থিও এনজেলোপুলুস

আলোর বিপরীতের দৃশ্যেরা সাধারণত মেটাফিজিক্যাল সৌন্দর্য নির্মাণ করে থিও এনজেলোপুলুস


[থিও এনজেলোপুলুস জন্মান ১৯৩৫ সালের ২৭ এপ্রিল এথেন্সে। সব মিলে তিনি তেরোটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, দেড়খানা তথ্যচিত্র (একটি অসমাপ্ত) এবং টেলিভিশনের জন্যে একাধিক কাজ করেন। দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ার তাঁকে পৃথিবীর চলচ্চিত্রপ্রেমিকদের সামনে বিপুলভাবে পরিচিত করে। ২০১২ সালের ২৪ জানুয়ারি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেইখানে তিনি একটি স্ট্রোক করেন যার ধকল আর তাঁর শরীর নিতে পারেনি। এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিলো ড্যান ফাইনারু সম্পাদিত থিও এনজেলোপুলুসের সাক্ষাৎকার সংকলন ‘ইন্টারভিউজ’ নামের বইতে। ১৯৮৪ সালের মে মাসে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ভয়েজ টু সাইথেরা’ ছবিটার প্রদর্শনী শেষে বিশিষ্ট চিত্রসমালোচক গিডিওন বাখমান সাক্ষাৎকারটি নেন। তাঁরা ভয়েজ টু সাইথেরা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি পরিচালকের অন্য সিনেমা, ব্যক্তিজীবন, দর্শন সহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকারটির ভাষান্তর করেছেন সৈকত দে।]

 

আপনার কাজের মধ্যে আপনি কি মাঝে মাঝে শৈলী আর বিষয়বস্তুর পারফেকশনের ভেতর দ্বৈরথ খুঁজে পান যা সম্পর্কে আপনার মনে হয়, বলা দরকার?

আমি এভাবে ভাবি না। আমি জানি, পারফেকশনের খোঁজের উন্মাদনাকে কেউ একজন খুবই কষ্টকর কাজ বলে ধরে নিতে পারে কিন্তু আমার মনে হয় লোকেশন ঠিক হয়ে গেলে, সেট নির্বাচন সাঙ্গ হলে, শুটিং এর সময় নির্ধারিত হলে এবং আলোকচিত্র পরিচালক যারা কিনা এই পুরো প্রসেসের ভেতর থাকেন তাঁরা এই কাজ অনেক সহজ করে দেন। শেষ অব্ধি, যখন আপনি শুটিং স্পটে যাবেন ব্যাপারটা শ্বাস নেয়ার মতোই সোজা। আপনি যে দ্বৈরথের কথা বলছেন তা যদি ঘটেও, ঘটে থাকে কদাচিৎ।

একটা উদাহরণ দেখা যাক, ‘ভয়েজ টু সাইথেরা’-য় এক বৃদ্ধের নাচের তিনটি দৃশ্য আছে। এই নাচ ঘটে একটা কবরস্থানে। তিনটি দৃশ্যই একই অক্ষে। প্রথম দৃশ্যটি হলো নাচের শুরু, দ্বিতীয়টি নাচের কন্টিনিউয়েশন এবং একই সময়ে, চারদিকে শূন্যতার আবিষ্কার ঘটে। তৃতীয় দৃশ্য হলো, ছেলের আগমন যে কিনা বলে, ‘ভদ্রমহিলারা আপনি বাড়ির দরজা খুলবেন বলে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ একই সময়ে, এই দূরত্ব উচ্চারণে বোঝা যায়, যদিও তৃতীয় দৃশ্যটি আরো দূরতর। আমার এইসব দৃশ্য নিয়ে সমস্যা হচ্ছিলো, আমি শেষ অব্ধি এই সমস্যাগুলিকে দেখে নেবো বলে ঠিক করি। এটা ছিলো আলোর বিপরীতে ধারাবাহিক দৃশ্যমালা। আলোর বিপরীতের দৃশ্যেরা সাধারণত মেটাফিজিক্যাল সৌন্দর্য নির্মাণ করে। এটা ঘটে, উদাহরণস্বরূপ, ব্যারিম্যানের সেভেনথ সীল সিনেমায়।

