না; আমি মাঝে মধ্যেই মারা যাই... এখন আসলে কবিতা পাঠের বদলে বনপিপঁড়া পাঠ, প্রকৃতিপাঠ বেশি হয়ে ওঠে...

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কবি ও কবিতার বিশেষ কোনো দায় নেই, আবার কবি ও কবিতার দায় জন্ম এবং মৃত্যুর সমান।

আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

৯০ দশকের পর থেকে যারা লিখছেন তাদের কবিতা বিশেষভাবে পড়া হয়নি; অতএব আমার পক্ষে বলাটা যৌক্তিক হবে না। ৯০ দশকের দু'এক জনের কবিতা হয়তো চেনা যাবে; তবে এ-কথা যুক্ত করতে চাই- ৯০পরবর্তী যাদের কবিতা পড়েছি তাদের অনেকের মধ্যে সনাক্তযোগ্য হওয়ার প্রখর প্রবণতা লক্ষ করেছি।

তো, আপনি কবিতা কেনো লিখেন বলে আপনার মনে হয়?

সমুদ্রে জাহাজ ডুবির পর একখণ্ড কাঠের মধ্যে ভর দিয়ে ভেসে-থাকার সর্বশেষ কৌশলের মতো.. কবিতা লেখাটাও আমার কাছে একটা কৌশল বা বেঁচে থাকার সর্বশেষ অবলম্বন...

নারীদের মধ্যে যারা কবিতা লিখেন, দেখা যায় অধিকাংশক্ষেত্রে তারা কবি হয়ে উঠতে পারেন না। কেনো তারা নারী কবিই থেকে যান? নারী কবির লেখা কবিতা নাম উঠিয়ে দিয়ে পড়লেও বোঝা যায় কবিতাটা কোনো নারী লিখেছে, এই বিষয়ে আপনার মত কী?

নারী বা পুরুষ বলে বিশেষ কোনো কথা নেই; সব নারী শতভাগ নারী নয়, সব পুরুষ শতভাগ পুরুষ নয়! আমি কিন্তু এও বলছি না—কবিতা লিখে তৃতীয়লিঙ্গ! 'কবি' শব্দের যেমন লিঙ্গ বিভাজন নেই তেমনি কবিতা কে লিখলো—নারী না পুরুষ, তা খেয়াল করে দেখি না।সিলভিয়া প্লাথই আমার শমসের আনোয়ার...

আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে যদি একটু আলো প্রদান করতেন…

আমার সমকালের কবিরা এখনো সচল। তাদের নিয়ে বিশেষ কথা বা শেষ কথা বলার সময় হয়তো এখনো আসেনি। তবে হ্যাঁ, বোর্ডস্ট্যান্ড করা ছাত্রের মতো উজ্জ্বল, ধীরস্থির, চালাক ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতার ছড়াছড়ি লক্ষ্য করছি। অধিকাংশ কবিতাই স্যুট-টাই পরা, ক্লিনশেভ করা, আফটার শেভ মাখা কবিতাও চোখে পড়ে; জংলি, জানোয়ারের মত কবিতা (আপাতবিশৃঙ্খল হয়েও গভীরে ভয়ানক রকম সুশৃঙ্খল) খুব একটা চোখে পড়ে না।

হাহাহাহাহা…। আচ্ছা, এইবার বলেন, কেনো জীবনদাশের কবিতা আমরা বারবার পড়ি?

জীবনানন্দ দাশ একজন আত্মবিধ্বংসী কবি এবং তার কবিতায় ডিভাইন ট্রাংকুইলিটি প্রখর বলেই আমরা বারবার পড়ি।

সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না কেনো বলে আপনার মনে হয়?

সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা বেশি পড়ি না, কারণ তা পাণ্ডিত্যে অনেকটাই নুয়ে-পড়া। অনেক সময় দুরবিন লাগিয়ে তুলে আনতে হয় চোখের রস, মনের ঝংকার...

আপনার কাছে কবিতা কী?

এই জিজ্ঞাসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় বহুবিদ শিরোনাম তৈরি করছি আমি। যেমন : কবিতা ও অক্ষরের নদী, কবিতা ও গৌতম বুদ্ধের গ্রাম, কবিতা ও তড়পে-ওঠা তরুর ক্রন্দন, কবিতা ও গর্হিত আত্মহত্যা ও আধ্যাত্ন সাধনা, কবিতা ও রুহের কুহক ও তৎসংলগ্ন বায়ুর বিভ্রম। তবে আজ 'কবিতা কী' এ-জিজ্ঞাসার জবাবে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে—যা রচিত হয় সফল সঙ্গম ও মৃত্যুর পরে।

এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

এই সময়ের কবিতা খুব একটা পড়া হয়নি। অন্তর্জালের কল্যাণে যেটুকু দৃষ্টির ভেতর এসেছে তা নিয়ে দু'একটা কথা যোগ করতে পারি—কবিতায় সহজিয়া ভাব লক্ষ্য করা যায়, তা বেশ স্বতঃস্ফূর্ত, সুখপাঠ্য। কবিতায় চমক তৈরির প্রবণতাও দুর্লক্ষ্য নয়। চমক কিন্তু কবিতা নয়। মনে রাখা দরকার—আরামদায়ক কবিতা দীর্ঘকাল আরামদায়ক থাকতে পারে না; মেরুদণ্ডের অভাবে ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়। কবিতায় সামগ্রিক শক্তি পুঞ্জিভূত করার জন্য একটা যতি চিহ্নেরও যে অনেক সক্ষমতা রয়েছে এসব বিষয়ে তারা বেশ উদাসীন। বহু ব্যবহৃত মেটাফোরের প্রয়োগও লক্ষ্য করি। কবিতায় উপমা আসলে তুচ্ছ যদি না তুলনাটা যথার্থ এবং মৌলিক না হয়! সম্ভবত উপমা এবং তুলনার বিষয়টি খেয়াল করলে আমরা নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারব যে নব্বই-এর কোন কবি বিমল আর কোন কবি উৎপল অনুসারী।

কনটেম্পরারি কবিতায় উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে বলেন।

উত্তরাধুনিকতা খুঁজতে যাবো কেন! উত্তরাধুনিকতা/ বিনির্মাণবাদ এগুলি তো পুরনো মুভমেন্ট! আমাদের সময় একটা চেষ্টা হয়েছে সারা পৃথিবীর মতো। মূলত আশির দশকের কবিরা ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন, নব্বইয়ের কবিরা মাঝারিমাপের কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পেরেছেন। এতে করে বাঙলা কবিতায় নতুন যুগ তৈরি হয়নি। আসলে উত্তরাধুনিকতা/ বিনির্মাণবাদ এ-সবই তো পশ্চিমাদের! আমরা আলোড়িত হয়েছি বাঙলা থেকে। নতুন কোনো মুভমেন্ট কি বাঙলা থেকে সম্ভব যাতে পাঠক মুভমেন্ট তৈরির পাশাপাশি নাড়িয়ে যাবে পশ্চিমাদেরও।

এই সময়ে এসে কবিতায় প্রথাগত ছন্দের প্রয়োজনীতা কি আছে? থাকলে কেনো আছে?

প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি! এমনকি গদ্যের জন্যও ছন্দ জানা দরকার; নইলে গদ্যপাঠের বদলে শব্দের ধাক্কাধাক্কিতে রক্তাক্ত করতে হয়। প্রথা না জানলে প্রথাহীন হওয়া কি সম্ভব! আমি অবশ্য প্রথাহীনতার পক্ষে।

মানে প্রথাগত ছন্দ বলতে মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত বা অন্যান্য শাস্ত্রগত ছন্দের কথা বলছিলাম আরকি…

প্রথাগত ছন্দের দুর্বলতা তথা সীবাবদ্ধতা সীমাহীন। কবিত্বমণ্ডিত কবিতায় দেখবেন, ক্ষুদ্রতম অংশটি কবিতা হয়ে উঠলেও অধিকাংশই থাকে অকবিতা; কবি যেনো কবিতা রচনার বদলে ছন্দ রচনায় বেশি উদ্যোগী। আসলে ছন্দ তথা মাত্রাজ্ঞানের মুন্সিয়ানা পাঠকের দৃষ্টি বহিঃর্ভূত থাকবে, শব্দগুলি এলোমেলো থাকবে ঠিক কিন্তু অদৃশ্য আঁটা বা বন্ধনের বিষটি তো অনস্বীকার্য। পুরোনো সূত্রটি সঠিক মনে হয়—ছন্দ জেনে ছন্দ ভুলে যেতে হবে। কবিতার তীব্রতম মুহূর্তটি পাওয়া তো চাই-ই, তা যে নিয়মেই হোক!

কবিতা প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

অর্ন্তজাল খারাপ না, মন্দের ভালো। স্বর্গ হোক আর নরকই হোক কবিতার কুসুম ফুটিয়েই যাবো...

আপনি তো শয়তানকে পবিত্র মনে করেন। তো শয়তানের কোন রূপটি আপনার কাছে ভালো লাগে? কেনো ভালো লাগে?

