আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

যারা কবিতা লেখে না কিন্তু কবি, তাদের কাছে আমার ঋণ সবচেয়ে বেশি আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

[আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদিরের জন্ম সিরাজগঞ্জে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করে এখন শিক্ষকতা করছেন ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। দৈনিক 'সংবাদে'র সাহিত্য পাতায় ছোটগল্প ও কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ২০১০ সালে। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়  তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান’। এছাড়াও বিভিন্ন দৈনিক ও সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত লিখছেন তিনি। শুরুর দিককার লেখা, কবিতার বই, সাম্প্রতিক জীবন ও সাহিত্যচর্চাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেন তিনি একরামুল মোমেনের সঙ্গে।]

 

আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থঅন্য গাঙের গান, সমুদ্রসমান আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সমুদ্রসমান গাঙ বা নদী বলতে আমরা কী বুঝবো? এটা কি আপনার শৈশবের নদী?

এই নামের একটা কবিতা আছে বইটিতে। লেখার সময় আমি যমুনাকে মাথায় রেখেই লিখেছি, আমার জন্ম থেকে কৈশোর পুরোটাই ওই নদী ঘিরেই। তবে আমার শৈশবের যমুনাকে ভেবে কবিতাটা লিখিনি আসলে। আমার নানীর জীবন কেটেছে ইছামতির মতোন প্রায় মরে যাওয়া নদীর তীরে। প্রায় পয়ষট্টি বছর বয়সে এসে তাঁকে  নতুন করে বসবাস শুরু করতে হয় যমুনার কোল ঘেষা অন্য এক গ্রামে। যমুনাকে দেখে তাঁর প্রথম অনুভূতি আমার মনে হয়েছে এমনই হওয়ার কথা। যে নদীর ওইপার দেখা যায় না তা আসলে প্রায় সমুদ্রই।

আপনার কবিতায় বাস্তবতার যে কথকতা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল অনুসন্ধানে পুরাণের গল্প বহুলাংশে পাওয়া যায় বয়ানের আখ্যানধর্মীতা বেছে নেওয়ার কারণ কী?

‌কিছু কবিতা আখ্যানধর্মী কারণ ওগুলো আসলে গল্প হতে গিয়ে কবিতা হয়ে গেছে। যেমন 'চাঁদ বহুকাল চাঁদ থাকার পর' নামে একটা কবিতা আছে বইয়ে, আসলে গল্প লিখতে বসেছিলাম। এখনও মনে হয়  বড় একটা গল্প হতে পারত কবিতাটি। আর কিছু কবিতা যেমন 'জল ফুরালে ফুলের হিসাব', 'শেষ শীতের শেষ গল্প' - এখানে আখ্যানধর্মীতা ইচ্ছা করে বেছে নেওয়া। গল্পচ্ছলে কবিতা বা কবিতার ঢংয়ে গল্প বলার চেষ্টা আর কি।

এইক্ষেত্রে অস্কার ওয়াইল্ডের 'পোয়েমস ইন প্রোজ', টনি মরিসনের 'দ্য ব্লুয়েস্ট আই', সেলিম আল দীনের 'যৈবতী কন্যার মন' আর অরুন্ধতী রায়ের 'গড অভ্ স্মল থিংস' দ্বারা আমি মনে হয় বেশ প্রভাবিত। এই লেখাগুলোকে আমার কোনদিনই গদ্য মনে হয়নি।  আর 'মহাভারত' আমার জন্যে একটা বড় অনুপ্রেরণার জায়গা। মহাকাব্যে যেভাবে আখ্যান আসে তা আমাকে  বরাবরই গদ্যে লেখা উপন্যাসের গল্পের  চেয়ে বেশি অনেক অনেক বেশি ভাবায়, কাছে টানে।

ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা   শিক্ষকতা আপনার কাব্য রচনার নেপথ্যে কতখানি প্রভাব রাখছে?

