আহমদ শরীফ

বিয়ে হচ্ছে সমাজস্বীকৃত যৌনসম্ভোগের অধিকার আহমদ শরীফ

 

[হুমায়ুন আজাদ তার সময়ের অন্যতম পাঁচজন সৃষ্টিশীল, মননশীল আর মুক্তচিন্তার মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলেন। তারা হলেন আব্দুর রাজ্জাক, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান এবং কামরুল হাসান। পাঁচজনের মধ্যে কামরুল হাসানের সাক্ষাতকার নেয়া সম্ভব হয়নি, কেননা তার আগেই তিনি মারা যান। এইখানে কথাবলির পাঠকদের জন্য হুমায়ূর আজাদ গ্রহণকৃত আহমদ শরীফের সাক্ষাৎকারের একটি নির্বাচিত অংশ প্রকাশ হলো। উক্ত সাক্ষাৎকারে তিনি সমাজ, সম্পর্ক, দর্শন, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। বলাবাহুল্য যে হুমায়ূন আজাদ তাকে ‘পণ্ডিত ও বয়স্ক-বিদ্রোহী’ বলতেন।] 

 

কোন দার্শনিক ধারাটিকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

নাস্তিক্যধারা। জগৎ-জীবন-স্রষ্টার রহস্য জানার আগ্রহ থেকে দর্শন শাস্ত্রের শুরু। কুলকিনারা না পেয়ে দুর্বলেরা আস্তিক্য দর্শনগুলো গ’ড়ে তোলেন, পরবর্তীকালে সেগুলো ধর্ম নির্ভর দর্শনে পরিণত হয়। অবশ্য কেউ কেউ সংশয়বাদী হয়েছেন, নাস্তিক্যবাদী হয়েছেন। ভারতবর্ষে বৈশেষিক দর্শন বা সাংখ্য দর্শন এক সময় নাস্তিক্য দর্শন ছিলো। লোকায়েতিকেরা নাস্তিক্যবাদী। এগুলো আমার খুব পছন্দ, কারণ আমি আস্তিক্যে বিশ্বাস করি না। শাস্ত্রকে আমি মনে করি ম্যান মেইড।


বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্ককে আপনি কী দৃষ্টিতে দেখেন?

এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। সামাজিক কারণেই বিয়ে দরকার, মারামারি ঠেকিয়ে রাখার জন্যে। বিয়ে হচ্ছে সমাজ স্বীকৃত যৌনসম্ভোগের অধিকার। এখন ইউরোপের অনুকরণে আমাদের দেশে পারমিসিভ সোসাইটি শুরু হয়ে গেছে। এর জন্যে শিক্ষার দরকার।


আপনি একবার বলেছিলেন যে চলচ্চিত্রে চুমোর অধিকার দিলে অনেক উপকার হবে।

এখনো বলি। এখানে সিনেমায় অশিক্ষিত লোকের, তরুণ তরুণীর রিরংসাপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে আদিরসের ভিয়েন দেয়া হয়, এটা গান, নদীর ধারে গাছের তলে ছোটাছুটি, নাচ, এটা কুৎসিত। কুরুচির ব্যাপার। দুজনের প্রেমই যদি দেখানো হয়, তবে আবেগ বশত চুমো খাওয়া দোষের হতে পারে না।


মদ্যপান সম্পর্কে আপনার কী মত?

মদ্যপান তো খারাপ জিনিশ নয়। আমাদের এখানে নিম্নবিত্তের লোকেরা চিরকালই মদ খেয়েছে। মাওলানা কেরামত উল্লাহর প্রচারে মুসলমানদের মধ্য থেকে মদ্যপান উঠে গেছে। বড়োলোকেরা সারা পৃথিবীতে চিরকাল মদ খেয়েছে। মাঝারি লোকেরা শাস্ত্র মানে ব’লে খায় না। ইসলামে ও প্রথমদিকে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিলো না। হযরত আলি একবার মাতাল অবস্থায় মসজিদে গিয়েছিলেন, তখন অহি নাজেল হয় যে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মসজিদে যাবে না। যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম হয় তখন মদ্যপান নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু রাজা বাদশারা, ধনীরা চিরকাল মদ খেয়েছে, এখনো খায়।


একটা পশ্চিমা পপ নাচ ও একটা খাঁটি বাঙালি জেলে নৃত্যের মধ্যে কোনটা আপনার ভালো লাগে?

পপ নাচে আমার চোখ অভ্যস্ত নয় ব’লে ভালো লাগে না; আর জেলে নৃত্য অক্ষমতার দান, আমার কাছে কখনো আকর্ষণীয় ছিলো না। তবে পশ্চিমা নাচগান প্রবেশ করছে, কেননা তা অনিবার্য। এতে বাঙালিত্ব চ’লে গেলো বলে চিৎকার করেন যাঁরা, তাঁরা কুপমণ্ডুক। বাঙালি সংস্কৃতির কোনো চিরস্থায়ী রূপ নেই।