সত্যজিৎ দাস

সিনেমা মানুষকে ভাবায়, এটা সত্যি সত্যজিৎ দাস


[ সত্যজিৎ দাসের জন্ম কলকাতায়, ১৯৯৬ সালের ২ জুন৷ ছেলেবেলা কেটেছে কলকাতাতেই৷ পড়েছেন কলকাতার একটি স্কুলে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের বিষয়ে স্নাতকোত্তর। সাথে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা দিল্লিতে ৷ অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে প্রথম কাজ বড় ছবিতে ৷ প্রথম ছবিই কানস, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ৷ পরবর্তী ছবি লন্ডন, আইএলও, এনএফডিসি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে৷ সাথে আরো চারটি বড়ো ছবিতে বিশেষ ডাক অ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর হিশেবে ৷ তারপর ছোটো ছবি দিয়ে নিজের পরিচালনা শুরু ৷ ‘ঋতুবেশে রুদ্রাণী’ টেলিভিশন মহালয়া অনুষ্ঠান দিয়ে শুরু৷ ৷ পরবর্তী ছবি ‘একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যত’, যেটি এই মুহূর্তে আলোচনায়। সাথে বড়োছবি দিয়ে এইবছরে পদার্পন৷ আগামীতে নিজের লেখা ২০ টি বড়ো ও ৮০টি ছোটো ছবি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে নতুন ও পরিচিত অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের নিয়ে ৷সম্প্রতি কথাবলির সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন তার কাজ, স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে।]

 কখন থেকে সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন ?

ছোটোবেলায় ছবি দেখতে খুব পছন্দ করতাম, কিন্ত ছবি দেখতে দেখতে লক্ষ্য করতাম দৃশ্যগুলো কিভাবে তুলছে৷ ক্যমেরার ব্যপারটা খুব টানতো আমায় বরাবর। সেখান থেকেই ভালোলাগা শুরু তারপর জানতে শুরু করি বিষয়টাকে ৷ পড়ি , রিসার্চ করি ৷ দিল্লীতে  পড়তে সর্বপ্রথম একটি বড়ো ছবি অ্যাসিস্ট করার সুযোগ পাই ৷ সেই কাজটি করে আমার নিজের অনেক অভিজ্ঞতা হয় , অনেক হেল্প পাই কাছ থেকে জানার ৷ সেই ছবিটি সব থেকে বড় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নির্বাচিত হয় ‘CANNES-MARCHE DU FILM" সাথে BERLIN, CANADA আরো কিছু ফেস্টিভ্যাল এর অংশ ছবিটি৷ এখন তো ছোটোছবি খুব নাম করছে ৷ ফেস্টিভ্যারের মতো জায়গায় সন্মান পাচ্ছে ৷ সেই থেকেই আমার নিজের ভাবনা থেকে ছোটোছবি তৈরির কথা ভাবলাম ৷ শর্ট ফিল্ম এর মাধ্যমে নিজের কথা অনেক সহজেই তুলে ধরা যায় ৷ 

আপনি তো  কয়েকটি ফিচার ফিল্ম ডিরেকশনের সঙ্গে জড়িত , সেই অভিজ্ঞতা বলুন?

খুব সুন্দর অভিজ্ঞতা ৷ প্রথম যখন ছবি অ্যাসিস্ট করার সুযোগ পাই , নিজের স্বপ্নের প্রথম ধাপ ছিলো সেটি ৷ সারাদিন ডিরেক্টরের সাথে বসে আলোচনা, আরো ছবি দেখা, কনসেপ্ট ক্লিয়ার করা, খুব এনজয় করতাম, আর সব থেকে ভালো লাগে প্রতিটি ছবি যখন পৃথিবীর সবথেকে বড়ো ফেস্টিভ্যালগুলিতে দেখানো হয় ৷

আপনার এর মধ্যে কোনো ফুল লেন্থ সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা আছে ? থাকলে তা কেমন ? কীসের ওপর ?