অথবা দভজেঙ্কোরআর্থচলচ্চিত্র যেখানে চাঁদের আলোর বিপরীতে একটি নাচের দৃশ্য ছিলো-

ঠিক বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভালোটা আপনি গ্রহণ করবেন কি বাতিল করবেন। শেষ পর্যন্ত, আমি গ্রহণ করাই ঠিক করলাম। বিশেষ করে, দ্বিতীয় দৃশ্য যেখানে উদ্দেশ্য ছিলো অনেকটা আকাশের সাথে সম্পর্কিত একটি চরিত্রের প্রকাশ, পেছনে আলোটা কাজে লেগেছিলো।

আপনি কি বলতে চান , এই দৃশ্যমান উপাদানেরা, যে কোনো ক্ষেত্রে, কেবলমাত্র বিষয়বস্তু প্রকাশের মাধ্যম? ব্যাকরণসম্মত বিন্যাসের প্রশ্নমাত্র? আপনি আপনার সিনেমার ভাষায় কথা বলবেন, প্রশ্ন হলো, দর্শক কি তা বুঝবে?

আমার মনে হয় না, সমস্যাটার সমাধান আমার কাছে আছে। যে ধরণের ছবি আমি নির্মাণ করি,তা সবসময়ই এক ধরণের ভাষাতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। আপনি এমন একটা অবস্থায় এসে পৌঁছাবেন যেখানে ভাষাই বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে। এটা খুবই সত্যি যে দর্শকের যাত্রাটা কঠিন। এটা মাত্রার তারতম্য নিয়ে কথা। আমি দর্শককে প্রথম স্তরেই একটা বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়ার পক্ষে এবং তারপর দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তর নির্মাণ করতে চাই যা কিনা আরো অগ্রসর দর্শকেরা বুঝতে পারবেন। কিন্তু আমি প্রথম স্তরের বোঝাপড়াটুকুতে বিশ্বাস করি যা অপেক্ষাকৃত সহজেই বুঝে ফেলা সম্ভব। নিদেনপক্ষে, এই জিনিসটাই আমি করার চেষ্টা করি কিন্তু সবসময় আমি আমার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছি কিনা সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমি কম্পিউটারের মতন কাজ করতে পারি না এবং পুরো পরিকল্পনাও একসাথে করি না। যেসব পরিচালকেরা বেশ কঠিন সিনেমা বানান তাঁদের সম্পর্কে একটি কথা বিশ্বাস করবার চল আছে, তাঁরা পুরো সিনেমাটা বিশদে ছকে রাখেন কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আন্তরচেতনার। এ হতেই পারে যেসব পরিচালক গুছিয়ে কাজ করেন দর্শকদের উপর তাঁদের বেশ প্রভাব থাকে। আপনি সব উপাদান- খানিক রসিকতা, খানিক নাটকীয়তা মিশিয়ে একটা বৈদ্যুতিক সরবত বানিয়ে যন্ত্রে ঢেলে দিতে পারেন যা কিনা একটা চিত্রমালা রন্ধনপ্রণালীর সন্ধান দেবে তা ভালো হোক বা খারাপ। কিন্তু আমার মনে হয় না, ফেলিনি এভাবে কাজ করতেন।

দেখুন, সিনেমা করতে অনেক টাকা লাগে, অনেক মানুষের সেটা দেখতে হয়, যারা সরবত টাইপ সিনেমা পছন্দ করেন না তাঁদের জন্যেও এটাই সেরা মাধ্যম যাদের কিছু বলার আছে, যারা প্রথম স্তরের পরেও চিন্তা করতে পারেন। নিশ্চয়ই আপনি এই প্রশ্নের সদর্থকভাবেই দেবেন, আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে সিনেমা হলো অন্যের মনে আইডিয়া সঞ্চারের একটা মাধ্যম? বাস্তবে, আপনার চিন্তার সাথে মেলে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কখনো কি বেশিরভাগ মানুষ তেমন নয় এই কথাটা ভেবে ভয় হয় না?