শয়তান জিজ্ঞাসা তৈরি করতে পারে। দার্শনিকের কাজ হলো জিজ্ঞাসা তৈরি করা, উত্তরপত্র নয়। একান্ত অনুগত বাধ্য ছাত্র নয় শয়তান; এটি একটি আধুনিক চরিত্র।

মিশেল ফুকোকে আমার অনেক বড় জ্ঞানী লোক বলে মনে হয়। তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

আপনি কি ডিলিউজ-এর অনুগামী? তিনি বলেছিলেন, পৃথিবীকে দুইভাগে ভাগ করলে ফুকোপূর্ব এবং ফুকোত্তর রূপে দেখতে হবে। ডিলিউজ আত্মহত্যা করেছিলেন। আপনি করবেন না তো!
আমার কথা হলো, ফুকো কি আমন ধান, ইরিধান রোপন করতে জানতেন? ক্ষেত্রবিশেষে ফুকোর চেয়ে চর-কাশিমপুরের একজন কৃষককেও জ্ঞানী মনে হয়। তবে হ্যাঁ, উন্মাদনাকে অধ্যয়ন করার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক ছিলেন ফুকো। মনোসমীক্ষণের ফ্রয়েদীয় ধারাগুলির বিশেষভাবে কৌতূহলী ছিলেন বালক বয়সে; বালক বয়সে আমি কৌতূহলী ছিলাম লালনকে নিয়ে। কে বেশি জ্ঞানী ছিলেন, লালন না ফ্রয়েদ, কখনো ভেবে দেখিনি!

না, আমি ডিলিউজ-এর মতো আত্মহত্যা করবো না। কারণ আমি ফুকোকে একটা পর্যায় অবধি জ্ঞানী মনে করি, কিন্তু দেবতা বা অসীম কিছু মনে করি না। তাছাড়া দেবত্বে আমার তেমন আস্থাও নাই। আমার মনে হয়েছে ফুকো তার পূর্ববর্তী জ্ঞানসমূহের একটা সাবলিল সিনথিসিস করতে পেরেছেন। যাইহোক, ফুকোর সাক্ষাৎকার যদি আপনাকে নিতে বলা হতো তাকে আপনি কোন প্রশ্নটি প্রথমে করতেন?

সিমেনটিক্স-এর ক্ষেত্রে ডিসকোর্স যদি হয় কয়েকটি বাক্যের সমন্বয়ে গঠিত এক ধরনের ভাষাতাত্ত্বিক একক, তা হলে কয়েকটি বাক্যের সমন্বয়ে গঠিত ধরেন আপনার কবিতাকে আর কী নামে সজ্ঞায়িত করব! আমি অবশ্য ফুকোর বদলে দারিদার সাক্ষাৎকার নিতে চাইতাম।

হুঁ, দারিদাকেও আমার পৃথিবীর সব থেকে জ্ঞানীদের একজন মনে হয়। তাই তার প্রতি আপনার আগ্রহেরও কারণ জানতে ইচ্ছে করে।

ফ্রান্সে যাবো, দারিদার সঙ্গে দেখা করবো করবো, তখনই তিনি মারা যান। তাঁর বিনির্মাণ তত্ত্বকে জেফ কলিনস ও বিল মেবলিন ভয়ানকভাবে আক্রমণ ও ব্যাখ্যা করেছেন। এতো সৎ এবং উজ্জ্বল আলোচনা দীর্ঘদিন পড়িনি। এই গ্রন্থ পাঠের সময় অনেকটা নিজের অজান্তেই রচিত হয়ে যায় ‘মৌলিক ময়ূর’ কবিতার বই। দারিদা পাঠের একটা অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছি... এই গ্রন্থের প্রায় ৩০ ভাগ শব্দ আমি বুঝি না। পড়তে হলে অনুবাদ করতে হবে। পুরোগ্রন্থ অনুবাদ করি নিজে পড়ার জন্য। একদিন বিকেলে বিদ্যালয়ে গিয়েছি কন্যাসন্তানকে নিয়ে আসবো বলে; গাড়ি পার্ক করে বই পড়ছি শব্দ ও বিষয়ে ভ্রমণ করছি.. .ঘোরগ্রস্হ হয়ে পড়ি। বিদ্যালয়ের সামনে বিশালায়তন দূর্বাভরা মাঠ; আমার মেয়েটা মাঠের প্রান্ত ঘেঁষে আসছে অন্যান্যদের সঙ্গে, অথচ আমি দেখছি—সে মাঠের মধ্যে একা এবং তার মুখ অর্ধেক দেখা যায়, অর্ধেক যায় না। তার অর্ধাংশ মুখে বাঙালি মেঘ জমে আছে; তার বেণী-বাঁধা চুলে লাল ফিতা দূলছে, আর আমি যেন মাথার ভেতর খোদাই করে লিখে রাখি—‘কন্যা ধনবতী, মা আমার চুলের বেণীতে বেঁধে রাখো লাল লাল ফাঁসির ফিতা।’ এই গ্রন্থের প্রায় অধিকাংশ কবিতায়ই এরকম ঘোর, ভ্রম, বিভ্রমের মধ্যেই লেখা; কবিতার জগত থেকে যোজন যোজন দূরে বসে লেখা। আমার নতুন করে অভিজ্ঞতা হয়—কবিতা লেখার কুমতলব নিয়ে কখনোই কবিতা লেখা যায় না, অন্তত আমি লিখবো না। এতে যেমন নিরানন্দিত হবো, মৌলিক কিছু দাঁড়াবেও না!
দারিদা শিখিয়েছেন নতুন করে দেখার কৌশল, যা কিছু সাজানো সে সবকে বিশৃংখল করে দেখা অথবা এলোমেলো ভাবনাকে সজ্ঞায়িত করা বা সজ্ঞায়িত সংসারকে তচনচ করার আনন্দ। সম্ভবত এ জন্যই একরাতে রচনা করি ‘অভিজিত কুণ্ডুর লায়ন লিলিগুচ্ছ’-এর শতাধিক কবিতা।

আচ্ছা। আপনি তাহলে বলেন দারিদাকে কী প্রশ্ন করতেন?

দারিদার সঙ্গে দেখা হলে হয়তো একটি মাত্র প্রশ্নই করতাম, আপনি এতো কুটনা এবং পাকনা কী করে হলেন? কৌশল বলেন!

অনেকে মনে করেন কবিতায় দর্শন থাকতে হবে, এই থাকতে হবে, সেই থাকতে হবে…। কেনো থাকতে হবে, না থাকলে কী সমস্যা?

দর্শন শাস্ত্রের দর্শন না হয়েও কবিতা তো এক প্রকার সহজিয়া দর্শন! লালনের দর্শনের সঙ্গে স্পিনোজা, দেকার্টের দর্শনের তুলনামূলক আলোচনা যেমন যৌক্তিক নয় তেমনি ইকবালের কবিতাকে দার্শনিক কবিতারূপে চিহ্নিত করাও অযৌক্তিক। অনেকে করে থাকেন, কারণও আছে; ইকবালের কবিতা জ্ঞান আর উপদেশের ভারে ভরপুর। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি প্রভাবিত হলেন ইকবাল। ধারণা করা হয়, বর্তমান বিশ্বে কবিতার সর্বাধিক বিক্রিত বই রুমির। এখন পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশের অধিক ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষদিকে রুমির কবিতার অনুবাদের পর পাশ্চাত্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। রুমির সহজিয়া দর্শন কিন্তু শক্ত মেরুদণ্ডে ওপর দাঁড়ানো, অস্বীকার করা যাবে না। আসলে জ্ঞানের একটা শাখার সঙ্গে অন্য একটা শাখার যোগসূত্র থাকায় কবিতায় অনেকে দর্শন খোঁজেন। আমি তাদেরকে অপ্রকৃত পাঠক বলে উড়িয়েও দিতে চাই না। আধুনিক কবিতা অনেক সময় সু-প্রবেশ্য না হওয়ায় পাঠক থেকে দূরতম অবস্থান করে; পাঠককেও আধুনিক কবিতার পাঠক হয়ে উঠতে হয়। কবিতা আসলে স্বপ্রতিষ্ঠ, স্বতোদ্ভাসিত এবং পরিবর্তনশীল একটি শিল্পমাধ্যম। এই সরল সত্য পাঠকের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে কবিতার মাধ্যমেই। ভের্লেন যেমন ‘ফ্লার দ্যু মাল’ পড়ে বলেছিলেন অলৌকিক শুদ্ধতা সম্পন্ন তেমনি ইন্দ্রিয়বিলাসী পাঠককেও কবিতা পড়ে অন্তত বলতে হবে—বাহ্! না বললেও ক্ষতি নেই, বই পুড়িয়ে দিলেও ক্ষতি নেই; শুধু কবিকে পুড়িয়ে না মারলেই হলো!

জীবনদাশকে আমার পৃথিবীর সব থেকে বড় কবি মনে হয়...

আপনি মনে হয় নিজেকে দুর্বল কবি মনে করেন নতুবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবি আপনিই হওয়ার কথা!

হাহাহাহা…। যাই হোক, তো বলেন জীবনদাশ সম্পর্কে আপনার কী মত?

কখনোই প্রীত হতে শিখিনি, আমার আছে শুধু অট্টহাসি... আমি এই ধারার মানুষ। বোদলেয়ার আমার কাছে বড় কবি! আমি অংক বিজ্ঞানে দুর্বল—কে সবচেয়ে বড় কবি, এটা কখনো ভেবে দেখিনি, এখন ভাবছি; আমার নামটাও রাখবো কি না তাও ভাবছি। জীবনানন্দ ঘরানার শব্দ যদি হয় ‘সর্বপ্রিয়’ তাহলে এই শব্দের পেছনে জীবনানন্দের নাম যোগ করেছি দুই যুগ হলো। জীবনদাশ এর পাশাপাশি লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে জীবনদুঃখদাশ, জীবনদুখীদাশ…।

বাঙলা কবিতাকেও আমার পৃথিবীর সব থেকে ভালো কবিতা মনে হয়। আপনার কী মত?

