জাহিদুর রহিম অঞ্জন

সারা পৃথিবীতেই পুরস্কার নিয়ে নানা বিতর্ক, পুরস্কার জিনিশটাই এমন যে, বিতর্ক থাকবেই জাহিদুর রহিম অঞ্জন


[মেঘমল্লার’ মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর গল্প ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রের জন্য এ বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে জাতীয় স্বীকৃতি পেলেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। চলচ্চিত্র, চলমান তর্ক-বিতর্ক-নির্মাণ-পরিস্থিতি কিংবা পথ চলা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বললেন জুয়েইরিযাহ মউ। এই সাক্ষাত্কারটি পূর্বে বাংলামেইল২৪ডটকম এ প্রকাশিত হয়]।

 

চলচ্চিত্রের সাথে কী ভাবে জড়িয়ে গেলেন?

বাসার পরিবেশ অনুকূলে ছিল আমার। ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তি কবিতা লিটল ম্যাগ এর সাথে জড়িত ছিলাম। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় খুলনাতে একটা কর্মশালার আয়োজন করেন জামিল আহমেদসহ কয়েকজন। তখন চলচ্চিত্র পড়া যেতে পারে মনে হল। তখন পুনে ফিল্ম ইন্সটিউটে চিঠি লিখেছিলাম, ওরা জানালো স্নাতক হতে হবে। তারপর ঢাকা এসে ফিল্ম সোসাইটি, শর্ট ফিল্ম ফোরাম-এসমস্তকিছুর সাথে জড়িত হয়ে যাওয়া। এখন তো অনেক কোর্স হয়, তখন এতো কোর্স চালু ছিল না। এক সাথে বসে ফিল্ম দেখা, আলোচনা এগুলোই তখন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রেখেছে। পরে তো পড়তে চলে গেলাম পুনেতে। এভাবেই...

 

শর্ট ফিল্ম ফোরামের কথা বলছিলেন, যেভাবে সক্রিয় তখন ফোরাম ছিল আজ অতোটা নেই। এর পেছনে কারণ কী মনে হয়?

ফোরাম তো শুরু হল ১৯৮৬ সালের শেষ দিকে। এখন তো ছবি দেখার ভিউটা পরিবর্তিত হয়েছে, আগে এটা একটা প্ল্যাটফর্ম ছিল যারা এফডিসির বাইরে কাজ করতে চাইছে তারা সবাই মিলে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র বানানোর জন্য এটার চালু হয়েছিল। দেখুন ফিল্ম সোসাইটিও এখন তেমনভাবে আর নেই। শর্ট ফিল্ম ফোরামের বেসিক প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে। সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার ব্যাপার আগে ছিল, যখন শুরু হচ্ছে ফোরাম লক্ষ্য করুন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রায় বিলুপ্ত... এসব মিলিয়ে সবাই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলো। কিন্তু এখন তো আর সেভাবে কেউ উপলব্ধি করছে না। বিস্তৃত পরিসরে। এখনো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে শর্ট ফিল্ম ফোরামের, এখনো কাজ হচ্ছে কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে। শুধু ফোরাম না সমাজের চেহারাটাই এমন, সবাই আত্মকেন্দ্রিক। ইচ্ছে করলে যে কেউ ঘরে বসে ফিল্ম দেখছে এখন। আগে একজন আরেকজনকে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখন দেখুন তরুণদের পাওয়া যাচ্ছে না যারা দায়িত্ব নিয়ে শর্ট ফিল্ম ফোরাম করবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে। এখন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র করার প্রবনতাও আগের চেয়ে কমে গেছে। হচ্ছে তবে যতটা হওয়া দরকার ততটা হচ্ছে না এখন আর। সারা দুনিয়াতেই আসলে, সিনেমাটা বাণিজ্যনির্ভর হয়ে গেছে তো। এসব থেকে বের হতে একটা ন্যাশনাল ফিল্ম পলিসি থাকলে ভালো হয়, সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিবেশনের দিক দেখলো। তাহলে একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রয়াস এগোবে বলে মনে হয়। নতুনদের জন্যও সুবিধাজনক এটা।

 

আচ্ছা সরকার যদি পলিসি করেই সরকারী প্রক্রিয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণও কি বৃদ্ধি পাবে না?