প্রভাব তো আছেই, হয়তো বেশ স্পষ্ট করেই আছে। কোলরিজ, জন কীটস, ইয়েটস, এলিয়ট, ডিকিনসন, হুইটম্যান, রবার্ট ফ্রস্ট, ভার্জিনিয়া উলফ, টনি মরিসন, গিন্সবার্গ, অরুন্ধতী রায়- এঁদের লেখা নানান সময় নানান ভাবে মোহিত করে রেখেছিল ছাত্র জীবনে। এখনও সে ঘোর কাটেনি বোধ হয়।

পড়াতে এসে মনে  অবশ্য অন্যরকম হয়ে গেছে প্রভাবটা। এখন মনে হয় লিখতে গেলে ওভারকনশাস হয়ে যাই। নিজের লেখার ক্রিটিক নিজে হয়ে যাওয়ার প্রবণতাটা আমার খুবই অপছন্দ। কিন্তু মনে হয় তাই হয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করব শিক্ষকতার সাথে নিজের লেখাকে না গুলিয়ে ফেলতে, যতদিন পারি। আদৌ সম্ভব হবে কিনা জানি না।

কবিতার পাঠক তৈরিতে লিটল ম্যাগ, সংবাদপত্র সাময়িকী সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যেহেতু আপনি বিভিন্ন সাময়িকীতে লিখছেন, এখনকার সাময়িকী এবং পাঠক সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন?

অভিজ্ঞতা আসলে এখনও খুব অল্প। তাই কোন ওভারঅল মন্তব্যে যাচ্ছি না।  তবে আমার শুরুটা দৈনিক পত্রিকা দিয়ে।'সংবাদে'র সাহিত্য পাতার কাছে আমি ঋণী। ২০১০ এ প্রথম লেখা ছাপা হয় 'সংবাদ সাময়িকী'তে। কিন্তু কবিতা  না, একটা বেশ বড় গল্প । সপ্তাহ দু'য়েক পরে 'সংবাদে'ই  প্রথম কবিতা ছাপা হল । এরপর ওবায়েদ ভাই ( ওবায়েদ আকাশ) 'শালুকে' আমার করা অনুবাদ ছাপলেন, অস্কার ওয়াইল্ডের চার/পাঁচটা ছোট গল্প।

অবশ্য এই সাত বছরে অনেক কিছু বদলে গেছে। ফেসবুকে তখনও মানুষ হয়তো লিখত কিন্তু অতোটা ছড়ায়নি । এখন তো লিটল ম্যাগের জায়গা অনেকখানি দখলে নিয়েছে অনলাইন ম্যাগাজিন গুলো। 'শিরিষের ডালপালা', 'ইপ্রকাশ আর্টস', বাংলা নিউজের 'শিল্প-সাহিত্য', 'এন টি ভি অনলাইন' এই রকম অনেক ম্যাগাজিনগুলোতে লেখা ছাপা হওয়াতে দেখলাম, বুঝলাম তাদের পাঠক, ফলোয়ার ভালোই আছে। পাতাগুলোর মানও কম বেশি সন্তোষজনক।

সচেতনভাবে আপনি কখনও কবি হতে চেয়েছেন বা কখন মনে হলো কবিতা লেখা যায়?

কবিতা হয়তো সচেতন, অবচেতন, অচেতন সব ভাবেই লেখা যায়। আমার ক্ষেত্রে বলতে গেলে- হ্যাঁ, আমি সচেতনভাবেই চেয়েছি কবি হতে। আমার কাছে অবশ্য পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় শিল্প মাধ্যম হল গান। যখন থেকে বুঝতে পারলাম যে গানে আসলে আমার দেওয়ার কিছু নাই, আমি অপারগ,  তখন থেকেই কবি হওয়ার ইচ্ছা তৈরী হয়। গান গাইতে পারি না বা পারব না বলেই হয়তো কবিতা লিখে যেতে চাই।

আপনার একটি গল্প থেকেলংগেস্ট নাইট অব দ্য ইয়ারনামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কবিতা বা গল্পের  সঙ্গে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের যোগাযোগ কতটা নিবিড় বলে আপনি মনে করেন?

