আসমা অধরা

কবিতা হলো খুব আঁকড়ে ধরে থাকার মতন অবলম্বন আসমা অধরা

[মহান একুশে বইমেলা ২০১৭ কে সামনে রেখে কথাবলিডটকম আয়োজন করেছে এমন কতিপয় কবি ও কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকারের যাদের এই মেলায় নতুন কিংবা প্রথম বই প্রকাশ পাচ্ছে। এই পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি কবি আসমা অধরার সঙ্গে। এই মেলায় প্রকাশিত হচ্ছে তার নতুন কাব্যগ্রন্থ হাওয়াকল’ প্রকাশক ভিন্নচোখ। তিনি আমাদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। আসুন, এইবার তার কথা শুনি। — নির্ঝর নৈঃশব্দ্য] 

 

নিজের বই নিয়ে অনুভূতি কী?

যা কিছু আমি লেখার মধ্যে বলতে চেয়েছি তাই ছাপার অক্ষরে যাচ্ছে। এর বাইরে বিশেষ কোনো অনুভূতি আমার নেই।


ছোটোবেলায় কিছু হতে চাইতেন?

ছেলেবেলা থেকে এখন পর্যন্ত মহাকাশের প্রতি আমার সীমাহীন আগ্রহ ছিল, আছে। অদ্ভুত বিধ্বংসী এক আকর্ষণ বোধ হয়। তখন আমি মহাকাশ বিজ্ঞানী বা পাইলট হতে চাইতাম।


আপনার লেখালেখির শুরু কবে থেকে মানে কতোদিন ধরে লেখালিখি করছেন?

একভাবে বলতে গেলে সেই স্কুল থেকেই, নিজের খাতা ভর্তি করে কবিতা লিখতে চাইতাম, লিখতাম। আবার প্রকৃতপক্ষে এখন বুঝি সেই অর্থে লেখালিখির শুরুই আমি করতে পারি নাই।


আপনার লেখালেখির শুরু কেনো বলে মনে হয়?

অনেক কথাই আমি বলতে চাইতাম বা চাই, যা বলতে পারিনা বা বলে ওঠা হয় না। সেসব কথাই একসময় আমি লিখতে শুরু করেছি এইভাবে।


আপনি কি শেষ পর্যন্ত কবি হতে চান, নাকি অন্যকিছু?

শেষ পর্যন্ত আমি আর কিছুই হতে চাই না।


আপনার কাছে কবিতা কী?

কবিতা মানেই কথা, কবিতা মানে মনন, ছবি- দৃশ্যকল্প, প্রতিবাদ, ভালোবাসা, কবিতা মানে মিছিল। কবিতা হলো খুব আঁকড়ে ধরে থাকার মতন অবলম্বন, খুব একা সময়ে বা সবসময়েই নির্ভরযোগ্য প্রিয় বন্ধু যে হটাত ফুঁসে উঠে ছোবল দিতে চায় না। আশ্রয় দেয়, ছায়া দেয়, জড়িয়ে রাখে।


আপনার মাথার মধ্যে কবিতার ইমেজ কেমন করে আসে?

আমি হয়তো একটা ঘটনা দেখছি, শুনছি বা পড়ছি। ওই সময় কিছু প্রতিক্রিয়া হয় যা বলতে চাই। বা একদম নিষ্ক্রিয় কিছু সময় থাকে যে সময় আমি কিছুই করি না, ইচ্ছাকৃত ভাবে ভাবিনা বা ভাবতে চাই না। তখন হটাত মনে হয় আমি আসলে অনেক্ষণ ধরেই অনেক কিছুই ভাবছিলাম যা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যন্ত্রণা হয় মাথার ভেতর। অথবা চারিদিকে অসংখ্য মানুষ, খুব কোলাহল। অথচ ওই সময়ের একটা শব্দও আমি শুনতে পাইনি। সবকিছুর মধ্যে থেকেও কিছুর মধ্যেই ছিলাম না, কিছুই দাগ কাটেনি। সেই সময় গুলোয় এমন অনেক দৃশ্য আমার ভেতর কাজ করে, বলা যায় ভাবনাগুলোকে আমি ভিজুয়ালাইজ করতে থাকি।


বিশেষ কারো কবিতা কি আপনাকে প্রভাবিত করে?

অনেকের কবিতাই খুব বেশি ভালো লাগে। নাসিমা সুলতানা, সোয়েব শাদাব, ওয়াল্ট হুইটম্যান, অ্যানা সেক্সটন, আবুল হাসান, সিলভিয়া প্লাথ, মহাদেব সাহা, বিনয় মজুমদার, সুকান্ত ভট্টাচার্য, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী এরকম আরো অনেকেই আছেন।


আপনার নিয়মিত কার কার কবিতা পড়তে ভালো লাগে, কেনো লাগে?