হ্যাঁ ৷ শীঘ্রই একটি পরিকল্পনা রয়েছে ৷ যেটি বাস্তবায়িত হতে চলেছে ৷ আমি বিশ্বাস করি বাস্তবকে ৷ বর্তমান পরিস্থিতি তে ঘটে চলার ওপর একটি ঘটনার ওপর আমার লেখা গল্প একটি গ্রামের ঘটনা ৷শীঘ্রই দেখতে পাবেন ৷

কার সিনেমা দ্বারা আপনি প্রভাবিত ?

আমি বরাবরই বিদেশি ছবি দেখতে পছন্দ করি ৷ সেখান থেকে গোদার, ফ্যঙ্কয়িস , তারকোভস্কি, আরো আছেন ৷ আর বাঙলায় মৃনাল সেন , সত্যজিৎ রায় , ঋত্বিক ঘটক  আর নতুনের মধ্য ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং অপর্ণা সেন ৷

কার কাজ আপনাকে অনুপ্রেরণা দেয়?

কোয়েন্টিন টরান্টিনো , আলফ্রেড হিচকক্ , মৃনাল সেন এবং সত্যজিৎ রায় ৷

ঋতুপর্ণ ঘোষের পরে আমি বাংলা সিনেমায় তার মতো পরিপূর্ণ কাউকে দেখছি না ৷ এই ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?

দেখুন ঋতুপর্ণ ঘোষ কেনো, সত্যজিত রায়, মৃনাল সেন এর মতো পরিপূর্ণ কাউকে কি দেখছেন? 
তারা যা সৃষ্টি করেছেন সেটা সম্ভব নয়, তাদের মতো ছবি করার জন্য কিছু নতুন প্রতিভা সম্পন্ন ডিরেক্টর চেষ্টা করছেন , এখন তো বেশির ভাগ ইনডিপেন্ডেন্ট ছবি তৈরী হচ্ছে যেগুলো অনেকেই দেখতে পারছে না , তার মধ্যে কি ভালো ছবি হচ্ছে না? যেমন- মানস মুকুলের ‘সহজ পাঠের গপ্পো, এমন আরো  অনেক পরিপূর্ণ ছবি আমরা দেখছি৷
আমাদের এটা মানতে হবে যে তাদের মতো ছবি যেমন করা সম্ভব নয়, তেমনই কিছু ভালো ছবিকে না মেনে নেয়া টা অসম্ভব৷

আপনি সিনেমা বানান বা বানাতে চান কি দায় থেকে না ভাবাবেগ থেকে ?

দায় পড়ে সিনেমা বানানো তো আমার দ্বারা হয়  না৷ আমি বিশ্বাস করি যোগ্যতা যার আছে তাকে দিয়ে কাজ করানোর ৷ আর সেটা আমি নিজে খুজি ৷ শিল্প বেচে খেলেও সেটাকে সন্মানের সাথে করি, সিনেমাকে ভালোবেসে সিনেমা বানাই ৷ যেহেতু আগেই বলেছি , বাস্তব ঘটনাকে আমি দর্শককে দিয়ে রিলেট করাতে পারি সেহেতু এই পরিস্থিতি আমাকে ছুয়ে যায় তাই সেটি দর্শকের মধ্যে তুলে ধরি প্রতিবারই ৷

দায় বলতে সামাজিক/মানবিক এই জাতীয় দায়ের কথা বুঝিয়েছি আমিএই জাতীয় কোনো দায় কি অনুভব করেছেন? 

না , সেরকম কোনো দায় অনুভব করিনি ৷আমি ভেবে করলে যে সেরকম ভাবে চরমপ্রতিফলন হবে সেটা একদম ই না ৷ তবে হ্যাঁ , সিনেমা মানুষকে ভাবায় এটা  সত্যি ৷তার থেকেই বানানো একটু হলেও মানুষ ভাবতে শেখে ৷

আপনি সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, কাহিনি স্ক্রিপ্ট নাকি সিনেমাটোগ্রাফি?