আমি বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত নই। প্রতিদিন আলাদা আলাদা রুচির মানুষ জন্মাচ্ছেন। বড়ো প্রচারযন্ত্রের আনুকূল্য পাওয়া আমেরিকান সিনেমা তো সিনেমা নামক এই মাধ্যমের মাধ্যমেই যোগাযোগসাফল্যে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।– সিনেমাগামী মানুষের দলে কিছু আলাদা গোত্রের মানুষও আছেন যারা প্রতিদিন বাড়ছেন।

আপনি মানসিকভাবে কি ঠিক করেই ফেলেছেন যে সুনির্দিষ্ট দর্শক গোত্রের জন্যে কাজ করবেন?

সেরকম মনে হতেই পারে- যদিও অনেক নয় সংখ্যাটা, কেউ কেউ আমার সিনেমা কেনে আর দেখে- এনারাও একটা দর্শকশ্রেণি। যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি না যে, প্রকাশের মাধ্যমকে সংযোগের আমর্ম ইচ্ছেতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করলে আপনি ভালো কিছু করতে পারবেন।

সংযোগের আমর্ম ইচ্ছে’- শিল্পের জন্যে খুব চমৎকার একটি সংজ্ঞা; তাহলে কেন আপনি এতো দামী একটি শিল্পমাধ্যম বেছে নিলেন? কেন সঙ্গীত, চিত্রকলা, লেখা বা বক্তা হওয়ার মাধ্যম বাছেননি?

আমি নিজেকে মাঝে মাঝে প্রশ্নটা করি। আমাকে জিজ্ঞেস করে লোকজন। যখন আমি সিনেমাস্কুলে যেতাম তখনই আমাকে জিনিয়াস বলা হতো।বলা হতো, আমিও যাতে লেগে থাকি, তাই লেগে আছি।

অন্যভাবে বললে, আপনি অনুভব করলেন যে সকলে আপনাকে এই শিল্পমাধ্যমে গ্রহণ করেছে?

না কিন্তু এটা এক ধরণের তৃপ্তি, আস্বাদন যার দরকার আছে। সিনেমা এক রকমের ব্যাধি। এটা অহর্নিশ জেগে থাকে ভেতরে কাউকে লোকে গ্রহণ না করলেও। অতীতে আমার সময়টা খুবই জটিল ছিলো। কিন্তু সিনেমা তখন সবাইকে আঁকড়ে রাখতো একসাথে। এটা কেবল নিজেকে প্রকাশের মাধ্যম না যাপনের একটা ধরণও বটে।

তাহলে আমরা আপনার নতুন ছবিতে, আলেকজান্ডার চরিত্রটিকে আপনার অল্টার ইগো হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। তাঁর অফিসের দেয়ালে দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ারের পোস্টার এবং আমি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করি এবং বিশ্বাস করি যে সকল গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাই আত্মজৈবনিক। আপনি, তারকোভস্কি আর ফেলিনিই পেরেছেন সিনেমা মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিত্ব সেরা উপায়ে তুলে ধরতে। কিন্তু আমি টের পেলাম, আলেকজান্ডার চরিত্রে এক ধরণের ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। এক ধরণের মৌনতা, নিজের পেশা নিয়ে এক রকমের মোহমুক্তি। আপনার ব্যক্তি জীবনের সাম্প্রত বর্তমানের সাথে এর কি কোন সম্পর্ক আছে?এই সিনেমাটা কি আপনারএইট এন্ড হাফ?’

হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছি, আপনি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছেন। কখনো কখনো যাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তরশক্তি খানিক নড়বড়ে হয়ে যায়। একাধিকবার, এই সিনেমা চলাকালীন সময়ে আমি চেয়েছি কাজটা বন্ধ করে দিতে। মানুষজন বলতে শুরু করেছিলো- কাজটা শেষ করতে আমি এতো সময় কেন নিচ্ছি! দুটো উত্তর ছিলো আমার কাছে। দুটোই খুব ঠিকঠাক উত্তর। প্রথমটা হচ্ছে, প্রধান চরিত্র অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং আমাদের তাঁর জন্যে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। দ্বিতীয় উত্তর, আবহাওয়া, পরিস্থিতি সবদিক থেকেই অনুকূলে ছিলো না। তবু আমরা সামনের দিকে এগিয়েছি। প্রতীক হিসেবে উৎসবটা তৈরি করেছি। আমি অনেক বেশি করে বুঝতে পেরেছি যে সিনেমা বানানোটাও একটা প্রতীক। প্রায়ই আমি জেনেবুঝেই, একটা প্রশ্ন দিয়ে সিনেমাটা শেষ করতে চাই। এটাই দেরীর আসল কারণ। আমার নিজেকে নিয়ে সমস্যা হচ্ছিলো।

