বাবুল হোসেইন

কবিতা কিছুই না, অন্তত আমি কবিতাকে কিছুই মনে করি না বাবুল হোসেইন


 

[বাবুল হোসেইন। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। পেশা আইটি সেক্টরে। কম্পিউটারে স্নাতক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুইটি, বিমূর্ত ক্যানভাস আর আত্মমুগ্ধ শিকল। সম্পাদিত ছোটকাগজ লিপি। এই তরুণের সঙ্গে আমি কথা বলেছি নানা বিষয় নিয়ে কথাবলির পক্ষ থেকে। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।]

 

আপনার লেখালেখির শুরুটা নিয়ে বলেন

ছোটবেলা পড়তে চেয়েছি খুব। যা পেয়েছি, যা পাই নি তাও পড়ার আক্ষেপ ছিলো। কিভাবে কিভাবে জানি লেখকদের জগৎটা আমাকে আলোড়িত করে ফেললো। পড়তে পড়তে একদিন লেখার জগতে আসা। লিখবো যে তা ভাবি নি তখনো মানে যখন পড়তে শুরু করি। ক্লাস থ্রি থেকে শুরু পড়া। সেবার বই আর ওয়েস্টার্ন অনুবাদের বিশাল একটা কালেকশান পড়েছিলাম হাই স্কুল লাইফে। প্রথমে যে বই দিয়ে পড়া শুরু সেটা একটা চটি বই, ছোটকাকুর বালিশের নিচে যেগুলি প্রায়ই থাকতো। অশ্লীল সেসব বই তিনি পড়তেন আর আমাকে পড়ার আগ্রহি করেছে সেইসব গোপন বইসমূহ।

প্রথম কবিতা কখন লিখলেন?

সেই কবে। মনে নেই। অসংখ্য লেখা নষ্ট করে করে একজন কবিকে যেতে হয়। তাই প্রথম কখন কবিতা লিখেছি মনে নাই। রেখে লাভ কি? এখনো একটা কবিতা লিখতে পেরেছি কিনা জানি না। হয়তো একদিন পারবো।

আপনার কবিতা লেখার পেছনে কি কারো অনুপ্রেরণা ছিলো?

প্রথমে জীবনানন্দ ছিলেন। পরে আর কেউ অনুপ্রেরণা ছিলো না। পড়তে পড়তে একদিন লেখার তাগিদ পেলাম, তাই লিখছি। কবিতা কী? কিছুই না। অন্তত আমি কিছুই মনে করি না।

বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

অনেকের কবিতাই করে। পড়তে পড়তে যেহেতু রুচিবোধ তৈরি হয়েছে তাই প্রভাব থাকেই। নিজস্বতা তৈরির নিরন্তর চেষ্ঠা সব কবিই করেন জীবনভর, আমিও তার ব্যতিক্রম নই। প্রভাব কাটিয়ে একদিন নিজস্ব স্বর নির্মাণের স্বপ্ন দেখি। অনেকের কবিতাই পড়ি। প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া যায় না যদিও আমি ভুলে যাই অনেককিছুই। শুরুতে জীবনানন্দকে মাথা থেকে সরাতে পারতাম না। কেনো যেনো কিছু লিখতে গেলেই জীবনানন্দ এসে কানে মন্ত্রণা দিতেন। আমার অনেক ডায়েরিই লেখা হয়েছিলো জীবনানন্দকে অনুকরণ করে। বলা ভালো- আমার কবিতা পড়ার শুরু ও গুরু দুইটাই জীবনানন্দ দিয়ে। ক্লাস সিক্সে রূপসী বাংলা পাই স্কুল থেকে, পরের বার বনলতা সেন। আমি আর শেরন মানে আমার বন্ধু প্লাস ক্লাসমেইট পালা করে সেই বই এবং আরো সংগ্রহ করা বই পড়তাম। এবং আমরা তখন সবুজপত্র নামে একটা কাগজে করতাম, মফস্বলের অন্ধকার এক গ্রামে থেকে। ক্লাস এইটে তখন আমরা।

কেনো জীবনদাশের কবিতা আমরা বারবার পড়ি, সেই তুলনায় তিরিশের অন্য চার কবির কবিতা পড়ি না?

জীবনানন্দ আমাদের মর্মমূলে যেভাবে নাড়া দিতে পেরেছেন, বাকিরা সেটা পারেননি।

কবিতা কী?

কবিতা কিছুই না, অন্তত আমি কিছুই মনে করি না।

কবিতা কেনো লিখেন?

লিখতে চাই, তাই লিখি। ভেতরে তাড়া আছে বলেই লিখি। না লিখে পারি না তাই লিখি।

কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কিছুই নাই। দায়-ফায় দিয়ে কবির কাজ নাই। দায় তখনি আসে যখন এর উপযোগিতা নিয়ে সমাজ ভাবে। কাজ করে। কিন্তু সেটা শিল্পের জন্য হিতকর নয়। শিল্প যে মুক্ত আকাশের স্বপ্ন দেখে, দায় সেইসবকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলে। দায় থাকলে শিল্পকে আরোপিত লাগবে।

আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

কেমন করে আসে তা জানি না অথবা তার কোনো ধরন নেই আসার। কোলাহলের ভেতর, নৈঃশব্দ্যের ভেতর কিংবা আত্মমগ্নতার ভেতর হঠাৎ দুয়েকটা লাইন এসে নিমগ্ন করে ফেলে। এতো কোলাহলের ভেতরেও নিজেকে খুব একলা মনে হয়। মনে হয় সংসার সায়রে আমি এক নিঃসঙ্গ নাবিক।

ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় হয়নি। এরপরে সচেতনে আর কিছু হতে চাইনি কবি ছাড়া। এখনো কবিই হতে চাই। আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে যেহেতু চাকরিই করছি, এছাড়া অন্য কোনো পথ নেই জীবন জীবিকার। কবির পেট নেই এই সমাজ এটা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে আগেই।

নিয়মিত কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে?