মানুষ সর্বরাষ্ট্রিক হলে, সর্বভাষিক হলে, মানুষ থেকে আরও একটু উত্তীর্ণ হয়ে উঠলে পৃথিবীতে বাঙলা কবিতা বলে বিশেষ কিছুর অস্তিত্ব থাকে না। পৃথিবীর সর্বভাষার কবিতাই মনুষ্যভাষার কবিতা। আমার কাছে সবকিছু ছাপিয়ে এইসব হাড়ের খাঁচা, যকৃত হৃৎপিণ্ডসহ পৃথিবীর চলমান, অচলমান জীবিত এবং মৃত মানুষই এক একটি কবিতা। ধুলাভূমে জন্ম তাই ভূমি-ভরা মানুষের আর কোনো মাতৃভূমি নাই...

সাপ আর সূর্যমুখির মধ্যে কী সম্পর্ক?

মন আর মগজের মধ্যে, নারী আর পুরুষের মধ্যে যেমন...

গেওর্গে আব্বাস, মঞ্জু মিস্ত্রাল, অভিজিৎ কুণ্ডু, দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু এর মধ্যে কোন রূপে নিজেকে ভালো লাগে?

কোনো রূপেই না, আমাকে আমার একটুও ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যে ছোটবেলার ‘আমি’কে ভালো লাগে। তবে হ্যাঁ, গেওর্গে আব্বাস হয়ে লিখলে উদ্যত, চমকপূর্ণ, মাঝে মাঝে সাহিত্য-মাস্তানি (অবশ্য বুদ্ধদেব বসু'র মতো সততার জায়গা থেকে, ভাষিকভাবে কিঞ্চিত কেদার ভাদুড়ী...) হয়ে ওঠে, এই আর কি! আর অভিজিৎ কুণ্ডু আসলে একটা গ্রন্থের জন্যই তৈরি হয়েছিল। আর আমি অবাক হই—এখনো অনেকে আমায় মঞ্জু মিস্ত্রাল নামে সণাক্ত করে! প্রসঙ্গত বলি- কলেজ জীবনে মঞ্জু হোসেন নামে অনেক লিখেছি, বিশেষ করে ছড়া; সব ক'টি জাতীয় দৈনিকে ছাপিয়েছি, বাঙলাদেশের বাছাই ছড়ায়ও কয়েকটা ছড়া সংকলিত হয়েছে, ফটোসহ! হায়! নাম দিয়ে কী হবে, লেখা পড়ে যদি ধরা না গেলো, কার লেখা?

বেহেস্ত না দোজক, আপনাকে কোনটা বেশি টানে?

দোজক। হুরপরীরা বেহেস্তে থাকে; দোজখে আমি আগুন দিয়ে তৈরি করেছি দোজক সুন্দরীদের। আমি জানি, দোজকে গেলেও আমি কবিতা লিখবো। তারা আমার ডানপাশে বসে আমায় তরল আগুনের চা বানিয়ে দেবে...

আগুনের রূপ কেমন লাগে?

কোনো এক কবিতায় লিখেছিলাম, আগুনের রূপ মা আমেনার মতো উজ্জ্বল।

যেমন আমি মাঝে মাঝে সুতীব্রভাবে আগুনের আগুনকে কামনা করি। আপনি কি কখনো আগুনকে কামনা করেছেন?

আমার তো আম্রকাষ্টের আগুন ভালো লাগে। তিন-পায়া মাটির উনুনে আগুনের পুষ্পরং তো আলাদাই; স্নান ঘর থেকে এসে দেবী-দক্ষিণ প্রতি-অঙ্গে মেখে নেয় কচি কচি আগুনের গুদা, নরকের ময়েশ্চারাইজিং লোশন।

আপনার চোখে মানুষের উচ্চতা কীসে?

যদিও মানুষ বৃক্ষের আহার, তারপরও মাঝে মাঝে মানুষের উচ্চতা দেখে নিই মনুষ্যপ্রেমে, জীবপ্রেমে...

আপনার কবিতাকে ইদানীং আপনি ‘ক্যান্সার আক্রান্ত’ বলছেন। কেনো বলছেন?

আসলে কবিতা তো ধীরে ধীরে বড় হয় কবিকে বিদীর্ণ করে! এখানে ধ্বংসের মধ্যেও সৃষ্টির গোপন কোলাহল রয়েছে। বিবিধ প্রজন্মে ক্যান্সারকে কুসুমের সঙ্গেও তুলনা করেছি, ধনিয়াবনে ক্যান্সারকুসুম ফোটাতে চেয়েছি। শেষপর্যন্ত উপশমকারকও, যা আমার কাছে কবিতার কেমোথ্যারাপি...

মাঝে মাঝে মনে হয় কবির নিয়তি আত্মবিধ্বংসী হওয়া। তাহলে কেনো আপনার বীণায় ঝড় হয়ে উঠে না দীপক রাগ?

কে বললো কবির নিয়তি আত্মবিধ্বংসী হওয়া? বাঙলা কবিতায় খুব কম আত্মবিধ্বংসী কবি রয়েছেন, নিতান্তই অঙুলিমেয়! আত্মবিধ্বংসী কবির তালিকায় আপনি কি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ-এর মতো বহুলপঠিত, বহুল প্রচারিত কবিকে রাখতে পারবেন? আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর মতো শক্তিশালী এবং প্রতিভাবান কবিও কিন্তু শেষপর্যন্ত আত্মবিধ্বংসী নন (মাটির উপরি অংশে ঝাকুনি টের পাই, হাজার ফুট নিচে প্রায়-অনুপস্থিত)!

আপনার দ্বিতীয় বাক্য আরও স্পষ্ট হতো যদি দীপক রাগের পরিবর্তে ভীমপলশ্রী'র কথা বলতেন! কয়খানা আত্মবিধ্বংসী কবিতা লিখেছি, এরকম সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলেও করতে পারতেন! তবে একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারবো—কখনোই আমি আফটারসেভ-মাখা, স্যুট-টাই পরা, রোমান্টিক কবিতা, শিক্ষিত মানুষের কবিতা কখনোই লিখিনি; দীর্ঘকাল দেশের বাইরে আছি বলে অতীত নিয়ে, অতীতের শাক-সবজি, ফলমূল নিয়ে, বেহুলা সুন্দরী নিয়ে কান্নাকাটি খুব কমই করেছি...

প্রেম আর কামকে আপনি কী রূপে দেখেন? প্রেম ছাড়া কী কাম পরিণতি পায়?

মৃত্যু, কবিতা, কাম ত্রিমাত্রিক এই শব্দগুলিকে আমি এক করে দেখি। কাম আমার কাছে মৃত্যুর মতো, প্রেম হলো ক্রমমৃত্যু। কীসে যে কি পরিণতি পায়! প্রেম ছাড়া কামের কথা ভালো করে ভেবে দেখিনি।

আপনি সম্ভবত এই বিষয়ে একটা ফিকশনও লিখেছেন…

হ্যাঁ। কামের বহুমাত্রিকতা নিয়ে উপন্যাস লিখেছি—‘অনবদ্য ইতর।’ একটানেই লিখেছি; বানান-বাক্য ভালো করে দেখতে পারিনি বলে ৭/৮ বছর পেরিয়ে গেলো, এখনো প্রকাশ পায়নি।

আমার মনে হয় বাঙলা কবিতায় রাধা নামের প্রেমিকারূপী এক নারীচরিত্রকে রক্তমাংসে সৃষ্টির মাধ্যমে প্রেমের যথার্থ সূচনা করেন জয়দেব তার গীতগোবিন্দে, তারপর চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতিসহ আরো কয়েকশ কবি মধ্যযুগেই সেই প্রেমকে যথার্থ প্রলম্বিত করেন। রাধার মতো কোনো চরিত্র কেনো আর সৃষ্টি হয় না বলে আপনার মনে হয়?

দরকার আছে বলে তো মনে হয় না! আমি দেবী-দক্ষিণ চরিত্র সৃষ্টি করেছি। দক্ষিণ হচ্ছে চিরপুরাতন, চিরআধুনিক। জানেন তো, রাধার অন্য নাম কিন্তু দক্ষিণ...

হুঁ জানি, জগতের সকল ললিত আর সুন্দর নামই তো শ্রীমতি শ্রীরাধিকারই। যাইহোক, অনেকে মনে করেন প্রেমের কবিতা মানেই ব্যর্থ কবিতা। আপনি কী মনে করেন?

আমার কাছে প্রেমের কবিতা শুনলেই দ্বিতীয়শেণির কবিতা মনে হয়। আমি এমনিতেই অবজেক্টধর্মী শিল্পে খুব একটা বিশ্বাসী নই। কবিতাও এক প্রকার অবজেক্ট ধর্মী শিল্প। প্রেমের কবিতা, আধ্যাত্বিক কবিতা, রোমান্টিক কবিতা ইত্যাদি অনুষঙ্গ টেনে ভাবনাকে সংক্ষিপ্ত করতে চাই না। যারা সমুদ্রে ঝাঁপ দেবে বলে জন্মেছে তারা কেন খানাখন্দ নিয়ে এতো ভাববে!

জিরাফের ভাষা আসলে কী?