এখন তো আর আগের মতো সীমারেখা গুলো নাই। গল্পকে গল্পই হতে হবে, কবিতাকে কবিতাই হতে হবে এমন না। আধুনিক সাহিত্য বিশেষ করে  আধুনিক পশ্চিমা সাহিত্য তো চিত্রকলা থেকে অনেক কিছু নিয়েছে। প্যারিস কেন্দ্রিক যে শিল্পচর্চা ছিল ১৯২০ এর দশকে সেখানে আসলে একই ধারায়, প্রায় এক অনুভবে সকল ধরণের শিল্পমাধ্যর বিকাশ ঘটেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি একজন কবি আরেকজন কবিকে যতটা ভাবাতে পারে বা কিছু দিতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি পারে এক চিত্রশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা বা চলচ্চিত্রকার। যারা কবিতা লেখেনা কিন্তু কবি, তাদের কাছে আমার ঋণ সবচেয়ে বেশি।

আর যে গল্পটা নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে ওইটা আসলে কবি আবুল হাসানকে নিয়ে লেখা ছিল। রাধা- কৃষ্ণের প্রচলিত মিথ ভেঙে লিখেছিলাম। যেহেতু কবিকে নিয়ে লেখা তাই ভাষাটা বেশ কাব্যিকই ছিল। মূলত ওই গল্পের একটা অংশ নিয়ে কাজ হয়েছে। কাজটার ভিজ্যুয়াল ট্রিটমেন্ট ও বেশ কাব্যিক ছিল।

কাব্যচর্চায় সংঘবদ্ধতার যে সমসাময়িক চিত্র, এখানে একজন কবি আরেকজন কবিকে ঠিক কতটুকু গ্রহণ করে? এক্ষেত্রে অনেকেই দলগত চর্চায় ভিড়ে যান এই যে দলবাজি, স্ট্যান্টবাজি-এসব নিয়ে আপনার অভিমত কী?

সংঘবদ্ধ চর্চা কিন্তু সবসময়ই ছিল। এবং এটা দোষের কিছু না। কিন্তু গ্রুপ মানে যদি গ্রুপের বাইরের সবাইকে না-কবি, না-লেখক ঘোষণা করা হয়; বা কেবল গ্রুপের অংশ বলে কোন লেখককে যদি অতিমূল্যায়ন করা হয়, সেটা আমার মনে হয় আপত্তিকর এবং দৃষ্টিকটু। তবে আমি যেটা বিশ্বাস করতে ভালোবাসি তা হল  সব লেখকই শেষমেশ সময়হীন আর একা। সময়ের স্রোত বা গোষ্ঠীর আশ্রয় কোন কোন ক্ষেত্রে অতি আত্মঘাতী।

বর্তমানে আপনি ময়মনসিংহে থাকছেন, এখানকার জল, নদী, হাওয়া এবং মানুষ আপনার সষ্টিশীল সত্ত্বায় কতটুকু প্রভাব রাখছে? লেখাখেলিতে কী কোন বদল লক্ষ্য করেছেন?

মাঝখানে আমার ‘রাইটার'স ব্লক’ চলছিল। এর মধ্যেই চাকরি বদল। শহর বদল। ঢাকার বাসা ছেড়ে ময়মনসিংহের বাসায় উঠলাম। শহরটা ঘুরে দেখা শুরু করলাম। শহর জুড়ে পুরোনো রঙ, পুরোনো গন্ধ। লাল ইটের রেল স্টেশনে গিয়ে বসলাম একদিন। ঘরে ফিরে দুইটা লাইন রিখলাম শহর নিয়ে। ব্লক কেটে গেল।

আমি আসলে ‘অ্যান্টিকুয়ারিয়ান’। পুরানো গান, পুরনো বাড়ি সমস্ত কিছু আমাকে ভীষণ টানে। ময়মনসিংহ এতো তাড়াতাড়ি আপন হয়ে গেছে যে অবাক লাগে। এই শহর নিয়ে লিখতেও ভালো লাগে। লিখছিও। এখানে এসেই কবিতার চেয়েও কাব্যিক কিছু গল্প লিখতে পেরেছি।