আমার জন্যে সিনেমা নির্মাণ করাটা পেশা নয়। আমি নিজেকে পেশাদার চিত্রপরিচালক ভাবি না। আমি তো অন্যভাবেই বাঁচতে পারতাম। অতএব,কেন? কারো সাথে কথা বলতে, সংযোগ ঘটাতে? কানে যেতে চাই? পুরষ্কার জিততে চাই? ঘুরে বেড়াতে চাই অনেক? পরিচালকের জীবন যাপন করতে চাই? না, এসব একেবারেই নয়। এই কাজটা করার সময় যখন আমি ভাবছিলাম কাজ বন্ধ করে দেবো, তখন খুব মনে হচ্ছিল, গ্রামে চলে যাই আর কোনো কাজ না করে বসে থাকি। পুরো সিনেমাটা তৈরিই হয়েছে আমার এক গভীর ব্যক্তিগত সংকটের সময়ে। সকলকে বলতে পারার পক্ষে কথাটা খুবই সহজ কিন্তু আমার আমির সাথে এর একটা গভীর সম্পর্ক আছে।

এই সিনেমার শক্তি হচ্ছে সিনেমাটা অনুভব করা যায়- আপনার কি মনে হয়?

আমি অজস্র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছি। আমি জানি, আমরা সকলেই এর ভেতর দিয়ে গিয়েছি কিন্তু আমার ভেতর এই টানাপোড়েন গভীর এক ক্ষত রেখে গেছে। এটা সম্ভবত আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন আঘাত যাতে আমাকে ভুগতে হয়েছে। এই সিনেমায় এই ব্যাপারটারও একটা ভূমিকা আছে।

তাহলে, ছোটো নাচের দৃশ্যটা জীবনবোধের উদযাপন?

এটা বাচ্চাদের খেলা থেকে নেয়া। সাদা কালো ছক থাকে এবং নিয়ম হচ্ছে দুয়ের মধ্যকার লাইনে আপনি পা দিতে পারবেন না।

শৈশবের স্মৃতি- বাস্তবের সাথে মানুষের সম্পর্ককে অনেক সহনীয় করে তোলে, বিপর্যয়ের মুহূর্তগুলিতেও। নাচটা আসলে বেঁচে থাকারই একটা উপাদান। যখন সকলে নারী, প্রেম, মঞ্চ সব তাঁকে হিম একাকীত্বে ফেলে চলে যাচ্ছে।

অনুভূতিটা থাকে- ছবিটা তোলার সময় আমি আবিষ্কার করেছিলাম মানুষটা বিদায় জানাচ্ছে। চলে যাচ্ছে এক নিরুদ্দেশ যাত্রায় যা কিনা সিনেমার জন্যেও এক যাত্রা। ভয়েজ টু সাইথেরা হয়তো তেমন ধরণের সিনেমাই যা সে বানাতে চেয়েছিলো। এটা প্রথম স্তর,কিন্তু অবশ্যই প্রতীকটা পরিষ্কার,- যেন সে সত্যিই একটা যাত্রায় বেরিয়ে পড়ছে, বিদায় জানাচ্ছে সবাইকে। তাঁর বাড়িকে, তাঁর স্ত্রীকে, তাঁর চারপাশের লোককে, তাঁর সবকিছুকে। অনেকটা আন্সারিং মেশিনে মেসেজ রাখার মতো-‘ আমি সাইথেরায় যাচ্ছি।’

আরো সিনেমা আপনার কাছ থেকে পাচ্ছি তো?