বস্তু জগতের মধ্যে জিরাফের কোনো ভাষা নেই, স্বর নেই কিন্তু শরীরের ভঙ্গিমা আছে, ইঙ্গিতি আছে।

আপনার কী মনে হয় জিরাফের ভাষা বাদুড় তার ডানার কানে শোনে?

বাদুড় তার ডানার কান দিয়ে যদি মানুষের কবিতা শুনতে পায় তাহলে জিরাফের কবিতাও শুনতে পাওয়ার কথা...

সমুদ্রের সকল ভার আমার মনে হয় তিমিমাছ তার স্তনের ভিতর দুগ্ধরূপে বহন করে। আপনার কী মনে হয়?

আমি স্তনবিজ্ঞানী নই, তিমিবিজ্ঞানীও নই! কী করে বলবো! তবে তিমি মাছের স্তনের কথা শুনে সমুদ্রের মধ্যে একটা চলমান দুধের পুকুর দেখতে পাচ্ছি...

আমার মনে হয় সংযম কিংবা অবদমনের মাধ্যমে নির্বাণ লাভ হয় না। সার্বিক ভোগ-উপভোগের প্রান্তিক উপযোগিতায় যে বিতৃষ্ণা সেইখানে নির্বাণ। আপনি কী মনে করেন?

নির্বাণ লাভ কি খুব জরুরি?

আক্ষরিক অর্থে জরুরী নয়। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বিশাল একটা গোষ্ঠীর কাছে খানিকটা জরুরী বৈকি। নাহয় তো পুনর্জন্ম হবে।

বিতৃষ্ণা থেকে যে নির্বাণ তাতে রসহীনতা প্রকট হওয়ার কথা! অবদমনের মাধ্যমে আমার বন্ধুদের দু'একজন রূপসী নারীর শরীরেও পঁচা মাছের গন্ধ আবিষ্কার করেছেন। হেডোনিজমের যুগে আপনি যে নির্বাণ নিয়ে ভাবছেন ওটাই ভালো লাগলো।

ভয় আর প্রলোভনে নিচে যে রাস্তা সেইটা কি আসলে সিরাতুল-মুস্তাকিম?

সিরাতুল-মুস্তাকিম মানে সঠিক বা প্রকৃত রাস্তাই তো?

হ্যাঁ, সরল পথ…

হ্যাঁ, ‘সিরাতুল-মুস্তাকিম’ শব্দবন্ধটি অধিবিদ্যাকেন্দ্রীক। ভয় আর প্রলোভনের চর্চা পুঁজিবাদী চর্চাও বটে! এই পথে মানুষের ধ্বংস অনিবার্য। মানুষ আসলে বিভ্রমে আছে বাস্তবতা নিয়ে; বাস্তবতা তো দুই প্রকার, পরিদৃশ্যমান বাস্তবতা, ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতা। ঐন্দ্রজালিক বাস্তবতার মধ্যে ছড়ানো রয়েছে পরলৌকিক লোভ। মানুষ মোহিত হচ্ছে, প্রশান্তিও পাচ্ছে। এই পুঁজিকে ভর করে, পরিদৃশ্যমান বাস্তবতায় খুন-খারাবি তো চলছেই....

জেব্রা তো ঘোড়ার চেয়ে বেশি দৌড়ায়। জেব্রার পিঠে কেনো মানুষ চড়ে না?

জেব্রা অনেকটা মহাকাব্যের মতো; মানুষ জেব্রার পিটে চড়ে না মহাকবিতার সম্মানে...

তৃতীয়বাঙলা ব্যাপারটা কী?

তৃতীয় বাঙলার লেখক বলতে মূল ভূখণ্ডের বাইরে থেকে যারা লেখালেখি করছেন তাদেরকেই ধরা হয়ে থাকে।

যুক্তরাজ্যে রচিত বাঙলাসাহিত্যের ক্ষেত্রকে তৃতীয় বাঙলা বলে আলাদা করা কেনো?

অনেকে তৃতীয় বাঙলা বলতে শুধু যুক্তরাজ্যকে ইঙ্গিতি করেন, তা কিন্তু ঠিক নয়। তবে ইতিহাস, ঐতিহ্য, গুরুত্বের ক্ষেত্র যদি ধরে নেয়া হয় তাহলে যুক্তরাজ্যের নাম সর্বগ্রেই আসে। এখানকার বাঙালিরা তো তিন প্রজন্ম অতিক্রম করলো! প্রায় আড়াই লক্ষাধিক বাঙালির অবস্থান এখানে। রাজনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পাওয়ার হাউসগুলিতে বাঙালির একটা অবস্থান আছে। সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বেশ অগ্রসর। লেখালেখির ক্ষেত্রে আলাদা করার বিষয়টি চলে আসে ডায়াস্পোরা ভাবনা থেকে। প্রথম প্রথম আমিও কিন্তু আপনার মতো জিজ্ঞাসা তৈরি করেছি—কেন এই আলাদাকরণ! কবি কেতকী কুশারী ডাইসন এর ডায়াস্পোরা বিষয়ক ভাবনাগুলি পড়ে আমি নিজেও তৃতীয় বাঙলা বলতে দ্বিধান্বিত হই না। একটু স্পষ্ট করে বলার জন্য একটা উদাহরণ টানছি, যেমন আমি মূল ভূখণ্ডের বাইরে আছি দুইযুগের ওপর হলো। আমার সবগুলি গ্রন্থই বিলেতে বসে লেখা। আপনি কি মনে করেন না আমার লেখায় স্থানিক একটা প্রভাব পড়েছে?

না, আপনার লেখায় স্থানিক তেমন প্রভাব আছে বলে আমার মনে হয়নি।

আপনি দেশে বসেই খেয়াল করলে দেখবেন যে দশবছর কিন্তু দীর্ঘ সময় একটা ভূ-ভাগ, ভূ-দৃশ্য পরিবর্তনের জন্য। আমার শৈশবের বিদ্যালয় তো আমি নিজেই চিনতে পারি না। এ পরিবর্তনটা আপনার চোখে স্বাভাবিক মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে স্যুররিয়াল। আমি ইউকে'র রাস্তায় হয়তো একটা ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে আছি, লাল সাংকেতিক বাতি দেখে শৈশবে-দেখা মাকাল ফলের কথা মনে পড়ছে... আমার মাকাল ফল দেখা আর আপনার দেখার মধ্যে কি পার্থক্য হবে না! আমার চেয়ে কত অগ্রজ এখানে আছেন। তাদের মনস্তত্বকে পাঠ করার জন্য ডায়াস্পোরা বিষয়টি মাথায় রাখলে ক্ষতি নেই; আলোচনার জন্য বা চিহ্নিতকরণের জন্য বেশ সুবিধে হয়। কেউ যদি বিষয়টি না মানেন তাতেও বিশেষ আপত্তি নেই।

আচ্ছা। আধুনিক গদ্যে/আখ্যানে কাব্যিকতাকে ক্রিটিকগণ নঞ্চর্থক দৃষ্টিতে দেখেন। এই বিষটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

বিষয়টা নির্ভর করে প্রয়োগবিদ্যা ও বিদ্যকের ওপর। যেমন ধরুন, বাঙলা কবিতাকে এক সময় যুদ্ধ করতে হয়েছে লিরিসিজম থেকে বের হয়ে আসার জন্য। এই বেরিয়ে আসাটা কিন্তু ক্ষণকালে হয়নি, সময় লেগেছে। গদ্যও তেমনি পৃথক মাত্রালাভ করেছে বিবিধ দ্যোতনায়, প্রয়োগবিদ্যায় ভর করে। ক্ষমতাবান লেখক হলে এখনো লিরিকের মধ্যে কবিতা রচনা যেমন সম্ভব তেমনি আধুনিক গদ্য ও কবিতা নির্ভর হওয়া অসম্ভব নয়। একটা সার্থক সিনেমা যেমন শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠতে চায়, একটা সার্থক উপন্যাসও তেমনি; পথ শুধু ভিন্ন। একটা সতর্কতার বিষয় হলো, কবিত্ব এবং কবিয়ালি দুটো বিষয়। আরোপিত কবিয়ালি গদ্যের জন্য যেমন অন্তরায় তেমনি প্রাসঙ্গিক কবিত্ব গভীর গদ্যের জন্য বিশেষ শক্তি বলে আমার ধারণা।

একজন কবি যখন ফিকশন লিখতে যান সেখানে অভ্যাসবশত বা ইচ্ছাকৃত কাব্যিকতা চলে আসে? সেটা কেনো দোষের?