আমাদের এই দশকের অসংখ্য কবিতা অন্তর্জালে নিয়মিতভাবে পড়ি। আমি অনেকের কবিতাই পড়ি। পড়ার একটা মোক্ষম সময় বের করে পড়ি। শহীদ কাদরি পড়ে এতোটা তন্ময় হয়েছিলাম একবার হোটেলের রুমে, পাশের রুমের মানুষেরা ভিড় করেছিলো দরজার সামনে। নৌকায় বসে একবার তসলিমা নাসরিন পড়ে কেঁদেছিলাম। আমার প্রিয় কবির তালিকায় তিনিও আছেন।

আপনার সময়ের কবিদের কবিতা সম্পর্কে বলেন

আমার সময়ে অনেক সম্ভাবনাময় কবি আছেন। তাদেরকে আমরা একদিন তাদের নিজস্ব আলোয় উদ্ভাসিত হতে দেখবো। তারা অনেক ভালো লিখছেন। সময় ও নিবিড়চর্চা তাদেরকে একদিন মহৎ কবিতাকর্মীর কাতারে নিয়ে যাবে। তবে কবির সংখ্যাধিক্য নিয়ে কথা না বলাই ভালো। সময়ের থেকে ভালো ফিল্টার আর কিছুই হতে পারে না।

আপনার কি মনে হয় কনটেম্পরারি কবিদের নাম উঠিয়ে দিলে কবিতা পড়ে কবিদের চেনা যাবে?

নিবিড় পাঠে সবাইকেই চেনা যায়। আপনি যদি সবার মতই ভাবেন, পড়েন তাইলে এইটা মনে হতে পারে। কিন্তু পাঠকের জন্যও নিবিড়পাঠ একান্ত দরকার। প্রত্যেক কবিই তার নিজস্বতা নির্মাণের চেষ্টা করছেন। হ্যা, সময়ের পরেই শুধু এ প্রশ্ন খাটে। আজকেই লেখালেখি শুরু করা কাউকে আপনি বিচার করতে যেতে পারেন না। কবি হবার জন্য সময় দরকার। আর একই সময়ের ভেতর দিয়ে যেহেতু সবাইকেই যেতে হচ্ছে তাই একই বিষয়ে সবাই কথা বলছে, আপাতদৃষ্টিতে এরকম মনে হলেও, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা পর্যবেক্ষণ আছে, যাপন পদ্ধতি আছে। আছে নিজের পথ তৈরির কারিকুরিও।

আপনাকেতো মাঝে মাঝে গল্পও লিখতে দেখা যায়

হ্যাঁ, আমি গল্পও লিখেছি বেশ কয়েকটা।

আধুনিক গল্প কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আধুনিক গল্পে বিষয়ের এতো বৈচিত্র এবং ভাবনার এতো স্পেস দাবি করে যে, এসব না হলে গল্পকে খেলো মনে হয়; যেহেতু কবিতার থেকে গল্প বেশি চর্চিত ও পঠিত হয়।

চাইলেই ঘুমোতে পারেন, মানে ইচ্ছে ঘুম?

ইচ্ছেঘুম? আমার তো ঘুমই আসে না। ওষুধ খেয়ে ঘুমুতে হয়।

ঘুম না এলে কী করেন?

ঘুম না এলে নানাকিছু করি। বেশির ভাগই ফেসবুক। অথবা কবিতা পড়ি। অথবা লিখি। অথবা স্মোকিং ননস্টপ।

আর গান? কার গান শুনতে ভালো লাগে?

অনেকের। রবীন্দ্রনাথের গান শোনে কেঁদেছি অজস্রবার। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনেকের গানই শোনা হয়েছে, এখনো শোনার মধ্যেই আছি। রক, মেটাল, হেভি মেটাল, ফোক, লালন, শাহ আব্দুল করিম এমনকি কাঙালিনী সুফিয়াকেও শোনা হয়। আমি ছোটবেলায় শাহ আব্দুল করিমের গানের আসরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। বেশ কবার।

লেখালেখি প্রকাশের মাধ্যম হিশেবে অর্ন্তজালকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ভালো। অন্তর্জালে যেহেতু কোনো সম্পাদকের অধীনে নাই তাই ফ্রিলি সবাই লিখতে ও প্রকাশ করতে পারে। এর খারাপ দিক হলো সবাই কবি/লেখক হয়ে যাচ্ছে। ভালো দিক হলো আঁতেল সম্পাদকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না। আউটকাম বিচার হবে আরো পরে মানে অন্তর্জাল থেকে কজন লেখক বের হলো তার ওপর।

লেখালেখি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

পরিকল্পনা তেমন নাই। বড় পরিসরে কাজ করার ইচ্ছে আছে সময় ও সুযোগ পেলে।