কবিতার প্রকরণ, শৈলী এবং বুননে কোন নির্দিষ্ট রীতি মেনে চলেন, নাকি বিষয়বস্তু শৈলী ঠিক করে দেয়

কবিতা লিখতে গেলে বোধহয় নিজের মতো করে কথা বলা শিখতেই হয়। এর বিকল্প নাই।  যেই ধরণের বাক্যে, শব্দে কথা বলতে পারলে আমার সবচেয়ে ভালো লাগত কিন্তু নানান কারণে বলা হয় না; চেষ্টা করি সেই ভাষায় , সেই শব্দে-বাক্যে লিখতে। এর বেশি কিছু চিন্তা করি না কবিতা লেখার সময়। তবে  গল্প লিখতে গেলে আগে শেষটা চিন্তা করি।পরে সেই মতোন  ভাষা আর ভাব ঠিক করি।

লেখালেখির মাধ্যম হিসেবে অন্তর্জালকে কিভাবে দেখছেন?

যাদের আমি আমার লেখা পড়তে দিতে চাই, তাদের সবাইকে একসাথে পাঠাতে পারি। পৃথিবীর যেকোন জায়গা তেকে মানুষ পড়তে পারে যখন তখন। এটা তো তুচ্ছ ব্যাপার না। অন্তর্জাল আসলে জাদু। জাদু কার না ভালো লাগে?

একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার পাঠদানের প্রিয় বিষয় কী?

কবিতা। বিশেষ করে বিশ শতকের কবিদের কবিতা। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালে লেগেছে ইয়েটস আর এলিয়ট পড়াতে। জেন্ডার থিওরি আর কালচারাল স্টাডিজ পড়ানোর শখ খুব।  এখনও সুযোগ হয়নি যদিও।

আপনার বর্তমান কাজ, গবেষণা লেখালেখি কী নিয়ে?

সেলিম আল দীনের 'নিমজ্জন' নিয়ে একটা বড় প্রবন্ধ লিখছি, একাডেমিক ধাঁচের। 'নজরুলের গল্প বলা গান: পুরাণের নতুন পাঠ' নামে একটা লেখা লিখেছিলাম গত বছর 'বাংলানিউজে'র ঈদসংখ্যার জন্যে। ওইটা নিয়ে আরও পড়ছি। বড় আকারে লেখার ইচ্ছা আছে।

আমাদের ইংরেজি বিভাগে একটা সাহিত্য সংসদ আছে । ওইটার মডারেটর হিসেবে আছি তাই ছাত্র ছাত্রীদের লেখা পড়া হয় নিয়মিত। ওদের সাহিত্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা গুলো শুনতে্ও ভালো লাগে বেশ। ওদের মাঝে বেশ ভালো প্রবন্ধকার আর কবিও পেয়েছি।

পরবর্তীতে প্রকাশনা হিসেবে আমরা কি কাব্যগ্রন্থ আশা করবো, নাকি অন্যকিছু লিখছেন?

কবিতার বই শীঘ্রই আসার কোন সম্ভাবনা নাই। তবে কবিতার ভাব আর ভাষায় বেশ কিছু গল্প লিখেছি; যাকে ইংরেজিতে 'পোয়েটিক ফিকশন' বলে । সেই গল্প গুলো নিয়ে বই করার পরিকল্পনা আছে।

এছাড়াও 'গডেস অভ্ অ্যামনেশিয়া' নামে একট দীর্ঘ লেখায় হাতে দিয়েছি সম্প্রতি। একটা সম্মিলিত স্মৃতিকথার মতোন লেখা। ফিকশনের আদলে হিস্ট্রি আর ফ্যাক্টস থাকবে । মূল চরিত্রে একজন কাল্পনিক দেবী যার কাজ হচ্ছে মানুষের ভুলে ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো জমিয়ে রাখা। তিনিই শোনাবেন গল্পগুলো। আমরা যা মনে রাখতে পারি না, আমার মনে হয়, তাই আসলে জীবন। যা মনে রাখতে পারি তা নিতান্তই অল্প। এত অল্পতে কারও জীবন হয় না।