দোষের কিছু তো মনে করি না! তবে হ্যাঁ, আপন ক্ষমতায় পাঠককে টেনে, হিচড়ে গদ্যের গভীর অরণ্যে নিয়ে যেতে হবে। ম্যাড়ম্যাড়ে উপস্থাপন হলে গদ্যপাঠ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। যেখানে ঘোড়ার গতি দরকার সেখানে কচ্ছপের গতি হলে কি চলে! আসলে চুমু দিতে হবে তো দাঁত-জিহ্বা ফুটিয়ে চুমু দিতে হবে; এতে রক্ত ঝরলেও ক্ষতি নেই! সালমান রুশদির ইংরেজি গদ্যও কিন্তু অনেক কাব্যিক; স্পেস ক্রিয়েট করে, শূন্যস্থান পাওয়া যায়।

আপনার গদ্যেও আমি কবিতার স্বাদ পাই। সেটা আমার ভালো লাগে।

আমি মূলত গদ্যগুলিকে কবিতার নিকটপ্রতিবেশি করার চেষ্টা করি। যে বিষয়গুলি কবিতা হয়ে আসে না তা-ই মুক্তগদ্যে লিখি।

যেমন ধরেন, আপনার লেখা উপন্যাস ‘জ্যোৎস্নার বেড়াল’-এ, অনেক অংশ আমার কবিতাই মনে হয়। এবং আমার পড়তে ভালো লাগে।

‘জ্যোৎস্নার বেড়াল’ রচনার সময় বর্ণনা লিখে লিখে যখনই ক্লান্ত হয়েছি, কবিতার আশ্রয় নিয়েছি। বিষয়টা অনেকটা সিনেমা-সম্পাদনার মতো; বিষয় বর্ণনার পর একটা স্পেস তৈরি করা, দৃশ্যান্তরে পলায়ন...। যে সব গদ্যে ধ্যান নেই সেগুলি পড়তে ভালো লাগে না। আমার বন্ধুদের অনেকেই বড় বড় গদ্যকার, কিন্তু দুঃখের বিষয়- দু'চার পাতা পড়ার পর আমি আর এগিয়ে যেতে পারি না; ক্লান্তি আসে, মনে হয়- স্রোত নেই, আড়ষ্ট, জটলাপাকানো বাক্যাচার। একটা লোকের মিথ্যেকথা কেন আমি আমার সময় খরচ করে পড়বো! মহৎ মিথ্যে কিন্তু সার্বিকভাবে সুন্দর এবং অনেকার্থদ্যোতক! ধ্যানের বিষয়টা আসলে জটিল কিছু না, গভীর পর্যবেক্ষণ মাত্র; যেমন—একটা জারুল গাছের দিকে একজন ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ তাকিয়ে আছে... তাকিয়ে আছে... এবং তাকিয়ে আছে...। একসময় গাছটিকে ইস্পাতের গাছ মনে হতে পারে, ঈষৎ পরে মনে হতে পারে মায়ের মতো, আবার প্রেমিকার মতো; শৈশবের গাভীর কথাও মনে হতে পারে, গাভীটাকে মনে হতে পারে জীবনের প্রথম প্রেমিকা। আসলে বিষয়গুলি এরকমই, লেখকের শক্তিমত্তার ওপর নির্ভর করে...

আপনার কি মনে হয় ডিকন্সট্রাকশন থিউরির পরে আর কোনো থিউরির দরকার আছে?

চোখের ভেতরের ছোট ছোট চোখগুলিকে তুলে আনার চেষ্টা, এই তো! সময়ের সঙ্গে এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে, সমুদ্রের ভেতর পুকুর তৈরি অথবা পুকুরের ভেতর সমুদ্র...

আমার মনে হয় বিশুদ্ধ কবিতা শেষ পর্যন্ত অধিবিদ্যার দিকে ধাবিত হয়? আপনি কী মনে করেন?

লেখ্যরূপে পৃথিবীর প্রথম কবি অ্যানহেদোয়ানার লাইনগুলি ছিল এরকম ‘I am yours And it will always be the so... May your heart cool off me May your understanding... compassion... I have experienced your great punishment. অ্যাকাডিয়ান এই রাজকুমারী প্রতিভোরে চন্দ্রমন্দিরে যেতেন আর চন্দ্রদেবীর সামনে দাঁড়িয়ে তা উচ্চারণ করতেন। চরণগুলি অধিবিদ্যাকেন্দ্রিক। স্যাফোর লাইনগুলি অনুবাদ করেছিলেন শিশির কুমার দাস (স্মৃতিভ্রম হলে দুঃখিত) ‘ওরে যে আজ আমার ঈশ্বরের মতো মনে হয়/ যে যুবক আজ তোমার মুখের পানে চায়।’ এই লাইনগুলিতেও অধিবিদ্যা আছে। তবে এখন আমরা মাঝে মাঝে নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে ঘড়ির গুণাবলি নিয়ে আসি আর ঘড়ির মধ্যে প্রতিস্থাপন করি হজরত শাহজালালের গুণ। এইসবই প্যারাডাইম শিফ্ট। এর মধ্যে আপনি যদি বলেন, মানুষ এক আধ্যাত্বিক প্রাণি আর আমি যদি বলি মানুষ এক ভাসমান চলমান বস্তু তাতেও বিশেষ কিছু যায় আসে না। গন্তব্য তো একই! এলিয়েট এর 'আমার মৃত্যু'র মতো আমি আমার মৃত্যুকে আমার মতো করে পান করবো। আমি মদ পান করি আর মৃত্যু পান করি, শেষ পর্যন্ত আমি আমাকে পান করছি। এইসব বিষয় কি অধিবিদ্যাকেন্দ্রিক! বিশুদ্ধ কবিতা হয়তো ঐন্দ্রজালিক হয় আর সমূহ ইন্দ্রজাল অধিবিদ্যার অন্তর্গত নয়; ইন্দ্রজাল হচ্ছে অধিবিদ্যার মৌলিক মুখোশ।

মহাভারত পড়লে শ্রীকৃষ্ণকে আমার খুবই আধুনিক, এবং কনটেম্পরারি মনে হয়। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আধুনিক বলে চিরন্তন তো কিছু নেই! দেবী দক্ষিণের পাশে দাঁড়ালে নিজকে শ্রীকৃষ্ণ ভাবতে বেশ ভালোই লাগে; অতঃপর সুইমিংপুলে সাঁতার কাটি, জলছিদ্রে ভেসে উঠে মথুরা-বৃন্দাবন। বৃন্দাবনে শপিং কমপ্লেক্স আর টিউমারের মতো ঘরবাড়ি কয়টা হলো কে জানে!

মৃত্যু নিয়ে কী ভাবেন? মানে আপনার মধ্যে কি মৃত্যুচিন্তা কাজ করে?

মৃত্যুশীল প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ভাবে কবি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মরন রে তুহু মম শ্যাম সমান’ অনতি-তরুণ বয়সে এ-কথাটিকে বিনির্মাণ করে বলতাম, মৃত্যু আমার গার্লফ্রেন্ড...
যাহোক, মৃত্যুটা কিন্তু জীবনের অনিবার্য অংশ; মৃত্যু ব্যতিরেকে জীবনের পূর্ণতা আসে না। আমি এমনও দেখি- দেখি বলতে সত্যি সত্যি দেখি, আমার মৃত্যুর এক'শ বছর পর আমার মাথার খুলিতে একটা সাপের বাচ্চা শুয়ে আছে, অলস দুপুরে রোদ পোহাচ্ছে। আমি ওই সর্প শিশুর চেহারা দেখে কাতর হই, কেমন মায়া মায়া লাগে।

মৃত্যু পরবর্তী ডিক্রিটেশন নিয়ে কি আপনার নিজস্ব ভাবনা-চিন্তা আছে?

ডিক্রিটেশনের বিষয়! পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ দু'টো পদ্ধতিতে প্রথা পালন করে—বায়োলজিক্যাল ডিক্রিটেশন, থার্মাল ডিক্রিটেশন। ছোটবেলা আগুনে পোড়ানোর বিষয়টি ভয় লাগতো, তবু শ্মশানঘাটের অদূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। মানুষপোড়া গন্ধ নাকে এসে লাগলে মনে হতো- মাথার মগজ বের হয়ে আসবে। আধুনিক থার্মাল পদ্ধতিতে হাড়মাংস পুড়িয়ে ফেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে।বিষয়টি নির্মম মনে হলেও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গিতে খুব স্বাভাবিক এবং আধুনিক প্রথা। কবরের বিষয়টি তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, এখন বিলেতে যে কবরগুলি দেখছি তা বাঙলাদেশের সিন্দুকী কবরের চেয়ে আলাদা। বিলেতে এতো গভীর কবরে কফিন রাখা হয় এবং মেশিন দিয়ে ঠাস ঠাস করে মাটি ফেলা হয় ভীষণ অনাধ্যাত্মিক লাগে, নির্মম লাগে।

তো এইটা কীভাবে কী হবে?

আমার মাথায় যে ভাবনাটি কাজ করে এর নাম দেবো ‘পোয়েট্রিক ডিক্রিটেশন।’ একটা ইলেক্ট্রনিক কফিন উদ্ভাবন করতে হবে, যার সক্ষমতা থাকবে কয়েক মিনিটের মধ্যে মরদেহকে নীল কুয়াশায় রূপান্তর করা; জীবিত মানুষের চোখের সামনে মৃত মানুষটি কুয়াশা হয়ে মিশে যাবে লতা-পাতায়, গাছের শেকড়ে অর্থাৎ প্রকৃতিপুত্র নীল কুয়াশা হয়ে মিশে যাবে তার আদি অবস্থায় অর্থাৎ মানুষ কুয়াশা হয়ে যাবে। এ ধরনের বৈদ্যুতিন কফিন আবিষ্কার অসম্ভব কিছু না। মানুষ এমনিতেই তো ক্যামিকেল এনটিটি।

সত্যকে উপেক্ষা করে আপনি কেন মহৎ মিথ্যার দিকে অনুগামী?