হ্যাঁ কিন্তু সরকার টাকা দিক না দিক নিজের টাকাতেও কি সরকারের বিপক্ষে চলচ্চিত্র বানিয়ে মুক্তি দেওয়া সম্ভব? তা তো না। কিন্তু অন্য দিক হল পলিসি থাকলে একটা আইন থাকে কি ভাবে জিনিসটা হবে। কিওরোস্তমি একবার বলেছিলেন এ সম্পর্কে যে – বাধা আসবে এমন জিনিস যদি চলচ্চিত্রে দেখাতে চাই তবে তা ঘুরিয়ে দেখানো ভালো যাতে চলচ্চিত্র বাধাপ্রাপ্ত না হয়। 

আর আরেকটা দিক দেখুন শর্ট ফিল্ম ফোরাম থেকে আগামী, হুলিয়া ছবিগুলো কি দেখানো যায় নি। সেন্সর বোর্ড আটকানোর পরেও কিন্তু ছবিগুলো দেখানো গিয়েছিল। ভালো চলচ্চিত্র পৌঁছোবেই দর্শকের কাছে। আটকানো যাবে না।

 

মেঘমল্লার- এ আসি এবার, কখন মাথায় এলো এ গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র করার ভাবনা?

গল্পটা আগে থেকে পড়া ছিল। গল্পটায় কম পাত্র-পাত্রী, কম জায়গা, আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সাধারণ মানুষ কী করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এটা মেন স্ট্রিমের ইতিহাসে কম তো। এ জিনিসটা এ গল্পে ছিল। আর সরকারী অনুদান তো, ভাবলাম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট জমা দেই। নির্বাচিত হলেও হতে পারি।

 

আচ্ছা কথাটা বললেন যখন বলি, এটা কি আমাদের নির্মাণে প্রভাব ফেলে না। অনেকেই এটা করছেন এখন যে সরকারী অনুদান পেতে সুবিধা এমন স্ক্রিপ্ট নির্বাচন করছেন অনুদান পাওয়ার স্বার্থে। এটা কি নির্মাতার ভাবনাকে আটকে দিচ্ছে না অনুদানের চক্রে?

হ্যাঁ অবশ্যই প্রভাব ফেলে। কিন্তু দেখুন এইবারের কমিটি কিন্তু আবার এতো দিচ্ছে না, ওরাই বলছিল মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রগুলো যতটা ভালো হবে প্রত্যাশা করেছিলাম ততটা ভালো হয়নি। এবার ভালো গল্প দেখা হচ্ছে। আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। চলচ্চিত্র তো একটা কালচার। আমার সাথেও তো অনেকে পেয়েছেন যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বানাননি। চলচ্চিত্রের মানের দিকটাও দেখতে হবে। তবে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রেরও তো দরকারই আছে।

 

এ গল্পই কেন নির্বাচিত হল চলচ্চিত্রের জন্য?

টেক্সট নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহিত্য হিসেবে কত মূল্যবান, ভালো এসব দেখেছি। আর ভালো গল্পকারের গল্পে যা হয় চরিত্র নির্মাণ, শক্তিশালী সংলাপ, এগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে চিত্রনাট্য লেখার ক্ষেত্রে। এজন্যই।

 

সাহিত্য থেকে বা অন্য মাধ্যম থেকেও যদি ধরি চলচ্চিত্রে গ্রহণের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা স্বীকারের বিষয়টা নিয়ে কী ভাবেন। মিডিয়াতে এখন নানান বিতর্ক চলছে ‘বৃহন্নলা’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে। এই বিষয়গুলোকে কী ভাবে দেখছেন?

আমার মনে হয় গ্রহণ করাটা খুব বড় ব্যাপার না, কারণ এডাপটেশন নানান রকমের হয়। পিক পকেট- ব্রেসোর একটা চলচ্চিত্র আছে যেখানে ক্রাইম-পানিশমেন্টের কোন বিষয় নেই তবু ওখানে লেখা “ইন্সপায়ারড বাই দস্তয়ভস্কিস ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট”। এটা এরকম না হুবুহু বই এর মতো হতে হবে। কিন্তু অন্যের লেখা অন্যের গল্প নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াটা অন্যায় যা ‘বৃহন্নলা’র ক্ষেত্রে হয়েছে। আমার মনে হয় সরকারেরও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ। নয়তো এটা ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে, তার উপর এটা সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র যেহেতু। কারণ যাদের সোস্যাল কমিটমেন্ট থাকার কথা বলে মনে হয় তারাও এরকম কাজ করছে দেখাটা দুঃখজনক ব্যাপার।

 

 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার আর সরকারী অনুদানের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির কথা ওঠে। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

 এটা এভাবে এক কথায় বলা যাবে না। কিন্তু সরকার যখন কোন কাজ করে তখন তাদের একটা পক্ষপাতিত্ব থাকবেই আমাদের মতোন দেশে। এরপর ধরেন অন্য রাজনৈতিক দল এলে আমাদের হয়তো অনুদানই দিবে না। এখন সারা পৃথিবীতেই পুরস্কার নিয়ে নানান বিতর্ক থাকে। পুরস্কার জিনিসটাই এরকম ব্যাপার যে বিতর্ক থাকবেই। যার মনে হয় পুরস্কার যারা দিচ্ছেন তারা যথার্থ না তবে সেখানে চলচ্চিত্র জমা না দেওয়াটাই ভালো। ছবি জমা দিয়ে না পেলে বলবেন জুরি বোর্ড যথার্থ না তা তো হয় না। গতবার একটা চলচ্চিত্র সতের না আঠারোটা পুরস্কার পেল, সে চলচ্চিত্র কি এতো পুরস্কারের দাবি রাখে? এখন চলচ্চিত্র যা নির্মিত হচ্ছে তা থেকেই তো পুরস্কার দিতে হবে, তাই অনেক চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছে এই আর কী। এগুলো নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর কিছু নেই।