আমি আসলে যতটা পারা যায় সবাইকেই পড়তে চেষ্টা করি। সমসাময়িক সবাইকে না হলেও অনেককেই পড়ার চেষ্টায় থাকি, আর আগে যাদের নাম বললাম এদের সবার কবিতাই নিয়মিত পড়তে ভালোলাগে।


কবি এরং কবিতার দায় সম্পর্কে আপনার মত কী?

কবিতার কোনো দায় থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না, বা নেই। সেক্ষেত্রে কবির কিছু দায় অনেকাংশে থাকতে পারে কারণ যখন একজন কবি নামে পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করেন তখন তার পাঠকদের কিছু প্রত্যাশা জন্মে যায় সেই ব্যাক্তির প্রতি। তবে আমি মনে করি কবি তার নিজের কাছেই দায়বদ্ধ সবচাইতে বেশী, কারণ তার ভালোলাগার জায়গা থেকেই কবিতার জন্ম, চর্চা মূলত। যদিও তার কবিতায় যারা আবিষ্ট, মোহিত, বা প্রভাবিত হন, তাদের প্রতি কবির সুক্ষ্ম দায়বোধ থেকেই যায় যা অনেকেই অস্বীকার করতেও পারেন।


আপনার সমকালীন কবিদের লেখা কবিতা সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

সমকালীন প্রত্যেকের কবিতাই পড়া সম্ভব হয়ে ওঠে না, ব্যাপারটা কঠিন। কারণ বর্তমান সময়ে অসংখ্য মানুষ কবিতাচর্চা করছেন। তবুও ভার্চুয়াল মাধ্যমের কারণে অনেক সহজেই অনেকের কবিতা পড়া যায় যাদের অনেকেই খুব ভালো লিখেন। তবে প্রত্যেকেরই তাদের কবিতায় একান্তই নিজের একটা স্বর তৈরী করার প্রচেষ্টা আছে।


এই সময়ে যারা কবিতা লিখেন তাদের কবিতা বিষয়ে বলেন। তাদের অনেকের মাঝে কি স্টান্টবাজি লক্ষ করেন না?

এই সময় যারা লিখেন তাদের কথা তো বললামই। আর যারা লিখছেন বর্তমান সময়ে, তাদের মধ্যে নিজেকে আলাদা করার যে প্রবণতা বা নিজস্ব স্টাইল, স্বর তৈরীর প্রচেষ্টা সেটা খারাপ না। অনেকেই শব্দ নিয়ে খেলেন, বৈচিত্র আনেন, যেখানে জীবন বা দর্শন কম, অনেকেই মেটাফোর নির্ভর লিখেন, কেউ কেউ ছন্দ, কেউ খুব সহজ ভাষায়, কেউ অপ্রচলিত কিন্তু খুব ঋদ্ধ শব্দভাণ্ডারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন পাঠকদের। অনেকেই গদ্য কবিতা যা বহতা নদীর মতো, তা নিয়ে কাজ করছেন, এটা যার যার নিজস্ব ভাবনা। এইসব নিরীক্ষাধর্মী কবিতায় যেমন সাবলীলতা আছে, বৈচিত্র্য আছে তেমন কিছু একঘেয়ে ব্যাপারও আছে, কিন্তু তাই বলে এঁকে আমি স্টান্টবাজি হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাই না।


দশক বিভাজন বিষয়ে আপনার মত কী?

কোন কবিকে টিকিয়ে রাখার জন্য দশক জরুরী না। একজন কবির উত্থানের কাল নিরূপণ ছাড়া দশকের আর কোন প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমার মনে হয় না।

 
শিল্প-সাহিত্যেক্ষেত্রে পুরস্কার প্রকৃতপক্ষে কী কোনো ভূমিকা রাখে?

একজন প্রকৃত শিল্পী বা সাহিত্যিক, যে প্রাণ থেকে শিল্প বা সাহিত্য করে যাচ্ছেন বা আজীবন করতে চান, তার জন্য পুরস্কার তেমন কোন ভূমিকা রাখে বলে আমি মনে করি না। পুরস্কার শব্দটাই এমন যে শুনলেই আগ্রহী করে তোলে মানুষকে। কেউ পুরস্কার পেলে মানুষ তাকে বা তার সম্পর্কে জানার জন্য খানিক উৎসুক হয়ে ওঠে, এ ছাড়া আর কী! আর এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তর্ক বিতর্ক ছাড়া কিছুই উঠে আসেনা।


সবশেষে আপনি আপানার এমন একটা স্বপ্নের কথা আমাদের বলেন, যেটা বাস্তবায়ন করতে আপনার চেষ্টা আছে।

বলার মতো আমার কোনো স্বপ্ন নেই। আমি আজীবন মানুষ শব্দের কাছে ঋণী। কেবল মনে প্রাণে মানুষ হতে চেয়েছি।