রাগ-মালকোষ শুনে পৃথিবীতে তিনজন মানুষ কোমায় চলে গেছেন আর কোনোদিন তারা ফেরত আসেননি— প্রায় পনেরো বছর আগে এই কথাটি আমায় বলেছিলেন পাকিস্তানের একজন সংগীতানুরাগী। রাগ মালকোষের প্রতি গভীর একটা টান এমনিতেই ছিলো, লোকটির কথা শোনার পর ভালোলাগার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়; বলা যায় রাত বারোটার পর রাগ মালকোষই আমার নিয়মিত সঙ্গীন হয়ে যায়। এখন কথা হলো- মালকোষ শুনে কেউ মারা গেছে বা সংগীত শুনে মৃত্যুবরণ সম্ভব, এরকম তথ্য অন্য কারো মুখে শুনিনি; লোকটির কথার সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনবোধও করিনি। সে যদি আমাকে মিথ্যেও বলে থাকে তা আমার কাছে মহৎ মিথ্যে, যা সত্যের চেয়ে অধিক সত্য, অধিক আনন্দদায়ক। আজকাল দেখি কাউকে কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে রেফারেন্স খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেলফোন টিপে গুগল-স্যারের দ্বারস্থ হয়, আমার ছেলে মেয়েরাও তাই করে। তারা আসলে সত্য এবং মিথ্যেকে ডিফাইন এবং রিফাইন করার কৌশল জানে না। মিথ্যেও যে প্রশ্নাতীত ভাবে মহৎ হতে পারে এ ব্যাপারে ব্যাপক অজ্ঞ তারা। আরিস্ততল তার কাব্যতত্ত্বে উল্লেখ করেছেন, কাব্যের সত্য বিশ্বজনীন, তা বিশেষ সত্য নয়, বিশেষ সত্য ইতিহাসে, কারণ তা বিশেষ মানুষের কথা। আর আমি বলি, সকল সত্য সার্বজনীন নয়, মহৎ মিথ্যে সার্বজনীন, যা ইতিহাসে সত্য নয় ঠিকই কিন্তু মানুষে অন্তরে গভীরতম স্থানে সত্যের অধিক জ্যোতির্ময়, বাহুল্যদোষহীন ও চাতুরতাবর্জিত। এই যে আমি বলি, কবিতায় পঞ্চপৃথিবীর ফরমালিন মিশিয়ে দাও কবিতা বুড়া হবে না, কবি মরে গেলে ক্ষতি নেই কবিতা মরে গেলে অবশিষ্ট কিছুই থাকে না। পঞ্চপৃথিবীর ফর্মালিন হচ্ছে মহৎ মিথ্যে, আর কিছু না।

 

 

মুক্তি মণ্ডলের সঙ্গে আলাপচারিতা

 

বাঙলা কবিতার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাঙলা কবিতা কোন অবস্থায় বা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের তুলনায় কোন অবস্থায় আছে?

বাঙলা কবিতার ধারাবাহিকতায় বর্তমানের কবিতা নিয়ে আমার ধারণা ধণাত্বক। আমার পূর্বতম কবিদের মতো বর্তমানকে অবহেলা করে অর্থহীনভাবে অতীতচারী হতে চাচ্ছি না। বর্তমান কবিতায় একটা সহজিয়া ভাব লক্ষ করছি, হয়তো পৃথক কণ্ঠস্বর তৈরির তাড়না থেকে। তবে অতি-আরামদায়ক কবিতা শেষ পর্যন্ত স্মরণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। সীমাবদ্ধতাও অনস্বীকার্য। ভাবনা-চিন্তার ফ্যাশনটিও এড়িয়ে যাওয়ার নয়; বেশ ঘনবদ্ধ। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাঙলা কবিতা কখনো পিছিয়ে ছিলো না, এখনো নেই।

দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

একজন সচল কবির জন্য দশ বছর বেশ দীর্ঘ সময় এবং দশ বছরে কয়েকটি কবিতা সণাক্তযোগ্য হয়ে উঠলে উঠতেও পারে। আলোচনার সুবিধার্থে দশক বিভাজন বেশ সুবিধাজনক। তবে দশকের বিষয়টি প্রগাঢ় ভাবে অস্তিত্বশীল হওয়া অবাঞ্চনীয়। কবিতা লেখা যেহেতু টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট ক্রীড়া নয়, দশক-কেন্দ্রীক চিৎকারগুলিও উচ্চহাস্যপ্রবণ। প্রত্যেক দশকেই অসংখ্য নিম্নমেধার সংকলন সম্পাদকের আবির্ভাব লক্ষ্য করা যায়, তা মূলত দশক চেতনার হুলস্তুল থেকে; গভীর চৈতন্যপ্রসূত নয়। একজন কবি পঞ্চাশ/ ষাট/ সত্তর দশকের কবি হয়ে বেশি দিন বাঁচতে পারে না; প্রকৃত কবি বেঁচে থাকে অনন্ত দশকের কবি হয়ে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাঙলা কবিতা কখনো পিছিয়ে ছিলো না, এখনো নেই।


আপনি তো কয়েকযুগ ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, ওখানকার কবিতা এই সময়ে কীরকম অবস্থায় আছে এবং সেটার সঙ্গে এখানকার এই সময়ের কবিতার তুলনামূলক কোনো বিচার কি করতে চান?

তুলনামূলক বিচারটা ঠিক যায় না যেনো! উভয় কবিতার সৌন্দর্য্য এবং ব্যক্তিত্ব আলাদা। জগতের প্রত্যেকটি বস্তুর আলাদা আলাদা আওয়াজ থাকে, কাঠের আওয়াজ থেকে লোহার বা কাগজের আওয়াজ থেকে কাঠপেন্সিলের শব্দ আলাদা। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে আমাদের অনেকেই ইংরেজি কবিতাকে মাত্রাতিরিক্ত তমিজ করে থাকেন। আমার কাছে বিষয়টা ঠিক ওরকম না। ভাষা যা'ই হোক, কবিতার আত্নায় অনুধ্যায়ী হলে শক্তিটা ধরা পড়ে। বাঙলা কবিতার প্রচুর্য অনেক। একজন Carol Ann Duffy কে নিয়ে এতো যে হৈ চৈ করল ব্রিটিশরা তাঁকে কি খুব বড় মাপের কবি মনে হয়েছে আপনার কাছে! ব্রিটিশরা আইডিয়ায় তো বরাবরই অগ্রসর! বেশি পরিমাণে দুধ দেয়ায় জন্য গাভীকে নিয়ম করে সংগীত শোনায়। গাভীর মনস্তত্বের ওপর নির্ভর করে দুধপ্রদানের বিষয়টি। ভালো কবিতা লেখার জন্য এ রকম কোনো আয়োজন এখানে না থাকলেও ইংরেজী কবিতা লিখলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়া যায়, যা বাঙলাদেশে প্রায়-অনুপস্থিত। তবে হ্যাঁ, ইংরেজী কবিতা হোক আর বাঙলাই হোক শেষ পর্যন্ত কবিতার কাছেই তো পৌঁছাতে হবে! বলা যায়- আপন ভাব ও ভাষা, সৌন্দর্যবিদ্যা নিয়ে উভয়ই স্বয়ম্ভু।

 

আন্দালীবের সঙ্গে আলাপচরিতা

 

দীর্ঘকালের অভিবাসন আপনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, ভাষা, মনোজগত, শব্দরুচি, প্রকাশভঙ্গী এইসবে কি কোনো প্রভাব ফেলেছে? সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এই ধরনের অবস্থান কী কোনো সুবিধা যোগ করেছে, নাকি এই দীর্ঘ সময়ের দূরবর্তীতা বাঙলা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে আপনাকে সমস্যায় ফেলেছে?

হ্যাঁ, বিশেষ প্রভাব ফেলেছে গদ্য রচনার ক্ষেত্রে। একটা সময় মনে হতো, গদ্য লিখবো তো মগজের খুলিতে লেগে-থাকা কথাগুলি চামচ দিয়ে চেখে তুলব, যে রকম অর্ধপুক্ত ডাবের ভেতর থেকে জলপতনের পর তুলে আনা হয় নারকেলের নরম গুদা। তা আর হয়ে উঠলো কোথায়! অর্থনৈতিক দৌড়-ঝাঁপ বিশেষ করে গদ্য রচনায় এবং নির্দিষ্ট পাঠে ব্যাঘাত তৈরি করেছে। এখানে বলে রাখা দরকার- আমি সিলেট অঞ্চলের মানুষ। সিলেটের ভাষা মূল বাঙলার চেয়ে অনেকটা আলাদা রূপ-রসে স্বয়ম্তূ হওয়ায় কেন জানি বাল্যবেলা থেকেই মনে হতো- আমার শব্দরুচি, কাব্যচিন্তা, চেতনা-চিত্র আলাদা হচ্ছে, হতে বাধ্য; সতর্ক অবিদিকরণ/ অপরিচিতিকরণের প্রয়োজন নেই। কুড়ি বছর বয়সে যখন দেশান্তরী হই, তখন কিন্তু পড়ে ফেলেছি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদ প্রকাশিত গ্রন্থগুলি (ঋণস্বীকার)। তারপর যখন রুশ ভাষা শিখতে যাই, মস্কো নগরীর পথে পথে যখন লম্বা কোট পরে হাঁটি, বুট পরি, নিজকে তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি মনে করি, তখনো কিন্তু কবিতা লিখি বাঙলায়। রুশভাষা শিক্ষক বলেছিলেন, ভাষা শিখতে গেলে অন্য সব ভাষা ভুলে যেতে হবে। একটা ব্ল্যাকবোর্ড যখন খালি থাকে, তাতে নতুন কিছু লিখতে সুবিধে হয়; অনুবাদ করে পড়লে নতুন কিছু আর শুদ্ধ ভাবে/ মৌলিক ভাবে শেখা যায় না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যে ভাষা আমি শিখতে যাচ্ছি প্রথমে সে ভাষায় স্বপ্ন দেখার কৌশল রপ্ত করতে হবে। একদা আমি রুশ ভাষায় স্বপ্ন দেখছি; স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নের ভেতর এরোফ্লোট চালিয়ে ল্যান্ডিং করেছি মইয়ারচরে, বাঙলার কাদা মাটিতে। বুঝতে বাকি রইলো না, রুশ ভাষার মধ্য দিয়ে আমি আসলে বাঙলা ভাষা শিখছি। বিলেত জীবন প্রায় দুই যুগ হতে চলছে। বিলেতকে এখন আর বিলেত মনে হয় না, নরসিংদী-জয়দেবপুর-মাদারীপুর মনে হয়। ক্যারালাইনের কবিতাকে মনে হয় মুন্সীগঞ্জের কোনো মহিলা কবির রচনা। আইনস্টাইন বলেছিলেন, যে যতো বেশি তার শৈশব উন্মোচন করতে পারে সে ততো প্রতিভাবান। আত্মতৃপ্তির ঢেকুর হয়তো স্বতোদ্ভাসিত হতো...! হলো কোথায়! আমার আট বছর বয়সে পিতার প্রস্থান হলো, তার দাফন হলো গ্রামের গোরস্থানে এশার নামাজের পর। অন্ধকারে মানুষ ভয় পায়, এই ভেবে পিতার কবরের ভেতর লন্টনের আলো রুয়ে আসি সেই কতো কতো আগে! আজ এতো যুগ পর সেই আলোর গাছ কতটা বড় হলো সেগুলি দেখার সময় পাচ্ছি কোথায়! নিজেকে মাঝে মধ্যে তাই মানুষ মনে হয় না, মনে হয় পুঁজিবাদী পোকা মাকড়! লেখালেখিতে সুবিধা অসুবিধা যোগ হয়েছে কী না, তা নিয়ে কখনো ভাবিনি, ভাবি না। লেখালেখি কিছু ছাইভস্ম হলো কী না— সেটাই তো জানি না!