আমার খুবই ইচ্ছে আছে দ্রুততম সময়ের ভেতর আরেকটা সিনেমা বানাবার। আমার মনে হয়, সিনেমা বানাবার এতো তীব্র ইচ্ছে আমার কখনো এর আগে হয়নি, এখনকার মতো। এটা এক রকমের সন্তান জন্মের আনন্দ। মুক্তির আনন্দ।

মেগালোজ্যান্ড্রাস এবং দ্য হান্টার্স নিয়ে আমার কিছু সমস্যা হচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো একটা আন্তর দ্বৈরথ আছে, একটা নির্যাতিত আত্মার কাজ এই ছবি দুটো। ভয়েজ টু সাইথেরায় বৃদ্ধ মানুষটাকে তাঁর আত্মার সঙ্গীর সাথে আপনি খুবই অল্প আয়োজনে মৃত্যুযাত্রায় পাঠিয়ে দিলেন-

আলেকজান্ডার দেখছে, দুজন বৃদ্ধ মানুষের চলে যাওয়া। যেন সে-ই চলে যেতে দিচ্ছে। এটাই হচ্ছে, স্বাধীনতা। নাড়ী ছিন্ন করে ফেলা স্বাধীনতা।

এটা কি কমিউনিস্ট আদর্শ যাকে আপনি দূর মৃত্যুযাত্রায় পাঠাচ্ছেন?

এটা খুবই বাঁধা গতের কথা। এটা এক গোটা ঐতিহাসিক সময় যে সময়টা এক অবসেশনে, একটা ট্রমায় পরিণত হয়েছে। এই সময়টা মোহমুক্তি ঘটিয়েছে অনেকের যার কথা একটু আগেই বলছিলাম। সকল মোহ হারিয়ে গেছে। আমার কাছে, এই সিনেমায়, মানুষটি শেষ পর্যন্ত সহজবোধ্য। তাঁর আত্মপরিচয়ের সংকট আছে, তিনি নিজেকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন কিন্তু নিজের ভেতরেই একটা স্পষ্টবাদীতার ঝোঁক আছে তাঁর।

আপনি তাঁকে এতো নিঃসঙ্গ করে নির্মাণ করলেন কেন? কেন কারো সাহায্য পেতে দিলেন না?

কারণ তাঁকে নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। এটাই তাঁর একমাত্র উপায়। কোনো ব্যক্তি বা বস্তু তাঁকে সাহায্য করতে পারবে না। ভালোবাসাও না। বাইরের কিছুই না। এই নিঃসঙ্গতা তাঁর অস্তিত্বের নির্যাস, অস্তিত্বের স্বায়ত্ত্বশাসন।

আপনি সংযোগের আমর্ম ইচ্ছের কথা বলেছেন, আমি অত্যন্ত সচেতন যে একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তের দর্শন এই কথাটা শেখায় যে কেউ নিজেকিছুনা হয়ে কাউকে সেটা দিতে পারে না।আমার নিজের মত হচ্ছে- ‘হওয়ামানে হচ্ছে অন্য মূর্ত সত্ত্বার সাথে সংযোগ স্থাপন। অথবা একজনের বেশি, অবশ্যি একজন দিয়েও চলে। ঈশ্বর সোডোম নগরী ধ্বংস করতেন না যদি অন্তত একজন পুণ্যবান সেখানে থাকতেন। সুতরাং, একা হওয়া যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে কি করে সংযোগ আর অনুভূতি ঘটবে? শত হলেও, আমরা গোষ্ঠীবদ্ধ প্রাণী।

অস্তিত্বের সমস্যা প্রত্যেকের নিজেকেই সমাধান করতে হবে। কিন্তু সৃজনশীল যাত্রাপথে ‘হওয়া’ মানে সবকিছুর আগে ‘বুঝতে পারা’ । নিজেকে বুঝতে পারা। সৃষ্টিতে, সংযোগ ঘটাতে অন্তত দুটি সত্ত্বা লাগে। দুইয়ের মধ্যে যা ঘটে তা-ই সৃষ্টি।

কিন্তু ভয়েজ টু সাইথেরায় আলেকজান্ডারকে মেনে নিতে হয়েছিলো যে সে কারো সাথে সংযোগ ঘটাতে পারবে না।

আপনার মনে পড়বে- ছবির শেষে ‘সমাপ্ত’ বলে কোনো চিহ্ন দেগে দেয়া হয়নি। আমার মতে, ছবিটার আরো কিছুদূর যাওয়ার আছে। ফেলিনি আর আন্তোনিওনির সিনেমার বেলাতেও একই কাণ্ড- সিনেমাগুলি কখনোই শেষ হয় না। আমার মধ্যেও ব্যাপারটা ঘটে। দর্শকেরও মনে হয় এরপর আরো দৃশ্য আসবে কিন্তু কেউ জানে না দৃশ্যমালার গন্তব্য। আমি নিজেও জানি না, আলেকজান্ডার এরপর কি করবে!