 

‘ছুঁয়ে দিলে মন’ মুক্তি পাচ্ছে কলকাতায় আর ‘বেলাশেষে’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশে, বিষয়গুলোকে কী ভাবে দেখছেন?

এটার মধ্যে খারাপ কিছু দেখি না। কিন্তু ভারতীয়দের ছবির বাজেট কত-আমাদের কত, কারা অভিনয় করছে, কয়টা হলে কোনটা চলছে এটা কিন্তু দেখার বিষয়। যেমন- ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের আগ্রাসন সরকারের নজরদারী ছাড়াই তো চলছে। এছাড়া চলচ্চিত্র যদি দু’টোই দু’দেশে সমান তালে চলে এতে ক্ষতি নেই। তবে একশ কোটির ভারতীয় ছবি এখানে চললো, ওখানে আমাদের কত বাজেটের ছবি চলছে এসবও ভাবতে হবে। বাজেট বেশি হলে ছবিতো ভালো হবেই। এসব ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ভালো বলতে পারবেন আমাদের চেয়ে। কিন্তু চলচ্চিত্র তো ব্যবসা না কেবল, সাংস্কৃতিক মূল্যও আছে। শুধু ভারতীয় না ইরানী, জাপানী অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্রও আসা দরকার বলে মনে করি।

 

দেখা যাচ্ছে নির্দিষ্ট দর্শককে বিবেচনা করেই চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে। অধিকাংশ দর্শকের কাছে তাই অনেক চলচ্চিত্রই ইদানীং পৌঁছোতে পারছে না। এ সম্পর্কে কী মনে হয়?

এক ধরণের শিল্প সবার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না, চলচ্চিত্রও তাই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যারা পড়েন তারা হুমায়ুন আহমেদ নাও পড়তে পারেন। যাদের হুমায়ুন আহমেদ পছন্দ তারা কত জন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েন জানি না। অডিয়েন্স টার্গেট ছাড়া বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র হয় না।

আর সব ক্ষেত্রে বাণিজ্য প্রাধাণ্য পাচ্ছে ইদানীং। এই যে ভারত থেকে পরমব্রত, ইরফান খানকে আনা মানে ছবিটা ভালো চলবে। কিন্তু ভালো নির্দেশক ভালো অভিনয়শিল্পী তৈরি করতে পারে এ ভাবনাটা হারিয়ে যাচ্ছে। আর্টের চেয়ে চলচ্চিত্র অধিক বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশে না, অন্যান্য দেশেও এটা হচ্ছে।

তবে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাতার টার্গেট না থাকাই ভালো। কুমার সাহানী একবার সুন্দর বলেছিলেন – যারা বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেন তাদের থাকে টার্গেট অডিয়েন্স, ফিল্মের টার্গেট অডিয়েন্স আবার কী!

 

সাম্প্রতিককালে চলচ্চিত্রের ভাষার পরিবর্তন ঘটছে বলে কি মনে হয়?

একটা লেভেলেতো হচ্ছেই, তবে প্রত্যেকে তার মতোই বানাচ্ছে। একদিনের ভেতর তো পরিবর্তন হবেও না। এখন ইন্সটিটিউট হচ্ছে, বাইরে থেকে পড়ে আসছে। ভালো একটা ফিল্ম পলিসির ভেতর সিনেমা সংক্রান্ত লেখাপড়া, প্রোডাকশান প্রসেস থাকলে পরিবর্তন আরও দ্রুত হবে।

 

আপনার ‘চলচ্চিত্র ভাবনা’ জানতে চাইলে কী বলবেন?

 চলচ্চিত্র একটা আর্ট মিডিয়া। আসলেই ভাল সিনেমা করতে হলে এ মাধ্যমকে বুঝতে হবে। এখানে সবাই গল্পটাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, কিন্তু গল্প বলাটাও যে গুরুত্বপূর্ণ তা অনেকেই বুঝতে চায় না। ব্রেসোর একটা উক্তি আছে – ফর্ম যখন পিওর হয় তখনই যে কোন আর্ট শক্তিশালী হয়। সিনেমাটিক ভাষায় গল্পটাকে বলতে পারাটাই আসল বিষয়।