সাহিত্যের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীবাদ, তাবুতন্ত্র, যূথবদ্ধতা—এই ধারণাগুলিকে কীভাবে দেখেন? এই গুলিকে কি উদারভাবে দেখবার কোনো উপায় আছে? আই মিন, সাহিত্যে এর কোনো ইতিবাচক অবদান…

গোষ্ঠীবাদের একটা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রয়েছে। শিখা গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কাজি মোতাহার হোসেন, আব্দুল ওয়াদুদ'রা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করেছেন; সমাজ ও চিন্তাভাবনার জগতকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। এ-রকম গোষ্ঠীবাদ সন্দেহাতীত ভাবে উজ্জ্বল। গোষ্ঠীবাদের মধ্যে বড় হয়েছেন সালভাদর, ব্রেতোঁ'র মতো প্রতিভাবানরা। কিউবিজম, দাদাইজম, সুররিয়ালিজম, ফিউচারিজম এ-সবই তো একটা শক্তিশালী গোষ্ঠীর চূড়ান্ত চলনের ফল। বাঙলার পথে, ঘাটে, মসজিদে, মন্দিরে চারদিকে সুররিয়ালিস্টে ভরপুর। পশ্চিমারা বলার আগে আমরা কেউ কি এ-নিয়ে কথা বলেছি! বাঙলায় শিখা গোষ্ঠীর পর এরকম কেউ আর দাঁড়াতে পারে নি। গেলো ত্রিশ বছর ধরে ঢাকার গোষ্ঠীবাদী চর্চাগুলি হাস্যকর পর্যায়ে চলে এসেছে। নিম্নমেধার লোকজন গোষ্ঠীবদ্ধ হওয়ায় এদের কার্যক্রম অনেকটাই আলু-পেঁয়াজের সিন্ডিকেট-ব্যাবসায়ীদের মতো। সৃষ্টি ও দার্শনিক উপলব্ধির জায়গায় তাই তারা ঝাকুনি দিতে পারে নি। ইদানীং আমাদের দেশে গোষ্ঠীবাদী কিছু জ্ঞানপাপীদের উচ্চকণ্ঠ হতে দেখি। মৌলবাদের সঙ্গে মার্ক্সবাদ মিলিয়ে মিশিয়ে অনতি-তরুণদের বিভ্রান্ত করছে।
বিভ্রান্তি তৈরির মৌলিক মুখোশ হলো সুফিবাদ। আধিপত্যবাদ/রণকৌশলবাদের আরেকটি রূপ যে বাঙলার সুফিবাদ সে বিষয়টি সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। তাই সাধারণের মাঝে একটা সময়ের জন্য অসাধারণ হয় জ্ঞানপাপীরা। তবে হ্যাঁ, শেষ বিচারে শিল্পী কিন্তু নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, একা এবং একাই...

শিল্প-সাহিত্যে জাতীয়/ বিজাতীয় পুরস্কারগুলি প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে জাতীয় বা বিজাতীয় পুরস্কার কোনো ভূমিকাই রাখে না। জীবনানন্দ, বোদলেয়ার কয়টা পুরস্কার পেয়েছেন! কবিদের রাজা তো তারাই! পুরস্কারকে কেন্দ্র করে অনেক গৌণজন আলোচনায় চলে আসে। অনেক সময় প্রকৃতজনরাও পুরস্কার পেয়ে যান। তখন একটা ভালোলাগা তৈরি হয়। এই আর কি! পুরুস্কার যেহেতু প্রদান করে প্রতিষ্ঠান সেখানে প্রতিষ্ঠানেরও গোপন বা প্রকাশ্য স্বার্থ থেকে যায়। আমি পুরষ্কারের বিপক্ষে হলেও দু'তিনটে পুরস্কারের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে জড়িত আছি। পুরস্কার যেহেতু দিতেই হবে তো প্রকৃতজনদের দেয়া হোক! আমার নিজেরও ইচ্ছে আছে, আগামীতে পুরস্কার প্রদান করবো। বিষয়টি স্ববিরোধপূর্ণ হলেও করবো... because I content multitude. আশির দশকের কবি বিষ্ণু বিশ্বাসের অনেক গল্প শুনেছি আমার মৃত বন্ধু কিশয়ার ইবনে দিলয়ার-এর মুখে। শুনেছি ওই দশকের একাডেমি কেন্দ্রিক কতিপয় পণ্ডিত, অর্ধ-পণ্ডিত বিষ্ণুকে খুব আক্রমণ ও অপমান করতেন। বিষ্ণু বিশ্বাস কোনো প্রতিবাদ করতেন না, কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন...

বিষ্ণু বিশ্বাস একজন আত্মবিধ্বংসী কবি'র নাম। বিষ্ণু প্রায় হারিয়ে গেছেন প্রায় এক যুগ হলো। কে জানি সর্বশেষ তাকে দেখেছে বাঙলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী কোনো গ্রামে! আমি দূর দেশে বসে এখনো বিষ্ণু বিশ্বাসকে খুঁজি। ২০০৮ সালে আমি যখন বইমেলায় যাই (এহেন মানব জন্মে এই এক বারই গিয়েছি) বয়রাতলায় দাঁড়াই, তখনও আমি হাজার মানুষের ভিড়ে বিষ্ণুর চক্ষুদ্বয় খুঁজেছি। আশির দশকের যে ক'জন আত্মবিধ্বংসী কবির নাম আসে এর মধ্যে শোয়েব শাদাব, বিষ্ণু বিশ্বাস, কিশোয়ার ইবনে দিলওয়ার এই ত্রয়ী নাম অত্যুজ্জ্বল। কোনো সরকারি বা বাণিজ্যিক খোঁয়াড় প্রতিষ্ঠান এদের চিহ্নিত করবে না। আমি জানি, এসব পুরস্কার কবি'র কোনো উপকারে আসে না। তারপরও আত্মতৃপ্তির জন্য এসব আনন্দের কাজ স্বার্থপরের মতো করতে চাই। পুরস্কারকে কেন্দ্র করে আমি সর্বদা স্ববিরোধী নই; দু'টা পুরস্কার নিজেও অস্বীকার করেছি। কবিতা রচনার জন্য কেউ যদি পুরস্কারের বদলে তিরস্কার দেয় তাহলে এই লাইনের প্রথমে আমিই দাঁড়াবো। আর তো জানি, যদি নোবেলে পুরস্কারও নির্ধারণ করা হয় তাতেও কিছু যায় আসে না। অনেকেই নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তারপর আত্মহত্যাও করেছেন। অতএব আমি নোবেল পুরস্কার পেলেও নতুন কিছু হবে না। তিরস্কার পেলে অন্যরকম হবে... আমি অন্যরকম কিছুতে আনন্দ লাভ করি...


কেবল সংস্কৃতিচর্চার পরিধি বিস্তৃত করলে, বা পরিবার সময় দিলেই বাঙলাদেশের চলমান ধর্মীয় উগ্রবাদ রুখে দেয়া যাবে না। একে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলাও জরুরী। এ বিষয়ে বর্তমান বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের কোনো প্রস্তুতি দেখতে পাচ্ছেন কী না?