এই কথা সত্য যে, এই সিনেমায় একটা ক্রমাগত পরিত্যাগের অনুভূতি আছে।আবার একটা নতুন প্রস্থানবিন্দুও আছে। একটা চলে যাওয়া যা সবাই জানে কোনো একটা নির্দিষ্ট যাত্রা সম্পর্কে। সাইথেরার দিকে যাত্রা নয় এই ছবিটা, সাইথেরার জন্যে যাত্রা।

এখন এই তথ্যে একটা বৈপরীত্য টের পাওয়া যাচ্ছে যা আপনি বলেছিলেন, কিছু মানুষ আপনার ছবি দেখে এবং কেনে যদিও আপনি জানেন না তাঁরা কারা। এই সিনেমা আশাযাপনের ইছেপত্রে পরিণত হলো

আমি আশা করি, আপনার সাথে দ্বিমত করতে সক্ষম হবো। একনায়কতন্ত্রের সময়, আমি শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়িয়েছি, সারা গ্রিস জুড়ে, ছাত্ররা নিমন্ত্রণ করেছিলো, ফিল্মক্লাবগুলি ডেকেছিলো- বড়ো শহরে এবং সবচেয়ে ছোটো গ্রামগুলিতেও। সিনেমা দেখিয়েছি। আলোচনা করেছি। আমি এসব করেছি আমার প্রথম ছবি রিকনস্ট্রাকশন, ডেজ অফ থার্টি সিক্স এবং দ্য ট্রাভেলিং প্লেয়ারের জন্যে। শেষ যে সিনেমার জন্যে ঘুরে বেড়ালাম তার নাম হলো দ্য হান্টার। আজকাল আমার এসব কাজ করবার দরকার পড়ে না। একনায়কতন্ত্রের সময় এটা খুবই কাজ দিয়েছিলো, জরুরীও ছিলো। এটা হচ্ছে সিনেমার জন্যে সাধারণত যে যোগাযোগ ঘটে তার সীমার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। আমি আমার দর্শকদের তখন চিনেছি। আমার সিনেমাটা ইচ্ছেপত্র নয় তবে একটা বাহন।

এই যে বলছেন আরেকটা ছবি বানানোর জন্যে আকুতি বোধ করছেন তার সাথে কি আলেকজান্ডারের স্বাধীনতার অনুভূতির কোনো যোগ আছে? শেষ অব্ধি তার ভাবনার, অনুসন্ধানের কোনো পথ সে খুঁজে পেলো কি?যদি পেয়ে থাকে সেটি কি?

আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর- নিশ্চিতভাবেই- হ্যাঁ। দ্বিতীয় অংশের উত্তর আমি নিজেই এখনো খুঁজে চলেছি। তবে যে যন্ত্রনা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেটা থেকে মুক্ত হয়েই উত্তর খুঁজে পেতে হবে আমার।

এই অনুভূতি ঠিক আমারো। আমি ভাবছিলাম, ছোটো নাচটা যা তিনি নেচেছিলেন, যা আমরা আগেই আলোচনা করেছি সেটা আরেকটা সিনেমার শুরু। হয়তো অন্য কারো জীবনের কথা। আমি আপনাকে চিনতাম না- আজকের আগে আমি জানতাম না আপনার স্ত্রী আছেন, কিভাবে আপনি জীবনটা যাপন করেন, আপনি আগে কি ছিলেন- কিন্তু এই সিনেমাটা আমাকে এই অনুভূতিই উপহার দিলো- অনুভূতিটা হচ্ছে, দুনিয়ায় একমাত্র অনুসরণযোগ্য জিনিস বিপুল আনন্দের সাথে যুক্ত জীবন, প্রকৃতির সাথে তন্নিষ্ঠ সংযোগের জীবন- আমি জানি না, বেড়ালেরা হয়তো...

সত্যি বলতে কি, আমি টমেটো চাষ শুরু করেছি।