আমার কাছে অবশ্যই সবার আগে প্রাধান্য পায় শুধুমাত্র 'কাহিনী'৷কাহিনী টাচ্ করলে আমি ছবি করতে উদ্যত্ হই৷তারপর অভিনয় ৷ আর ছবি করতে গেলে বাকি বিষয় গুলি তো মাথায় রাখতেই হয় ৷ 

এই মুহূর্তে কি নিয়ে কাজ করছেন ?

এই মুহূর্তে বড়োছবির প্রি-প্রোডাকশন নিয়ে ব্যস্ত ৷ দিনরাত ছবির মিটিং , রিসার্চ নিয়ে কাজ ৷

আপনার ‘একটি অনিশ্চিত ভবিষ্য’ নিয়ে কিছু বলুন

এটা  আমার  ছোটো একটি ছবি ৷ এখানে একটি রাস্তার একটি বাচ্চা ছেলে ও মেসে থাকা একটি ছেলের গল্প৷ সিনেমাটি এই এপ্রিলেই আসবে  ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যশনাল ফেস্টিভ্যালে ৷

সিনেমার প্রিয় কোন চরিত্র মনে পড়ে প্রথমেই? 

নীলকান্ত বাগচী, ঋতিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্ক  আর গপ্পো’।

বাপ্পাদিত্যের সিনেমা কেমন লাগে? ধরেন ‘শিল্পান্তর’ কিংবা ‘হাউজফুল’?

বাপ্পাদিত্য দার ছবির মধ্যেও বাস্তব ব্যাপারটা আছে ৷ ছবির মাধ্যমে যে ক্যানভাস টা তুলে ধরেছে সেটা খুব টাচ্ করে আমায় কিছু সিনেমায় ৷ যেমন- শিল্পান্তর, শহরা ব্রিজ, হাউজফুল তো অনবদ্য ৷

বাঙলাদেশি সিনেমার প্রধান দুর্বলতা কী বলে আপনি মনে করেন? 

সিনেমার নির্মাণ দুর্বলতা, কাহিনির বৈচিত্রহীনতা, হলের মানসম্পন্ন পরিবেশের অভাবসহ নানা বিষয় ৷ কয়েকটি হাতে গোনা সিনেমা ছাড়া তেমন ভালো সিনেমার কাজ  নেই বাঙলাদেশে ৷

আপনার নিজের কি কখনো অভিনয় করতে ইচ্ছে করেছে সিনেমা কিংবা মঞ্চে? সিনেমায় হলে কার সিনেমায়? মঞ্চে হলে কোন চরিত্রে? 

হ্যাঁ৷ অভিনয়ের ইচ্ছা তো অবশ্যই রয়েছে৷ মঞ্চে অভিনয়ে বেশি আগ্রহী আমি৷ তবে সিনেমায় একমাত্র আমি বাঙলাদেশের ডিরেক্টর গিয়াসউদ্দীন সেলিমের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা রাখি৷ আর মঞ্চে যে কোনো চরিত্রে আমি  আগ্রহী ৷

সিনেমার বাইরে আর কী করেন জাতীয়? লেখালেখি ,মিউজিক? 

গল্প লিখতে ভালোবাসি , কবিতা লিখি ৷ মিউজিক নিয়ে জানতে শুরু করেছি ৷

হংকং এর সিনেমা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? ধরেন ওং কার ওয়াই? তার সিনেমা? 

আমায় বরাবরই ফ্রেঞ্চ সিনেমা টানে তাই খুব একটা না জানলেও দেখেছি কিছু ছবি ৷ ওং কার ওয়াই এর ছবিতে তার কালার গ্রেডি টা মারাত্মক আর মিউজিক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট দারুণ লাগে ৷

সিনেমা সবসময় কি সবশ্রেণির দর্শকের জন্য বানানো দরকার?

অবশ্যই ৷ শিল্পের কোনো ভেদাভেদ হয় না ৷ সিনেমার মাধ্যমে দূরদুরান্তের মনে পৌছে যাওয়া যায় ৷ মানুষের যে অনুভূতি তা ছবির মাধ্যমে প্রকাশ পায় ৷ এটা আমি নিজে অনুভব করেছি ৷