আপনি যদি সরকারের কথা বলে থাকেন তাহলে বলবো, জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের তৎপরতা দৃশ্যমান এবং একরকম স্পষ্ট। আপনি যদি জনজাতিসহ পুরো সমাজের কথা বলে থাকেন তাহলে বিষয়টি বেশ ঘোলাটেই বলা যায়; কার্যক্রমের ক্যানভাস অস্পষ্ট। ধর্মীয় উগ্রবাদের বিষয়টি অল্পদিনের নয় সেহেতু উগ্রবাদ উপড়ে ফেলা অসহ্জ হবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদের কিঞ্চিৎ রূপ বাঙলার মানুষ প্রত্যক্ষ করছে মাত্র, হয়েনা রূপ এখনো দেখেনি। সাংস্কৃতিক চর্চার যে পরিধির কথা বলছেন তাওতো অস্পষ্ট। সংস্কৃতি বলতে তো নাচা গানা বোঝায় না; ধর্ম-অধর্ম-নৃত্য-উগ্রবাদ-অনুগ্রবাদ সবকিছু মিলিয়েই তো সংস্কৃতি! এখন কোনটার পরিধি বাড়াতে হবে! একটার পরিধি বাড়িয়ে কি অন্যটার পরিধি কমানো যায়! বহু যুগ হল বাঙলার সংস্কৃতিকে অন্যান্য সংস্কৃতি ওভাররান করেছে। উগ্রবাদ দমনে বাঙলার বুদ্ধিজীবীদের সাম্প্রতিক মতামতে আমি বেশ অনুধ্যায়ী হয়েছি। দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম- কেউই সমস্যার কাঁচামাল বা উপকরণ নিয়ে কথা বলছেন না; যুক্তিহীন, ভাবালুতা সম্পন্ন এলোমেলো এবং নিজস্ব অবস্থানে দাঁড়িয়ে সুবিধাসম্পন্ন সব বাক্যাচার... উপকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বর্তমান সরকারের মধ্যে কম করে হলেও বিশ ভাগ লোক মনস্তাত্ত্বিক ভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদ লালন করছে। তারা আবার উগ্রবাদ দমনের জন্য রাস্তায় নেমেছে। আবার এই সত্যটিও মানতে হয়- বাঙলার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ প্রকাশ্যে, অপ্রকাশ্যে, জেনে, অর্ধ-জেনে, না-জেনে উগ্রবাদী, অর্ধ-উগ্রবাদী। অশুদ্ধ উপকরণের বিস্তার নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয় বাঙলার সমাজ। প্রসঙ্গত একটু অতীতচারী হতে ইচ্ছে হচ্ছে। মোঘল সম্রাট শাহজাহান-পুত্র দারাশিকো মাজমা-উল বাহরিন নামে একটা বই লিখেছিলেন; এর অর্থ দুই সাগরের মিলন। বইয়ের মধ্যে তিনি প্রাচীন ভারতের ত্রিমূর্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরের সঙ্গে সমান্তরাল মিলিয়ে ছিলেন জিব্রাইল, মিখাইল, ইস্রাফিল এর। তার যুক্তিও বেশ প্রখর ছিল। ‘ব্রহ্মা’ এই জ্ঞান দাদুর সঙ্গে জ্ঞানী জিব্রাইলের তুলনা করেছিলেন। মহেশ্বর ধ্বংসের প্রতীক, ইস্রাফিল ও তাই। বিষ্ণু ও মিখাইল অস্তিত্বের ধারক। দারার শিরোচ্ছেদ করেছিলেন তার ছোট ভাই আওরঙ্গজেব। দারার শিরোচ্ছেদর সঙ্গে অভিজিৎ রায় হত্যার তুলনা করে সরলীকরণ করছি না, উচিতও হবে না; তবে অনুল্লেখযোগ্য নয়, ভ্রাতা দারাশিকোর শিরোচ্ছেদ করে বন্দী পিতা শাহজাহানের নিকট শির উপহার পাঠিয়েছিলেন আর জনগণের কাছে ঘোষণা করেছিলেন যে দারা হচ্ছেন ইসলামের জন্য খতরা (ইসলাম ধর্মের জন্য হুমকি স্বরূপ)। অভিজিৎও জঙ্গীদের দৃষ্টিতে ইসলামের জন্য খতরা ছিলেন বলে খুন হতে হলো। দারা ছিলেন ওই সময়ের প্রগতিশীল, জ্ঞানপিপাসু (উপনিষদকে ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন)।

বিস্ময়ের বিষয় হলো, যে মাটিতে ১৯৭১ সালে ধর্মের ছত্রছায়ায়, ধর্মকে পুঁজি করে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়েছে, গণ-ধর্ষণ হয়েছে, সে মাটিতে কী করে ধর্মীয় উগ্রবাদ বারংবার ফণা তোলে! বিস্তর আলোচনার দরকার।

আপনি বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলাও জরুরী। রাজনীতি তো সমাজবিজ্ঞানের একটা অংশ মাত্র! ইঞ্জিনিয়ারিংটা কী রকম হবে! যারা এক সময় বাঙলার মরমীবাদের বিরোধিতা করেছে, লালনের একতারা ভেঙে দিয়েছে তারাই তো এখন লালন লালন বলে চিৎকার করছে; উত্তরাধুনিকতার নামে ছড়াচ্ছে ফকিরালি। এখন যারা কথায় কথায় কার্ল মার্কস সঙ্গে রুমী, হাফিজ, নজরুলকে নিয়ে আসে ওরাই তো এক সময় হাফিজকে, নজরুলকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে! এরা আসলে জঙ্গীবাদের শুভার্থী! জেহাদ প্রচারকরা রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় থাকবে, প্রধানমন্ত্রী মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চালাতে চাইবেন, ধর্মের নামে অনুদান দিয়ে যাবেন, বিশেষ প্রয়োজনে ভাসমান ধর্মাগারও তৈরি করে দেবেন, আবার ছেলেমেয়েরা জঙ্গি হলে গুলি করেও মারবেন, তা-তো যৌক্তিক হতে পারে না! আসলে দুর্বল অনুমান দিয়ে একটা সমাজকে বেশি দূর এগিয়ে নেয়া যায় না। বাঙলাদেশ অনুমানের ওপর চলছে; অনুমানের ওপর চলছে মুসলিমজাহান। এই তো কয়েকদিন আগের খবর, ব্রিটেনের এক ধর্মশালায় বাচ্চাদেরকে পাঠদান করা হচ্ছে যে, যৌনদাসী রাখা ইসলামসম্মত। অর্থাৎ বলাৎকারকেও প্ররোচিত করা হচ্ছে এবং ইসলামাইজ করা হচ্ছে। আমি নিশ্চিত, এইসব শিশুরা, যারা গণ-প্রজাতন্ত্রী বাঙলাদেশের সন্তান তাদেরকে শেখানো হয়নি যে ‘মানুষের প্রয়োজনে ধর্ম, ধর্মের প্রয়োজনে মানুষ নয়।’ তাদেরকে কেউ কোনোদিন বলেনি যে ‘জীব প্রেম করে যেইজন/ সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’


কবির রাজনৈতিক অবস্থান থাকবেই। নিজের প্রজ্ঞা বলে তিনি কখনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রচিন্তকও বটে। কিন্তু কবি যেহেতু অ্যাকটিভিস্টের মতো মাঠে ময়দানে স্লোগানে থাকেন না, ফলে কবি-সাহিত্যিকদের রাজনৈতিক অবস্থান বা ভূমিকা নিয়ে সবার মধ্যেই সংশয় থাকে। মানে কবি সমস্যার দিকে আঙুল তোলেন, কিন্তু এর সমাধান দেন না। অনেকে একে নিস্পৃহা বলেন, কবিকে সুবিধাভোগী বলে নিন্দা করেন। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে আঙুল বাঁকা করে ঘি উঠানো কী কবির দায়িত্ব? বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

রাষ্ট্র পরিচালনার কাজ অনেকটাই মিস্ত্রিবিদ্যকের কাজ, রাজনীতিবিদরা তা করে থাকেন। কবি'রা হচ্ছেন রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্বিক অধিপতি। একজন কবিকে একটিভিস্টের মত মাঠে ময়দানে শ্লোগানের মাধ্যমে থাকার প্রয়োজন নেই; কবির চিন্তা ভাবনা তো মাঠে ময়দানে আছে! কবিদেরকে সুবিধাভোগী বলে যারা নিন্দা-মন্দ করেন তারা মূলত সীমাবদ্ধ ভাবনা থেকেই করেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে আঙুল বাঁকা করে ঘি উঠানোর দায়িত্ব প্রকৃত কবির নয়; অর্ধ-কবি, রাষ্ট্রের পোষ্য কবি (দলকবি/ দলদাস), অকবিরা তা করে থাকেন। অবশ্য মাঝে মাঝে বৃহত্তর চিন্তা থেকেও অনেক প্রকৃত কবি রাষ্ট্রের বড় কর্মযজ্ঞে অংশ নিলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না। প্রকৃত কবি প্রতিষ্ঠানের নতজানু নীতির সঙ্গে অভ্যস্ততা তৈরিতে প্রায়-অক্ষমই বলা যায়। কবি শামসুর রাহমানকেই দেখুন, সবাই তাকে আওয়ামী ঘরানার বুদ্ধিজিবী হিশেবে গণ্য করতেন। তিনি বাঙলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে মাস-কয়েকও টিকতে পারেননি; মার্কসিস্ট লেখক হয়েও, অ্যাকটিভিস্ট হয়েও একটি মায়াকোভস্কির সঙ্গে লেনিন-প্রশাসনের সম্পর্ক কতো তিক্ত ছিলো!